
গত শতকের ষাটের দশক থেকে জেন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন প্রাইমেটদের স্বভাব চরিত্র নিয়ে গবেষণার কাজে। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়, শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে নিবিড় নিবিষ্ট গবেষণায় জেন ছিলেন পথিকৃৎ। একজন মহিলার পক্ষে আজ থেকে ষাট বছরেরও আগে এই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা যে কতটাই কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল আজ জেন চলে যাবার পর, হয়তো নতুন করে তা উপলব্ধি করতে পারছি আমরা।
জন্মসূত্রে বৃটিশ হয়েও জেন অরণ্য সঙ্কুল,দুর্গম আফ্রিকাকেই তাঁর বাসভূমি এবং কর্মভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন নির্দ্বিধায়। শিম্পাঞ্জিদের খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা শুধু নয়, মানুষের অন্যতম পূর্বজ হিসেবে পরিচিত এই প্রাইমেটদের সংরক্ষণ করে উন্নততর গবেষণায় নিজেকে এবং পরবর্তীয়দের উদ্বুদ্ধ করাই ছিল জেন গুডলের নিরন্তর প্রচেষ্টা। পাশাপাশি জেন একান্ত ভাবে চেয়েছিলেন মানুষের অবিবেচকের মতো কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাতে প্রাইমেটদের জীবন ও বাসভূমি সুরক্ষিত থাকে। এইদিক থেকে দেখলে জেনের কাজের প্রয়োগ দর্শন ছিল খুব সাদামাটা– বন বাঁচলে বাঁচবে বসত, বসত রক্ষা পেলেবিকশিত হবে প্রাণের বৈচিত্র্যময় ধারা, মুখরিত থাকবে বিশ্ব প্রকৃতির প্রাঙ্গণ। ভালো থাকবে মানুষও। নিজের এই বিশ্বাসের প্রতি জেন বিশ্বস্ত ছিলেন জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত।
- এই সুদীর্ঘ গবেষণার সূত্রে আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, যতটুকু আমার একান্ত উপলব্ধি তাতে করে বলতে পারি যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিদের মধ্যে পার্থক্য বোঝাতে যে বিভেদরেখা আমরা সবাই টানি তা কিন্তু মোটেই খুব স্পষ্ট নয়। আমরা ওদের সম্পর্কে খুব কম জানি বলেই এমন ভেদরেখা টানতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
কি সাংঘাতিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলেন জেন আমাদের! এমন কথা তাঁর মুখেই মানায় যিনি এই সত্যানুসন্ধানে ব্রতী ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত – দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে। সত্যিই এক অসামান্য উপলব্ধি!
শিম্পাঞ্জিদের সঙ্গে তাদের ডেরায় গিয়ে সময় কাটানোর অবসরে জেন উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে পৃথিবীর পরিবেশ মোটেই ভালো নেই। একদিকে জলবায়ুর পরিবর্তনের সংকট অন্য দিকে তাকে একরকম উপেক্ষা করেই মানুষের বেড়ে যাওয়া আগ্রাসন প্রাইমেটদের জীবনেও চরম অভিশাপ হয়ে নেমে আসছে। পৃথিবীর প্রাণ পরিবেশকে রক্ষা করতে না পারলে সকলের জীবনেই যে নেমে আসবে চরম পরিণতি। সেই কারণেই জেন পরবর্তী সময়ে একজন পরিবেশ সংগঠক হিসেবে কাজ করতে শুরু করলেন। ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যথাভরা কন্ঠে বলেন –
- আমরা বোধহয় ভুলে যাচ্ছি যে আমরাও এই বিশ্বপ্রকৃতির অংশ। এখনও সময় আছে ঘুরে দাঁড়াবার । সবকিছু নতুন করে ভাববার।
১৯৩৪ সালের ৩ এপ্রিল লন্ডনে জন্ম জেনের। পুরো নাম ভ্যালেরি জেন মরিস গুডল। যদিও তাঁর বিশ্ব পরিচিতি জেন গুডল নামেই।ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলীয় শহর বোর্ণিমাউথেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই জেনের স্বপ্ন ছিল পশুপাখিদের সঙ্গে বন্য পরিবেশে জীবন যাপনের। ছোটবেলায় জেনের বাবা তাঁকে একটা তুলো ভরা গোরিলা পুতুল উপহার দিয়েছিলেন। গোরিলাদের তথা প্রাইমেটদের সঙ্গে জেনের সখ্যতার সেই সূচনা।
কিছু টাকাপয়সা জমিয়ে নিয়ে জেন নৌকায় করে পৌঁছে গেলেন তাঁর স্বপ্নের কর্মভূমিতে। এখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় নৃতাত্ত্বিক ও জীবাশ্ম বিজ্ঞানী ডঃ লুইস লিকি এবং তাঁর পূরাতত্ববিদ স্ত্রী মেরী লিকির সঙ্গে। এই বিজ্ঞানী দম্পতিই জেনকে প্রাণিত করেন প্রাইমেটদের সঙ্গে কাজ করতে।
ডঃ লিকির তত্বাবধানে জেন গোম্বি স্ট্রিম শিম্পাঞ্জি রিজার্ভ স্থাপন করলেন তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুবিধার জন্য। টাঙ্গানাইকা হ্রদের তীরে গড়ে তোলা এই গবেষণা কেন্দ্রে থাকতে থাকতেই তিনি পর্যবেক্ষণ সূত্রে পৃথিবীকে জানালেন শিম্পাঞ্জিদের সম্পর্কে অনেক অনেক অজানা তথ্য – শিম্পাঞ্জিরা লড়াই করে , মাংস খায়,গর্ত থেকে উইপোকা ধরে খাবার জন্য ব্যবহার করে সহজ সরল কিছু টুলস বা সহযোগী উপকরণ। জেনের এই গবেষণা লব্ধ তথ্যে ডঃ লুইস লিকি এতোটাই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে তিনি মন্তব্য করেছিলেন –
- আমাদের এখন থেকে যন্ত্র ও মানুষের প্রচলিত সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনতে হবে, নাহলে মেনে নিতে হবে যে শিম্পাঞ্জিরাও আদতে মনুষ্য পদবাচ্য।

ভালো থেকো জেন, ভালো থেকো।
ঋণ স্বীকার: দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকা, দ্যা হিন্দু পত্রিকার প্রতিবেদন।
ছবির জন্য কৃতজ্ঞ দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকার কাছে।
ভিডিওটি ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলের সৌজন্যে প্রাপ্ত।
অক্টোবর ৩. ২০২৫












চমৎকার লেখা।
জয়ন্ত বাবুকে নমস্কার জানাই। সদ্যপ্রয়াতা যে অসামান্যা মানুষীর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য এই নিবন্ধটি লেখা হয়েছে, তাঁর কথা যিনিই লিখুন না কেন পাঠকের মন ছুঁয়ে যাবে। আমি উপলক্ষ মাত্র। ভালো থাকবেন।
খুব ভালো লাগলো। ধন্যবাদ লেখক কে এমন একজন মানুষের সম্মন্ধে জানানোর জন্যে।
এক অসাধারণ মানবীর কথা তুলে ধরার সুযোগ পাওয়ার জন্য আমারও খুব ভালো লাগছে। ধন্যবাদ জানাই।