৪৬-এর দাঙ্গা, দেশভাগ, এবং বাংলাভাগ নিয়ে সম্প্রতি হঠাৎ করেই প্রবল আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিহাস নিয়ে নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হলে তা অবশ্যই স্বাগত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আলোচনার বড় অংশ ইতিহাসকে বোঝার জন্য নয়; বরং সঙ্কীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য- কোনও একটি রাজনৈতিক দলের বাঙালি আইকন নির্মাণের এবং সমগ্র একটি সম্প্রদায়কে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রয়াস।
কিন্তু ইতিহাস কি এত সরল?
১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ড, নোয়াখালি, বিহার কিংবা ১৯৪৭-এর দেশভাগ—এসবই ছিল রাজনৈতিক শক্তিগুলির সিদ্ধান্ত, ব্যর্থতা, উসকানি, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের ফল। সেই ইতিহাসের দায় কোনও একটি ধর্মের সমস্ত মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া শুধু অন্যায় নয়, ইতিহাসবিরুদ্ধও।
হিন্দু মহাসভার রাজনীতির জন্য যেমন সমস্ত হিন্দু দায়ী নন, তেমনি মুসলিম লীগের রাজনীতির জন্যও সমস্ত মুসলমানকে দায়ী করা যায় না। রাজনৈতিক সংগঠনের দায় রাজনৈতিক সংগঠনের; ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নয়।
যদি আমরা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের শাসকদের যুক্তি গ্রহণ করি, তাহলে নাথুরাম গডসের অপরাধের জন্য সমগ্র হিন্দু সমাজকে দায়ী করতে হবে। সতবন্ত সিং ও বেয়ন্ত সিংয়ের কর্মকাণ্ডের জন্য সমগ্র শিখ সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করতে হবে। কিন্তু আমরা তা করি না। কারণ আমরা জানি, ব্যক্তি বা সংগঠনের কাজের দায় পুরো সম্প্রদায়ের উপর চাপানো অন্যায় এবং বিপজ্জনক।
ইতিহাসের কাজ ঘৃণার নতুন উপকরণ তৈরি করা নয়; ইতিহাসের কাজ হলো জটিল বাস্তবতাকে বোঝা। ১৯৪৬–৪৭ সালের বাংলার ইতিহাস আমাদের শেখায় যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ-তারা হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, শিখ হোক বা অন্য যে কোনও পরিচয়ের মানুষ হোক।
ফেসবুকের সৌজন্যে পাওয়া উত্তরবঙ্গের এক বন্ধুর পরিচয়-সংকট নিয়ে কথোপকথন থেকেই এই লেখার সূত্রপাত। কিন্তু বিষয়টি শুধু তাঁর নয়। ইতিহাসের সত্য যতটা সম্ভব নিরপেক্ষভাবে জানা এবং জানানো আমাদের সকলের দায়িত্ব।
লেখাটি একটু বড়। এক রাজনৈতিক বন্ধু পড়ে বললেন—ফেসবুকে পোস্ট করে দিতে। তাই এই পোস্ট। দু খণ্ডে প্রকাশিত।
___________________________________________________
কলকাতা হত্যাকাণ্ড, যুক্তবঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ
একটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার ইতিহাস (২)
বাংলা ভাগের প্রশ্ন
১৯৪৬ সালের আগে বাংলার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অন্তত তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণা ছিল:
1. পাকিস্তানের অংশ হিসেবে একটি অবিভক্ত বাংলা।
2. ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হিসেবে অবিভক্ত বাংলা।
3. ধর্মভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা।
১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তৃতীয় বিকল্পটি অনিবার্য ছিল না।
কিন্তু কলকাতা হত্যাকাণ্ডের পর:
• হিন্দু মধ্যবিত্তের নিরাপত্তাবোধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
• মুসলিম লীগের প্রতি অবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
• পৃথক পশ্চিমবঙ্গের দাবি ক্রমশ শক্তিশালী হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় নোয়াখালি (অক্টোবর ১৯৪৬) এবং : বিহার দাঙ্গা ও প্রতিশোধের রাজনীতি ( নভেম্বর ১৯৪৬)
গান্ধীর নোয়াখালি সফর পরিস্থিতির নৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা, গ্রামীণ বাংলার সংকট বদলাতে পারেনি। এর ফল:
• কলকাতা হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি আরও তীব্র হয়।
• হিন্দু উদ্বাস্তু প্রবাহ শুরু হয়।
• হিন্দু জনমতের মধ্যে পৃথক প্রদেশের দাবি আরও জনপ্রিয় হয়।
• মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির পক্ষে নতুন যুক্তি তৈরি হয়।
• মুসলমানদের মধ্যে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
• সর্বভারতীয় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়।
বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্ত ও পশ্চিমবঙ্গের দাবি
এখানে জয়া চট্টোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন:
• কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণি ক্রমশ মনে করতে শুরু করে যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলায় তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অনিশ্চিত।
• শিল্প, শিক্ষা, প্রশাসন ও বাণিজ্যে তাদের ঐতিহাসিক আধিপত্য প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ফলে তাদের পাকিস্তানবিরোধিতা এবং পশ্চিমবঙ্গের দাবি অনেক ক্ষেত্রে একই রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হয়।
মুসলিম লীগের দৃষ্টিভঙ্গি
মুসলিম লীগের কাছে অবিভক্ত বাংলা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ:
• পূর্ববঙ্গ ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
• কলকাতা ছাড়া পূর্ববঙ্গের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ত।
• বন্দর, শিল্প ও আর্থিক অবকাঠামো কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল।
তাই সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম বিশেষভাবে অবিভক্ত বাংলার পক্ষে ছিলেন।
যুক্তবঙ্গ প্রস্তাব
১৯৪৭ সালের এপ্রিল–মে মাসে একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ সামনে আসে: যুক্তবঙ্গ (United Bengal) পরিকল্পনা।
মূল উদ্যোক্তারা ছিলেন:
• হুসেন শাহীদ সোহরাওয়ার্দী: সোহরাওয়ার্দী ছিলেন ১৯৪৬-৪৭ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন।
• আবুল হাসিম: আবুল হাশিম ছিলেন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং দলের সবচেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রগতিশীল নেতাদের একজন।
• শরৎচন্দ্র বসু: সুভাষ বোস এর বড় ভাই, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং কংগ্রেস নেতা।
প্রস্তাব ছিল:
• বাংলা স্বাধীন ও অবিভক্ত থাকবে।
• ভারত বা পাকিস্তান—কোনওটির সঙ্গেই অবিলম্বে যুক্ত হবে না।
কেন ব্যর্থ হলো?
১. কলকাতা হত্যাকাণ্ড ও নোয়াখালির স্মৃতি তখনও তাজা।
২. হিন্দু মধ্যবিত্তের বড় অংশ আস্থা হারিয়েছিল।
৩. কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব উৎসাহী ছিল না।
৪. মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় নেতৃত্বও পুরোপুরি সমর্থন দেয়নি।
২০ জুন ১৯৪৭: বঙ্গীয় আইনসভার ভোট
২০ জুন ১৯৪৭ বঙ্গীয় আইনসভা কার্যত বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করে।এটি ছিল বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বিধানসভা কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ভোট দেয়:
বাংলা ভাগ নিয়ে তিন ভাগে, মোট ৪ টে ভোট হয়। সব জেলা গুলো নিয়ে, শুধু মুসলিম প্রধান জেলাগুলো নিয়ে, এবং শুধু হিন্দু প্রধান জেলা গুলো নিয়ে। ২৫০ জনের সদস্যের বিধানসভায় মুসলিম লীগের ১১৩ জন, ৯ জন ইন্ডিপেন্ডেন্ট মুসলিম, জাতীয় কংগ্রেস এর ৮৬ জন, কমিউনিস্ট পার্টির ৩ জন, হিন্দু মহাসভার ( নির্দল ) ১ জন, ১৩ জন জন ইন্ডিপেন্ডেন্ট হিন্দু, এবং অন্যান্য ২৫ জন, যার মধ্যে ইউরোপিয়ান, খ্রিষ্টান, তপশীলি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা ছিলেন।
সব জেলা গুলো নিয়ে যে ভোট হয় তাতে যুক্তবঙ্গের পক্ষে এবং বিপক্ষে ভোটের ফলাফল ছিল: ১২৬-৯০ । এরপর মুসলিম সংখ্যাধিক্য জেলাগুলো নিয়ে দুটো ভোট হয়। প্রথমটা অবিভক্ত বাংলা কোন দেশে যাবে? সেই ভোটের ফলাফল ছিল, ১০৬ জন অবিভক্ত বাংলা এবং পাকিস্তানের পক্ষে এবং ৩৫ জন বাংলা ভাগের পক্ষে। এই অধিবেশনে দ্বিতীয় ভোটটা হয়, বাংলা যদি ভাগ হয়, পূর্ব বঙ্গ তাহলে কোন দেশে যাবে। সেই ভোটের ফলাফল ১০৭-৩৪, পাকিস্তানের পক্ষে। এর পর শুধু হিন্দু সংখ্যাধিক্য জেলাগুলোর প্রতিনিধি নিয়ে তাহলে ভোট হয়। বাংলা যদি ভাগই হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ কোন দিকে যাবে? সেই ভোটের ফলাফল: বাংলা ভাগ এবং ভারতের পক্ষে ৫৮ -২১জন বাংলা ভাগের বিপক্ষে।কম্যুনিস্ট পার্টির ৩ জন সদস্য ( রতন লাল ব্রাহ্মণ, জ্যোতি বসু, এবং রূপনারায়ন রায়) ছিলেন। প্রথম ভোটে তাঁরা অংশ গ্রহণ করেন নি। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ভোটে (মুসলিম সংখ্যাধিক্য জেলাগুলো), রূপনারায়ন রায় ছাড়া অন্যদের অধিকার ছিল না। তিনি তেভাগা আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অনুপস্থিত ছিলেন। চতুর্থ ভোটে (হিন্দু সংখ্যাধিক্য জেলাগুলোর)রতন লাল ব্রাহ্মণ, জ্যোতি বসু বাংলা ভাগের অনিবার্যতা মেনে নিয়ে ভারতের পক্ষে ভোট দেন। বিধান সভায় হিন্দু মহাসভার সদস্য, নির্দল প্রার্থী শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্বঃভাবতই বাংলা ভাগ এবং ভারতের পক্ষে ভোট দেন। সাংগঠনিক দিক দিয়ে বাংলার হিন্দু মহাসভা কিন্তু এই সময় খুবই দুর্বল অবস্থায় ছিল। ১৯৪৫-৪৬’এর নির্বাচনে ছাব্বিশটি অমুসলিম আসনে তারা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয়। এক জনও জেতেনি। ভোটে স্পষ্ট হয়ে যায়:
পশ্চিমাঞ্চলের (পশ্চিমবঙ্গ অংশ):হিন্দু-প্রধান প্রতিনিধিরা বিভাজনের পক্ষে।
পূর্বাঞ্চলের (পূর্ববঙ্গ অংশ): মুসলিম-প্রধান অধিকাংশ সদস্য বাংলাভাগের বিপক্ষে, পাকিস্তানের পক্ষে।
এই ভোট ছিল শুধু সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ছিল এক বছরের রাজনৈতিক মেরুকরণের পরিণতি। ফলাফল:
• বাংলা বিভক্ত হয়।
• পশ্চিমবঙ্গ ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
• পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয় (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ)।
ভয় এবং অবিশ্বাসের আবহ ও রাজনীতি
কলকাতা হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক ভাষ্যে “সংখ্যালঘু নিরাপত্তা” প্রশ্নটি কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে।
হিন্দু মধ্যবিত্তের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয় যে:
• মুসলিম লীগ-শাসিত বাংলায় তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
অন্যদিকে মুসলিম লীগ দাবি করতে থাকে যে:
• ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুসলমানরা নিরাপদ থাকবে না।
এই দ্বিমুখী নিরাপত্তাহীনতা রাজনৈতিক মেরুকরণকে ত্বরান্বিত করে।
নোয়াখালি (অক্টোবর ১৯৪৬) এবং বিহার (নভেম্বর ১৯৪৬) সাম্প্রদায়িক সহিংসতা পারস্পরিক ভয়ের রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়:
কলকাতা, নোয়াখালি,এবং বিহার—তিনটি ঘটনাই একে অপরের রাজনৈতিক ব্যাখ্যার অংশ হয়ে ওঠে।
প্রতিটি সম্প্রদায় নিজেদের ক্ষতিকে স্মরণ করে এবং অপর সম্প্রদায়ের ক্ষতিকে তুলনামূলকভাবে উপেক্ষা করে।
কেন এই দাঙ্গা?
১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা। এই ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে গত আট দশকে বিভিন্ন ধরনের ইতিহাসচর্চা গড়ে উঠেছে। জাতীয়তাবাদী, পাকিস্তানি, মার্কসবাদী, কেমব্রিজ স্কুল, সাবঅল্টার্ন এবং সমসাময়িক সামাজিক ইতিহাসের গবেষকরা এই ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রশ্নগুলি আজও বিতর্কিত:
• দাঙ্গার জন্য কে বেশি দায়ী?
• এটি কি মুসলিম লীগের পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক কর্মসূচির ফল?
• নাকি হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদি মেরুকরণের বিস্ফোরণ?
• ব্রিটিশ প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল?
• শ্রেণি, নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ভূমিকা কতটা ছিল?
এই প্রবন্ধে সেই বিতর্কগুলির একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা হলো।
প্রাথমিক জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা
১৯৪৬-৪৭ সালের অব্যবহিত পরে প্রকাশিত অধিকাংশ ভারতীয় জাতীয়তাবাদী লেখায় কলকাতা হত্যাকাণ্ডকে প্রধানত মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কৌশলের ফল হিসেবে দেখা হয়। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
• মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিকে শক্তিশালী করতে “ডাইরেক্ট অ্যাকশন” ঘোষণা করে।
• সোহরাওয়ার্দী সরকার প্রশাসনিক যন্ত্রকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় রাখে।
• প্রথম আক্রমণ মুসলিম লীগ সমর্থকদের দিক থেকেই আসে।
এই ব্যাখ্যা কংগ্রেসপন্থী লেখালেখিতে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী ছিল।
তবে এর দুর্বলতা হলো, এটি পরবর্তী কয়েক দিনের হিন্দু প্রতিশোধমূলক হিংসাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেয়।
পাকিস্তানি ও মুসলিম লীগ-সমর্থক ব্যাখ্যা
পাকিস্তানের প্রাথমিক ইতিহাসচর্চায় কলকাতা হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নভাবে দেখা হয়। এখানে যুক্তি দেওয়া হয়:
• মুসলমানদের রাজনৈতিক দাবিকে অস্বীকার করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।
• কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার উস্কানি সংঘর্ষকে বাড়িয়ে তোলে।
• মুসলমানরাও ব্যাপক প্রাণহানির শিকার হয়।
এই ব্যাখ্যায় সোহরাওয়ার্দীর দায়িত্ব সাধারণত কম গুরুত্ব পায়।
সমস্যা হলো, এই ধারা প্রায়শই ১৬ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এবং মুসলিম লীগের আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ভাষাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয় না।
সুরঞ্জন দাস: সাম্প্রদায়িকতার সামাজিক ইতিহাস (Communal Riots in Bengal 1905–1947):
ঐতিহাসিক সুরঞ্জন দাশ এর কাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। তাঁর মতে:
কলকাতার দাঙ্গাকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখলে চলবে না; এর শিকড় ছিল দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে। সুরঞ্জন দাস দেখিয়েছেন:
• কর্মসংস্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা,
• নগরায়ণের চাপ,
• আবাসন সংকট,
• মধ্যবিত্ত রাজনীতির সাম্প্রদায়িকীকরণ,
ধীরে ধীরে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়।
তাঁর ব্যাখ্যায় দাঙ্গা কোনও একদিনের ঘটনা নয়; বরং বহু বছরের সঞ্চিত উত্তেজনার বিস্ফোরণ।
জয়া চট্টোপাধ্যায়: বঙ্গভঙ্গের রাজনীতি (Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947):
জয়া চট্টোপাধ্যায়এর গবেষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন:
• ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা এবং ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
• কলকাতার হিন্দু ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশ ক্রমশ পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষে চলে যায়।
• মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি এবং হিন্দু মধ্যবিত্তের নিরাপত্তাহীনতা একে অপরকে শক্তিশালী করে।
চট্টোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণে দাঙ্গা কেবল সাম্প্রদায়িক ঘৃণার ফল নয়; এটি ক্ষমতা, সম্পদ এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের লড়াইয়েরও অংশ।
শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়: ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সংকট (From Plassey to Partition: A History of Modern India):
শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় দাঙ্গাকে ব্রিটিশ শাসনের চূড়ান্ত সংকটের অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে:
• দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটিশ প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
• পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা কমে যায়।
• রাজনৈতিক দলগুলি রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
ফলে রাষ্ট্র যখন ব্যর্থ হয়, তখন সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি রাস্তায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।
জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে: স্মৃতি ও পরিচয়ের রাজনীতি (Remembering Partition: Violence, Nationalism and History in India):
জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে ভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চান:
কেন বিভিন্ন সম্প্রদায় একই ঘটনাকে ভিন্নভাবে স্মরণ করে? তাঁর মতে:
• ইতিহাস শুধু কী ঘটেছিল তা নয়,
• মানুষ কীভাবে ঘটনাটিকে মনে রাখে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
হিন্দু স্মৃতিতে কলকাতা হত্যাকাণ্ড প্রায়ই মুসলিম আক্রমণের প্রতীক।
মুসলিম স্মৃতিতে এটি মুসলমানদের ওপর প্রতিশোধমূলক হত্যার স্মারক।
এই স্মৃতির দ্বন্দ্ব দেশভাগ-পরবর্তী রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছে।
কেমব্রিজ স্কুলের ব্যাখ্যা (The Emergence of Indian Nationalism: Competition and Collaboration in the Later Nineteenth Century):
অনিল শীল এবং সংশ্লিষ্ট গবেষকরা সাম্প্রদায়িকতাকে মূলত রাজনৈতিক সংগঠন ও এলিটদের প্রতিযোগিতার ফল হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের মতে:
• হিন্দু ও মুসলিম অভিজাতরা জনগণের সমর্থন অর্জনের জন্য ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করেন।
• সাম্প্রদায়িকতা ছিল ক্ষমতা দখলের এক রাজনৈতিক কৌশল।
এই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা বোঝাতে সাহায্য করলেও, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেয়।
সাবঅল্টার্ন ইতিহাসচর্চা:
সাবঅল্টার্ন ঐতিহাসিকরা প্রশ্ন তোলেন:
সাধারণ মানুষ কেন দাঙ্গায় অংশ নিল? তাঁদের মতে:
• দাঙ্গা কেবল নেতাদের নির্দেশে হয় না।
• স্থানীয় অভিমান, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রতিবেশী সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দাঙ্গা শুধু “উপরে” থেকে পরিচালিত হয়নি; “নিচের” সমাজের জটিল সম্পর্কও এতে ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমান গবেষণায় একটি আপেক্ষিক ঐকমত্য গড়ে উঠেছে:
সমকালীন ঐকমত্য: ইতিহাসবিদদের মূল্যায়ন
আজকের অধিকাংশ পেশাদার ইতিহাসবিদ কয়েকটি বিষয়ে একমত—
১. ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ছিল তাৎক্ষণিক প্ররোচক
মুসলিম লীগের আহ্বান এবং তার রাজনৈতিক ভাষ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছিল।ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে এবং মুসলিম লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল তাৎক্ষণিক প্ররোচক।
২. সোহরাওয়ার্দী প্রশাসনিকভাবে ব্যর্থ হন
সোহরাওয়ার্দী সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল গুরুতর। তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেননি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেননি।
৩. হিন্দু প্রতিশোধও ব্যাপক ছিল
হিন্দু মহাসভা-সমর্থিত প্রতিশোধমূলক হিংসা পরবর্তী প্রাণহানিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।দাঙ্গার পরবর্তী পর্যায়ে সংগঠিত হিন্দু আক্রমণ বিপুল প্রাণহানির কারণ হয়।
৪. ব্রিটিশ প্রশাসন দায় এড়াতে পারে না
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্ব ছিল ঔপনিবেশিক সরকারের।ব্রিটিশ প্রশাসন কার্যত ভেঙে পড়েছিল।
৫. এটি একক কোনো পক্ষের ষড়যন্ত্র ছিল না
দাঙ্গাকে কেবল ধর্মীয় বিদ্বেষ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে শ্রেণি, নগর অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং ঔপনিবেশিক শাসনের সংকট জড়িত ছিল দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল ছিল।
উপসংহার
কোলকাতা হত্যাকাণ্ড বাংলাভাগের একমাত্র কারণ ছিল না, কিন্তু এটি ছিল একটি মোড়-ফেরানো ঘটনা। আগস্ট ১৯৪৬-এর আগে অবিভক্ত বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তব রাজনৈতিক সম্ভাবনা ছিল। আগস্ট ১৯৪৬ থেকে জুন ১৯৪৭-এর মধ্যে ধারাবাহিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ সেই সম্ভাবনাকে ক্রমশ ক্ষয় করে দেয়। সেদিক থেকে বলা যায় যে:
২০ জুন ১৯৪৭-এর ভোটের ভিত্তি কেবল আইনসভায় নয়, আংশিকভাবে ১৬ আগস্ট ১৯৪৬-এর রক্তাক্ত কলকাতার রাস্তাতেও নির্মিত হয়েছিল।
কলকাতা হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসচর্চা আমাদের শেখায় যে সাম্প্রদায়িক হিংসার কোনও একক কারণ থাকে না। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক ভয়,এবং পরিচয়ের রাজনীতি—সবকিছু মিলেই ১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতাকে রক্তাক্ত করেছিল।
সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন না কংগ্রেস, মুসলিম লীগ বা হিন্দু মহাসভার শীর্ষ নেতা। তাঁরা ছিলেন সাধারণ মানুষ—শ্রমিক, হকার, দোকানদার, কেরানি, বস্তিবাসী। ইতিহাসের বৃহৎ রাজনৈতিক সংঘর্ষের সবচেয়ে বড় মূল্য তাঁদেরই দিতে হয়েছিল।
তাই বাংলাভাগ কোনও অবশ্যম্ভাবী ঐতিহাসিক ঘটনা ছিল না। ১৯৪৬ সালের আগে অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তব ছিল। কিন্তু কলকাতা হত্যাকাণ্ড, নোয়াখালি, বিহার এবং ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সেই সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে।
সুতরাং, ২০ জুন ১৯৪৭-এর আইনসভা ভোটকে কেবল সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল ভয়, স্মৃতি, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সংকটের সম্মিলিত ফল।
১ ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা (১৯৪৬) ছিল ব্রিটিশ সরকারের শেষ বড় সাংবিধানিক উদ্যোগ, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে বিভক্ত না করে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে বের করা। ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার তিন সদস্য—Frederick Pethick-Lawrence, Stafford Cripps এবং A. V. Alexander—ভারতে আসেন। তাঁদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভারত একটি শিথিল ফেডারেল ইউনিয়ন হিসেবে গঠিত হবে, যেখানে কেন্দ্রের হাতে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা; বাকি অধিকাংশ ক্ষমতা থাকবে প্রদেশগুলির হাতে। প্রদেশগুলিকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল—হিন্দু-প্রধান প্রদেশগুলি (গ্রুপ A), উত্তর-পশ্চিমের মুসলিম-প্রধান প্রদেশগুলি (গ্রুপ 😎, এবং বাংলা-অসম (গ্রুপ C)। এই পরিকল্পনা পাকিস্তানকে সরাসরি স্বীকৃতি দেয়নি, কিন্তু মুসলিম-প্রধান অঞ্চলগুলিকে উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। প্রথমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই পরিকল্পনাটি নীতিগতভাবে গ্রহণ করলেও, গ্রুপিং ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিরোধের কারণে সমঝোতা ভেঙে যায়। এই ব্যর্থতার ফলেই মুসলিম লীগ “ডাইরেক্ট অ্যাকশন” কর্মসূচি ঘোষণা করে, যা পরবর্তীকালে কলকাতা হত্যাকাণ্ডসহ দেশভাগের পথে রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে।
নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি
• Abul Hasim: In Retrospect
• Anil Seal: The Emergence of Indian Nationalism: Competition and Collaboration in the Later Nineteenth Century
• Annada Shankar Roy: Jukta Banger Smriti O Mukta Banger Smriti
• Anwesha Roy: Making Peace, Making Riots: Communalism and Communal Violence, Bengal 1940–1947
• Archibald Wavell: Wavell: The Viceroy’s Journal
• Asiatic Society: Banglapedia
• Ayesha Jalal: The Sole Spokesman: Jinnah, the Muslim League and the Demand for Pakistan
• Bidyut Chakrabarty: The Partition of Bengal and Assam, 1932–1947
• Clement Richard Attlee: Transfer of Power: 1942–47
• Govt. of India: The Collected Works of Mahatma Gandhi
• Govt. of West Bengal: Assembly Proceedings: Official Report: Bengal Legislative Assembly, 20.06.1947
• Gyanendra Pandey: Remembering Partition: Violence, Nationalism and History in India
• H. S. Suhrawardy: H. S. Suhrawardy: A Biography
• Joya Chatterji: Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947
• Jyoti Basu: Memoirs, a Political Autobiography
•Partha Chatterjee: ইতিহাস শিক্ষা বিড়ম্বনা
• Patricia A. Gossman: Riots and Victims: Violence and the Construction of Communal Identity Among Bengali Muslims, 1905-2947
• Rakesh Batabyal: Making Peace, Making Riots: Communalism and Communal Violence, Bengal 1940–1947
• Sarat Chandra Bose: I Warned My Countrymen
• Sekhar Bandyopadhyay: From Plassey to Partition: A History of Modern India
• Stanley Wolpert: Shameful Fight: The Last Years of the British Empire in India
• Sugata Bose: Agrarian Bengal: Economy, Social Structure and Politics
• Suranjan Das: Communal Riots in Bengal 1905–1947
“ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু তার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ।”










