সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে
পর্তুগিজ ছবি : ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল
ঔপনিবেশিক ক্ষমতার স্বার্থে একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার চেষ্টা হলেও কী করে আক্রান্ত সেই জনগোষ্ঠী সৃষ্টিশীল চেতনার মধ্যে বেঁচে থাকে,ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল সেই সংগ্রামের চলচ্চিত্র রূপ ।পরিচালক ফার্নান্দো ভেন্দ্রেল এই ছবিতে দেখিয়েছেন পদদলিত মানুষও বাঁচে ভালোবাসা পেলে, সৃষ্টির অপার অনিন্দ্য আনন্দে! সৃষ্টিশীল আনন্দে মানুষের প্রাণ শক্তি কীভাবে একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তারই অনুসন্ধানে এই ছবির নায়ক সিনোত্তি। এ যেন জীবনের সন্ধানে আর এক অন্বেষকের জীবন গাথা।

পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন এবং শোষণের মুখে পূর্ব তিমুরের যে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছিল, তা সংরক্ষণের জন্য তিনি লড়াই করেন। সিনোত্তি পূর্ব তিমুরের বিভিন্ন উপজাতির ভেতর গিয়ে তাদের আচার-অনুষ্ঠান নথিবদ্ধ করেন, ছবি তোলেন এবং আদিবাসী প্রধানদের সাথে রক্তশপথ (Blood Oath) নিয়ে তাদের পবিত্র স্থানগুলোতে প্রবেশের অনুমতি পান। তিনি এতটাই মিশে গিয়েছিলেন যে নিজেকে একজন তিমুরিজ (তিমুরের বাসিন্দা) মনে করতেন।
ছবিটা শুধুই তথ্যচিত্র নয় , একটি জনজাতি ও এক মানবতাবাদী কবির জীবন আলেখ্য । এই নিয়ে একটা ফিচার ফিল্ম হতেই পারত। গল্প, আবেগ,রহস্য সব উপাদানই ছিল।কিন্তু আশ্চর্য পরিমিতি নিয়ে সেগুলি ছেঁটে ফেলে পরিচালক নান্দনিক এক নিটোল তথ্যচিত্র তৈরি করলেন।দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় পূর্ব তিমুর এক প্রত্যন্ত ভূখণ্ড। এর মূল নিবাসী মানুষের জীবন ,সংগ্রাম ও তাদের সংস্কৃতির পরম্পরার দৃশ্য কথা সেলুলয়েডের ফিতায় রেখে গেলেন । সিনোত্তির তোলা পুরোনো পূর্ব তিমুর ফটোগ্রাফির সঙ্গে তাঁর সঙ্গে কাটানো মানুষজনের একটার পর একটা সাক্ষাৎকারের ক্লোজ আপ , সম্পাদনার গুণে টানটান । আবহে চমৎকার বিবরণীতে নিটোল ৭১ মিনিটের ছবিটি প্রদর্শিত হল সিনে সেন্ট্রালের আয়োজনে নন্দনে লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে। কলকাতাবাসী হিসেবে ইংরাজি সব টাইটেলে পর্তুগিজ ভাষায় ছবি দেখা এক বড় প্রাপ্তি।
ছবির নামকরণে কেন ক্রোকোডাইল? কিসের ফ্লাইট ? এশিয়ার দক্ষিণ পূর্বে এই দ্বীপ ভূমিরাষ্ট্র রাষ্ট্র পূর্ব তিমুর আকাশ থেকে দেখতে এক ঘুমন্ত কুমিরের মতো। এই ভূখণ্ডের মানুষের বিশ্বাস, কুমিরই তাদের প্রকৃত পরিত্রাতা! তাই এরা কুমির পুজো করে।তাই নামকরণে ক্রোকোডাইল। আকাশ থেকে দেখে মনে হয়, যেন গোটা দ্বীপরাষ্ট্রই উড়ন্ত কুমির!
সেই নীল জলে ঘেরা সবুজ বনানীর দ্বীপ খণ্ডে এসে পৌঁছলেন সিনোত্তি। পেশায় নৃতাত্ত্বিক হলেও অন্তরে তিনি কবি , যিনি আকাশে বাতাসে মানুষকে ভালোবাসার রামধনু খোঁজেন।ছবিটির দ্বন্দ্ব এখানে । একদিকে মানুষ, প্রকৃতি,তার নান্দনিকতা।অন্যদিকে লোভ, দমনের ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র । স্বার্থের সব কুটিল হিসেব পেরিয়ে ছবিটি মানবতায় মুক্তি খোঁজে।
ভালোবাসার অবুঝ অপ্রতিরোধ্য বন্ধন বদলে দেয় জীবনের গতিপথ। সিনোত্তিকে নিজেদের কাছেই রেখে দিতে তাঁর অগোচরে অলীক শক্তির কাছে প্রার্থনা জানায় পূর্ব তিমুরবাসী। তাঁদের জন্যেই তো এই দ্বীপ খণ্ডে সিনাত্তির আসা।
মানবতাবাদী সিনাত্তি খুঁজতে চেয়েছেন দ্বীপবাসীর শিকড় , মিশে গেছেন তাঁদের সঙ্গে।জীবনে জীবন যোগের গল্প গোটা সিনেমা জুড়ে। সেতু হয় সিনাত্তির ছবি, তাঁর কবিতা।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মানবতার জয় দেখাতে এমন একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ভালোবাসা আর কবিতা দিয়ে এক আলেখ্য রচনা করেন পরিচালক। অদ্ভুত ভাবনা। সারা বিশ্ব যখন ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামকে বিপ্লবের রক্ত ঝরানো ইতিহাসে – শ্লোগানে তুলে ধরতে অভ্যস্ত, তখন এই ছবির পরিচালক ফার্নান্দো ভেন্দ্রেল পর্তুগিজ ভাষায় নির্মাণ করলেন ঔপনিবেশিকতার প্রতিরোধে এক মানবিক আলেখ্য। এই ছবির সাব টাইটেলে ফুটে ওঠে সিনাত্তির কবিতার লাইনে লাইনে বিশ্বাস আর ভালোবাসার শপথ। শোষণের প্রেক্ষাপটে কবিতার প্রতিরোধ। পূর্ব তিমুরে সিনাত্তি এসে আর চলে যান নি।থেকে গেছেন এখানকার মানুষের সঙ্গে। এই দ্বীপ ভূমির প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যে মিশে গেছেন। স্বভূমির ঔপনিবেশিক স্বার্থের বিরুদ্ধে তিনি মানবিক চৈতন্যের প্রতিরোধ গড়ে তোলেন শিল্পে আর কবিতায়। তাঁর দীর্ঘ কয়েক দশকের দ্বীপ ভূমিতে বাস জগতকে দেখিয়েছে এই ভূখণ্ডের জনজাতির বিবর্তন।তাদের ইতিহাস বোঝার উপাদান নৃতাত্ত্বিক কবি রেখে যান কবিতার খাতায়।
এই ছবি সর্ব দিকেই অন্যধারার এক অন্য মাত্রার তথ্যচিত্র। অভাবনীয় উপস্থাপনা। ক্যামেরার চলন অত্যন্ত সন্নিষ্ঠ। তথ্যচিত্রের সংযম লক্ষ্যণীয়। অনিবার্যভাবেই তা কখনও বিষয়কে অতিক্রম করে সিনেমাটিক কম্পোজিশন তৈরি করে না। অথচ তার জন্য প্রকৃতির বুকে প্রস্তুত ছিল প্রেক্ষাপট। পরিচালক ফার্নান্দো সেই টেম্পটেশন অবলীলায় উপেক্ষা করে মনোনিবেশ করেছেন দ্বীপভূমির জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ইতিহাস তুলে ধরায়। সিনেমার আধুনিক ভাবনার এ এক উজ্জ্বল সৃষ্টি যেখানে সিনেমা কেবলই মাত্র বিষয়কে নিবিষ্ট করে রাখে না দর্শকের মনে বরং দর্শককে যুক্ত করে বিষয়ের চারপাশের ইতিহাস ভূগোল এবং সংস্কৃতির সঙ্গে। সিনেমাটিকে শুধুই উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রামের উচ্চকিত ধারাবিবরণী না করে দ্বীপবাসীর আদিম পরিচিতি,সমাজ, পরিবেশ ও ইতিহাসের মিশেলে পরিচালক ছবিটিকে একটি জনগোষ্ঠীর দলিল করে তোলেন। তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেল ছবিতে প্রতিটি ফ্রেমে। ক্যামেরা চলন কথা বলে। শট ডিভিশনে বৈচিত্র্য এনে পরম্পরাগত চেতনা বয়ে চলার অবহমানতা তুলে ধরেছেন। জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ঐতিহ্যই ছবির মুখ্য হয়ে ওঠে। যুদ্ধ, উপনিবেশ , পুঁজির আগ্রাসন ধ্বংস করে জন সংস্কৃতি বেঁচে থাকে সংস্কৃতি চেতনায়। এইখানেই তথ্যচিত্রটি কেবলই ইতিহাসের দলিল থাকে না, মানবিক সংগ্রামের সাংস্কৃতিক নির্ঘষ হয়ে চিহ্নিত হয়ে থাকে।ছবিটা এইখানেই অনন্য।

সিনোত্তির কবিতাকে পরিচালক ব্যবহার করেছেন খুব সুচারুভাবে। তাঁর কবিতার লাইনে ধরে রেখেছেন পূর্ব তিমুরবাসীর আত্মার স্পন্দন, তাঁর তোলা ছবি আগামী প্রজন্মের কাছে অতীত এই দ্বীপিভূমিকে চেনার জন্য ।এখানকার মানুষের সঙ্গে হয়েছিল তাঁর রক্তের শপথ, তাই আমৃত্যু তিনি তাঁদের ছেড়ে যান নি।স্বভূমি পর্তুগালের সরকার পূর্ব তিমুরের উপর ঔপনিবেশিক আগ্রাসন চাপিয়ে দিলে মর্মাহত সিনোত্তি প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় নীরব হয়ে যান।শেষে বলেছিলেন, আমি তো ওদের জন্য কবিতা লিখিনি, ওরাই আমার কবিতা হয়ে উঠেছিল।এতটাই আবেগী বন্ধনে সিনোত্তি জড়িয়ে পড়েন দ্বীপবাসীর সঙ্গে।
এই ছবি উপনিবেশের বিরুদ্ধে সৃজনশীল চেতনার সংগ্রাম। ছবিটি দেখিয়ে দিল মূলনিবাসী মানুষের লড়াইয়ে মিশে যেতে পারেন আগ্রাসী শাসক রাষ্ট্রের সংবেদনশীল মানুষও। স্বার্থের কুটিল হিংসা ভুলে অন্তহীন ভালোবাসা আর নিখাদ বিশ্বাস মানুষকে জাতি রাষ্ট্র বর্ণ ভুলে অবিচ্ছেদ্য মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারে। তাই দেশের সরকারের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে সাদা চামড়ার সিনোত্তি থেকে যান দ্বীপভূমির কালো মানুষের সাথে ।এখানেই জিতে যায় মানবতা। ছবিটি এক নৃতাত্ত্বিক কবির হাত ধরে সভ্যতার পদচিহ্ন খুঁজতে থাকা একদল প্রান্তিক মূলনিবাসী মানুষের মানবিক উত্তরণের সেলুলয়েডি ভাষ্য যা সভ্যতাকে নতুন করে দিশা দেখায়।










