[এই জ্বলন্ত এবং গলন্ত সময়ে যখন সমাজের সব স্তরের মানুষ তাঁদের নিরাপত্তা, ভোটাধিকার এবং বে-নাগরিক হবার ভয় নিয়ে বর্তমানকে যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন, তখন এই লেখাটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি পূর্ণ নয় – আমি বিলক্ষণ বুঝি। আপাতত এই গবেষণাকর্মটি প্রকাশিত হোক। তারপরে আমিও আমাদের বর্তমান যাপন নিয়ে লিখবো।]
শুরুতেই প্রশ্ন উঠবে – চিকিৎসার সেকাল বলতে কী বোঝায়, আবার একাল বলতেই বা কী বোঝায়?
এ এক অতিবিস্তৃত ক্ষেত্র। শুরু হবে কোথা থেকে, শেষ হবে কোথায় – এ বিষটি নির্ণয় করা প্রায় অসাধ্য। যাহোক, সাধারণভাবে বাঙালির সেকাল-একাল বোঝাতে রাজনারায়ণ বসু ১৮৭৪ সালে লিখেছিলেন সে কাল আর এ কাল।[1] তাঁর পুস্তিকায় রাজনারায়ণ মোটের ওপরে হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা কালকে (১৮১৭) জলবিভাজিকা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
এ পুস্তিকায় তিনি বাঙালির স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রমের ক্ষমতা, আচারব্যবহার ইত্যদি বিভিন্ন বিষয়ের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর পুস্তিকায় তিনি জানাচ্ছেন – “আমাদিগের বর্ত্তমান রাজপুরুষদিগের আমলে সকলেতেই ভেজাল, সকলেতেই খাদ, সকলই গিলটি। মানুষেতেও ভেজাল, মানুষেতেও খাদ্, মানুষও গিলটি … শরীর সম্বন্ধীয় ইংরাজী আচার ব্যবহার অবলম্বন শারীরিক বলবীর্য্যহানির এক প্রধান কারণ। আমরা ইংরাজী পড়িয়া শরীররক্ষা সম্বন্ধীয় অনেক মঙ্গলকর পুরাতন প্রথা পরিত্যাগ করিতেছি। ইংরাজী রীতি এ দেশের পক্ষে উপযুক্ত নহে।”[2] তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে সাংস্কৃতিক রূপান্তর বোঝাতে গিয়ে একটি লাগসই শ্লোক ব্যবহার করেছিলেন। সংস্কৃতে আসল শ্লোক ছিল –
অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা।
পঞ্চ কন্যাঃ স্মরেন্নিত্যং মহাপাতকনাশনং।।
রাজনারায়ণের কালে এর আদলে তৈরি যে শ্লোকটি জনপ্রিয় হয়ে উঠল, তা হল –
হেয়ার্ কল্বিন্ পামরশ্চ কেরি মার্শমেনস্তথা।
পঞ্চ গোরাঃ স্মরেন্নিত্যং মহাপাতকনাশনং।।[3]
রাজনারায়ণের পুস্তিকা প্রকাশের আগে ১৮৬৪ সালে মেডিক্যাল কলেজের অতি কৃতি চিকিৎসক সূর্যকুমার গুডিভ চক্রবর্তী (যে চারজন ছাত্র উচ্চতর মেডিক্যাল শিক্ষার জন্য বাংলা তথা ভারত থেকে প্রথম লন্ডন যাত্রা করে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে (UCL) ভর্তি হন এবং যিনি ভারতের মধ্যে প্রথম আইএমএস (Indian Medical Service)-এ পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হয়ে কর্মরত হয়েছিলেন) ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক অধিবেশনে (২ ফেব্রুয়ারি, ১৮৬৪) “The Present of the Medical Profession in Bengal” শীর্ষক একটি লিখিত বক্তব্য রাখেন।
তাঁর ভাষণে তিনি ৩টি ভাগে বাংলার চিকিৎসাব্যবস্থাকে ভাগ করেছিলেন – (১) মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে, (২) মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরে (১৯শ শতকের শেষার্ধে) কী অবস্থা বিরাজ করছিল, এবং (৩) এর উন্নতি এবং সংস্কারের জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।[4]
সূর্যকুমারের করা বিভাজনটি আমার বাংলায় চিকিৎসার সে কাল ও এ কাল নিয়ে আলোচনায় গ্রহণ করছি। প্রসঙ্গত এটা বলে রাখা ভালো যে, একেবারে আধুনিক সময়ে বাংলায় চিকিৎসার আর কোন স্থানিক বৈশিষ্ট্য সেভাবে নেই। চিকিৎসার জগৎটি দখল করেছে প্রধানত অতিবৃহৎ কর্পোরেট হাসপাতাল এবং ৫-তারা ক্লিনিক।
অষ্টাদশ শতক এবং উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি বাংলার চিকিৎসা
ভারতে যেসব ইংরেজরা ইংরেজ শাসনের গোড়াপত্তন করেছিলেন এবং ইউরোপীয় মেডিসিনকে ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাবার ক্ষেত্রে প্রাগ্রসর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে উইলিয়াম হ্যামিলটনের নাম সর্বাগ্রগণ্য।
ডি জি ক্রফোর্ড তাঁর বিখ্যাত পুস্তকে মন্তব্য করছেন – “গত তিন’শ বছর ধরে যত মেডিক্যাল অফিসার ভারতের হয়ে চাকরি করেছেন তাঁদের মধ্যে উইলিয়াম হ্যামিল্টন সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত। এবং নিশ্চিতভাবে সেই ব্যক্তি যিনি দেশের পক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ হিতকারী (greatest benefactor)।”[5]
অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় উইলিয়াম হ্যামিল্টন ১৭০৯ সালে গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশুনো করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে যোগ দেন। এখানে মনে রাখা দরকার, স্বদেশে অর্থাৎ ইংল্যান্ডে সার্জেনদের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান একেবারেই সুবিধের ছিল না – কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে। এজন্য পাশ করা ডাক্তারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাঁধা চাকরিতে যোগ দিতেন। এছাড়া প্রাচ্যের তথা ভারতের বিপুল সম্পদ সম্পর্কে লোভ তো ছিলই – যতটুকু কামানো যায় এদেশ তথা ভারত থেকে। কিন্তু এখানেও ডাক্তারদের মাইনে আহামরি কিছু ছিলনা। তবে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করা যেত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উইলিয়াম হ্যামিল্টনের ৬ মাসে মাইনের জন্য বরাদ্দ ছিল £৩৬ বা ১৪৪ টাকা।[6] এখানে উল্লেখ করা দরকার যে কলকাতায় করা প্রথম যে পোস্টমর্টেমের খবর নথিভুক্ত আছে সে পোস্টমর্টেম যে দুজন সার্জেন করেছিলেন তাঁদের একজন হলেন এখানে আলোচিত উইলিয়াম হ্যামিল্টন – “In the same year, 1713, Hamilton and Harvey performed a post-mortem, the first in Calcutta of which any record has been preserved, as noted in Cons, of 6th Aug., 1713.”[7] কেমন ছিল সেই পোস্ট মর্টেম? “We do declare according to the best of our Skill upon the opemng of the Body of Wm Hall who had reced (received) a wound … the lower part of his Belly on the right side … which wounds he reced (received) his death.”[8]
এই সময় দিয়ে অর্থাৎ ১৮শ শতকের প্রথমভাগে ইংরেজদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল তৈরি শুরু হয়। এরকম একটি হাসপাতাল সম্পর্কে আরেক চিকিৎসসক-পর্যটক অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিল্টন মন্তব্য করেছিলেন – “The Company has a pretty good Hospital at Calcutta, where many go in to undergo the Penance of Physick, but few come out to give Account of its Operation.”[9] অর্থাৎ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি যথেষ্ট চমৎকার হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে বহু মানুষই রোগের চিকিৎসার জন্য যায়, কিন্তু খুব স্বল্প সংখ্যকই ফিরে আসে হাসপাতালের ভেতরের খবর দেবার জন্য। হাসপাতালের চিকিৎসায় মৃত্যুহার এই বিবরণ থেকে সহজেই অনুমেয়।
মজার বিষয় হল, হ্যামিলটনের বহুবছর পরে অন্তত ১৫০ বছর পরে লেখা হুইলারের লেখাতেও এ প্রসঙ্গটি উদ্ধৃত হয়েছে – “The Company has a pretty good hospital at Calcutta, Hospital, where many go in to undergo the penance of physic (মেডিসিন অর্থে), but few come out to give account of its operation.”[10]
অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিল্টনের আরেকটি পর্যবেক্ষণও চিকিৎসাসংক্রান্ত না হলেও বর্তমান প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিচারে – ““কলকাতায় সমস্ত ধর্মকে মুক্তভাবে সহ্য করা হয়, … The Roman Catholics have their Church to lodge their idols in, and the Mahomedan is not discountenanced.”[11]
সহজ বাংলা করলে, “কলকাতায় সমস্ত ধর্মকে মুক্তভাবে সহ্য করা হয়। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতায় সমস্ত ধর্মের মুক্ত সহাবস্থান তাঁকে বিশেষ করে প্রভাবিত করেছিল বোঝা যায়।
পলাশীর যুদ্ধের পরে ইংরেজরা যখন বাংলা এবং, পরবর্তীতে, ভারত বিজয় করে তখন তাদের চিকিৎসা খুব শ্লাঘনীয় অবস্থায় ছিলনা। আমি বাংলার দেশজ চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা থেকে আপাতত বিরত থাকছি। ইংরেজদের চিকিৎসা কেমন ছিল সে সংক্রান্ত একটি নমুনা পেশ করা যায়। ইংরেজকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সিরাজ-উদ্-দৌলার বিপক্ষে যারা চক্রান্তে গভীরভাবে লিপ্ত ছিল, তাদের একজন জগৎ শেঠ। কোন কারণে শেঠ পা হড়কে পড়ে গিয়ে হাতের অস্থিচ্যুতি (dislocation) হয়। শেঠ ইংরেজদের কাছে মেডিসিন পাঠানোর আবেদন করেন (খেয়াল করুন কোন আয়ুর্বেদজ্ঞ বা হাকিমের কাছে নয়)। ইংরেজিতে বিষয়টি এভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে এভাবে – “494.-Medicine for Jagat Set. [FROM ROYROYAN, SEPTEMBER.]
Your friendly letter in answer to mine, together with the oil and extract of horn and other medicines wrapt in paper for the cure of Juggut Seat’s arm dislocated by his foot slipping, with the letter, I have received … but you have not wrote in what manner the medicines are to be applied , for this reason I shall trouble you to send with expedition the name of the medicines in the paper and the method to apply them in separate notes, and I will forward them to Juggut Seat.”[12]
লক্ষ্য করুন, অস্থিচ্যুতির ওষুধ হিসেবে “extract of horn” তথা গরু বা মোষের শিংয়ের নির্যাস পাঠানো হচ্ছে।
এরপরের এন্ট্রিতেই বলা হয়েছে – “495.-A Doctor wanted to apply medicine to Jagat Set. [FROM JAGAT SET, SEPTEMBER. ]
Saturday the 20th of Morum, at 6 o’clock in the evening, as I was returning from dinner upon plain ground my foot slipped and I fell down, by which accident my shoulder was disjointed and two hours after I was bereaved of my senses … and I have received your favorable letter and the oil and extract of horn and other medicine and therefore I think you have done it from your own heart, and since their arrival I have gained much strength, but you did not mention in what manner the medicines were to be applied, … My hand was lost to me, but your favour I have received the use of it again, and I beg you will enquire and send me what other medicines may be necessary to remove the pain, and write me concerning the application, and also send a Doctor that perfectly understands the nature of the medicines. ”[13]
সম্ভবত ইউরোপীয় মেডিসিনের এরকম একটি অসহনীয় প্রেক্ষিত থেকেই সুখ্যাত ঐতিহাসিক C. A. Bayly বলেন – “When the British denounced Indian backwardness in theory, they meant their continued adherence to Aristotelian humoral notions which had only recently been abandoned in Europe. The insecurity of European knowledge was a potent element in their rages.”[14]
ইরেজরা শুধু শিংযের নির্যাস ব্যবহার করত এমন নয়। বাংলারও পল্লী অঞ্চলে এবং শহরাঞ্চলেও বিচিত্র ধরনের সব চিকিৎসা চালু ছিল। খোদ কলকাতায় (সেসময়ে বিকাশমান) বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেদেনিরা ওষুধ বিক্রি করত ছড়া কেটে
এই ওষুধ মোর ছুঁতে ছুঁতে
হুড়কো বৌ জায়ে আপনি শুতে,
বারো ফাটকা পুরুষ যারা,
আচল-দরা হয়ে ওঠে।[15]
সুমন্ত বন্দোপাধ্যায়ের দেওয়া আরেকটি তথ্য থেকে জানতে পারছি যে, মুদ্রণালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বটতলার ছাপাখান থেকে সস্তায় চিকিৎসাবিদ্যার বই বের হতে শুরু করে – গরিবদের চিকিৎসায় নিযুক্ত ডাক্তারদের সুবিধার্থে।[16] উদাহরণ হিসেবে সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন – “যেমন ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত চিকিৎসার্ণব। এর দাম ছিল দুই আনা, এবং বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে যে এ বইটি প্রণীত হয়েছে সেইসব চিকিৎসকদের জন্য যাঁরা তাঁদের রোগীদের কাছ থেকে চার আনা মাত্র পারিশ্রমিক পান। এই বইটির কয়েক সহস্র কপি বিক্রি হয়েছিল। সমসাময়িক হলধর সেন রচিত চিকিৎসা রত্নাকর ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত, তিন খণ্ডে বের হয়েছিল – প্রতি খণ্ডের মূল্য চার আনা।”[17]
সুমন্ত বন্দোপাধ্যায়ের মন্তব্য – “বটতলার এইসব বিষয়ের পাঠকশ্রেণি উঠে এসেছিল গ্রামের পুরানো কবিরাজ-হাকিম সম্রদায় থেকে, আবার নতুন এক সম্প্রদায় যারা পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যার অনুশীলনে উৎসাহী ছিল, তাদের চাহিদা মেটাবার জন্যও বটতলা প্রস্তুত ছিল।”[18] শুরু হল “print capitalism”-এর যুগ।
“হুতোম” তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে জানাচ্ছেন – “দিসি ও বিলিতি যমেরা (এখানে অর্থলোভী আক্তারদের কথা বলা হচ্ছে) অবস্থা ও রেস্ত মত গাড়ি পালকি চড়ে ভিজিটে বেরিয়েচেন – জ্বর বিকার ওলাউঠোর প্রাদুর্ভাব না পড়লে এঁদের মুখে হাসি দেখা যায় না – উলো অঞ্চলে মড়ক লাগাতে অনেক গোদাগাও (হাতুড়ে পশু চিকিৎসক[19]) বিলক্ষণ সঙ্গতি করে নেছেন; কলিকাতা শহরেও দু-চার গোদাগাকে প্রাকটিস্ কত্তে এ যায় এদের অষুধ চমৎকার, কেউ বলদের মতো রোগীর নাক ফুড়ে আরাম করেন; কেউ শুদ্ধ জল খাইয়ে সারেন। সহুরে কবিরাজরা আবার এঁদের হতে এক কাটি সরেশ, সকল রকম রোগেই “সদ্য মৃত্যুশ্বর” ব্যবস্থা করে থাকেন – অনেকে চাণক্য শ্লোক ও দাতাকর্ণের পুঁথি পড়েই চিকিৎসা আরম্ভ করেচেন।”[20]
এবার আমরা গ্রামের দিকে নজর দিতে পারি। পঞ্চানন মণ্ডল একটি অতি মূল্যবান কর্মসাধন করেছিলেন।[21] তাঁর পুস্তকের “নিবেদন” অংশে জানিয়েছেন (বেশিরভাগই গ্রামীণ মানুষের লেখা) বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন সময়ে লেখা মোট ৬৬২টি চিঠি সংকলিত হয়েছে এই পুস্তকে। এ এক দুঃসাধ্য কাজ। যদিও সবসময়ে এবং সব চিঠিতে নির্দিষ্ট সাল এবং তারিখ পাওয়া যায় না। কিন্তু চিঠি লেখার ধরনে এবং বাক্যবিন্যাসে গ্রামীণ শিক্ষার ছাপ এবং শিক্ষার স্বল্পতা স্পষ্টভাবে ধরা আছে। এবং প্রায় সব চিঠিই যতিচিহ্নহীন।
“ব্যাধি ও উৎপাত (১১৪৮-১২৭২ সন)” শিরোনামের প্রথম চিঠিতে লেখা হয়েছে – “আজ্ঞাকারি প্রতিপাল্য শ্রী ফকীর চন্দ্র সিংহ – সবিনয় পূর্বক নমষ্কারা নিবেদনঞ্চাগে … জানিবেণ আমার এখানে বড়ই বিভ্যরাট হইআছে এবং আমার হাতে আঙ্গুলে হইআছে তাহাতে কাহিল হইআছি … ইতি তারিখ ২৩ জষ্টি – [সন ১২৬২ সাল]।”[22]
আরেকটি চিঠিতে লেখা হয়েছে (যতি চিহ্নের ব্যবহার পাওয়া যায়) – “ঔষধের বহির নকল ঠাকুরের নিকটে আছে। তন্মধ্যে ক্ষতর মহৌষধ কাল্যা লতার পাতার দফা লেখা আছে। তাহা স্মৃতি না থাকনের সন্দেহ জন্যে এরূপ নিবেদন লিখিলাম। ক্ষতে ঐ পাতা বাঁধা কিম্বা ঐ পাতা বাটিয়া ক্ষতে প্রলেপ দিয়া শুষ্ক জলে উঠান। পুনশ্চ প্রলেপ দেওয়া। পুনঃ পুনঃ এইরূপ করিলে দুষ্ট রসাদি নির্গত হইয়া ক্ষত শুষ্ক শীঘ্র হয় অতএব বিহিতাজ্ঞা হবেক … ক্ষতে কাল্যা লতার পাতা শুষ্ক ক্ষতে প্রলেপ। [সন ১২২৩ সাল ২৮ আষাঢ়]।”[23]
অন্য আরেকটি চিঠিতে লেখা হয়েছে – “জ্বর পরে পালা জ্বরের আশঙ্কা ও আসেতে বড় পীড়িত সম্প্রতি কয়দিন স্পষ্ট জ্বরানুভব হয় নাহি কাসের অসাতে (?) ঔষধ পথ্য যোগে আছি ভাবিত নহিবা শ্রীঁঘাটে মানত পূজা দিবা … ইতি ১৭ শ্রাবণ”[24]। ভিন্ন একটি চিঠিতে লেখা হচ্ছে – “মহাকাল ভৈরব পূজা করিয়া একুষটি মরিচা দিয়া গঙ্গা জল দিয়া বাটিয়া সেবন করিবেন সাত দিবস হবিস্বি এবং ঔষধ ধারণ করিবেন আর তৈল মাখিবেন না কাঁচার ডাল খাইবে না মিষ্টাদি খাইবে না আর লেসা (? নেশা) মাত্রেক করিবে না প্রতি অমাবস্যায় পূজা করিবেন আর খাবার দ্রব্যাদি গরম করিয়া খাইবেন।। – দুগ্ধ ঘৃতাদি গরম করিয়া খাইবেন।। – দধি খাইবেন।। – (তারিখ অনুল্লেখিত)”[25]।
পরের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠিতে লেখা হয়েছে – “আমিই আপনাদের আপকার (অপকার) করিয়া সহর গিয়াছিলাম তাহাতে বীজাতীয় ব্যামো পাইতেছি ইহা জ্ঞাত হইবেন… (তারিখ অনুল্লেখিত)।[26]”
এই চিঠিগুলো ভালোভাবে নজর করলে কতগুলো বিষয় যথেষ্ট স্পষ্টভাবে আমাদের গোচরে আসবে – (১) স্থানীয় লেখার এবং ধ্বনির ধরন বাদ দিলেও জড়িয়ে থাকছে কর্মফল এবং অসুখের আন্তঃসম্পর্ক, (২) সমস্ত চিকিৎসাই সম্পূর্ণত দেশীয় ভেষজ এবং পদ্ধতি নির্ভর, এবং (৩) আধুনিক ইউরোপীয় মেডিসিনের লেশমাত্র গ্রামীণ সমাজে (অন্তত আমাদের আলোচ্য অংশতে) খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ঠাকুর পরিবার এবং আধুনিক চিকিৎসা
বাংলার চিকিৎসা জগতে ঠাকুর পরিবারের স্থান উল্লেখযোগ্য। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তুলনামূলকভাবে অল্প বয়সে বিষয় বুদ্ধির বদলে ব্রহ্মবিদ্যা সম্পর্কে আগ্রহ এবং তাঁর শিক্ষক রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ সম্পর্কে দ্বারকানাথ একদিন বিরক্ত হয়ে যা বলেন তার মর্মার্থ হল, এখন দেখি যে, বিদ্যাবাগীশ দেবেন্দ্রর কানে বহ্মমন্ত্র দিয়া তাহাকে খারাপ করিতেছেন। একে তার বিষয় বুদ্ধি অল্প, এখন সে ব্রহ্ম ব্রহ্ম করিয়া বিষয়কর্মে কিছুই মনোযোগ দেয় না।[27] এখানে বৈষয়িক এবং পাশ্চাত্যমুখী দ্বারকানাথের চিন্তা জগতের সঙ্গে একটি বিভাজনের সূচনা হচ্ছে। ঠাকুরবাড়ির পাশ্চাত্য অনুকরণ এইসময় থেকেই লঘু এবং দুর্বল হতে শুরু করে।[28]
বাংলার সাংস্কৃতিক শুধু নয়, সামগ্রিক চিন্তাপ্রবাহের ওপরে ঠাকুরবাড়ির বিপুল প্রভাব রয়েছে বলে আমরা ঠাকুরবাড়ির তথা দ্বিজেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা নিয়ে কী ধরনের ধারণা পোষণ করতেন সে বিষয়ে সামান্য কিছু আলোচনা করে নিতে পারি। এক্ষেত্রে প্রামাণ্য রবীন্দ্র জীবিনীকার প্রশান্তকুমার পালের একটি পর্যবেক্ষণ সাহায্যকারী – “ঠাকুর বাড়ির অদ্ভুত চিকিৎসা বিধানে অ্যালোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথি ও কবিরাজী চিকিৎসার আশ্চর্য সহাবস্থান দেখা যায়।”[29] ইংরেজ প্রশাসনের সঙ্গে সামাজিক সংযোগ, অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন এবং ভিক্টোরীয় যুগের ভাবাদর্শের ত্রিবিধ অভিঘাতে ঠাকুর পরিবারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত চিকিৎসক – বাঙালি, অবাঙালি এবং ইংরেজ – এবং হাসপাতালের প্রশিক্ষিতা বিদেশিনী নার্সের ব্যবস্থা গোড়া থেকেই ছিল। এমনকি মেডিক্যাল কলজের চিকিৎৎসকরাও, প্রিন্সিপাল সহ, ঠাকুরবাড়িতে চিকিৎসা করার জন্য আসতেন।[30]
তবে লিখিত চেহারায় এবং নির্দিষ্টভাবে ঠাকুর পরিবারে আয়ুর্বেদ নিয়ে আলোচনা করেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সামাজিক রোগের কবিরাজি চিকিৎসা পুস্তিকায়। কম্বুলিয়াটোলার পাঠ্য সমিতির অষ্টম মাসীয় পঠিত ভাষণের মুদ্রিত রূপ এই পুস্তিকা – প্রিয় শিষ্য অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়ের করকমলে সমর্পিত। বেঙ্গল লাইব্রেরি ক্যাটালগ অনুযায়ী এই পুস্তিকা প্রকাশের তারিখ ২৪শে আগস্ট ১৮৯১ সাল।[31]
তাঁর পুস্তিকা তথা ভাষণের শুরুতেই দ্বিজেন্দ্রনাথ জানান – “একে তো চিকিৎসামাত্রেই অন্ধকারে ঢেলা নিক্ষেপ, তাহাতে আবার কবিরাজি চিকিৎসা – ঊনবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানের রশ্মি আজ পর্যন্ত যাহার গবাক্ষ ভেদ করিতে পারে নাই।”[32] আধুনিক চিকিৎসা এবং কবিরাজির মধ্যেকার প্রভেদ বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন – “ডাক্তারি বিদ্যার গোড়াতেই শবদেহ পরীক্ষা; কবিরাজি বিদ্যার গোড়াতেই শরীর-মনের সম্বন্ধ পর্যালোচনা … শরীরের সঙ্গে যেখানে মনের সংশ্লেষ, সেইখানেই প্রাণের বসতি।”[33]
এরপরে বেশ কয়েক পৃষ্ঠা জুড়ে ক্লাসিকাল আয়ুর্বেদীয় ব্যাখ্যার কিছু আধুনিকীকরণ করেছেন। আয়ুর্বেদে ব্যবহৃত শ্লেষ্মা বা কফ, পিত্ত এবং বায়ু বা বাত-এর ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় শ্লেষ্মার আধিক্য তমোগুণের প্রাধান্য বোঝায়, কিন্তু কার্যত সামাজিক স্থিতির দল। পিত্ত-তে রজোগুণের প্রাধান্য, কিন্তু তাঁর বিচারে এরা “গতির দল”। বায়ু বা বাত সত্ত্বগুণ প্রধান এবং তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যায় “সৃষ্টিশীল তথা প্রবর্তনশীল দল”।[34] উদাহরণ হিসেবে তিনি লিখেছেন – “রুসো ভোলতেয়ার প্রভৃতি বায়ু-প্রধান মহাত্মারাই ফরাসীয় বিপ্লবের সৃষ্টিকর্তা কিনা মূল প্রবর্তক; আর Robbespiere Danton প্রভৃতি পিত্ত প্রধান মহাত্মারা ফরাসীয় বিপ্লবের গতিকর্তা কিনা নির্বাহ-কর্তা।”[35]
এই লেখার উপসংহারে বলেছেন – “ইংরাজি বিদ্যার প্রখর আলোকে এবং প্রচণ্ড উত্তাপে গোঁড়ামি ক্রমশই শহর নগর হইতে দূর-দূরস্থিত পল্লীগ্রামে নির্বাসিত হইতে লাগিল।”[36] কিন্তু বাস্তবে যে তা হয়নি সে বিষয়টি নিশ্চয়ই পাঠকেরা লেখার শুরুতে সুমন্ত বন্দোপাধ্যায়ের আলোচনা থেকে উপলব্ধি করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসার বোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে আছে বায়োকেমিক চিকিৎসা এবং বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে একটি eclectic দৃষ্টিভঙ্গী। মৈত্রেয়ী দেবীর লেখা থেকে নীচের বিষয়গুলো জানা যায়।[37]

গৌরচন্দ্র সাহার সংকলিত গ্রন্থে আমরা হোমিওপ্যাথি বা বায়োকেমিক চিকিৎসার শিরোনামে রবীন্দ্রনাথের শতাধিক চিঠির সন্ধান পেয়ে যাই।[39] বি এন মিত্রের Tissue Remedies গ্রন্থের (প্রথম সংস্করণের) ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন – “I still have a genuine interest in pursuing Homeopathic and Biochemic publication whenever I have the pleasure.”[40] তাঁর বিশেষ স্নেহাস্পদ মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারি পশুপতি ভট্টাচার্যের বইয়ের ভূমিকায় লিখছেন – “কিছুদিন থেকে গ্রামের কাজে নিযুক্ত আছি, দেখেছি সকলের চেয়ে গুরুতর অভাব আরোগ্যের। চিকিৎসার উপায় বিরল এই দেশে আনাড়িরাও বাধ্য হয়ে হোমিওপ্যাথি প্রভৃতি চিকিৎসা প্রণালী সম্বন্ধে পুঁথিগত বিদ্যা সংগ্রহ করে রোগের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াই করার চেষ্টা করে। ব্যবসায়ীরা যাই বলুক, কিছু ফল পায় না এ কথা বলা অত্যুক্তি। মন্দ ফল হয় না তাও বলতে পারিনে … বিবিধ উপায়ে গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে এদেশের লোককে বুঝিয়ে দেওয় উচিত ছিল কী করে রোগকে ঠেকানো যায়। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক সভার অঙ্গীভূত একটি আরোগ্য বিভাগ থাকা চাই। রাশিয়াতে এই প্রচারকার্য কীরকম সম্যকভাবে সমস্ত দেশ জুড়ে চলছে তা দেখে এসেছি। আমাদের দেশে এর প্রয়োজন সেখানকার অনেক বেশি। অথচ আয়োজন নেই বললেই চলে … ডাক্তার পশুপতির এই বইখানি তাঁদের কাজে লাগবে।”[41]
৩ মার্চ ১৯৩৮-এ ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় All Bengal Tuberculosis Association-এর সভাপতিত্ব করা অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন – “এযাবত এইরূপ বার্ষিক অধিবেশনে গবর্নরগণই সভা নেতৃত্ব করে এসেছেন। বর্তমান বৎসরে আমার একান্ত ইচ্ছা এই পরিবর্তন হয়।”[42]
২৫ জুলাই ১৯৩২-এ মহামহোপাধ্যায় গণনাথ সেন কর্তৃক “আয়ুর্বেদ মহাবিদ্যালয়”-এর প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন – “একদিন ছিল যখন ভারতবর্ষের চিকিৎসাবিদ্যার দূর সম্প্রসারিত খ্যাতি ছিল। এ বিদ্যা পরীক্ষণ ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ দ্বারা তখন ক্রমশঃ পরিণতি লাভ করিয়াছিল … মানুষের জ্ঞান কোন বিশেষ শাস্ত্রে কোন বিশেষ কালে যদি আবদ্ধ থাকে, তবে তাকে আমরা শ্রদ্ধা করতে পারি না … নিশ্চল শাস্ত্রে বদ্ধ জ্ঞানও প্রথা ও বিশ্বাসের দ্বারা সেইরকম খণ্ডীকৃত। তার মধ্যে সত্য নেই তা নয় কিন্তু সে সত্য কৃপণের সঞ্চয়ের মতো … তবে নতুন প্রতিষ্ঠিত এই মহাবিদ্যালয়ে গবেষণা মন্দির ও সেই মন্দিরের অপরিহার্য আনুষঙ্গিক রূপে আরোগ্যশালাও আছে।”[43]
রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর মেডিক্যাল কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ব্রামলেকে চিঠি লিখে জানাচ্ছেন – “বর্তমানে যে সমস্ত ছাত্র কলেজে পড়ছে কিংবা ভবিষ্যতে যে সমস্ত ছাত্র পড়বে তাদের উৎসাহিত করার জন্য আগামী তিন বৎসরের জন্য বার্ষিক দু-হাজার টাকা হিসেবে দিতে চাই। পুরষ্কারের আকারে এই টাকা ছাত্রদের অধ্যে বিতরিত হবে।”[44] এ ছাড়াও দ্বারকানাথ ভারতের মধ্যে যে প্রথম ৪ জন ছাত্র উচ্চত্র মেডিক্যাল শিক্ষার জন্য বিদেশ যাত্রা করেছিলেন, তাঁদের ২ জনের ব্যয়ভার দ্বারকানাথ বহন করেছিলেন।[45] পটলডাঙ্গায় Native Fever Hospital (এ দেশীয়দের চিকিৎসার জন্য) তৈরির ক্ষেত্রে একজন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগপতি ছিলেন।
সূর্য গুডিভ চক্রবর্তীর বিবরণ
শুরুতে যেমন বলেছি, চক্রবর্তী ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ১৮৬৪ সালের মিটিং-এ সেসময় থেকে ৩০ বছর আগেকার গ্রামীণ বাংলার চিকিৎসার কথা বলেছেন, অর্থাৎ ১৯ শতকের গোড়ার দিকের কথা। কেমন ছিল সে চিত্র? তাঁর বকব্যকে সহজে বোঝার জন্য আমরা আলোচনাটিকে সূত্রবদ্ধ করতে পারি এভাবে –
(১) বৈদ্য বংশে জন্ম নিলেই সে জন্মগতভাবে কবিরাজ হিসেবে পরিগণিত হয়। তারা কেবলমাত্র নাড়ি দেখতে পারত এবং কিছু ওষুধ দিতে পারত। রোগীকে পরীক্ষা করার কোন বালাই ছিল না।
(২) আরেকটি দল ছিল যাদেরকে টীকাদার বলা হত – দেশজ পদ্ধতিতে ধর্মীয় আচার-আচরণ সহ টীকা দিত। ওষুধের ক্ষেত্রে কী কী ছিল এদের হাতে? চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, পাচন, তুলসী বা বেল পাতা সহ ওষুধ খাবার নির্দেশ দিত। এ ছাড়া পাউডার বড়ি এবং তেলের ব্যবহার ছিল। তদুপরি ছিল মলম, ধোঁয়া দিয়ে জীবানু তাড়ানো এবং ক্ষার দিয়ে কোন ক্ষতের দহন ঘটানো। এদের প্রধান নির্ভরতা ছিল বদ্ধ ঘরে রোগীকে যথেষ্ট পরিমাণে কাপড়ে ঢেকে খাবার ন্যূনতম খাবার দেবার বিধানের ওপরে – এতে প্রচুর ঘাম হত।[46]
(৩) এরকম মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অনুষঙ্গ-যুক্ত চিকিৎসার মাঝেও চক্রবর্তী দুজন শিক্ষিত এবং স্বনামধন্য আয়ুর্বেদজ্ঞ চিকিৎসকের উল্লেখা করেছেন – রামদুর্লভ সেন এবং নীলাম্বর সেন। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছেন যে, নীলাম্বর সেন কোন গ্রামে গেলে গ্রামের সমস্ত মানুষ রাস্তায় ভিড় করে থাকত তাঁকে একবার দেখার জন্য। একটি ঘটনার কথা হুবহু চক্রবর্তীর বয়ানে রাখি – “The case was then in the last stage of of dysentery; and so, finding that he could do nothing in the way of cure, he boldy foretold the day and hour of death, which proved to be correct.”[47] মনে রাখা দরকার, মেডিক্যাল কলেজের প্রতিষ্ঠা পরব্ররতী শবদেহের ব্যবচ্ছেদ তখনো শুরু হয়নি এবং রোগের অঙ্গ-স্থানিকতা (organ localization of disease) সাধারণভাবে বাংলার চিকিৎসা ধারায় প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে নীলাম্বর সেনের prognosis-কেন্দ্রিক চিকিৎসার কৃতিত্বকে স্বীকার করতেই হবে।
(৪) চক্রবর্তী মোট ১৪ রকমের ভ্রাম্যমান “বিশেষজ্ঞের” কথা বলেছেন – (ক) barber-surgeon এবং টীকাদার ছাড়া ভ্রাম্যমান “চোখের ডাক্তার” যারা ছানি অপারেশন করত, (খ) ভ্রাম্যমান রক্তমোক্ষনকারী, (গ) lthotomists – যারা মূত্র থলির পাথর কেটে বের করত, (ঘ) “itinerant cuppers”, (ঙ) “itinerant leech-man”, (চ) “itinerant devotees” যারা বিভিন্ন ধরনের যাদুদ্রব্য এবং মাদুলি বিক্রি করত, (ছ) “itinerant exorcisers” – যারা বিভিন্ন স্নায়বিক এবং মানসিক রোগের চিকিৎসক বলে পরিচিত ছিল, (ছ) ওঝা – যারা সাপের বিষ বের করতে পারত বলে ধরে নেওয়া হত, (জ) হিন্দু মন্দিরের পূজারির দল, (ঝ) “cauterists” – যারা দেশীয় জ্বলন্ত গুল এবং লাল হয়ে গরম লোহা ব্যবহার করে ক্রনিক রোগ সারাতো বলে গ্রাহ্য ছিল, (ঞ) “acupuncture men” – যারা স্ফীত প্লীহা এবং লিভার ফুটো করত, (ট) “issue-men” – যারা কোন হাতের এবং পায়ের ক্ষতের জন্য বিচিত্র পদ্ধতি গ্রহণ করত, (ঠ) নারী-ডাক্তার – যারা মহিলাদের রোগের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করত, (ড) “travelling aurists”, (ঢ) দাঁত তোলার জন্য ভ্রাম্যমান “ডাক্তারের দল”, এবং অন্যান্য আরও অনেক রকমের “ডাক্তার”।[48]
(৫) মুসলিমদের ক্ষেত্রে তাদের হাকিম এবং জারা ছিল। এরা প্রায় সমস্ত রোগেই প্রচুর পরিমাণে রক্তমোক্ষণ করাতো এই বিশ্বাস থেকে যে দূষিত রক্ত বেরিয়ে গেলে রোগী সুস্থ হবে। এদের মধ্যে “good oculists”-ও ছিল।
(দেশীয় পদ্ধতিতে ছানি কাটার একটি হাতে আঁকা চিত্র – সৌঃ ওয়েলকাম লাইব্রেরি)১৮৬৪ সালে চক্রবর্তী মন্তব্য করছেন – “European practice was then, as yet, but little known in the country.”[49]
মেডিক্যাল কলেজ এবং পরবর্তী অভিঘাত[50]
একদিকে যেমন উদীয়মান মেডিক্যাল ছাত্ররা আধুনিক ইউরোপীয় মেডিসিনের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মেডিসিন, অবস্টেট্রিকস এবং, সার্জারির জগতে, দৃঢ়ভাবে নিজেদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করছিল, অন্যদিকে আয়ুর্বেদের ওপরে এর অনপনেয় প্রভাব পড়তে শুরু করল। ১৮৩৭ সালে মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক রিচার্ড ও’শনেসি উদয় মণ্ডল নামে একটি ২১ বছরের ছেলের চোয়ালের একটি বিশাল টিউমারের (প্রায় ৪ কেজি ওজনের) সফল অপারেশন করেন।[51] অপারেশনের আগে ও পরের দুটি চিত্র দিলাম। মনে রাখতে হবে, প্রাক-অ্যানেস্থেশিয়া যুগের এই অপারেশন কিরকম ইতিবাচক সামাজিক অভিঘাত তৈরি করতে পারে। ১০ মিনিটেরও কম সময়ে অপারেশন করা হয়েছিল। রক্তপাত হয়েছিল ২৩০ মিলিলিটারের মতো। ইউরোপীয় সার্জারির ঔৎকর্ষের প্রভাব ইউরোপীয় মেডিসিনের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলেছে।


১০০ বছরেরও বেশি আগে গণনাথ সেন লিখেছিলেন – “ক্রমে অনুচিত ধর্ম্মাভিমান বশতঃ চিকিৎসকগণ রোগীর মল-মূত্র-পূয়-রক্তাদিকে ঘৃণা করিতে আরম্ভ করেন এবং তাহার ফলে বস্তিক্রিয়া লোপ পায়, শস্ত্রচিকিৎসা ক্ষৌরকারদিগের বৃত্তি বলিয়া পরিগণিত হয় ও প্রসূতিবিদ্যা নীচ-জাতীয়া স্ত্রীলোকের হস্তে সমর্পিত হয় … নষ্টপ্রায় ভারতীয় বিদ্যার এবং বিপ্লবপীড়িত প্রজার উদ্ধারের জন্যই যেন বিধাতা কৃপা করিয়া উদার হৃদয় ইংরাজ জাতিকে এদেশে প্রেরণ করিয়াছেন … বহুদিনের পরে ভারতের নানা স্থানে আয়ুর্বেদের একটা নতুন জাগরণ দেখা যাইতেছে।”[53]
সামগ্রিক ফলাফল হিসেবে যা হল, এতদিন আয়ুর্বেদে প্রধানত যে চর্চা চলছিল তা হল টেক্সটে যা আছে তাকে সুপ্রমাণিত করা, সৃজনশীলভাবে তার প্রয়োগ করে চলা। সেটা মূলগতভাবে পরিবর্তিত হয়ে গিয়ে হল শবব্যবচ্ছেদ এবং রোগীর বেডসাইড ক্লিনিক্যাল অবস্থা যা শেখায় তা নতুন আয়ুর্বেদীয় জ্ঞানের জন্ম দেবে। Text-as-authority রূপান্তরিত হল আধুনিক পরীক্ষালব্ধ জ্ঞানে। মৃতদেহ শিক্ষিত করে তুললো জীবিত দেহ সম্পর্কে। ভারতীয় টেক্সটের সুপ্রাচীন কর্তৃত্ব, জীবন্ত এম্পিরিক্যাল ও এক্সপেরিয়েনশিয়াল (অভিজ্ঞতালব্ধ) জ্ঞান চিরকালের জন্য আধুনিক চিকিৎসাবিদার জগতে হারিয়ে গেলো।
আধুনিক মেডিসিনের সমকক্ষ হতে গিয়ে আয়ুর্বেদ এর প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে প্রকারান্তরে এবং প্রয়োগভেদে আধুনিক ইউরোপীয় চিকিৎসার ভিন্নতর প্রসারিত রূপ হয়ে উঠলো। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার প্রবর্তিত AYUSH-এর ক্ষমতাবৃদ্ধির মাঝে এটা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ভারতকে “বিশ্বগুরু” হতে হবে যে!
_______________________________
[1] রাজনারায়ণ বসু, সে কাল আর এ কাল, সম্পাদকঃ ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সজনীকাণ্ট দাস (কলকাতাঃ বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, মাঘ ১৪১১)।
[2] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৮-৩৯।
[3] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৫।
[4] S. Goodeve Chuckerbutty, “The Present State of the Medical Profession in Bengal”, British Medical Journal July 23, 1864, p. 86.
[5] D. G. Crawford, A History of Indian Medical Service: 1600-1913, ১ম খণ্ড (1914), পৃঃ ১১৩।
[6] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১১৫।
[7] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১১১।
[8] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১১১।
[9] আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন, A New Account of the East Indies, Being the Observations and Remarks, Vol. II, ১৭২৭, পৃঃ ১১।
[10] J. Talboys Wheeler, Early Records of British India: A History of English Settlements in India, 1878, পৃঃ ১৯১।
[11] Eyre Chatterton, A History of the Church of England in India Since the Early Days of the East India Company, 1923, Chapter IV. Calcutta, 1690-1756, পৃঃ ৭২।
[12] James Long, ed. Selections from Unpublished Records of Government for the Years 1748 to 1767 Inclusive, vol. I, 1869, পৃঃ ২৩৪।
[13] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৩৪-২৩৫।
[14] C. A. Bayly, Empire and Information: Intelligence gathering and social communication in India, 1780-1870, 2007, p. 281.
[15] সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, The Parlour and the Streets, 1989, পৃঃ১০৬।
[16] সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, উনিশ শতকের কলকাতা এবং সরস্বতীর ইতর সন্তান, ২০১৩, পৃঃ ৩৬৫।
[17] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩৬৬।
[18] প্রাগুত, পৃঃ ৩৬৬।
[19] সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা, সম্পাদনাঃ অরুণ নাগ, ২০০৮, পৃঃ ১৮৯।
[20] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৪৭।
[21] পঞ্চানন মণ্ডল, চিঠিপত্রে সমাজচিত্র, ২য় খণ্ড, বিশ্বভারতী, ১৯৫৩। (রবীন্দ্রভবন আর্কাইভস)
[22] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৬৬।
[23] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৬৬-৬৭।
[24] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭২।
[25] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৭৬।
[26] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৮০।
[27] শ্রী মন্মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, সম্পাঃ সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী, ৩য় সংস্করণ, বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ১৯২৭, পৃঃ ৬০-৬৩।
[28] জয়ন্ত ভট্টাচার্য, মেট্রোপলিটান মন বন কসমোপলিটাণ চিকিৎসাঃ একটি উত্তর উপনিবেশিক পর্যবেক্ষণ, ২০০০, পৃঃ ১৭।
[29] প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩০।
[30] প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী, ৫ম খণ্ড দ্রষ্টব্য। জয়ন্ত ভট্টাচার্য, মেট্রোপলিটান মন বনাম কসমোপলিটান চিকিৎসা, পৃঃ ১৯।
[31] রবীন্দ্রভবন আর্কাইভস এবং প্রশান্তকুমার পালের সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথন।
[32] দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সামাজিক রোগের কবিরাজি চিকিৎসা, ১৮৯১, পৃঃ ১।
[33] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৩।
[34] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১২-২৩।
[35] প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৯।
[36] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৫৫।
[37] মৈত্রেয়ী দেবী, মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, ১৯৫৮, পৃঃ ৭০।
[38] জয়ন্ত ভট্টাচার্য, মেট্রোপলিটান মন, পৃঃ ২২।
[39] গৌরচন্দ্র সাহা, রবীন্দ্র পত্রাবলীঃ তথ্যপঞ্জী, ১৯৮৫ (রবীন্দ্রভবন আর্কাইভস)।
[40] জয়ন্ত ভট্টাচার্য, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২২।
[41] পশুপতি ভট্টাচার্য, ভারতীয় ব্যাধি এবং আধুনিক চিকিৎসা, ১ম খণ্ড, ১৯৩৬ (রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সংগ্রহ – রবীন্দ্রভবন আর্কাইভস)।
[42] ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ফাইল, রবীন্দ্রভবন আর্কাইভস।
[43] চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পাদক), রবীন্দ্র প্রসঙ্গঃ আনন্দবাজার পত্রিকা (২২ মার্চ ১৯৩২-৩১ ডিসেম্বর ১৯৪১), আনন্দ, ১৯৯৩, পৃঃ ৫-৬।
[44] রঞ্জিত চক্রবর্তী, দ্বারকানাথ ঠাকুরঃ ঐতিহাসিক সমীক্ষা, ১৯৮৩, পৃঃ ১৫৩-১৫৪।
[45] বিস্তৃত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য, জয়ন্ত ভট্টাচার্য, The Calcutta Medical College, 1822-1897: Medicine, Social Psyche and the Making of Modern Citizenry (Primus, 2025)।
[46] Chuckerbutty, “The Present State”, ibid, p. 86.
[47] Ibid, p. 86.
[48] চক্রবর্তী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ৮৭।
[49] Chuckerbutty, ibid, p. 88.
[50] এ বিষয়ে সুবিস্তৃত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য, জয়ন্ত ভট্টাচার্য, The Calcutta Medical College, 1822-1897: Medicine, Social Psyche and the Making Modern Citizenry (Primus, 2025)।
[51] Richard O’Shaughnessy, “Case of enormous Tumor of the upper Jaw”, The Quarterly Journal of Calcutta Medical and Physical Society, January 1 1838, pp. 1-7.
[52] গণনাথ সেন, শারীর-পরিচয় (পূর্বার্ধ), ১৯২৪, পৃঃ ৪২।
[53] গণনাথ সেন, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬।












Excellent 🙏
চমৎকার