পয়লা বৈশাখ। পয়লা অর্থ প্রথম। শব্দটির উৎপত্তি ফারসি শব্দ থেকে। সূত্র অনুসারে আকবরের শাসনকালে ফসল কাটার সময়ের সাথে কর দেবার বছর মেলানোর জন্য বাংলায় এই ক্যালেন্ডার চালু করা হয়। বাংলা “‘সন” বা “সাল” শব্দদুটিও এসেছে যথাক্রমে আরবি এবং ফারসি শব্দ থেকে। আবার অন্য একটি সূত্রের মতে সপ্তম শতাব্দীর ভারতীয় রাজা শশাঙ্কের সাথে বাংলা পঞ্জিকার সংযোগ আছে। শতাব্দী প্রাচীন দুটি শিব মন্দিরে “বঙ্গব্দ “শব্দটি পাওয়া যায়। বাংলা নববর্ষের উৎসব উদযাপনের উৎস,পুরনো ঢাকার মহিফরাস সম্প্রদায়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। ফসল কাটার উৎসব। চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব বকেয়া কর বা পাওনা মিটিয়ে নতুন খাতা অর্থাৎ হালখাতা চালু করা হতো। এই “হাল “শব্দটিও ফারসি শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ নতুন। ফসল কাটার সাথে লাঙ্গল বা হাল যুক্ত তাই সেখান থেকেও এই হালখাতা শব্দ আসতে পারে বলে মনে করা হয়। পয়লা বৈশাখ বাঙ্গালীর একান্ত নিজস্ব উৎসব, বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠী ধর্ম বর্ণ ভাষা সংস্কৃতিকে হৃদয়ে মননে ধারণ করেছে, আপন করেছে সেই বাঙালি, যার বুক চিরে দিয়েছে দেশভাগের নৃশংস ছুরি। সেই বাঙালির, যে তারপরেও মেয়ের বিয়েতে বিসমিল্লাহর সানাই বাজিয়েছে যাতে সব শুভ হয়, মঙ্গল হয়। আজ পয়লা বৈশাখে লিখতে বসে ক্যালেন্ডার দেখতে হয়, বাংলার কত সাল? ১৪৩৩। এইভাবেই বুঝি বাঙালি তার ঐতিহ্য ভুলতে বসেছে। আজ সারাদিন ইংরেজি মাধ্যমে পড়া আমাদের ছেলেমেয়েগুলিকে বা বাংলা মাধ্যমে পড়া আমাদের বাচ্চা গুলি যাদের স্কুলগুলিতে এখন পুলিশ মিলিটারি ঘোরাঘুরি করছে কবে পড়া আবার হবে জানা নেই, সেইসব বাচ্চাদের বলতে হবে আজ ১৪৩৩। বাঙালির একটা নতুন বছর শুরু হল।
শুভ নববর্ষ বলা উচিত কিন্তু কিভাবে বলব জানি না। আর কদিন পর এই বাংলায় গণতন্ত্রের উৎসব ভোট। আমরা যাব সেই উৎসবে, যেতেই হবে, সে আমাদের দায়িত্ব কিন্তু কোন মন নিয়ে যাব? লক্ষ লক্ষ আত্মজনের নাম বাদ হয়ে গেল। আমরা যারা এখনো নিশ্চিন্তে আছি তারা অনুভব করতে পারছি না বাস্তচ্যুত হওয়ার ভয়, রাষ্ট্রচ্যুত হওয়ার ভয় কেমন হয়। মন খারাপ হওয়ার কথা, কান্না পাওয়ার কথা, ভয়ংকর রাগ হওয়ার কথা প্রতিবাদে ফেটে পড়ার কথা আমাদের, যদি আমরা প্রকৃতই মানবিক হই। চোখ কান বন্ধ করে “আমার কি?” ভেবে যারা বসে আছেন হয়তো তারা ভাবছেন ভালো আছেন। আসলে না।” শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে, এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার, লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার”। বেঁচে মরে আছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। নাবালিকা বিবাহ বেড়েই চলেছে। কেন? একদিকে হাতের মোবাইলে ঝকমকে দুনিয়া অন্যদিকে ঘরে অভাব, মা-বাবা বিরক্ত, বকাবকি। সে রোমিওর হাত ধরে দুর্গতির পথে চলেছে। অথবা মা বাবা অতি উচ্চাভিলাষী। নম্বরের পেছনে ছুটছে একটা প্রজন্ম। পাশের গলিতে একটি মেয়ে নিখোঁজ। তার খোঁজ নেওয়ার সময় নেই কারো। টাকার জোর থাকলে তুমি বিদেশ চলে যাও না থাকলে তুমি ডেলিভারি বয় অথবা ক্যাব চালক। এরা মালিকদের চেনে না। রক্তকরবীর রাজার মতো আড়াল থেকে কাজ চালায় মালিকরা। আমরা খুব ব্যস্ত। আমাদের এইসব ছেলেমেয়েদের অধিকারের দাবিতে সরব হতে পারি না। কেউ সরব হলে, মিছিল করলে আমরা বলি ‘এদের কোন কাজ নেই’। এই বৈশাখের গরমে আপনার দরজায় বেল বাজাবে যে ঘামে ভেজা ছেলেটা তাকে অন্তত এক গ্লাস জল দেবেন। পারলে দুটো বাতাসা। বাঙালি এককালে করত এটা। ঋতুকালীন ছুটি নিয়ে বিচারালয়ে বিতর্ক হচ্ছে, ভালো কথা। শপিংমলে যে মেয়েগুলি সারাদিনে একবারও বসার অধিকার পায় না, একবার তাদের কথাও বলব কি আমরা? কখনো ওইসব মলের বেসমেন্টে পার্কিং লটে যে ড্রাইভাররা মালিকের অপেক্ষায় থাকে তাদের কেমন লাগে কতটা কষ্ট হয় ভাববো আমরা? অথবা ট্রাফিক পুলিশ ভাই? রাস্তার মোড়ে চরম রোদে গরমে তাদের কোন সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে? নর্দমা পরিষ্কার করতে গিয়ে যে শ্রমিক পাঁকে, বিষে মরে যায় তার কথা? ইলেক্টোরাল বন্ডে টাকা নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলির এগুলি ভাবার কথা নয়। তাদের অনেক বড় বড় ভাবনা আছে। কি করে আর জি করের তথ্য প্রমাণ লোপাট করবে, কি করে চাকরি চুরি করে ration চুরি করে জেলে গিয়ে ফিরে এসে আবার ভোটে দাঁড়াবে, কি করে ধর্ম ধর্ম করে মানুষকে লড়িয়ে দিয়ে সেই সুযোগে জল জঙ্গল ভাতের হাঁড়ি সব দখল করবে। এই ভাবনা ভাবতে হবে তাদের যারা বারবার ঘর ছাড়া হয়েছে, যাদের চোখের সামনে মা-বাবাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে, যার শিশু কন্যার কলিজাটা বোমার আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়েছে তার মায়ের চোখের সামনে, যাদের বাড়ির পুরুষগুলি সব রাজ্যের বাইরে আর রাতে বাড়িতে দরজায় টোকা মারে দুষ্কৃতীরা। বিরোধী দল করার জন্য জরিমানা দিতে হয় অথবা মার খেয়ে মরে যেতে হয়। ভাবতে হবে সেই সব বাঙালিকে যারা আজও একটি ডাক্তার কন্যার খুন ধর্ষণের পর পথে নেমে এসে আওয়াজ তোলে “রবীন্দ্রনাথের এই মাটিতে ধর্ষকদের ঠাঁই নেই”। জুলিয়াস সিজার থেকে চারু মজুমদার, ভালো পাহাড়ের উপর থেকে একটা স্কুল অথবা একটা আকাশ ভরা জানলা। সেই জানলার বাইরে রক্তকরবীর নন্দিনী অথবা উড়ন্ত তারাদের ছায়া দেখা যায়। সত্য আর স্বপ্নের মেলবন্ধন যে বাঙালি, মঞ্চের মধ্যে করেই চলেছে অনুদান থাকুক বা না থাকুক। যে বাঙালি শত বিরোধ সত্ত্বেও আমাদের প্রাণের সাথী রাহুল অরুনোদয় চলে যাবার পর চোখের জলে বলতে পারে আমরা এক হয়ে রাহুলের মৃত্যুর বিচার চাই। সেই বাঙালির মনটুকু বাঁচিয়ে রাখা খুব জরুরী। সেই মনটুকু থাকলে গাড়ির হর্ন অত জোরে বাজাবো না। গাছ কাটলে রুখে দাঁড়াবো। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ছেলে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় ভাববো এই বাংলায় নিরুপমারা আজো পনের জন্য মারা যায়, ভাববো এত জৌলুসের বিলাসিতার প্রদর্শন করে সাধারন মানুষের দুর্নীতিগ্রস্ত হবার পথ প্রশস্ত করছি কিনা। যে কোন অনুষ্ঠানে নেশার আয়োজন করার সময় মনে রাখবো গ্রামেগঞ্জে নেশায় বুঁদ হয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে ভবিষ্যতের বাংলা শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটু সংযমী হওয়া শুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তা নাহলে শত্রুর সাথে লড়বো কি করে? বর্তমান রাজ্য শাসক দল আর কেন্দ্রের শাসক দল এদের মূল অস্ত্র তো সেই দুটি, লোভ আর ভয়। বাঙালি কিন্তু প্রমাণ করেছে ১৪ ই আগস্ট ২০২৪, তারা ভয় পায় না আর সকলেই তারা লোভী নয়। পরের মেয়ে নয়, অভয়া আমার ঘরের মেয়ে এই ভাবনা যারা ভাবতে পেরেছে তারা স্বার্থের বেড়াজাল ডিঙানোর রাস্তা পেয়ে গেছে। ভালবাসার গান বাঙালি গাইতে জানে। ভালোবাসার জন্য প্রাণ বাঙালি দিতে পারে। লালন আমাদের রক্তে, “এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে”।
ওপার বাংলায় মাজারের পীর সহ অসংখ্য হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষকে যারা খুন করছে, তারা আমাদের কেউ নয়। নিপাত যাক তারা, আবার এবার বাংলায় যারা নির্দোষ মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের উপর অন্যায় অবিচার করছে, তাদের জন্য অনন্ত ঘৃণা। এই প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন মনে আসে। ইসলাম খ্রীস্টান ও ইহুদি ধর্মমতে প্রথম মানব আদম প্রথম মানবী, হাওয়া। হিন্দু ধর্মেও একইভাবে মনু ও শতরূপা প্রথম মানব মানবী। বিজ্ঞানীদের মতে আধুনিক মানুষের আদি নিবাস ছিল আফ্রিকা অর্থাৎ কয়েকজন আফ্রিকা নিবাসী থেকে গোটা মানব সমাজের উৎপত্তি। এখন তাহলে ধর্মমত অনুযায়ী আমরা সকলেই একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকেই সবাই জীবন পেয়েছি। তাহলে সকলেই জন্মগতভাবেই আত্মীয়। এরপরেও এত বিভাজনের গল্প কারা কি উদ্দেশ্যে রচনা করে? তাহলে কি তারা নিজেদের ধর্ম মানেন না? নাকি অন্য কোন স্বার্থ আছে? অনুসন্ধান জরুরী। এমনও স্বপ্ন দেখি পৃথিবীর সব শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ একদিন বিচারালয়ে যাবে ট্রাম্প, আম্বানিদের মতো বড়লোকদের বিরুদ্ধে এই বলে যে আমাদের আদি বাবা-মার সম্পত্তির সমানাধিকার চাই।
বৈশাখের এই বাংলায় দুটি দল রাজতন্ত্রের ধ্বজা ওড়াচ্ছে। নির্লজ্জ সে হুংকার, পেশী প্রদর্শন। মানুষকে বিভ্রান্ত করছে ক্রুদ্ধ করছে এই বলে ,একে নামাতে তাকে দরকার তাকে নামাতে একে। অথচ আসলে এই দলগুলির কুশীলবরা একই নির্দেশকের পরিচালনায় অভিনয় করছে। এই কুশীলবদের একজন এক ফুলওয়ালিকে বলল “ভোট নষ্ট করো না”। ফুলওয়ালি বলল “আমি যে দলকে ভালোবাসি, যে দলে আস্ত কিছু মানুষ আছে, যারা বলে সব মানুষ সমান, তাদের আমি ভোট দেবো। দিলে তো সে পাবে? নাকি পাবেনা? তোমরা নষ্ট কাকে বলো? শিরদাঁড়া সোজা রেখে আমি মানুষ হতে চাই নিজের বিবেকের কাছে। চোরেদের সাথে, দাঙ্গাবাজদের সাথে থাকলে নিজে খুব খুব ছোট হয়ে যাব যে। শ্রীচৈতন্য থেকে বিদ্যাসাগর কেউ গায়ের জোরে টাকার জোরে জেতে নি। প্রেমের জোরে জিতেছে। আমার সেই প্রেম বেঁচে থাক। সেই প্রেমের বন্যায় তোমরা যাবেই ভেসে আজ নয়তো কাল।”
কে সেই ফুলওয়ালি? তার নাম কি নন্দিনী?
এই নববর্ষে তুমি এসো নন্দিনী, জাগিয়ে দাও সব বিশু পাগলদের।
গণশক্তি পত্রিকায় ১৫ এপ্রিল ২০২৬ এ প্রকাশিত।











