মাননীয় মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক
পশ্চিমবঙ্গ
বিষয়ঃ- ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এস আই আর) চূড়ান্ত পর্বে প্রকাশিত তালিকার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে স্মারকলিপি প্রদান।
মহাশয়,
গত ২৭অক্টোবর, ২০২৫ থেকে শুরু করে চার মাসাধিক সময়কাল ধরে রাজ্যে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনে’র(SIR) কাজ সমাপ্ত হওয়ায় চূড়ান্ত পর্বের ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে গত ২৮ফেব্রুয়ারী, ২০২৬। এই ভোটার তালিকা প্রকাশের পর আমরা সবাই গভীর উদ্বেগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করলাম ৬০ লক্ষাধিক মানুষ যাদের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে কিন্তু ‘under adjudication’, যারা এই মুহূর্তে ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই ধরণের খন্ডিত ভোটার তালিকা প্রকাশ আমাদের রাজ্যের অভিজ্ঞতায় এই প্রথম। সারাদেশেও এর কোন নজির আছে কিনা আমাদের জানা নেই। SIR এর কাজকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য প্রশাসনের মধ্যে যে অভূতপূর্ব চাপানউতর, তার পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এ রাজ্যের বিচার ব্যবস্থার হস্তক্ষেপে ভোটার তালিকার সম্পূর্ণ প্রকাশের কাজ সমাপ্ত হবে, এও এক নজিরবিহীন ঘটনা। এর সাথে সাথে আমরা লক্ষ্য করলাম প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষ যাদের নাম খসড়া তালিকা থেকে নতুন করে বাতিল বা ‘ডিলিট’ করা হয়েছে, ফলতঃ আমাদের রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা খসড়া তালিকার তুলনায় কমে গিয়েছে, যা গোয়া ছাড়া অন্য কোন রাজ্যে ঘটেনি। স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যব্যাপী এক চরম অস্থিরতা ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে মানুষ দিন কাটাচ্ছেন। লক্ষ্যণীয়, রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের এক বড় অংশ যারা বিগত দিনগুলোতে নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন তাদের একাংশের নাম ‘অনিশ্চিত’ বা ‘বিচারাধীন’এর তালিকায় চলে গেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ছাড়াও আরও কিছু বিশেষ অংশের মানুষের নাম ‘বিচারাধীন’ (under adjudication) তালিকায় চলে গেছে। শুরু থেকেই নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া প্রক্রিয়াগত অস্পষ্টতা বজায় রাখার কারণে এমন অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা মনে করি এবং সেই কারণে এই প্রসঙ্গে আমরা আমাদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও দাবিসনদ আপনার সামনে উপস্থিত করছি।
১) লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি যা শুরু থেকে ব্যাখ্যায়িত ছিল না, তার ব্যবহারের ফলে অযৌক্তিকভাবে কিছু বিশেষ অংশের মানুষের নাম বিচারাধীন বা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, এমন বহু বাস্তব উদাহরণ আমাদের কাছে রয়েছে। এটা স্পষ্ট যে এইভাবে তৈরী করা তালিকা ব্যবহার করলে বহু বৈধ ভোটার অন্যায্যভাবে ভোটদানের মাধ্যমে তাঁর নাগরিক অধিকার প্রয়োগে ব্যর্থ হবেন। তাই আমাদের দাবি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির প্রসঙ্গ মুলতুবি রেখে, ডিলিটেড ও বিচারাধীনসহ খসড়া তালিকায় থাকা প্রতিটি ভোটারের ভোটদানের ব্যবস্থা করা হোক, সাথে নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ১.৮৬ লক্ষ ভোটারের নামও যুক্ত হোক। এতে আমাদের রাজ্যের ভোটার তালিকার সাথে অন্যান্য রাজ্যের তালিকার সাযুজ্য থাকবে।
২) উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব – প্রায় ৬০লক্ষাধিক মানুষ যাদের ভোটাধিকার ‘বিচারাধীন’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যথেষ্ট সময় নিয়ে সে বিচার প্রক্রিয়া চলুক কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে কমিশন তাদের ভোটদান মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে সুনিশ্চিত করুক।
৩) বিগত ১৬ডিসেম্বর,২০২৫ খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর নতুন করে ৫ লক্ষ ৪৭ হাজার ভোটার ‘বাতিল’ (deleted) কেন তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।
৪) নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক ঘোষণা অনুযায়ী ‘ম্যাপিং’ করা সম্ভবপর হয়েছে এমন অথচ তারপরেও ‘logical discrepancy’ র নামে ১কোটি ২০লক্ষ ভোটারকে যাচাই কোন নিয়মে তা জানতে চাই। ২০০২ সালের সাথে যাদের ম্যাপিং হয়ে গেছে তাদের নাম অবিলম্বে বৈধ বলে ঘোষণা করতে হবে। তাদের কোনভাবেই বিচারাধীন রাখা যাবে না।
৫) বাকি নাম কেন বিচারাধীন সেই কারণসহ নামের তালিকা এখনই প্রকাশ করতে হবে।
৬) ভোটার তালিকা তৈরীর ক্ষেত্রে কিছু চরম অযৌক্তিক নজির আছে। যার বাবার ছ’টি সন্তান বলে নোটিশ এসেছিলো তার নাম বাদ দিলে বলতে হবে যে বাবার ছ’টি সন্তান থাকায় নাম বাতিল হলো বা যে ব্যক্তির সঙ্গে ম্যাপিং করা হয়েছিল তিনি তার বাবা নন বলে প্রমাণিত হয়েছে। যার নোটিশ এসেছিলো যে আপনার পিতার বয়স আপনার থেকে ১৫ বছর বেশী সে ক্ষেত্রে বাদ দেওয়ার সময় বলতে হবে আপনার বাবা কম বয়সে বাবা হওয়ায় আপনার নাম বাদ দেওয়া হলো বা উনি আপনার বাবা নন বলে প্রমাণিত হওয়ায় আপনার নাম বাতিল করা হলো।
যার নোটিশ এসেছিলো যে আপনার বাবার বয়স আপনার থেকে ৫০ বছর বেশী সে ক্ষেত্রে বাদ দেওয়ার সময় বলতে হবে আপনার বাবা বেশী বয়সে বাবা হওয়ায় আপনার নাম বাদ দেওয়া হলো বা উনি আপনার বাবা নন বলে প্রমাণিত হওয়ায় আপনার নাম বাতিল করা হলো।
৭) কতকগুলো নির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণসহ দাখিল করতে চাই। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী পাসপোর্ট জমা দেওয়া হলেও তা ফেরৎ করা হয়েছে।মাইক্রো অবজারভার ফেরৎ দেওয়ার পরেও সংখ্যালঘু
ভোটার ‘বিচারাধীন’ অথচ ‘অন্য’ অংশের মানুষ ভোটার লিস্টে সহজেই স্থান পেয়েছেন, রহস্য কি? বিভিন্ন কারণে শুনানীতে ডাকলেও সেই প্রশ্নের উত্তর না চেয়ে নির্দিষ্ট কাগজ চাওয়া হয়েছে, কেন?
৮) এই ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারদের ৫৮.৬ শতাংশই মাত্র পাঁচটি জেলা থেকে। সেগুলি হলো মুর্শিদাবাদ, মালদা, উঃ দিনাজপুর, উঃ ২৪পরগনা ও দক্ষিণ ২৪পরগনা। যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ এই উদ্যোগ।
৯) সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর জেলায় ‘ lowest unmapping rate’ থাকা সত্ত্বেও বিচারাধীন ভোটারের অনুপাত সবচেয়ে বেশী। অন্যদিকে উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা, নদীয়াতে ‘highest unmapping rate ‘ সত্ত্বেও বিচারাধীন ভোটারের অনুপাত যথেষ্ট কম। এর পিছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে হবে।
১০) নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত গণনা ফর্মে সকল ভোটার নিজের নতুন ছবি ও বর্তমান বয়স উল্লেখ করলেও ভোটার লিস্টে তার কোন প্রতিফলন দেখা গেল না কেন তা জানা দরকার।
১১) নির্বাচন কমিশনের আধিকারিক হিসেবে কর্মরত রাজ্য প্রশাসনের যে আধিকারিকরা চরম অন্যায় ও অনৈতিক কাজ করে নিশ্চিত ভোটারদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিলেন তাদের চিহ্নিত করে চরম শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
১২) আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এ রাজ্যের ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে, বাধাহীনভাবে ভোটদান করতে পারেন তার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা গ্যারান্টি করতে হবে দেশের নির্বাচন কমিশনকে। কমিশনের নির্দেশ মেনে ভোটকর্মীরা সঠিকভাবে ভোট পরিচালনা করতে পারেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পান তা সুনিশ্চিত করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।
সামগ্রিকভাবে ‘সংগ্রামী গণমঞ্চ’ খসড়া তালিকায় নাম থাকা এবং নতুন যুক্ত হওয়া এমন সকল ভোটার যাতে আসন্ন নির্বাচনে ভোটদান করতে পারেন, রাজ্যের বৃহত্তর নাগরিক সমাজ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ নাগরিক অধিকার যাতে প্রয়োগ করতে পারেন তা সুনিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।
ধন্যবাদান্তে,
বিনীত
সংগ্রামী গণ মঞ্চ
৫ মার্চ ২০২৬ বেলা ৩টার সময় একটি মিছিল শুরু হয় সুবোধ মল্লিক স্কয়ার থেকে। কলকাতা কর্পোরেশনের কাছে মিছিলের পথ রোধ করে পুলিশ। সেখানে বিক্ষোভ সমাবেশ চলতে থাকে। সমাবেশ থেকে একটি প্রতিনিধি দল যায় উচ্চ আদালতে, অন্যটি ইলেকশন কমিশনের দপ্তরে।









