৪৬-এর দাঙ্গা, দেশভাগ, এবং বাংলাভাগ নিয়ে সম্প্রতি হঠাৎ করেই প্রবল আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিহাস নিয়ে নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হলে তা অবশ্যই স্বাগত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আলোচনার বড় অংশ ইতিহাসকে বোঝার জন্য নয়; বরং সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য- কোনও একটি রাজনৈতিক দলের বাঙালি আইকন নির্মাণের এবং সমগ্র একটি সম্প্রদায়কে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রয়াস।
কিন্তু ইতিহাস কি এত সরল?
১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ড, নোয়াখালি, বিহার কিংবা ১৯৪৭-এর দেশভাগ—এসবই ছিল রাজনৈতিক শক্তিগুলির সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতা, উসকানি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ফল। সেই ইতিহাসের দায় কোনও একটি ধর্মের সমস্ত মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া শুধু অন্যায় নয়, ইতিহাসবিরুদ্ধও।
হিন্দু মহাসভার রাজনীতির জন্য যেমন সমস্ত হিন্দু দায়ী নন, তেমনি মুসলিম লীগের রাজনীতির জন্যও সমস্ত মুসলমানকে দায়ী করা যায় না। রাজনৈতিক সংগঠনের দায় রাজনৈতিক সংগঠনের; ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নয়।
যদি আমরা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের শাসকদের যুক্তি গ্রহণ করি, তাহলে নাথুরাম গডসের অপরাধের জন্য সমগ্র হিন্দু সমাজকে দায়ী করতে হবে। সতবন্ত সিং ও বেয়ন্ত সিংয়ের কর্মকাণ্ডের জন্য সমগ্র শিখ সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করতে হবে। কিন্তু আমরা তা করি না। কারণ আমরা জানি, ব্যক্তি বা সংগঠনের কাজের দায় পুরো সম্প্রদায়ের উপর চাপানো অন্যায় এবং বিপজ্জনক।
ইতিহাসের কাজ ঘৃণার নতুন উপকরণ তৈরি করা নয়; ইতিহাসের কাজ হলো জটিল বাস্তবতাকে বোঝা। ১৯৪৬–৪৭ সালের বাংলার ইতিহাস আমাদের শেখায় যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। তারা হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, শিখ হোক বা অন্য যে কোনও পরিচয়ের মানুষ হোক।
ফেসবুকের সৌজন্যে পাওয়া উত্তরবঙ্গের এক বন্ধুর পরিচয়-সংকট নিয়ে কথোপকথন থেকেই এই লেখার সূত্রপাত। কিন্তু বিষয়টি শুধু তাঁর নয়। ইতিহাসের সত্য যতটা সম্ভব নিরপেক্ষভাবে জানা এবং জানানো আমাদের সকলের দায়িত্ব।
লেখাটি একটু বড়। এক রাজনৈতিক বন্ধু পড়ে বললেন—ফেসবুকে পোস্ট করে দিতে। তাই এই পোস্ট। দু খণ্ডে প্রকাশিত।
_________________________________________________________
কলকাতা হত্যাকাণ্ড, যুক্তবঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ
একটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার ইতিহাস (১)
ভূমিকা
বাংলা বিভাগের ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে সর্বভারতীয় দেশভাগের বৃহত্তর ইতিহাসের আড়ালে চাপা পড়ে ছিল। পাঞ্জাবের তুলনায় বাংলার দেশভাগকে প্রায়শই একটি গৌণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে বাংলার রাজনৈতিক গতিপথ ছিল স্বতন্ত্র, এবং ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গকে বোঝার জন্য ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিবেচনা করা আবশ্যক।
এই প্রবন্ধের মূল যুক্তি হলো যে ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গ শুধু মাত্র সর্বভারতীয় দেশভাগের একটি প্রাদেশিক প্রতিফলন নয়। বরং ১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ড ছিল বাংলার রাজনৈতিক পরিকল্পনার একটি নির্ধারক মোড়। এর আগে অবিভক্ত বাংলার সম্ভাবনা বাস্তব রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ১৯৪৬ সালের আগস্টের কলকাতা হত্যাকাণ্ড, অক্টোবরের নোয়াখালি সহিংসতা, নভেম্বরের বিহার দাঙ্গা, পাকিস্তান প্রশ্নে রাজনৈতিক মেরুকরণ,এবং যুক্তবঙ্গ প্রস্তাবের ব্যর্থতা—এই সমস্ত ঘটনার সম্মিলিত ফল ছিল বাংলার বিভাজন। আগস্ট ১৯৪৬ থেকে জুন ১৯৪৭-এর মধ্যে সংঘটিত এই ধারাবাহিক সহিংসতা, উদ্বাস্তু প্রবাহ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সেই সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়।কলকাতা হত্যাকাণ্ড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি হিন্দু ও মুসলিম মধ্যবিত্তের মধ্যে সহাবস্থানের সম্ভাবনাকে গভীরভাবে দুর্বল করে দেয় এবং পৃথক রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ধারণাকে শক্তিশালী করে।
১৯৪৬ সালের ১৬–২১ আগস্ট কলকাতায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যা ইতিহাসে “গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং” নামে পরিচিত, ছিল ব্রিটিশ ভারতের শেষ পর্বের সবচেয়ে ভয়াবহ নগর-হিংসার ঘটনা। এই দাঙ্গায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪,০০০ মানুষ নিহত এবং ১০,০০০-এরও বেশি আহত হয়। বেসরকারি হিসাব আরও বেশি সংখ্যার কথা উল্লেখ করে।
এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছিল না; এর পেছনে ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের সংকট, কংগ্রেস–মুসলিম লীগ দ্বন্দ্ব, পাকিস্তান প্রশ্ন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা,এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ।
কলকাতা হত্যাকাণ্ড (আগস্ট ১৯৪৬) থেকে বঙ্গভঙ্গের ভোট (২০ জুন ১৯৪৭):
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা১ ব্যর্থতার মুখে পড়ে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ বাংলার মুসলিম আসনগুলিতে বিপুল সাফল্য অর্জন করে। অন্যদিকে কংগ্রেস প্রধানত হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে প্রভাবশালী ছিল।
এই নির্বাচনের ফলে দুটি সমান্তরাল রাজনৈতিক বাস্তবতা গড়ে ওঠে:
1. মুসলিম লীগের কাছে বাংলা ছিল পাকিস্তান প্রকল্পের অন্যতম ভিত্তি।
2. হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির একাংশ বাংলার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনীতিকে ক্রমশ সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে।
তবুও ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাভাগ ছিল না কোনও সর্বসম্মত দাবি।
এই পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিকে জোরদার করার জন্য ১৬ আগস্ট ১৯৪৬-কে “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে” হিসেবে ঘোষণা করে।
কলকাতা ছিল তৎকালীন বাংলার রাজধানী এবং মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে।
রাজনৈতিক সংগঠন ও সামাজিক ভিত্তি
মুসলিম লীগ
মুসলিম জমিদারদের একাংশ , পূর্ববঙ্গের উদীয়মান শিক্ষিত শ্রেণি, মুসলিম মধ্যবিত্ত , গ্রামীণ মুসলিম কৃষক , নিম্ন-মধ্যবিত্ত , শ্রমজীবী মুসলমান, এবং পূর্ববঙ্গ থেকে আগত শ্রমিকদের একটি অংশ
হিন্দু মহাসভা
হিন্দু মধ্যবিত্ত , ব্যবসায়ী সম্প্রদায় , শিক্ষিত পেশাজীবী
কংগ্রেস
হিন্দু ভদ্রলোক, আইনজীবী , শিক্ষক , ব্যবসায়ী , শহুরে মধ্যবিত্ত
হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সমর্থক ছিল, তবে কলকাতায় তাদের সাংগঠনিক প্রভাব লীগ ও মহাসভার সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
তফসিলি জাতির প্রতিনিধিরা
নমঃশূদ্র , রাজবংশী , অন্যান্য তফসিলি সম্প্রদায়
ইউরোপীয় ব্লক
২৫ জন ইউরোপীয় সদস্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন।
তাঁরা সাধারণত ব্রিটিশ ব্যবসায়িক স্বার্থ- চা-বাগান মালিক, জুট শিল্প, ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করতেন।
অনেক সময় সরকার গঠনে এই ব্লক “কিংমেকার” হিসেবে কাজ করত।
কমিউনিস্ট পার্টি
ট্রাম শ্রমিক, বন্দর শ্রমিক , শিল্পাঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষ
মুসলিম লীগের ভূমিকা
সোহরাওয়ার্দীর সরকার
তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি একই সঙ্গে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন।
ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে উপলক্ষে তাঁর সরকার কলকাতায় সরকারি ছুটি ঘোষণা করে।
সমালোচকদের মতে—
• ছুটির ফলে বিপুল জনসমাবেশ সংগঠিত করা সহজ হয়।
• পুলিশ ও প্রশাসন যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়নি।
• দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ধীর ছিল।
অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, সোহরাওয়ার্দী সরাসরি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ছিলেন—এমন প্রমাণ নেই; কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর সরকারের ব্যর্থতা ছিল গুরুতর।
মুসলিম লীগের কর্মীদের ভূমিকা
বিভিন্ন সমকালীন রিপোর্টে দেখা যায় যে ১৬ আগস্টের প্রথম পর্যায়ে কিছু মুসলিম লীগ সমর্থক মিছিল ও জনসমাবেশ থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। কোথাও কোথাও সংগঠিত আক্রমণের অভিযোগও ওঠে।
তবে অধিকাংশ আধুনিক ঐতিহাসিকের মতে, ঘটনাটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং পরে উভয় সম্প্রদায়ের সশস্ত্র গোষ্ঠী এতে যুক্ত হয়।
কংগ্রেসের ভূমিকা
কংগ্রেস ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে আহ্বান করেনি। তবে রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সংঘাত তখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এঁদের কেউই কলকাতার রাস্তার সংঘর্ষে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না। তবে কিছু ঐতিহাসিকের মতে, কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে তীব্র সংঘর্ষ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
হিন্দু মহাসভার ভূমিকা
কলকাতায় হিন্দু মহাসভার যথেষ্ট প্রভাব ছিল, বিশেষত হিন্দু মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী মহলে।
হিন্দু মহাসভার প্রধান বাঙালি নেতা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। দাঙ্গার প্রথম দিনের পর বহু এলাকায় সংগঠিত হিন্দু প্রতিরোধ ও প্রতিশোধমূলক আক্রমণ শুরু হয়।
কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা
তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করেছিল।
কমিউনিস্ট কর্মীরা বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি কমিটি গঠন এবং আক্রান্ত মানুষদের রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। বে বাস্তবতা হলো— কলকাতার রাস্তায় লীগ ও মহাসভার তুলনায় কমিউনিস্টদের সাংগঠনিক শক্তি সীমিত ছিল, ফলে তারা দাঙ্গা থামাতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি।
ব্রিটিশ প্রশাসনের ভূমিকা
অনেক গবেষকের মতে, সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের। তখন বাংলার গভর্নর ছিলেন ফ্রেডরিক বারোজ; ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড ওয়াভেল ।
সমালোচনা ছিল— প্রশাসন আগাম সতর্কতা গ্রহণ করেনি। সেনাবাহিনী দেরিতে নামানো হয়।পুলিশ বাহিনী অকার্যকর ছিল।
জয়া চট্টোপাধ্যায়, সুরঞ্জন দাস প্রমুখ ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা না হলে হত্যাকাণ্ড এত ব্যাপক আকার নিত না।
দাঙ্গার গতিপ্রকৃতি
১৬ আগস্ট
• মুসলিম লীগের সমাবেশ ও মিছিল।
• শহরের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের সূচনা।
• প্রথম পর্যায়ে বহু হিন্দু দোকান ও বসতিতে আক্রমণের অভিযোগ।
১৭–১৮ আগস্ট
• হিন্দু প্রতিশোধমূলক আক্রমণ শুরু।
• সংঘর্ষ উত্তর ও মধ্য কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ে।
• স্থানীয় গুণ্ডা ও অপরাধী গোষ্ঠীও যুক্ত হয়।
১৯–২১ আগস্ট
• উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড।
• অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও জোরপূর্বক উচ্ছেদ।
• সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ড: নিহতদের ধর্মীয়, শ্রেণিগত, লিঙ্গ এবং বয়স, ও ভৌগোলিক পরিচয়
১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ডে নিহতদের ধর্মীয় পরিচয়ের নির্ভুল ও সর্বসম্মত পরিসংখ্যান নেই। সরকারি রিপোর্ট, পুলিশ রেকর্ড, হাসপাতালের নথি এবং সমকালীন সংবাদপত্রগুলির তথ্য অসম্পূর্ণ ছিল, এবং অনেক মৃতদেহ কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্তও হয়নি। তবুও ইতিহাসবিদদের গবেষণা থেকে কিছু বিষয় বলা যায়।
প্রথম পর্যায় (১৬ আগস্ট)
বেশিরভাগ গবেষক একমত যে দাঙ্গার প্রথম কয়েক ঘণ্টা এবং প্রথম দিনের অনেক অংশে নিহতদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি ছিল। কারণ সংঘর্ষের সূচনাস্থল ছিল এমন কিছু বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা যেখানে হিন্দু দোকানদার, কর্মচারী এবং বাসিন্দাদের উপস্থিতি বেশি ছিল।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায় (১৭–২১ আগস্ট)
পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। বহু এলাকায় সংগঠিত হিন্দু প্রতিশোধমূলক আক্রমণ শুরু হয়। ফলে পরবর্তী দিনগুলোতে মুসলমানদের মধ্যেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
সামগ্রিক চিত্র
আধুনিক গবেষণার সাধারণ মূল্যায়ন হলো:
• নিহতদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই কয়েক হাজার মানুষ ছিল।
• মোট নিহতদের ধর্মভিত্তিক নির্ভুল সংখ্যা আজও অজানা।
• কোনও নির্ভরযোগ্য সরকারি বা একাডেমিক গবেষণা নেই যা নিশ্চিতভাবে বলতে পারে যে মোট নিহতদের মধ্যে কত শতাংশ হিন্দু বা কত শতাংশ মুসলমান ছিলেন।
ইতিহাসবিদদের মত
ঐতিহাসিক জয়া চট্টোপাধ্যায়, সুরঞ্জন দাস, শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের গবেষণায় দেখা যায় যে: দাঙ্গার সূচনালগ্নে মুসলিম আক্রমণ বেশি ছিল।হিন্দুরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, পরবর্তী পর্যায়ে হিন্দু প্রতিশোধ আরও সংগঠিত ও ব্যাপক রূপ নেয় এবং প্রতিশোধমূলক হিংসায় মুসলমানদেরও বিপুল প্রাণহানি ঘটে। ফলে পুরো ঘটনার শেষে এটি একতরফা হত্যাকাণ্ডের চেয়ে দ্বিমুখী সাম্প্রদায়িক গণহিংসার রূপ নেয়।
ফলে কয়েক দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ড দ্বিপাক্ষিক সাম্প্রদায়িক গণহিংসায় পরিণত হয়।
কেন নির্ভুল সংখ্যা পাওয়া কঠিন?
১. অনেক মৃতদেহ সনাক্ত করা যায়নি।
২. তৎকালীন প্রশাসনিক রেকর্ড অসম্পূর্ণ ছিল।
৩. রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের বক্তব্যকে শক্তিশালী করতে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা প্রচার করেছিল।
৪. ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রকাশিত পরিসংখ্যানও সীমিত ছিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
সমকালীন হিন্দু সংবাদপত্রগুলি সাধারণত হিন্দু নিহতদের ওপর বেশি জোর দিয়েছিল, আর মুসলিম সংবাদপত্রগুলি মুসলমান নিহতদের ওপর। কিন্তু পরবর্তী একাডেমিক গবেষণা দেখায় যে উভয় সম্প্রদায়ই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এবং নিহতদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ ছিলেন সাধারণ শ্রমিক, কুলি, দোকানকর্মী, হকার, রিকশাচালক এবং বস্তিবাসী—যাদের রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল না।
১৯৪৬ সালের আগস্টের কলকাতা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জনস্মৃতিতে দুটি বিপরীত বয়ান দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত:
• একদিকে, এটি মুসলিম লীগের পরিকল্পিত হিন্দু-নিধন ছিল।
• অন্যদিকে, এটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হিন্দু প্রতিশোধের ঘটনা ছিল।
কিন্তু গবেষণা দেখায়, বাস্তবতা আরও জটিল। এই দাঙ্গার প্রধান শিকার ছিলেন সাধারণ মানুষ—গরিব শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, ফুটপাতের বিক্রেতা, কুলি, গাড়োয়ান, বস্তিবাসী এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত নাগরিক।
ধর্মীয় পরিচয়:
প্রথম পর্যায়: ১৬ আগস্ট
ঐতিহাসিক সুরঞ্জন দাস ও জয়া চট্টোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রথম দিনের সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। এর কারণ:
• ডালহৌসি, বউবাজার, বুররাবাজার, কলেজ স্ট্রিট, হ্যারিসন রোড প্রভৃতি এলাকায় হিন্দু ব্যবসায়ী ও দোকানকর্মীদের ঘনত্ব ছিল।
• মুসলিম লীগের সমাবেশ থেকে ফেরত আসা কিছু মিছিলের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়।
• পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপের অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
দ্বিতীয় পর্যায়: ১৭–১৮ আগস্ট
পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
উত্তর কলকাতা, শ্যামবাজার, মানিকতলা, বেলেঘাটা এবং অন্যান্য এলাকায় সংগঠিত হিন্দু প্রতিরোধ ও প্রতিশোধ শুরু হয়। ফলে মুসলমানদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
চূড়ান্ত চিত্র
আধুনিক গবেষকদের মধ্যে একটি সাধারণ মত হলো:
পুরো দাঙ্গার শেষে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই বিপুল প্রাণহানির শিকার হয়েছিল, এবং একতরফাভাবে কোনও এক সম্প্রদায়কে “একক শিকার” বলা ইতিহাসসম্মত নয়।
শ্রেণিগত পরিচয়:
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি।
শ্রমজীবী মানুষ
সবচেয়ে বেশি নিহতদের মধ্যে ছিলেন: বন্দর শ্রমিক , গুদাম শ্রমিক , ট্রাম ও পরিবহন শ্রমিক, দিনমজুর , ঠেলাগাড়ি চালক , কুলি।
এঁদের বসবাস ছিল মিশ্র জনসংখ্যার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়।
ছোট ব্যবসায়ী ও দোকানদার
মুদি দোকানদার , কাপড় ব্যবসায়ী , রাস্তার ফেরিওয়ালা , হকার , ছোট কারখানার মালিক
এদের দোকান ছিল প্রথম আক্রমণের লক্ষ্যগুলির মধ্যে।
বস্তিবাসী
কলকাতার বিশাল বস্তি এলাকাগুলি ছিল দাঙ্গার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
যেমন: খিদিরপুর , ট্যাংরা , বেলেঘাটা, এন্টালি , পার্ক সার্কাস সংলগ্ন অঞ্চল
এখানে বহু ক্ষেত্রে প্রতিবেশী প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।
নারী ও শিশু:
সমকালীন রিপোর্টে দেখা যায়: বহু নারী নিহত হন। শিশুদেরও প্রাণহানি ঘটে। হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। তবে সরকারি পরিসংখ্যানে নারী ও শিশুর সংখ্যা আলাদাভাবে সংরক্ষিত হয়নি।
ভৌগোলিক বণ্টন
বড়বাজার
হিন্দু ব্যবসায়ীদের প্রধান কেন্দ্র। প্রথম পর্যায়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি।
খিদিরপুর
বন্দর এলাকা।মিশ্র জনসংখ্যা।দুই সম্প্রদায়েরই বড় প্রাণহানি।
পার্ক সার্কাস
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল। পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সংঘর্ষের কেন্দ্র।
বেলেঘাটা
দাঙ্গার অন্যতম প্রধান সংঘর্ষস্থল।
মানিকতলা–শ্যামবাজার
হিন্দু প্রতিরোধ সংগঠনের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
শ্রেণি বনাম সাম্প্রদায়িকতা
সুরঞ্জন দাস এবং অন্যান্য ইতিহাসবিদদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো:
নিহতদের অধিকাংশই রাজনৈতিক নেতা বা সাম্প্রদায়িক সংগঠনের উচ্চপর্যায়ের কর্মী ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন দরিদ্র বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত নাগরিক। অর্থাৎ—
যারা পাকিস্তান, অখণ্ড ভারত বা বঙ্গভঙ্গ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তারা মূলত বেঁচে গিয়েছিলেন; কিন্তু যাদের কোনও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা ছিল না, তারাই সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছিলেন।
একটি ঐতিহাসিক বিদ্রূপ
১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ডে নিহতদের বড় অংশই ছিলেন: শ্রমিক, হকার, ছোট ব্যবসায়ী, বস্তিবাসী, দিনমজুর।
অর্থাৎ, একই শ্রেণির মানুষ, যারা স্বাভাবিক সময়ে একই বাজারে ব্যবসা করতেন, একই কারখানায় কাজ করতেন, একই ট্রামে যাতায়াত করতেন, তারাই কয়েক দিনের মধ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
এই কারণেই বহু ইতিহাসবিদ কলকাতা হত্যাকাণ্ডকে শুধু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়, বরং ঔপনিবেশিক ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাঙনের এক চূড়ান্ত প্রকাশ হিসেবে দেখেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই দাঙ্গা কলকাতার সামাজিক বিশ্বাসের ভিত্তিকে নষ্ট করে দেয়।
এই হত্যাকাণ্ডই পরবর্তী নোয়াখালি (অক্টোবর ১৯৪৬), বিহার (১৯৪৬) এবং শেষ পর্যন্ত দেশভাগের সাম্প্রদায়িক হিংসার পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়।










