২০২৪ এর ৯ই অগাস্ট আর জি কর হাসপাতালে পাশবিক যৌন অত্যাচারের শিকার হয়ে দুর্নীতির যূপকাষ্ঠে, শহীদ তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর ২ মাস ১৯ দিন পর, ২৮শে অক্টোবর গড়ে ওঠে অভয়া মঞ্চ, যার দশ দফা দাবীর প্রথম দাবী হল অভয়ার ধর্ষণ ও খুনের ন্যায় বিচার। পনেরো মাস অতিক্রান্ত, পথে নামা লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিবাদের পাশাপাশি গোপন কুটিল ষড়যন্ত্র চলেছে রাজ্য এবং কেন্দ্রের, বিচার ক্রমশ অধরা হয়েছে, সেটিং তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জন জোয়ারের ঢল ভাঁটার টানে কমতে থেকেছে। এর মধ্যেই লড়াইযের ময়দানে এক পাও পিছু না হটে অনমনীয় দৃঢ়তায় দাঁড়িয়ে আছে অভয়া মঞ্চ-
‘যদি চাও বন্ধু একা নও বন্ধু/ আছে এক লড়াইয়ের মঞ্চ/ এক সাথে লড়বার দুর্নীতি দুর্বার প্রতিরোধের গণমঞ্চ/ অভয়া মঞ্চ অভয়ার মঞ্চ/ লড়ছে লড়বে অভয়া মঞ্চ…’ (মানবজমিন সংগঠনের মিউজিক্যাল টিম ‘গানপন্থী’র তৈরি করা অভয়া মঞ্চের থিম সং)
বিপুল ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে নেমে নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন এবং পথে থাকার অবিচল সঙ্কল্পই অভয়া মঞ্চকে এগিয়ে যাবার শক্তি ও সাহস যোগায়। গত পনেরো মাসে অসংখ্য কর্মসূচির পাশাপাশি প্রতি মাসের ৯ তারিখ বিশেষ কর্মসূচির পরিকল্পনা করে মঞ্চ। ৯ তারিখ মানুষকে জাগিয়ে রাখার দিন, অপরাধকে ভুলতে না দেবার দিন, সাধারণ মানুষের করের তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে অপরাধকে ধামাচাপা দেবার চক্রান্তকে মনে করিয়ে দেবার দিন। ২০২৪ এর ৯ নভেম্বর অভয়া মঞ্চ রাণী রাসমণি রোডে এক বৃহৎ জনসভায় পেশ করেছিল জনতার চার্জশিট। সি বি আই-এর ব্যর্থতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে চিহ্নিত করেছিল প্রকৃত অপরাধীদের। এক বছর কেটে গেছে। সি বি আই খুন ধর্ষণ মামলায় চার্জশিট দিতে পারেনি এখনো। তাই ২০২৫ এর ৯ নভেম্বর অভয়া মঞ্চ গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু করল। আগামী তিন মাস ধরে এই স্বাক্ষর অভিযান চলবে। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি অভয়ার বত্রিশতম জন্মদিনে লক্ষাধিক মানুষের গণস্বাক্ষর নিয়ে অভয়ামঞ্চের প্রতিনিধিরা দিল্লি যাবেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারক লিপি জমা দিতে।
৯ তারিখ সকালে ডঃ পুণ্যব্রত গুণ অনলাইন মাস পিটিশনে সই করে অনলাইন স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করেন। সই এর কাগজে প্রথম সই করে কলকাতা শহরে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু করেন অভয়ার মা ও বাবা। জন্মলগ্ন থেকেই অভয়া মঞ্চের অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল মহানগরের এলিট আন্দোলনের গণ্ডী ছাড়িয়ে গ্রামে গঞ্জে মফস্বলের সব শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জেহাদ অভয়া আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। ৯ নভেম্বর এর কর্মসূচী পালিত হয় কলকাতার বাইরে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে।
কোন্নগর কানাইপুর বারোয়ারি তলায় নৃশংস ভাবে ধর্ষিত ও নিহত প্রতিবন্ধী মেয়েটির মা বাবাকে দিয়ে সকাল সাড়ে নটায় শুরু হয় গণ সাক্ষর ও প্রতিবাদ কর্মসূচি, যা চলে সাড়ে এগারোটা অবধি।
কলকাতায় আর জি কর হাসপাতালের সামনে বিকেল সাড়ে চারটেয় শুরু হয় গণস্বাক্ষর গ্রহণ। পাঁচ টায় সময় এখান থেকে মিছিল করে প্রতিবাদীরা শ্যামবাজার আসেন। আর জি কর হাসপাতালের সামনে এবং শ্যামবাজার – দুই জায়গাতেই পথসভায় যোগ দেন অসংখ্য মানুষ। রাস্তার ধারে বিভিন্ন দোকানে, রাস্তায়, মেট্রো স্টেশনে সই সংগ্রহ চলতে থাকে। পথচারী মানুষ, দোকানের ক্রেতা, বিক্রেতা, মেট্রো এবং বাসের যাত্রী – সমস্ত স্তরের মানুষের কাছ থেকেই বিপুল সাড়া মেলে। এই স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান বুঝিয়ে দেয় মানুষের ভিতরের চাপা আগুন এখনো মরে যায়নি । জীবন জীবিকার তাগিদে সকলের পক্ষে রাস্তায় থাকা সম্ভব না হলেও মানসিক ভাবে অভয়া মঞ্চের লড়াইযের পাশে আছেন এই শহরের অগণিত মানুষ।
প্রতিবাদী গান করেন ডঃ তরুণ কান্তি কর, সুকুমার প্রামানিক এবং ইলোরা দেবনাথ। উপস্থিত ছিলেন হাইকোর্টের প্রাক্তন আইনজীবী ভারতী মুৎসুদ্দি, মনীষা আদক, ডঃ হীরালাল কোনার, ডঃ তমোনাশ চৌধুরী, ডঃ সুবর্ণ গোস্বামী, ডঃ মানস গুমটা, ডঃ উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপ রায়, অসিত ভট্টাচার্য, ডঃ শতাব্দী মিত্র, নন্দা মুখার্জী, ধৃতিমান সেনগুপ্ত এবং অভয়া মঞ্চের অন্যান্য সদস্যরা। প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিচালনা করেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ।
উত্তরপাড়া অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে উত্তরপাড়ায় ৯ই নভেম্বর সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ৮. ৩০ টা পর্যন্ত উত্তরপাড়া স্বামী নিঃস্বম্বলানন্দ মহিলা কলেজের কাছে সলিল চৌধুরী ও ঋত্বিক ঘটকের জন্ম শতবার্ষিকী বর্ষে ১৫ মাস বিচারহীন অভয়া আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা আলোচিত হয় এক প্রতিবাদ সভায়। গণস্বাক্ষর কর্মসূচি শুরু হয়। সভায় প্রতিবাদী বক্তব্য, সলিল চৌধুরীর প্রতিবাদী কবিতা এবং নৃত্যের পাশাপাশি চলে গণস্বাক্ষর। জনগণ স্বত্বস্ফূর্ত ভাবে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রতিবাদ পত্রে স্বাক্ষর করেন।
ঋত্বিক –স্মরণ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক অরুনাভ গাঙ্গুলী। এছাড়াও অভয়া মঞ্চের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন জিষ্ণু মুখার্জী। সভাপতিত্ব করেন ডাক্তার অম্লান মুখার্জী।
আগরপাড়া অভয়া মঞ্চের ডাকে অভয়া হত্যার বিচারের দাবীতে আগরপাড়া বটতলায় গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়।
প্রান্তিক শহরের হেমন্ত সন্ধ্যা জেগে ওঠে বিচারের দাবীতে- জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে জলপাইগুড়িতে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু হয়।
গণস্বাক্ষর সংগ্রহ ছাড়া আরো কয়েকটি গণমুখী কর্মসূচি পালিত হয় এই দিনে। জনস্বাস্থ্য কমিটি ও কলকাতা নাগরিক সম্মেলনের উদ্যোগে, অভয়া মঞ্চ ও বেহালা প্রতিবাদী মঞ্চের সহায়তায় পর্ণশ্রী-তে অভয়া ক্লিনিকে পরিষেবা পান অসংখ্য সাধারণ মানুষ। এই ক্লিনিকে অংশগ্রহণ করেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ, ডঃ সুবর্ণ গোস্বামী এবং আরো বহু চিকিৎসক।
অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টরস-এর উদ্যোগে এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ ও ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল এন্ড সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ ইউনিয়নের সহযোগিতায় দার্জিলিং জেলার খড়িবাড়ি ব্লকের ডাঙ্গুজোত প্রাইমারি স্কুলে মেডিকেল রিলিফ ক্যাম্পে প্রায় চারশো রোগীর চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ করা হয়। উপস্থিত ছিলেন ডাঃ অমিত দত্ত, ডাঃ সৌমেন প্রতিহার, ডাঃ ঐশিক সরকার, ডাঃ সোহেল রানা, ডাঃ ফাতেহা খাতুন, ডাঃ পার্থ প্রতিম ভদ্র। এছাড়াও চারজন সহযোগী বন্ধু এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্যরা ছিলেন। ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে অঞ্চলে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা যায়।স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে শ্রীমতী দোলা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দ্রষ্টা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য।
সারা ভারত বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সংস্থার অশোকনগর শাখার সহযোগিতায় অশোকনগরে সকাল ১০ টা থেকে রাত ৭ টা অবধি প্রতিবাদী গানের অনুষ্ঠান হয় – ‘জীবনের জন্য গান’। প্রতুল মুখোপাধ্যায়, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, বিপুল চক্রবর্তী, সলিল চৌধুরীর গানে, শঙ্খ ঘোষের কবিতায় জেগে ওঠে শহরতলি।
স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ন্যায়বিচারের জন্য মানুষের সংগ্রাম জয় ছিনিয়ে আনবেই। আগামী তিন মাস সর্বশক্তি নিয়ে পথে থাকবে অভয়া মঞ্চ-
“জমা আছে মনে রক্তের যত ধার
প্রতি বিন্দুও শোধ দিতে হবে তার”
কৃতজ্ঞতা
- ডঃ সুদীপন মিত্র
- ডঃ মানস গুমটা
- ডঃ শুভজিৎ ভট্টাচার্য
- জিষ্ণু মুখার্জী
- ডঃ ঐন্দ্রিল ভৌমিক











