২১ নভেম্বর ২০২৫
সকালেই পোস্ট করা উচিৎ ছিল। কিন্তু সারাদিন সময় পাইনি। তাই রাতে খুপরী থেকে ফিরে লিখলাম।
আজ ২১ শে নভেম্বর এমন একজন মানুষের জন্মদিন, যার প্রভাব আমার চিকিৎসক জীবনের এক বিশাল স্থান জুড়ে। তিনি ডা. পুণ্যব্রত গুণ।
পুণ্যদাকে আমার স্যার বলা উচিৎ। কিন্তু স্যার বললে উনি ক্ষেপে যাবেন। এমনকি এই লেখার জন্যও ক্ষেপে যেতে পারেন। তাই যতটা সম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করে পুণ্যদাই বলছি। কারণ রেগে যাওয়া পুণ্যদাকে দুয়েকবার দেখেছি। অমন বিশুদ্ধ রাগ সামলানো আমার ক্ষমতায় কুলাবে না।
আমি যখন হামাগুড়ি দিচ্ছি, সেই ১৯৮৪ সালে উনি ভূপালে। ১৯৮৪ সালে ৩ রা ডিসেম্বর ভূপালের ইউনিয়ন কার্বাইড এর কারখানা থেকে গভীর রাতে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এই গ্যাস ছিল মিথাইল আইসোসায়ানেট (MIC)। বাতাসের চেয়ে ভারী হওয়ায় এই গ্যাস মাটি ঘেঁষে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তৎক্ষণাৎ হাজার হাজার ঘুমন্ত লোকের মৃত্যু ঘটে। যারা বেঁচে গেছিলেন তারাও ফুসফুসের ও নানা অঙ্গের জটিল রোগে আক্রান্ত হন।
ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি চিরকাল কর্পোরেটদের পাশেই দাঁড়িয়েছেন। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছিল ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনাকে লঘু করে দেখানোর। যেহেতু MIC কীটনাশক কারখানায় ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ছিল, সরকার থেকে প্রচার করা হয়, বিষাক্ত গ্যাসটি আদৌ MIC ছিল না। দূর্ঘটনাকে লঘু করে দেখার ফলাফল চিকিৎসা ক্ষেত্রে হয় মারত্মক। সে সময় বেশ কিছু চিকিৎসক যারা মানুষের জীবন রক্ষাকে একমাত্র ধর্ম মনে করে চিকিৎসা করতেন তারা বিভিন্ন জায়গায় মেডিকেল ক্যাম্প করে আক্রান্ত মানুষদের সঠিক চিকিৎসা দিতে শুরু করেন এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহে সায়ানাইডের উপস্থিতির প্রমাণ লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেন। এনাদের মধ্যে মেডিকেল কলেজের একটি চিকিৎসক দলও ছিল।
এক্ষেত্রে সরকার যা করার তাই করে। এই চিকিৎসা শিবিরগুলি তছনছ করে দেওয়া হয়। সমস্ত রকম নথিপত্র নষ্ট করে দেওয়া হয়। এবং চিকিৎসকদের গ্রেফতার করা হয়। ডাক্তার পুণ্যব্রত গুণ সেই সময় ভূপাল গিয়ে অন্যান্যদের সাথে এই বন্ধ হওয়া চিকিৎসা কেন্দ্র গুলি আবার খুলে নতুন উৎসাহে চিকিৎসা শুরু করেন।
যার চিকিৎসক জীবনের শুরুতে এরকম ঘটনা তার পরবর্তী জীবন যে আর পাঁচজন সাধারণ চিকিৎসকের মত হবে না সেটা নিশ্চিত। এরপর তিনি ছত্তিশগড়ে গিয়ে বিখ্যাত শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ শুরু করেন। শহীদ হাসপাতাল গড়ে তোলার অন্যতম ভূমিকা নেন।
পুঁজিপতি মালিকদের হাতে শংকর গুহ নিয়োগী খুন হওয়ার কয়েক বছর পর তিনি বাংলায় ফিরে আসেন। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগে আরও কয়েকজন সমমনস্ক চিকিৎসকের সাথে চেঙ্গাইল সহ আরও কয়েকটি চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। নুন্যতম খরচে কীভাবে সাধারণ মানুষের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান সম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব, এই চিকিৎসা কেন্দ্রগুলি তার একেকটি মডেল। তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বলার জন্য আমি একেবারেই আদর্শ লোক নই। আমি বরঞ্চ বলতে পারি আমি তাকে কিভাবে দেখেছি।
মেডিকেল কলেজে আমি ডিএসএ’র সাধারণ কর্মী ছিলাম। নেতা হওয়ার কোনোরকম ইচ্ছা বা ক্ষমতা ছিল না। আমার ভয়ানক মঞ্চ ফোবিয়া আছে। ডায়াসে উঠলেই পা ঠক ঠক করে কাঁপে।
সে সময় ওনার সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি। সেসব গল্প শুনে পুণ্যদাকে অতিমানব মনে হতো। কলেজ জীবনের শেষ দিকে দুই একবার দেখলেও ভয়ে ধারে কাছে ঘেঁষিনি।
তারপর মেডিকেল কলেজ থেকে বেরিয়ে মুর্শিদাবাদের এক প্রত্যন্ত গ্রামীণ হাসপাতালে চিকিৎসক হিসাবে চলে যাই। দৈনন্দিন নানা চিকিৎসক জীবনের অভিজ্ঞতা খাতাতে টুকে রাখতাম। ২০১৪ সালে এমডি পাস করার পর পানিহাটি হাসপাতালে পোস্টিং হয়। তখন ফেসবুকের ব্যবহার শিখলাম গল্পগুলো খাতার বদলে ফেসবুকেই লিখতে শুরু করলাম। দু চারজন করে পড়তেন। মন্তব্য করতেন।
একদিন দেখি ডাক্তার জয়ন্ত দাস মন্তব্য করেছেন, এই লেখাটা স্বাস্থ্যের বৃত্তে দেবে?
আমি তো আনন্দে আত্মহারা। স্বাস্থ্যের বৃত্তে পত্রিকা আগেও পড়েছি। সেখানে আমার লেখা জায়গা পাবে! এরপর নিয়মিত স্বাস্থ্যের বৃত্তে-তে লিখতে শুরু করলাম এবং সেই সূত্রে ডাক্তার পুণ্যব্রত গুণের সাথে আবার যোগাযোগ হল।
২০১৮ সালে হোস্টেলের দাবিতে মেডিকেল কলেজে ছাত্ররা অনশন করে। সে সময় একাধিকবার মেডিকেল কলেজে গেছি। সে আন্দোলনের দিনগুলিতে পুণ্যদার সাথে অনেক কথা হয়েছে।
এরপর এন আর এস এর ডাক্তার পরিবহ আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসাক আন্দোলন শুরু হয়। তারপর চলে আসে করোনা। সে সময় একাধিকবার পুণ্যদার সাথে মেডিকেল ক্যাম্প করতে গেছি। সাধারণ মানুষের জন্য তাঁর সহমর্মীতা দেখে অবাক হয়েছি। একেবারে হতদরিদ্র মানুষের পাশে বসে একই খাবার তৃপ্তি করে খাচ্ছেন। তাঁর সাথে বন্ধুর মত মিশছেন।
যখন জোরদার লকডাউন চলছে- বিভিন্ন জায়গায় ক্যাম্প করব বলা মাত্রই তিনি গাড়ি করে জেনেরিক ওষুধ পৌঁছে দিয়ে গেছেন মধ্যমগ্রামে। বারাসাত সিটিজেন ফোরামে বৃহস্পতিবার করে আউটডোর করতে আসতেন। এখনো আসেন। যাওয়ার পথে ওষুধ নামিয়ে দিয়ে যেতেন।
করোনার সময় শুরু হওয়া শ্রমজীবী মানুষদের জন্য সেই ক্যাম্প এখনো নিয়মিত চলছে। পুণ্যদার কাছ থেকে একটা জিনিস শিখেছি সহজে হাল ছাড়তে নেই। লেগে পড়ে থাকতে হয়। স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাঁটা সহজ নয়। কিন্তু বড় আনন্দের।
এই সময় ডক্টরস ডায়লগ বলে একটি ওয়েব ম্যাগাজিন শুরু হয়। সম্পাদক হিসেবে পুণ্যদার সাথে আমাদেরও কয়েকজনের নাম আছে। এই ম্যাগাজিনটির প্রায় ছয় বছর বয়স হয়ে গেল। কিন্তু স্বীকার করতে লজ্জা নেই ছ’বছর ধরে এটি পুণ্যদা প্রায় একক প্রচেষ্টায় বাঁচিয়ে রেখেছেন।
২০২৪ সালে অভয়া আন্দোলনের শুরু থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। কত মানুষ এসেছেন, চলে গেছেন। কত মানুষ আবার নিজের ইমেজ তৈরির জন্য আন্দোলনকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু পুণ্যদা মাটি কামড়ে পড়ে আছেন এখনো । তাঁর একটাই উদ্দেশ্য অভয়াকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দেওয়া। এবং এটা নিশ্চিত ভাবে জানি, যতদিন না সেটা হচ্ছে তিনি হাল ছাড়বেন না।
কিন্তু চরম আন্দোলনের সময়ও তিনি বিভিন্ন শ্রমজীবী ক্লিনিকে রোগী দেখা বন্ধ করেননি। এইসব জায়গায় রোগী দেখে তাঁর কোন অর্থনৈতিক লাভ হয় না। এইসব খেটে খাওয়া মানুষদের চিকিৎসা করে তার খ্যাতি হয় না। কিন্তু এসবের পরোয়া তিনি কোনদিনও করেননি। যাবতীয় কাজ করে যান শুধু দায়বদ্ধতা থেকে।
চিকিৎসক হিসেবে তিনি যথেষ্ট দক্ষ। চাইলেই সুখে স্বাচ্ছন্দে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, ভাগ্যিস করেননি।
তাই আমার মত বহু জুনিয়ার এই উদ্ভ্রান্ত সময়েও একজন আদর্শকে সামনে রেখে পথ চলতে পারছে। কখনো রাস্তা হারিয়ে ফেললে যাকে নিঃসংকোচে ফোন করে বলা যায়, পুণ্যদা, একটা সমস্যা হয়েছে।











খুব ভালো লেখা। এই অতিমানবের সংস্পর্শে এসে আমার মতো সাধারণ মানুষও ধন্য। এক শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালোবাসা মানুষটির সাথে থাকতে উদ্বুদ্ধ করে।
ডক্টর পূণ্যব্রত গুণের মতো একজন অসাধারণ নেতৃত্বের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছে অভয়া মঞ্চের সৌজন্যে। 🙏🙏✊✊
জন্মদিনের শুভকামনা রইলো। আত্মপক্ষের পথিক হয়েও দুজনে পাশাপাশি পাড়ি দিলাম বেশ কিছুটা সময়। প্রথম আলাপের সময়টা এখনও বেশ মনে আছে আমার। আপনার কি মনে আছে? ডক্টরস ডায়লগের পাতাটা কখন যে আমার লেখালেখির একটা গেরস্থালি হয়ে উঠেছে তা জানা নেই। আমাদের সামনাসামনি দেখা হয়নি এখনও তবে তাতে ভাব জমাতে কারোরই বোধহয় খুব অসুবিধা হয়নি। ভালো থাকবেন। নিজের বিশ্বাসে স্থিতধী থাকবেন আগামী দিনেও।
ঐন্দ্রিলকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই এই পুণ্য বার্তা ভাগ করে নেবার জন্য।