অনেক সময়ই রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের কাজকর্মের বিপক্ষে অবস্থান নিতে হয় বিভিন্ন গণ সংগঠনকে। অনুরোধ বিক্ষোভ সমাবেশ মিছিল অবস্থান অনশন এসব পরিচিত পন্থা। সরকার নানা ভাবে তার মোকাবেলা করে। মিছিল আটকে দেয়, অনেক সময় বলপ্রয়োগ করে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। তখন গণ সংগঠনকে আইনের দ্বারস্থ হতে হয়। গত কয়েক বছরে নানা আন্দোলন চলার সময় এই পরিস্থিতি বারবার হয়েছে। সংগঠনগুলি জেলা কোর্ট থেকে হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে বারবার।
আন্দোলন যখন তুঙ্গে থাকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বেশি বেশি হয়। আবেগ থেকে মানসিক সমর্থন, সরাসরি অংশগ্রহণ সবটাই অনেক সময় এত বেশি হয় যে সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়। সরকার তখন পরিচিত আপরিচিত উপায় খুঁজে নিয়ে তার মোকাবেলা করতে নামে। রাজনৈতিক ভাবে চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সেই মোকাবেলা করার কাজটি করে থাকে. ক্ষমতায় থাকা সরকার ও রাজনৈতিক দলটি।তারা নামীদামী আইনজীবীদের নিয়োগ করে। অনেক সময়ই কোন সরকারের কাজে দেশের আইন ভঙ্গের দায়ে অভিযোগ থাকলেও সরকার তার কৃতকর্মের অন্যায়কে রক্ষা করতে লাখ লাখ টাকা সরকারি ভাণ্ডার থেকে খরচ করে। অপর দিকে গণ সংগঠনগুলিকে কোর্টে এর জন্য পাল্টা আইনজীবী নিয়োগ করতে হয়।
এই আইনী প্রক্রিয়ায় অর্থের প্রয়োজন। সরকারের পক্ষে এটা আদৌ কোন সমস্যা নয়। কিন্তু অনেক সংগঠনের পক্ষেই এটা সমস্যার । তাদের অনেকের আর্থিক সঙ্গতি সত্যি সত্যিই সীমিত বা অতি-সীমিত। তাদের সদস্যরা অনেকেই নিজেদের উপার্জন থেকে একটা অংশ এর জন্যই ব্যয় করে। অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে টাকা চাইতে হয়। আন্দোলনের আবেগ, অংশগ্রহণ যখন বেশি থাকে তখন বেশ কিছু টাকা সেই ভাণ্ডারে জমা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে আইনী প্রক্রিয়া নানা কারণে দীর্ঘায়িত হয়। সময়ের সঙ্গে আন্দোলনের আবেগ অংশগ্রহণ স্বাভাবিক ভাবেই স্তিমিত হয়ে আসে। ক্রমশঃ ভাণ্ডার খালি হয়। তখন আর এক সমস্যা।এই সমস্যার মোকাবেলা কিভাবে করা যায় এই প্রশ্ন অনেকদিনের।
একটা সময় ছিল যখন অনেক আইনজীবী ছিলেন যারা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করতেন বা আন্দোলনের সরাসরি অংশীদার হয়ে যেতেন। এখনও অনেকে আছেন। আন্দোলনের জোয়ারের সময় এমন কিছু মানুষ জন থাকে যারা কিছুটা নিজেদের চারপাশের মানুষের কাছে নিজেদের গুরুত্ব বা ‘ইমেজ’ টা একটু আকর্ষণীয় করে তুলতে ‘আন্দোলনে আমিও আছি’, ‘নিঃস্বার্থ ভাবে আছি’ এসব সোচ্চার ঘোষণা করে আন্দোলনের ময়দানে নেমে আসেন। তারপর সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি ও দর্শন সমাপনান্তে বিলীন হয়ে যান। মানসিক তথা রাজনৈতিক চেতনার তাড়নায় বা কবুলিয়ত নিয়ে যারা আন্দোলনের শেষ পর্যন্ত থেকে যান সেই ব্যক্তি বা সংগঠনকে তখন আরও অনেক নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সেই পর্যায়ে সরকারি বাহিনী আন্দোলনে অংশ নেওয়া অগ্ৰবর্তী অংশের মনোবল ভাঙার জন্য চেনা-অচেনা নানা ধরনের প্রক্রিয়া প্রকরণ শুরু করে। এই অংশটিকে তখন আবার আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। আইনী ব্যবস্থার জন্য আবার নতুন করে অর্থের প্রয়োজন হয়। এইভাবে আইনী ব্যবস্থার জন্য অংশগ্রহণকারী ব্যক্তির ও সংগঠনের অর্থ সংস্থান সত্যি সত্যিই বৃহৎ সমস্যা হয়ে যায়।
এবার একটু তিক্ত বাস্তব কথা না বললেই নয়। যারা নিজেদের অ্যাক্টিভিস্ট বলে থাকেন তাদের কোন রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মী হতে হবে এমনটা নয়, অনেক সমাজকর্মী,শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ ছাড়াও সমাজের অনেক মানুষ থাকেন। অনেক খাবারের দোকানী, নির্মাণ কর্মী,পরিবহন কর্মী এরা সাম্প্রতিক সময়ে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালবেসে আন্দোলনে সামিল হয়ে গেছেন। অনতি অতীতের বা সুদূর অতীতের আন্দোলনের কথা স্মরণ করলে কমবেশি এমনটা দেখা গেছে। অনেক আইনজীবীকে এভাবে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় আন্দোলনের সমর্থনে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল হতে দেখা গেছে। চিত্তরঞ্জন দাশ প্রমুখ পরাক্রান্ত ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামী দের পক্ষে লড়াই করেছেন আদালতে। তাছাড়াও জেলা কোর্ট,হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে কয়েকজন আইনজীবী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন কারি দের পক্ষে আইনী লড়াই করে অনেক ঐতিহাসিক রায় আদায় করে বিখ্যাত হয়েছেন। নাগরিকদের কাছে সমাজের কাছে শ্রদ্ধা সম্ভ্রম পেয়েছেন।এই শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম ছিল নিখাদ। এটাই অনেকের কাছে লোভনীয়। তাদের বেশ কিছু জন স্বঘোষিত অ্যাক্টিভিস্ট ল- ইয়ার। তারা তাদের নিজেদের পারিশ্রমিক হিসেবে যা দাবি করে থাকেন তা বিস্ময়কর।
এখনও শিক্ষকদের অনেকেই বিনা পারিশ্রমিকে কিছু ছাত্র পড়ায়, চিকিৎসকদের অনেকেই বিভিন্ন চিকিৎসা মায় শল্যচিকিৎসা বিনা পারিশ্রমিকে করে থাকে তাদের মানবিক বোধ থেকে। বেদনার সঙ্গে বলতে হয় অনেক আইনজীবী এই ক্ষেত্রেও অনৃত ভাষণে অভ্যস্ত, এরাই স্বঘোষিত অ্যাক্টিভিস্ট ল-ইয়ার। এরকম স্বঘোষিত অ্যাক্টিভিস্ট শিক্ষক, চিকিৎসকের আবির্ভাব ঘটতে চলেছে।এই রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে চিকিৎসা শিক্ষাক্ষেত্রের অরাজকতা সেই ভয়ঙ্কর আতঙ্কের দিনের আগমনী গানের স্বরলিপি রচনা করছে। এই আত্ম প্রতারকদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা এক সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ।











