টেলিভিশনে কোটিপতি বানানোর প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে। উপস্থিত প্রতিযোগীদের মধ্যে যে সবথেকে দ্রুত আঙ্গুল চালিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে, সেই সেদিনের জন্য হট্ সিটে বসে প্রশ্নকর্তার চোখা চোখা প্রশ্নের উত্তর দেবে অনুষ্ঠানের বাকি সময়ে এবং সেই অনুযায়ী বাড়তে থাকবে পুরস্কারের অর্থমূল্য। আমাদের মনের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা ক্রড়োর পতি হবার বাসনা এভাবেই চেগে ওঠে টেলিভিশন শো এর কল্যাণে। এই অবধি সব ঠিকঠাকই ছিল। গোল বাঁধলো মাত্র সেদিন। আর এই গোল বাঁধার কারণেই জানা গেল এক আশ্চর্য মানসিক রোগ লক্ষণের কথা – সিক্স পকেট সিনড্রোম – ষষ্ঠ পকেটের সমস্যা। এই মুহূর্তে সমাজ মাধ্যমের রথী,মহারথীরা তূনীর থেকে চোখা চোখা বাক্যবাণ বেছে নিয়ে নিক্ষেপ করে চলেছেন এক একরত্তি ( ! ) ছেলের উদ্দেশ্যে। কেউ কেউ অবশ্য রুখেও দাঁড়িয়েছেন ওই ছয় ছোট্ট অভিমন্যুর হয়ে। তবে তাঁদের পালে হাওয়া অনেক অনেক কম।
ব্যাপারটা একটু খোলাসা করেই বলি। কৌন বনেগা ক্রড়োরপতির সান্ধ্য আসরে সেদিন হট সিটে এসে বসেছে দশ বছরের ঈশিত ভাট। বেশ সপ্রভিত,চালাক চতুর চেহারা। চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা চেহারায় একটা অন্য মাত্রা যোগ করেছে। উল্টোদিকে প্রশ্নের পসরা নিয়ে যথারীতি হাজির বিগ্ বি – অমিতাভ বচ্চন জী। শুরু হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব । প্রথম প্রশ্ন থেকেই ঈশিতকে বেশ চৌকস বলে মনে হচ্ছিল দর্শকদের, একটু বেশি কথা বলছে বটে তবে তা শিশুসুলভ নিষ্পাপ চপলতা বলেই মনে করছিল দর্শকরা। অমিতাভ জীর মতো প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ক্যুইজ মাস্টারের সামনে বসে ঈশিতের ভয় বা অস্বস্তিতো হচ্ছিলোই না , উল্টে তার উত্তর দেবার ভঙ্গিতে বচ্চন সাহেবকেই একসময় বেশ অসহায় লাগছিলো দর্শকদের। যত সময় এগোচ্ছিল ততই যেন বেড়ে যাচ্ছিল ঈশিতের অপ্রগলভতা – কথা বলার ভঙ্গি, চোখের চাহনি,হাবভাব,দেহ ভঙ্গিমায় ফুটে উঠছিল এক অমার্জিত, অর্বাচীন মানবকের অসহিষ্ণুতা। এমন শিশু আমাদের পরিবারের চেনা শিশুদের থেকে যেন অনেকটাই আলাদা। ফলত ঈশিতের এমন আচরণ নেট দুনিয়ায় সমালোচনার ঝড় তোলে। সকলেই উচ্চকন্ঠে ছি ছি করা শুরু করে। শুধু ঈশিত নয়, নেটিজেনরা তার অভিভাবকদেরও রেয়াৎ করে নি। ছেলের কাণ্ডকারখানার জন্য সমস্ত রকমের সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। শিশু মনরোগ বিশেষজ্ঞরা বাধ্য হয়ে আসরে নামেন। তাঁরা জানান যে ঈশিত এক মনোরোগে আক্রান্ত যা মনস্তত্ত্বের সংজ্ঞা অনুযায়ী সিক্স পকেট সিনড্রোম নামে পরিচিত।
কি! অবাক হচ্ছেন তো? আরে, অবাক হবার কিছু নেই। ঈশিত একটি মনো- আচরণগত সমস্যার শিকার। মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় যা হলো ছয় পকেটের সমস্যা। মনোচিকিৎসকদের মতে সিক্স পকেট সিনড্রোম হলো শিশুদের একটি আচরণগত সমস্যা।চিন দেশের শিশুদের মধ্যে প্রথম এই রোগের প্রকোপ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। এখন তা ধীরে ধীরে আমাদের দেশেও প্রসার লাভ করছে। এর ফলেই মাত্র দশ বছর বয়সি গুজরাটের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ঈশিত ভাটকে আমরা একদম অপরিচিত চেহারায় দেখলাম সেদিন। ঈশিতের কাণ্ডে যুগপৎ ক্রুদ্ধ ও হতবাক নেটিজেনরা তাকে বখা ছেলে, নষ্ট ছেলে, সংস্কার হীন বেয়াদব ছেলে বলে গাল দিলেও, মনোবিদরা তার ওপর যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। প্রশ্ন হলো কেন ঈশিতের অ- শিশুসুলভ? বাচনভঙ্গি ও আচরণের এমন অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ? কে বা কারা এর জন্য দায়ী? আসুন আমরা আর একটু গভীরে যাই।

আসলে এই হেলিকপ্টার পেরেন্টিং হলো মূল কারণ, আর সিক্স পকেট সিনড্রোম হলো তার অনিবার্য ফল। ১৯৬৯ সালে ডঃ হেইম গিনোট ( Haim Ginott ) তাঁর বেস্ট সেলার বই Between Parent and Teenagers এ প্রথম এই শব্দবন্ধের প্রয়োগ করেন সবেধন নীলমণি সন্তানের ওপর অভিভাবকদের অতি নজরদারির বিশেষ প্রবণতাকে বোঝাতে। সেখানেই এক টিনের (teen) মুখে শোনা গেল – Mother hovers over me like a helicopter. ব্যস্ ! সমাজবিজ্ঞানী আর মনোবিদরা লুফে নিলেন অভিভবকতার এই চলতি সংজ্ঞাটিকে।

ঈশিতের কথা পড়ে অভিভাবকরা যদি মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে বসেন তাহলে কিন্তু মুশকিল। মনে রাখবেন একটি শিশু হলো একটি চারাগাছ। যতদিন সেই চারাগাছটি মাথা উঁচিয়ে বাইরের সাথে নিজের অস্তিত্বের সম্পর্ক তৈরি না করছে ততদিন তাকে সামলে রাখতে হয়, যাতে কেউ তাকে নষ্ট না করে। একসময় গাছের চারপাশের বেড়াটাকে সরিয়ে নিতে হয় । গাছ তখন নিজের মতোই বেড়ে উঠতে পারে প্রয়োজনমতো ডালপালা মেলে ধরে। আপনার শিশুর ওপর অহেতুক খবরদারি না করে তাকে তার মতোই থাকতে দিন। এতেই কিন্তু মঙ্গল। সকলের সাথে মিলে মিশে বড়ো হয়ে উঠুক আপনাদের একল সন্তানটি। খালি লক্ষ রাখুন ওর মতো করেই, ও বেড়ে উঠছে কিনা!
১৭ অক্টোবর,২০২৫













ভাল লাগল
ধন্যবাদ জানাই। কেন ভালো লাগলো? আমি তো সমস্যার কথা বলেছি !
হেলিকপ্টার পেরেন্টিং টার্মটি ভালো লেগেছে।
তবে রিয়েলিটি শোয়ের পুরোটাই স্ক্রিপটেড। ও নিয়ে মাথা ঘামানো অনর্থক। আচরণগত পরিবর্তন ঘটছে এটা ঠিক।তার প্রধান কারণ বাবা , মা। অভিভাবকের মনটি সংবেদনশীল হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
এসব টার্ম আমার দেওয়া নয়। চিন দেশের সমস্যা,গিনোট সাহেব তাকেই ছড়িয়ে দিলেন, জনপ্রিয়তা দিলেন। রিয়ালিটি শো এর অনেক কিছুই তৈরি করা ঠিক কথা। তবে ঈশিতের মতো একটি দশ বছরের ছোট বাচ্চাকে এভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার কারণ কী ? এমন সমস্যায় আক্রান্ত দুনিয়ার বহু পরিবার। সুতরাং……।
খুব সুন্দর।
মতামত জানানোর জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
দুটো নতুন কথা শিখলাম।।। যদিও আমার মনে হয়েছিল পুরো ঘটনাটা পূর্বপরিকল্পিত, তাও আজকালকার ছোটদের অনেকেই শালীনতা, ব্যবহার জানেনা। আর তার জন্যে মা বাবাই দায়ী।
কাউকে দোষারোপের জন্য লেখা নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সমস্যার চরিত্র বদলে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে । সেই পরিবর্তনের আঁচ পেতেই নিবন্ধটি লেখা হয়েছে। নতুন নতুন বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে আমারও অনেক কিছু জানা হয়। ধন্যবাদ মতামত জানানোর জন্য।
অজানাকে জানলাম। এমনও যে কোনও syndrom আছে সেটাই জানা ছিলো না। লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও শুভ দীপাবলির অনেক অনেক শুভেচ্ছা।
ধন্যবাদ জানাই অভিজিৎ চক্রবর্তী বাবুকে। এও এক ঘাতক রোগের মতো শাখাপ্রশাখা বিস্তার করছে ধীরে ধীরে। এযুগে চেনা একে সাফল্য অর্জন করার জন্য সবাই উন্মুখ। ফলে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন অভিভাবকরা । এগুলো অর্জিত সমস্যা। কাটিয়ে উঠতে হবে আমাদেরই।
Many problems of today’s society are attributed to the increasing number of nuclear families. Definition of family is changed in this era.
Thanks for your comments. The incident of lshit should not be treated separately. We must remember that he is just an innocent product of our experimental nuclear workshops ironically called a family. It’s just the tip of the iceberg.