সুধী,
২০২৪ সালের ১০ আগষ্ট, সংবাদপত্রের সংবাদে শিহরিত হয় সারা বাংলা। যদিও ৯ আগস্ট সন্ধ্যের পর থেকেই টিভি মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে ছড়িয়ে পড়ে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কজনক দুঃসংবাদ। “আর জি করে ধর্ষণ করে খুন চিকিৎসককে – ঘটনা চাপা দেওয়ার চেষ্টা – বিক্ষোভ কর্মবিরতি পরের পর হাসপাতালে”। সংবাদে প্রকাশ – “কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে রাতে ডিউটিরত তরুণী চিকিৎসকের অর্ধ নগ্ন দেহ উদ্ধার হল শুক্রবার। এদিন সন্ধ্যায় ময়নাতদন্ত হয়েছে। তাতে ধর্ষণ করে খুনের ইঙ্গিত মিলেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি, চেস্ট বিভাগের চিকিৎসক ওই তরুণীর দেহে দশ জায়গায় আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। চোখ, মুখ, যৌনাঙ্গ সহ ১০টি জায়গায় আঘাত মিলেছে ময়না তদন্তের রিপোর্টে। ধর্ষণের পর তাকে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ গলা উঁচিয়ে বলেছেন “সেমিনার রুমে রাতে কেন সে গিয়েছিল একাকী” ! শবদেহটি আবিষ্কারের পর সর্বাগ্রে তিনি চেষ্টা করেছিলেন আত্মহত্যার তকমা লাগাতে। পরিবারকে জানানো হয়, মেয়ে আত্মঘাতী। ১৩ আগস্ট,২০২৪ মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায় “পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পুলিশ” কলকাতা পুলিশকে ভর্ৎসনা করে তদন্তের দায়িত্ব কলকাতা উচ্চ আদালত তুলে দেয় সিবিআই এর হাতে। তারপর সর্বোচ্চ প্রশাসনের মদত নিয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা। তদন্তকে বিপথে পরিচালিত করার জন্য ‘প্লেস অফ অকারেন্স’ সহ বিভিন্ন জায়গায় ঘর ভেঙে ফেলা হয়, প্রমাণ লোপাটের জন্য বহিরাগত দুষ্কৃতীরা তছনছ করে দেয় সমস্ত প্রমাণের ক্ষেত্রগুলোকে। তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী নির্দিষ্ট একজনের ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ডি সি নর্থ অভয়ার মা বাবা-কে মেয়ের জীবন ও মর্যাদার মূল্যস্বরূপ দশ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব দিয়ে তদন্ত ধামাচাপা দেবার চেষ্টা করেন। কলকাতা পুলিশ কমিশনারের সন্দেহজনক আচরণ মানুষ প্রত্যক্ষ করে। গভীর রাত পর্যন্ত বিনীত গোয়েলের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর ফোনালাপের কথা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর ভাষ্যে শোনা গেলেও কথোপকথনের বিষয় অজ্ঞাত থেকে যায়। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সন্ত্রাসরাজ কায়েমের অন্যতম মুখ, শাসকদলের ঘনিষ্ঠ এক চিকিৎসককে ফিঙ্গার প্রিন্ট বিশেষজ্ঞ হিসাবে চালিয়ে দেবার নির্লজ্জ চেষ্টা করেন ডি সি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখার্জি। মানুষের শোক আর ক্রোধ আছড়ে পড়ে রাস্তায়।
১৪ অগাস্ট মেয়েদের রাতদখল এক নতুন ইতিহাস তৈরি করে। দিকে দিকে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, কর্মবিরতি, রাস্তায় প্রতিবাদে জনপ্লাবন। আন্দোলনে উত্তাল রাজ্য, দেশ, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় শহরগুলো। সরকারী হাসপাতালের অভ্যন্তরে এক মহিলা চিকিৎসকের এই মর্মান্তিক প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার সঙ্গে যুক্ত প্রশাসন, যাকে মদত দেয় দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক। ক্ষোভ ক্রোধে রূপান্তরিত হয়ে নতুন ইতিহাস রচিত হয় এই বাংলায়।
২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায় রাতের অন্ধকারে বিলাসবহুল গাড়ির মধ্যেই ধর্ষিতা হন সুজেট জর্ডান নামে এক তরুণী। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন ‘সাজানো ঘটনা’। নারীদের ওপর ধর্ষণ, অত্যাচার আর হত্যার ঘটনায় সরকারী মদত পাওয়া সেই থেকে শুরু। গত দেড় দশকে তারপর থেমে থাকেনি বাংলা। শাসকের সক্রিয় মদতে, সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে একের পর এক ঘটনা ঘটে চলে। পার্ক স্ট্রীট, কামদুনি, কাটোয়া, কাকদ্বীপ, সাত্তোর, মধ্যমগ্রাম, ধুপগুড়ি, রায়গঞ্জ, যাত্রাগাছি, কোন্নগর, ক্যানিং – দীর্ঘ তালিকা শেষ হবে না এই লেখায়। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি পাঁশকুড়া, আমতা, উলুবেড়িয়ার ঘটনা। রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রী কখনোই নির্যাতিতা বা খুন হয়ে যাওয়া মহিলা বা তার পরিবারের পাশে দাঁড়াননি, বরং সন্ধ্যার পর রাজ্যের সব মেয়েকে বাড়ির বাইরে পা না দেবার নিদান দিয়েছেন তিনি। তিনি অভিযুক্ত শাসকের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, মদত দিয়ে গেছেন, যাতে দুষ্কৃতী কোন শাস্তি না পায় তার পরিকল্পনা করেছেন। অবাধ দুর্নীতির রাজত্বকে কায়েম রাখার জন্য সব রকম চেষ্টা চালিয়েছে শাসক। সিবিআই তদন্তভার হাতে নেওয়ায় এবং সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্ত প্রক্রিয়া চলতে থাকায় রাজ্যের মানুষ, দেশের মানুষ, দুনিয়ার সর্বত্র প্রতিবাদী মানুষ প্রাথমিক পর্যায়ে আশান্বিত হন। কিন্তু ধীরে ধীরে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের কাছে। তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে থাকে সিবিআই এর হাত ধরে। আজ সারা দেশের বড় অংশের মানুষ বিশ্বাস করেন, এই কেন্দ্রীয় এজেন্সি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন কেন্দ্রের সরকার তথা কেন্দ্রের শাসকদলের দ্বারা। আজ অনেকগুলো মাস কেটে যাওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট মূল মামলা কলকাতা উচ্চ আদালতেই ফেরৎ দিয়েছেন। আর সিবিআই কলকাতা পুলিশের তদন্তের সুরেই কথা বলছে। এক চরম হতাশা নেমে এসেছে প্রতিবাদীদের প্রতিবাদী মানসিকতার উপর। মানুষ বুঝতে পারছেন না কি করা উচিৎ। অভয়া মঞ্চ প্রতিবাদের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। প্রতিমাসের ৯তারিখ স্মরণ করছে অভয়াকে। অভয়া মঞ্চ অভয়াদের ন্যায় বিচারের দাবিতে, নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার প্রতিবাদে, দুর্নীতি, লিঙ্গ বৈষম্যের প্রতিবাদে, প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, সাম্প্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। অভয়া মঞ্চের প্রচেষ্টায় কলকাতা থেকে দিল্লী সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবাদের এই ভাষা। কেন্দ্রের শাসক উন্নাও, হাথরসের রক্তমাখা হাতে মনেপ্রাণে অভয়ার প্রকৃত বিচার চাননি, চাইলে এতদিন অভয়া হত্যাকাণ্ডের কিনারা হতো। অভয়া হত্যার প্রকৃত বিচার না চেয়ে জুনিয়র ডাক্তার ও সিনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য কি, তার তদন্তের দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় শাসকদল। অভয়া আন্দোলনকে ভাঙবার চেষ্টা করেছেন। বিপথে চালিত করবার চেষ্টা করেছেন। কারণটাও খুব স্পষ্ট। ব্রাহ্মণ্যবাদী ও মনুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত একটি দল কখনোই অভয়া হত্যার প্রকৃত বিচার চায় না। আর সেই কারণেই বহুবার চেষ্টা করেও অভয়া’র পরিবার, অভয়া’র মা-বাবা দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এমনকি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কারোর সঙ্গেই দেখা করতে পারেন না। আমরা নিশ্চয়ই এই সমস্ত ঘটনা বিস্মৃত হবো না।
সূচনালগ্ন থেকেই অভয়া মঞ্চ অদলীয় এবং অদলীয় হলেও রাজনৈতিক। বহু দলের এবং বহু মতের মানুষ একত্রিত হয়ে এই আন্দোলনে শামিল হয়েছেন ন্যায়বিচারের দাবিতে। একটি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যার প্রতিবাদে বিচার চেয়ে, লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সহ সর্বস্তরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ও বিভাজনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে অভয়া মঞ্চের প্রতিটি পদক্ষেপ রাজনৈতিক। রাজ্যের শাসক দল ও কেন্দ্রীয় শাসক দলকে জনবিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানাচ্ছে অভয়া মঞ্চ। এই দুই অপশক্তিকে বর্জন করে, মানবিক, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত কারী সব শক্তিকে একত্রিত করে আন্দোলনকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার আমাদের। শ্রমজীবী মানুষ তথা শ্রমজীবী মহিলার অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, ঘরে ঘরে বেকার যুবক যুবতী এবং প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষের কাজের দাবিতে, অভয়ার ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনতে, আর যাতে কোন অভয়া না হয় তা সুনিশ্চিত করতে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধে ও সর্বধর্মের সম্প্রীতি রক্ষার্থে, রাজ্যে নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন।
পুরো বাংলা আজ খুন,ধর্ষণ লুটের পারাবার!
কী আছে আমাদের আর নতুন করে হারাবার?
যুদ্ধে নামুন দারুণ রাগে – বিচার পাওয়ার যুদ্ধে।











