কোনও মানুষের চিন্তা স্মৃতি, অনুভূতি ও পারপার্শ্বিক সচেতনতার মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে অনেক সময়েই তাঁর মধ্যে একাধিক সত্তা তৈরি হয়। ‘ডিসোসিয়েটিভ পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’ নামে এই অসুখ অনেককে আত্মহত্যাপ্রবণও করে তুলতে পারে। জানালেন চিকিৎসক অরিত্র চক্রবর্তী
প্রশ্ন: সিনেমায় অনেক সময়ে দেখা যায় একই ব্যক্তি সময় বিশেষে অন্য ব্যক্তি হয়ে উঠছেন। বাস্তবে কী এমনটা সম্ভব?
উত্তর: ‘ডিসোসিয়েটিভ ডিসঅর্ডার’ নামে একটি রোগ আছে। সেই রোগের কারণে এমনটা ঘটতে পারে। ‘ডিসোসিয়েটিভ ডিসঅর্ডার’ হল এক ধরনের মানসিক ব্যাধি, যেখানে সেই মানুষটির চিন্তা, স্মৃতি, অনুভূতি, পরিচয় ও পারিপার্শ্বিক সচেতনতার মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই অসুখের অনেক প্রকারভেদ রয়েছে। প্রথমত, ‘ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার’। এই রোগে একটি মানুষের ভিতরে তৈরি হয় একাধিক সত্তা। দ্বিতীয়ত, ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা (বিশেষ করে কোনও মানসিক আঘাত ) ভুলে যান। তৃতীয়ত, ডি-পার্সোনালাইজেশন/ ডিয়ারলাইজেশন ডিসঅর্ডার। এই রোগে নিজের শরীর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন অনুভব করা বা নিজেকে দর্শক মনে হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক সময়ে নিজের চারপাশকে বাস্তব বলে মনে নাও হতে পারে।
প্রশ্ন: আচ্ছা ভর হওয়ার ঘটনাগুলি কী কোনও মানসিক সমস্যা থেকে হতে পারে?
উত্তর: অনেক সময়ে কোনও একজন মানুষের মধ্যে অন্য কোনও মানুষ, দেবতা বা ভৌতিক শক্তি ভর করেছে করেছে বলে শোনা যায়। সেই শক্তি তাঁকে কিছুক্ষণের জন্য নিয়ন্ত্রণ করছে বলেও মনে হয়। বাস্তবে একে ‘ডিসোসিয়েটিভ পোসেশন ট্রান্স ডিসঅর্ডার’ বলা হয়। তবে সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় আঙ্গিকে হওয়া রূপান্তর; যেমন পুজো, উৎসব, কীর্তন, সুফি দরবারে ভাব সম্মিলন বা ভাব সমাধির মতো ঘটনা যাতে ওই ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করেন এবং যা সামাজিক ভাবে গ্রহণযোগ্য, সেটি কিন্তু ডিসঅর্ডার বলে গণ্য হবে না। যখন এই ধরনের পরিবর্তন অনিচ্ছাকৃত, নিয়ন্ত্রণহীন, দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে বা সামাজিক সমস্যা তৈরি করে তখনই তাকে ডিসঅর্ডার বলা হয়।
প্রশ্ন: প্রায়শই ‘মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’, ‘স্প্লিট পার্সোনালিটি’ প্রভৃতি কথা শোনা যায়। এগুলি কি আলাদা কোনও রোগ?
উত্তর: এই সব শব্দগুলি ‘ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার’-কেই বোঝায়। এই রোগে এক জন মানুষের মধ্যে একাধিক সত্তা তৈরি হয়। এমনকি এক জন ব্যক্তির মধ্যে একশো রকমের সত্তাও পাওয়া যেতে পারে। এক সত্তা অন্য সত্তার বিষয়ে নাও জানতে পারে। হয়তো দেখা গেল কোনও ব্যক্তির আসল সত্তাটি হয়তো লাজুক, ভিতু প্রকৃতির। কিন্তু অন্যগুলি হয়তো রুক্ষ, ভয়ানক ও বদরাগী। এই ধরনের সত্তাগুলির জন্ম হতে পারে বিভিন্ন রকম আঘাত থেকে। এই ভিন্ন ভিন্ন সত্তাগুলি রোগীকে বিভিন্ন সময়ে নিয়ন্ত্রণ করে। কোনও সত্তায় থাকাকালীন ওই ব্যক্তি কী করেছেন সেটা অন্য সত্তায় থাকাকালীন তাঁর মনে থাকে না।
প্রশ্ন: কোন কোন কারণে এই সমস্যা দেখা যায়?
উত্তর: শৈশবে কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটলে, বা শারীরিক অথবা যৌন হয়রানির শিকার যাঁরা হন বড় হলে তাঁদের অনেকের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। শৈশবে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে শিশু দুর্বলতার কারণে এর প্রতিবাদ করতে পারে না। কিন্তু তার ভিতরে প্রতিবাদ করার যে ইচ্ছা থাকে তা থেকেই তাঁর মধ্যে শক্তিশালী, প্রতিবাদী অন্য রকম সত্তা তৈরি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ডিসোসিয়েটিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কের এন্টেরিওর প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, ডরসোলাটেরাল প্রি ফ্রন্টাল কর্টেক্স, প্যারাইটাল কর্টেক্স ইত্যাদি জায়গাগুলি বেশি সক্রিয় ভাবে কাজ করে। আবার হিপোকাম্পাস এবং আমিগডালার মতো অংশগুলি আয়তনে ছোট হয়।
প্রশ্ন: এই রোগের সঙ্গে কি আর কোনও মানসিক সমস্যা যুক্ত থাকতে পারে?
উত্তর: এই রোগের সঙ্গে ডিপ্রেশন, নেশার সমস্যা, ঘুমের সমস্যা, যৌনতার সমস্যা, ইটিং ডিসঅর্ডার, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, পোস্ট ট্রামাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার ইত্যাদি সমস্যা যুক্ত থাকতে পারে। ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার রোগে আক্রান্ত রোগীদের এক তৃতীয়াংশের ক্ষেত্রে খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। অনেকে এই রোগটিকে সিজোফ্রেনিয়া বা সাইকোসিস গোত্রের রোগ ভেবে বসেন।
প্রশ্ন: এই রোগের প্রকোপ কতটা?
উত্তর: সাধারণ মানুষের এক থেকে তিন শতাংশের মধ্যে এই রোগটি দেখা যায়। অর্থাৎ এর প্রকোপ সিজোফ্রেনিয়া বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতোই।
প্রশ্ন: এই রোগের চিকিৎসা কী ভাবে হয়?
উত্তর: এর চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হল বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা সত্তাগুলিকে একটি সত্তায় কেন্দ্রীভূত করা। প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে ‘কগনিটিভ বিহেভিয়োরাল থেরাপি (সিবিটি), ডায়ালেকটিকাল বিহেভিয়ার থেরাপি (ডিবিটি), ‘আই মুভমেন্ট ডিসেনসিটাইজেশন অ্যান্ড রিপ্রসেসিং (ইএমডিআর) ইত্যাদির প্রয়োগ করা হয়। এই রোগের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হল চারপাশের মানুষের সহযোগিতা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে এমন একটি পরিবেশে রাখতে হবে যেখানে তিনি শারীরিক ও মানসিক ভাবে আরাম বোধ করেন। দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তি দুর্ঘটনার পরে ঘটনার বিবরণ কারও সামনে খুলে বললে তাঁর ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ হওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যায়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষকে মনের কথা খুলে বলতে দিলে তিনি অনেকটাই হাল্কা হন। ঘটনাগুলি মনের মধ্যে চেপে রাখলে পরে ট্রমার স্মৃতিগুলি পরে আরও ভয়ঙ্কর ভাবে ফিরে আসতে পারে। অবসাদ, উদ্বেগের জন্য অ্যান্টি ডিপ্রেসেন্ট জাতীয় ওষুধ দিতে হতে পারে। ‘ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার’ রোগে আক্রান্তদের সত্তর শতাংশই আত্মহত্যাপ্রবণ হন। সেই বিষয়টিকেও মাথায় রাখতে হবে।











