গোটা বর্ধমান মেডিকেল কলেজের দেওয়ালজুড়ে অভয়া আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে চলা অসংখ্য গ্রাফিটি, স্লোগান, গান ও কবিতার চিত্রকল্প রাতের অন্ধকারে চুনকাম করে মুছে সাফ করে দেওয়া হল।
রাজ্যে ক্ষমতার রদবদল হয়েছে। তিনজন IPS অফিসার সাসপেন্ড হয়েছেন। অভীক দে ও বিরূপাক্ষ সাসপেন্ড হয়েছে, বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার ভাষা কি আদৌ বদলেছে?
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এই দেওয়ালচিত্রগুলি নেহাতই কিছু শিল্পকর্ম ছিল না। এগুলি ছিল বাংলার অন্যতম বৃহত্তম গণআন্দোলনের স্মারক, প্রতিবাদের দলিল এবং গোটা কলেজ ক্যাম্পাস জুড়ে আন্দোলনের আবেগকে জীবন্ত রাখার মাধ্যম। তাহলে নতুন সরকারের আমলে হঠাৎ সেই ছবিগুলি মুছে ফেলা হল কার নির্দেশে?
ঘটনার পরদিনই ছাত্রছাত্রীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, তাঁরাও নাকি জানেন না কীভাবে এই ঘটনা ঘটেছে।
এই বক্তব্য শুনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তার থেকেও বড় উত্তর দিয়েছেন বর্ধমান মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীরাই।
পরবর্তী দুদিন ধরে চুনকাম করে দেওয়া প্রতিটি দেওয়াল আবার নতুন করে রঙে, তুলিতে, স্লোগানে, কবিতায় এবং প্রতিবাদের ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেছেন তাঁরা। স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন অসংখ্য পড়ুয়া। তাঁরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ক্যাম্পাস কোনো রাজনৈতিক দলের নির্দেশে চলবে না। স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠবেই।
এই ঘটনায় আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল, সরকার বদলালেও সমাজে দুটি পক্ষ আজও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এক পক্ষ ক্ষমতার রাজনীতিতে ও পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। অন্য পক্ষ বিশ্বাস করে অধিকার আদায়ের রাজনীতিতে, গণতান্ত্রিক প্রতিরোধে এবং প্রশ্ন তোলার অধিকারে।
অভয়া আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ক্ষমতার সামনে শিরদাঁড়া সোজা রেখে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। সেই শিক্ষা নিয়েই ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট নিজেদের এই সংগ্রামের অংশ ও প্রতিনিধি বলে মনে করে।
মনে রাখতে হবে, অভয়ার ঘটনার পর আন্দোলনের ফলেই রাজ্যের প্রায় প্রতিটি মেডিকেল কলেজে থ্রেট কালচারের ভয়াবহ অভিযোগ সামনে আসে। জুনিয়র ডাক্তার ও মেডিকেল পড়ুয়ারা সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন, তথ্য সামনে আনেন এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
সেই প্রেক্ষিতে বর্ধমান মেডিকেল কলেজের লড়াই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একমাত্র এই কলেজেই শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ তৃণমূলপন্থী উকিলবাহিনীর সমস্ত বাধা অতিক্রম করে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ জয় ছিনিয়ে আনেন। অভীক দে ও বিরূপাক্ষের সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত অভিযুক্তদের কলেজে প্রবেশ রোধ করার নির্দেশও আদায় করে নেন তাঁরা।
আইনের ময়দান থেকে রাজপথ, আদালত থেকে ক্যাম্পাস, এই দীর্ঘ লড়াইয়ে বর্ধমান মেডিকেলের জুনিয়র ডাক্তার ও পড়ুয়ারা যে সাহস, দৃঢ়তা এবং সংগঠিত প্রতিরোধের পরিচয় দিয়েছেন, তার পাশে আমরা ছিলাম, আছি এবং আগামী দিনেও থাকব।
দেওয়াল মুছে ফেলা যায়। স্মৃতি নয়।
রং চাপা দেওয়া যায়। প্রতিবাদ নয়।
ক্ষমতা বদলাতে পারে। লড়াইয়ের প্রয়োজন ফুরোয় না।












