তখনও ক্যাশ গোনা শেষ হয়নি। টুং টুং টুং করে মোবাইলটা বাজতে থাকল। একটু অন্য রকম আওয়াজ বলে প্রথমে বিজয় বাবু বুঝতে পারছিলেন না শব্দটা আসছে কোত্থেকে। রিঙ টোনের চেনা আওয়াজ নয়। বুঝলেন, একটা ভিডিও কল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ধরলেন বিজয় অগ্রবাল।
একটা সুন্দরী তরুণীর মুখ। – হ্যালো, দাদা নমস্কার।
বিজয় বাবু পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছেন কয়েক মাস হল এবং কয়েক বছর হল তিনি বিপত্নীক। তাঁর ছেলে এখন গাজিয়াবাদে একটা নাম করা ইনস্টিটিউটে এম বি এ করছে। ক্যানিং স্ট্রিটের এই পাইকারি বিশাল মনোহারি দোকানটা চারজন মাইনে করা কর্মচারী নিয়ে তিনি সামলান।
আজকাল খানিকটা ক্লান্ত বোধ করেন তিনি। হাওড়ায় তার বিশাল ফ্লাটটাতে মাঝে মাঝে ভীষণ একা মনে হয়। ছেলে আপাততঃ বছর দুই কদাচিৎ আসবে। স্ত্রীর অকাল মৃত্যু একটা অপূরনীয় শূন্যতা এনে দিয়েছে এই ব্যবসায়ী অগ্রবাল নামক প্রৌঢ়ের জীবনে । তিনি বেঁচে থাকতে স্ত্রীর উপস্থিতির গুরুত্বটা বুঝতে পারেন নি। ব্যবসা, টাকা, জি এস টি, পেমেন্ট, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এসবের মধ্যে আকন্ঠ ডুবে ছিলেন। তার সাথে একটু আধটু জনসেবামূলক সংগঠনের সাথে যোগাযোগ। যেমন আর পাঁচজন ব্যবসায়ী থাকেন।
মোবাইলে একজন মহিলার কন্ঠ এবং পর্দায় তার জীবন্ত ছবি। বেশ তরুণী, সম্ভবতঃ তাঁর ছেলের বয়সী হবে কিম্বা একটু বড় ।
– বলিয়ে ম্যাডাম।
– দাদা আপনার দোকান থেকে একটা জুয়েলারি কিনেছিলাম গত পরশু। উসমে থোড়া ডিফেক্ট হ্যায়।
– কই প্রবলেম নেই, লে কে আইয়ে। চেঞ্জ কর দেঙ্গে।
– মেরা পাশ তো কই বিল নেহি হ্যায়।
– তব মেরা ফোন নম্বর ক্যায়সে মিলা?
– একঠো কার্ড দিয়া থা উসমে ইয়ে নাম্বার মিলা।
– কই বাত নেহি, আপ এনি ডে চলা আইয়ে।
লাইন কেটে দিয়ে টাকা গোনায় মনোযোগ দিলেন। কর্মচারীদের সামনে দু’একজন করে খরিদ্দার দাঁড়িয়ে। ছোট দোকানের মালিকরা অনেকেই এই সখের ঝুটা গয়নার দোকান থেকে পাইকারি মাল কিনে নিয়ে যায় । কল শেষ করে বিজয়বাবু কাজ শুরু করলেন। টাকা নিচ্ছেন বিল কাটছেন হিসাব করছেন।
মেয়েটি তাকে দাদা ডাকল। সত্যি তার সে বয়স আছে কি? বরং তার বয়সী ছেলেমেয়েরা সবাই তো তাঁকে আঙ্কেল বা কাকু ডাকে। আরো ছোটরা দাদা নানাও বলে। বিজয়বাবু নিজের মনে হাসলেন একটু। আড় চোখে একবার আলমারির কাঁচে নিজের প্রতিফলিত অবয়বের দিকে তাকালেন। কপালের ওপরটায় চুল ফাঁকা হয়ে গেছে। রগের চুল অনেকটা পাকা এবং দুই তিন দিনের না- কাটা দাড়ি খড়খড়ে ও সাদা-কালোর মিশ্রণে ভরে গেছে। মোবাইলটা নিয়ে ক্যামেরা অন করে সেল্ফি মোডে একটা ছবি তুললেন। নিজেকে তার প্রায় বৃদ্ধ বলেই মনে হল। ছবিটা ডিলিট করে দিলেন। একটা হতাশার নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল ভিতর থেকে। নিজের ভুঁড়ির দিকে একটু তাকালেন। নিচু গদিতে বসে আছেন বলে বেল্টটা বেঢপ ভাবে চেপে বসেছে থলথলে কোমরে। ইস্ কি অবস্থা! অথচ এই বিজয় অগ্রবাল সাউথ ক্লাবে টেনিস চ্যাম্পিয়নশীপে রানার্স আপ হয়েছিলেন।
একজন খোট্টা টাইপের বয়স্ক খরিদ্দার পেমেন্ট দিতে হাত বাড়িয়ে রয়েছেন। – লিজিয়ে দাদা, মেরা বহুৎ দূর জানা হ্যায়।
অপ্রস্তুত বিজয়বাবু খেয়াল করেননি যে লোকটা অনেকক্ষণ হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করছে। – ঠিক হ্যায়,ঠিক হ্যায়।
এরা তার বাবার আমলের খরিদ্দার। যখন জয়পুরিয়া কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করে এই কাইন্টারে বসতে শুরু করেছেন তখন থেকে তাঁকে চেনে। সে এক ঝামেলার সময় ছিল। তিনি চাইছিলেন চাকরি করতে। বাবা বললেন।
– চাকরিতে যত মাইনে পাবে সেই টাকা আমি মাসে মাসে তোমাকে দেব। ডিউটি করো,বাড়ির খাও, স্যালারি বোনাস সব মিলেগা। সেই থেকে লেগে আছেন। বলতে গেলে বাবার অবর্তমানে তিনি এক সন্তান হওয়াতে উত্তরাধিকারের সূত্রে সব সম্পত্তিই তিনি পেলেন। যতটা পেলেন তা সৎ পথে চাকরি করে কোন কালে কেউ জোগাড় করতে পারে না।
দুপুরের দিকটায় বাজার একটু ঢিলে থাকে। ক্যাশবাক্সে চাবি লাগিয়ে তিনি টিফিন করতে বেরলেন। তাঁর সুন্দরী স্ত্রী সুইটি অগ্রবাল বেঁচে থাকতে সে বড় তিন থাকের টিফিন কেরিয়ারে ঠেসে দুপুরের খাবার পাঠিয়ে দিত। বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হত না। এখন যেতে হয়।
চেনা দোকান। নিরামিষভোজী লোকদের পছন্দসই খাবার পাওয়া যায় এখানে। টোষ্ট ধোসা বড়া ইডলি লস্যি একটা মিশ্র খাবারের বসে খাওয়ার রমরমা দোকান। ঢোকার মুখে বড় ডেচকিতে চা ফুটছে টগবগিয়ে। লম্বাটে দোকানের শেষের টেবিলে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসলেন। চেনা ছেলেটা এসে জানতে চাইলেন কি খাবেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খান। আজ সাদা বড়া আর লস্যির অর্ডার দিলেন।
সবে মুচমুচে বড়ার এক টুকরো চাটনি লাগিয়ে মুখে দিয়েছেন। অমনি টিং টিং টিং করে মেসেজ-এর একটা নোটিফিকেশন এল। বাঁ হাতে আনলক্ করে মোবাইলটা অন করলেন। ছেলের বাতিল করা স্মার্টফোন। এখনও অতটা সড়গড় হননি। বোতাম টেপা ফোনেই এতদিন চালিয়ে এসেছেন। ছেলে যাওয়ার আগে এটা দিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজও করে।
মেসেজটা খুলে দেখলেন একটা অজানা নম্বর আর ইংরাজিতে লেখা ‘হাই’। প্রোফাইল পিকচারে টাচ করতেই দেখলেন সেই সকালের মেয়েটার হাসি মুখের একটা ছবি। তিনি খেতে খেতে কি মনে করে একটা রেডিমেড মেসেজে টাচ করলেন। ‘গুড আফটার নুন ‘।
– ওপার থেকে মেয়েটা তার একটা হাসি মুখের ছবি পাঠাল। নির্মল হাসি-মাখা মিষ্টি মুখ। টোল পড়া হাসি।
বিজয়বাবু বাইরে বেরিয়ে একটু হেঁটে তাঁর পরিচিত একটা সেলুনে ঢুকলেন । ছোট্ট জায়গা তবে মৃদু এ সি চলছে বলে পরিবেশটা ঠান্ডা । পিন পিন করে মেশিনের আওয়াজ হচ্ছে। একটা চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বসলেন।
– আচ্ছা বেস্ট কোয়ালিটি হেয়ার ডাই করনে কা টাইম কিতনা লাগে গা?
– আধা ঘন্টা মে হো জায়েগা বাবু।
বিজয় বাবু একটা রিং করে দোকানের সবচেয়ে পুরোনো কর্মচারী অধীর বসাককে বললেন, আমি আধঘন্টা পরে আসছি। তুমি বিক্রির ক্যাশটা রাখো।
চুলে রঙ করার পর বিজয়বাবু নিজেকে আয়নায় দেখে অবাকই হলেন। এখন আর চুল অতটা পাতলা লাগছে না এবং দাড়ি সেভ করার পর ছেলেটা কি একটা মুখে লাগিয়ে দিয়েছিল তাতে নিজেকে বেশ ফর্সা মনে হচ্ছে। মনে মনে একটু হাসলেন। আর ভিড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা সেলফি তুলে নিলেন। নিজেকে বেশ তরুণ লাগছে নিজের কাছে ।
দোকানে কর্মচারীরা মুখ চাওয়া চাওয়ি করেছিল কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু বলে নি।
তিন দিন বাদে মেয়েটি এল। একটা হালকা নীল রঙের ফুল ফুল ছাপের হাত কাটা সালওয়ার কামিজ পরা। মনে হল বয়সটা তিরিশের মধ্যেই হবে। ফোনে যতটা কম ভেবেছিলেন অতটা কম নয়। একটু স্থুলের দিকে শরীর। এই বয়সের মেয়েরা সচরাচর জিন্স ও টপ পরে অভ্যস্ত হয়। একমুখ হাসি নিয়ে সে বলল, – আপনি যে পাল্টে দিতে রাজি হবেন এটা শুনে আমি খুব খুশি।
– আমরা জেনারেশন বাই জেনারেশন বিজনেসে আছি, ম্যাডাম। এটুকু তো করতেই হয়।
– থ্যাঙ্ক ইউ।
বিজয়বাবু নাম ধরে একজন কর্মচারীকে ডাকলেন। – দিদিমনির মাল-টা একটু চেঞ্জ করে দাও।
সে আরো কিছুক্ষণ রইল এবং হেসে হেসে নানা কথা বলল। যাওয়ার আগে মেয়েটি তাকে একটা বিজনেস কার্ড দিয়ে গেল। সেটাতে লেখা আছে মেয়েটি কোন একটি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোডাক্টসের সেলসে আছে এবং সে বি টেক করা একজন ইঞ্জিনিয়ার। বিজয় অগ্রবাল অবাক হলেন। খুশি হলেন তার সাবলীলতা সপ্রতিভতা এবং মিষ্টি হাসির জন্য।
ইদানীং বিজয়বাবু একটু শরীর চর্চা করতে লেগেছেন। তাঁর হৃষ্টপুষ্ট শরীরটাকে একটু ট্রিম ও আরো চাঙ্গা করতে জিমে ভর্তি হলেন। জিমের ইনস্ট্রাক্টর তাঁকে বললেন, – একটু সময় লাগবে। অনেক ঘি দুধ খেয়েছেন এবং একদমই শরীর চর্চা হয়নি।
– বিলকুল সাহি হ্যায়।
মোটিভেশানের জন্য তিনি একজন কাউন্সিলরের কাছে পাঠালেন। হেল্থ কাউন্সিলর তাদের লম্বা চওড়া ফর্দের নানা জিজ্ঞাস্যের মধ্যে তার দাম্পত্যের খুঁটিনাটিও জানতে চাইল। তিনি সঠিক এবং অকপট উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
তারা সব বিচার করে একটা ডায়েট চার্ট, এক্সারসাইজ প্ল্যান ও কিছু পেটেন্ট আয়ুর্বেদিক হেল্থ ড্রিঙ্ক সাজেস্ট করল।
বিজয়বাবু খুব মনোযোগ দিয়ে সব কিছু পালন করতে লাগলেন। কয়েক সপ্তাহে তাঁর শরীরে ও মনে একটা পরিবর্তন এলো সেটা কয়েকদিনে বুঝতে পারলেন।
ছেলেকে এ ব্যাপারে বেশি কিছু জানান নি । মাঝে মাঝে তাকে ফোন করেন আর হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠান। সেও উত্তর দেয় এবং ফোন কল করে।
ইদানিং প্রায়ই মেয়েটার মেসেজ আসে। তিনি রিপ্লাই করেন। একদিন জিম ক্লাবের একটা ছবি পাঠালেন মেয়েটিকে। সে কখনও উত্তর দিতে দেরি করে না। এখনও করল না।- নাইস। লুকিং হ্যান্ডসাম এ্যান্ড সেক্সি।
শব্দদুটোর মধ্যে ঠিক কি ছিল কে জানে? তিনি একটু আড়ষ্ট বোধ করলেন। নিজের বয়সের কথা মনে করলেন। মেয়েটি কি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন শূন্যতাকে ইঙ্গিত করতে চাইল বা কোন খোঁচা দিল। তিনি থ্যাঙ্কস লিখে রাতের খাবার খেতে টেবিলে ঢেকে রাখা পাত্রগুলোর কাছে বসলেন। এখন এগুলো এভাবে ঢাকা দেয়া থাকলেও সুইটি অগ্রবাল বেঁচে থাকাকালীন নিজে হাতে স্বামীকে খাওয়াতেন। ছেলে আগে খেয়ে নিত। দুজনেই একসঙ্গে নানান কথা বলতে বলতে খেতেন।
এ বয়সেও তাঁকে নিয়মিত কোন ওষুধ খেতে হয়না। এখনও অবধি তিনি ফিট । কায়িকশ্রম না করলেও শারীরিকভাবে অনেকটাই তন্দুরস্ত ।
আজ যেন শরীরে একটা অস্বস্তি হচ্ছে। না, বুকে পেটে ব্যথা বা মাথা ঘোরা তেমন নয়। বরং ঝিমধরা নেশাগ্রস্থের মত মনে হল। কালেভদ্রে মদ্যপান করলে যেমন অনুভূতি হয়, তেমনি। অথচ তিনি তো কোন রকম নেশা এখন করেন নি এবং সচরাচর করেন না । ধূমপান তাঁর পূর্বপুরুষ কেউ করতেন না তিনিও করেন না।
তবে কিসের জন্য এটা হচ্ছে ? সন্দেহ হল, তবে কি আয়ুর্বেদিক পেটেন্ট ওষুধটার কার্যকারণে এটা আজ হচ্ছে। অন্যদিন সেটা পান করেই ঘুমিয়ে পড়েন। আজ জেগে আছেন, সেজন্য কি এই ধরনের অস্বস্তি হচ্ছে। তিনি একটু ভয় পেলেন এবং তাড়াতাড়ি অল্প কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করলেন। অনেকসময় এসবে নাকি ইলিউশান হ্যালুসিনেশন ইত্যাদি নানা রকম জটিল মানসিক বৈকল্য হতে পারে । বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন বিজয়বাবু পাখাটা ফুলস্পিডে চালিয়ে দিয়ে ।
ঝিমধরা ভাবটা কাটাতে চোখ বুজে রইলেন।
প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছেন এমন সময় টিং টিং টিং করে মোবাইলটা বেজে উঠল। ছেলে এসময় ফোন করে। অন্ধকারে হাতড়ে ফোনটা ধরলেন। আর বিস্মিত হয়ে দেখলেন তাঁর ইদানীং পরিচিত মেয়েটি ভিডিও কল করেছে। তাঁর চশমাটা কোথায় খুঁজে পাচ্ছেন না। আবছা আলোয় বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি স্বল্পবসনা এবং সে নিজের ঘরে একা।
– কিছু মাইন্ড করলেন দাদা? আমি এমনি এমনি কথাটা বলেছিলাম। কিছু না ভেবেই। অ্যায়ম সরি। কোন উত্তর পেলাম না।
চশমা পরতেই দৃশ্যমান হল মেয়েটির উপস্থিতি। সে হাসতে হাসতে কথা বলছে। অর্ধাঙ্গের অনেকটাই অনাবৃত। সে নিশ্চয় অনিচ্ছাকৃত ভাবে তার এই উপস্থিতি ব্যক্ত করছে না। এই ধরনের কলে বিজয়বাবু অভ্যস্ত নন। তবুও তিনি নেশাগ্রস্তের মত কল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না।
– নো ম্যাটার ম্যাডাম, আই এম এনজয়েইং।
চোখ খুলে সামনে একজন উর্দিপরা পুলিশ অফিসারকে দেখে বিজয় অগ্রবাল একটু ঘাবড়ে গেলেন।
– কেমন লাগছে মিঃ আগরওয়াল, আর য়ু ফিলিং বেটার ? আমি মিঃ চাকলাদার ও সি হেস্টিংস পি এস।
– এর মানে কি, আমি ঠিক কোথায় আছি ?
– আপনি এখন আছেন সি এম আর আই নামক একটা প্রাইভেট হসপিটালে।
– কেন? হোয়াই?
– আপনি পুলিশ হেল্পলাইনে গতরাতে দশটা নাগাদ একটা ফোন করেছিলেন। আপনার টাওয়ার লোকেট করে আমাদের টিম আপনাকে উদ্ধার করে।
– আমি ঠিক কোথায় ছিলাম একটু বলবেন?
– একবালপুরের কাছাকাছি একটা সস্তার হোটেলে। ব্লু মুন হোটেল, সিক্স বাই থ্রি টু একবালপুর লেন।
– এটা কি দোতলায়, রুম নাম্বার টেন।
– একজাক্টলি। আপনি মনে করতে পারছেন ? আপনি যদি বেটার ফিল করেন তবে আমি আপনাকে ডিসচার্জ করিয়ে নিই। একটু থানায় গিয়ে ডিটেইলসটা যদি বলেন।
– সিওর। এখনই আমি যেতে পারি।
– হাওড়া লায়ন্স ক্লাব থেকে মিঃ কেডিয়া ফোন করেছিলেন। আপনার এক কালের টেনিস পার্টনার। সৌভাগ্যবশতঃ আমিও ওনার সাথে সাউথ ক্লাবে কয়েকবার খেলেছি।
– হ্যাপি টু মিট য়ু।
– কিন্তু আমরা একদম হ্যাপি নই। যে অবস্থায় আমরা আপনাকে উদ্ধার করেছি। আন অ্যাটেন্ডেন্ট থাকলে বিপদ হতে পারত। ভাগ্যিস ইউ ওয়ার রেসকিউড এ্যাট রাইট টাইম।
বেশি সময় লাগল না রিলিজ করতে। বিল আপাততঃ মিটিয়ে দেয়া হল পুলিশ অফিসারের পক্ষ থেকে।
পুলিশের জিপে তালুকদারের পাশে বসে বিজয় অগ্রবাল।
– মে আই ট্রাস্ট ইউ মিঃ তালুকদার ?
– উই আর স্পোর্টস মেন আফটারঅল । ইতস্তত করবেন না সত্যি ঘটনাটা বলবেন।
– সেটা বলব বলেই নিজেকে তৈরি করছি। আপনি বেধহয় জানেন না আমার ছেলে বেশ বড় এবং আমি বাগড়ি মার্কেট ব্যবসায়িক সংগঠনের একজন কর্মাধ্যক্ষ। কিছু বাজে কথা মিডিয়াতে ছাপলে আমি একটু এমব্যারাসড হতে পারি।
– ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি।
– থ্যাঙ্কস এ লট। তবে চলুন আপনার অফিসে গিয়েই ব্যাপারটা এফ আই আর হিসাবে লিপিবদ্ধ করি।
লিপিবদ্ধ হল বিজয় অগ্রবালের আত্মকথন।
– নিষিদ্ধ জীবনের আকর্ষণ কমবেশি সবাই টের পায়। আমি অনুভব করলাম তীব্র ভাবে। আমাদের পরিবার একটু ধর্মভীরু তা সত্বেও এই গোপন এবং গর্হিত কাজে আমি জড়িয়ে পড়লাম। মেয়েটির সাথে নিয়মিত চ্যাট করতে থাকলাম নেশার মত। বিশেষতঃ রাতের দিকে সে যখন ভিডিও কল করত তখনকার টান ছিল অপ্রতিরোধ্য এবং অন্য রকম । মাঝে মাঝে তার আর এক বান্ধবী এর মধ্যে জুটে গেল। আমি ব্যবসায়ে অমনোযোগী হতে থাকলাম। ছেলে দূর থেকে আমার অবস্থা কিছু অনুধাবন করতে পারত না।
মেয়েটির মেসেজ একদিন না পেলেই আমি অধৈর্য হয়ে যেতাম। অস্থির হয়ে পড়তাম। মনে হত কি যেন নেই, কি যেন কম পড়ছে। এভাবে একটানা একবার সে পাঁচদিন কোন মেসেজ না করায় আমার অস্থিরতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল। আমি তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য প্রায় পাগল হয়ে গেলাম। আমরা বংশ পরম্পরায় ব্যবসায়ী। তা সত্ত্বেও এই ছেলেমানুষী আমি যুক্তি তর্ক দিয়েও বুঝতে পারছিলাম না।
আবার মেসেজ এল, অনেকটা দূর থেকে , ভেলোর থেকে। দক্ষিণের রাজ্য কর্ণাটকের একটা শহর এই ভেলোর । সেখানকার একটা বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ভারত নিখ্যাত।
তার মা ভর্তি আছে সেখানে। সদ্য ধরা পড়েছে, গলায় ক্যানসার। সে একদম ভেঙে পড়েছে। ডাক্তারের সাথে আমাকে ফোনে কথা বলিয়ে দিল।
বুঝলাম অনেকটা টাকার প্রয়োজন। তার কাছে সে মুহুর্তে খুব বেশি টাকা নেই। সে কয়েকদিনের জন্য ধার চায়। সে হাত জোড় করে রিকোয়েস্ট করতে থাকল এই বিপদ থেকে যে করেই হোক তাকে যেন উদ্ধার করি। সে তার কলকাতার ব্যাঙ্কের আপডেট দেখিয়েছিল । ফিক্সড ডিপোজিট আছে অনেকটাই। মায়ের সাথে জয়েন্ট নামে। কিন্তু সেটা ভাঙাতে একটু সময় লাগবে।
আমি দোনমনো করাতে সে বলল, – ইটস ও কে দাদা আমি অন্য জায়গা থেকে চেষ্টা করছি । ফিক্সড ডিপোজিট গুলোকে মর্টগেজ রেখে আপাততঃ লাখ তিনেক টাকা জোগাড় করছি।
আমার ইগোতে লাগল। আমিই বললাম,- তুমি বরং ওটা আমাকে মর্টগেজ কর। আমি তোমার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
বলা যেতে পারে বিনা শর্তে আমি টাকাটা দিতে সম্মত হলাম।
এই ট্রান্জাকশন হতে একদিন সময় লাগল। আমি ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বললাম। তার মায়ের অপারেশনের তারিখ ঠিক হল।
আবার আমাদের সম্পর্কে স্বাভাবিকতা ফিরে এল। নৈশ আলাপ চলতেই থাকল। কোন একদিন অপারেশন হল। সব ডিটেইলস সে ওখান থেকে সরাসরি জানাত। আমি তাকে আশ্বস্ত করতাম।
দিন পনের পর ওরা ছাড়া পেল হসপিটাল থেকে।
তারপর বেশ কয়েকদিন পর একরাতে সে ফোন করে বলল, – আমরা ব্যাক করছি দু’দিনে। যদি সম্ভব হয় এখানে একজন অঙ্কোলোজিস্টের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা করে রাখি সি এম আর আই তে।
আমি করে দিলাম।
– মেনি মেনি থ্যাঙ্কস দাদা।
আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কারণ দু একদিনের মধ্যে সে কলকাডায় এসে পৌঁছবে।
কলকাতায় এসে সে ফোন করল।তবে তাকে একটু টেন্সড মনে হল।আমি জিজ্ঞেস করলাম। – কি হয়েছে? এনি প্রবলেম?
ও হু হু করে কেঁদে ফেলল। বলল, – মার অবস্থা ভীষণ খারাপ। গলা দিয়ে ব্লীড করছে। কলকাতায় একবালপুরে একটা নার্সিং হোমে ভর্তি করতে বাধ্য হয়েছি। আপনি যদি আজ একটু আসতে পারেন, কাইন্ডলি । কাজ শেষ হলে।
মাঝে সে এখানকার ডাক্তারবাবুর সাথেও কথা বলিয়ে দিল।
তিনি বললেন, – ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন। ইমিডিয়েট ও টি তে তুলতে হবে। আমরা একটা ট্রাই করব। তাকে সেভ করতে। বাট ইটস লিটল বিট কস্টলি অন্ততঃ সব মিলিয়ে দুই আড়াই লাখ তো বটেই।
আমি মেয়েটির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। সে কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই।
– ডোন্ট ওরি। ডাক্তারবাবুকে বল ওটি করতে। আমি রাতে দোকান বন্ধ করে টাকা নিয়ে যাব। আই শ্যাল ট্রাই মাই বেষ্ট। তোমাদের হোটেলের নামটা বল। যেখানে তোমরা আছো?
মনোযোগ দিয়ে নোট নিচ্ছিলেন মিঃ তালুকদার।
– তারপর মিঃ আগরওয়াল। আমার লোকজন বোধ হয় আপনাকে ওখান থেকে উদ্ধার করেছে?
– ঠিক তাই।
একটু দম নিয়ে বিজয় বাবু আবার শুরু করলেন, – ঐ অ্যামাউন্টের টাকাটা আমার কাছে কমবেশি সব সময় থাকে। সব তো ক্যাশে কারবার। তা সেই রাতে একটা ট্যাক্সি নিয়ে আমি ওখানে পৌঁছে গেলাম রাত তখন ন’টা। ওরা নার্সিং হোম থেকে ফিরে হোটেলের ঘরে অপেক্ষা করছিল। সস্তার হোটেল। আমাকে দেখে হাই মাই করে কেঁদে উঠল মেয়েটি। সঙ্গে তার এক বোন। আমি দুজনকে সামলাতে থাকলাম।
ওদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমাকে রিসেপশনে ফোন করে এক কাপ চা খাওয়াল। আমি সারাদিন দোকান করে টায়ার্ড ছিলাম। চা টা খেয়ে বেশ তৃপ্তি পেলাম।
– এই নিন দাদা, কাইন্ডলি ডাক্তারবাবুর সাথে যদি একটু কথা বলুন । বলে তার মোবাইল ফোনটা এগিয়ে দিল।
– হ্যালো, বলুন আমি ডাক্তার বোস বলছি।
হঠাৎ -ই আমার কেমন খটকা লাগল। ফোনের মধ্যে হৈ চৈ এর আওয়াজ, গাড়ির আওয়াজ এমন পরিবেশ তো কোন নার্সিং হোমে হওয়ার কথা নয়। তবে কি রঙ নম্বর? মেয়েটিকে দেখতে বললাম, সে কই দেখি বলে আমার কাছে এসে ফোনটা নিল। একটু নাড়াচাড়া করল, – এবার কথা বলুন।
ধরলাম আবার। সিগনাল সমস্যা জানলার ধারে এক কদম এগিয়ে গেলাম। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আওয়াজ। ওপার যিনি ধরেছেন তিনি বলতে চাইলেন অপারেশন সাকসেসফুলি করা গেছে। কিন্তু নার্সিং হোমের ওটি চার্জ এখনই পে করতে হবে।
সন্দেহটা আরো গভীর হল।
– আমি নিজে ওখানে গিয়ে পে করতে চাই। আই ওয়ান্ট সি হার।
– ওকে নাউ য়ু মে কাম।
ওরা কাছাকাছি ঘরেই ছিল কিন্তু মুখ ফিরিয়ে এখন কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। ওরা কি অন্য ঘরে? আমি উঠে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। দরজা লক করা। আমার পা দুটো কেমন টলমল করছে । দাঁড়াতে পারছি না। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। চায়ে কি কিছু মেশানো ছিল ? আমি কি ট্র্যাপড হয়ে গেছি?
বসার ক্ষমতাও নেই। ঢলে পড়েছি। কোন রকমে ফোনটা আনলক করে পুলিশ হেল্প লাইনের নম্বরটা পেয়ে কল করলাম। রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে।
– আপনি কে বলছেন বলুন, নাম বলুন ঠিকানা বলুন কি হয়েছে বলুন ? এনি প্রবলেম
– আমি মিঃ বিজয় অগ্রবাল। হোটেল ব্লু মুন। একবালপুর… আই অ্যাম ট্র্যাপড……।
– হ্যালো হ্যালো…।
আর কিছু শুনতে পাইনি। শুধু বুঝতে পারছিলাম অন্ধকারে কয়েকটা হাত আমার সারা শরীরে তছনছ করে আমার মোবাইল ঘড়ি সোনার চেন টাকার প্যাকেট সব ছিনিয়ে নিচ্ছে। আমি কোন রকম বাধা দিতে পারছি না। গভীর অন্ধকারে আমি ঢুবে যাচ্ছি । কোন বোধ কাজ করছে না।
শুধু মেয়েটার লাস্যময়ী মুখটা ভেসে আসছিল।
– ঠিক, ঠিক মিঃ আগরওয়াল। এই অবধি একদম ঠিক। বেঠিক যেটা সেটা হল তার ফোন নম্বর? সেটা কি মনে করতে পারবেন?
– চেষ্টা করি।
একটা নম্বর, দু’টো নম্বর। দুটোতেই চেষ্টা করা হল। একটা ‘ সুইচড অফ’ এবং আর একটা ‘ আন রিচেবল’।
মিঃ তালুকদার একটা ছবি দেখালেন তাঁর মোবাইলে।
– হ্যাঁ, এই তো সেই মেয়েটি।
– আপনার ‘সাময়িক প্রেমিকা’, তাইতো ?
– না না, চিটার। গ্রেট চিটার।
– এই মেয়েটি আদতে মুম্বাইয়ের একটা গ্যাং- এ ছিল। গত এক বছর কলকাতায় এই কারবার চালাচ্ছে। এখন বেপাত্তা। আমরা চেষ্টা করছি ট্রেস করতে।
– আমার এই মুহুর্তে কি করণীয়?
– চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। মিঃ কেডিয়া খুব অ্যাংজাইটিতে আছেন। আপনার ছেলে তাঁকে ফোন করেছিল । আমি আপনার ছেলেকে বলে দিয়েছি ইউ আর ও কে নাউ। আপনি বাড়ি গিয়ে একটা ফোন করবেন।
– কিন্তু আমার মোবাইল?
– লস্ট উইথ সিম। একটা অ্যাপ্লাই করুন আমাকে অফিসিয়ালি। আমি স্ট্যাম্প মেরে দিচ্ছি। নতুন সিম নিয়ে নিন একটা যাওয়ার পথে ।
– একটা মোবাইলও তো কিনতে হবে?
– সরি, স্মার্টফোন আপাততঃ আর নয়। এবার ঘরে যে বোতাম টেপা ফোনটা আছে ওটাই চালান। আবার কে ‘হাই হেলো’ করবে, বিপদে পড়ে যাবেন।
– একদম ঠিক। লোভে পাপ আর পাপে..।
– হতে পারত, কিন্তু হয়নি। আরে মশাই ক্লাবে আসুন। মাঝে মাঝে প্রাকটিস করি। ওখানেও সুন্দরী কম আসে না! তবে কিনা বাজারের মত নয় ।
– বলেছেন বটে। বড় রকমের শিক্ষা হলো।
সরকারি জিপ ধোঁয়ার কুন্ডলী আর ঘরড়ঘড়ে আওয়াজ করে ফোর্ট উইলিয়ামসের দিকে এগিয়ে চলল। কিছুটা যাওয়ার পর ড্রাইভারের কান এড়িয়ে মিঃ তালুকদার বললেন, – একটা কথা বলি আপনি কিন্তু এখনও যথেষ্ট হ্যান্ডসাম।
-সঙ্গে যোগ করে দিন, ফিজিক্যালি এন্ড মেন্টালি।
নিজেদের রসিকতায় দু’জনে হো হো হেসে উঠলেন।
(শেষ)











