আশ্বিনের ভিজে সন্ধে, জলে ডুবে কুঁচকে যাওয়া শহরতলি
রাত ৮টা
আমি কখনও যুদ্ধ দেখিনি। মানে যে যুদ্ধ দুই বা তার বেশি দেশের মধ্যে, সীমান্তে বা বিধ্বস্ত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ঘটছে, সেইরকম কোনও যুদ্ধ কখনও স্বচক্ষে দেখিনি।
যুদ্ধ খুব গুরুগম্ভীর বস্তু। পৌরাণিক গাথা থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত যুদ্ধের সংজ্ঞা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়প্রতিষ্ঠার দিকে একটি দুর্দম পদক্ষেপ।
আদতে ক্ষমতার এবং ইগোর লড়াই – ব্যাদড়া প্রতিপক্ষকে ঘাড় ধরে ‘সবক’ শেখানোর প্রতিজ্ঞাও বটে। বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের মোহময় মুখচ্ছদ দিয়ে আড়াল করা একটি কঠিন, হৃদয়হীন প্রক্রিয়া – যাকে বৈধ ঘোষণা করার জন্য সুমিষ্ট লব্জ তৈরি করা হয়েছিল প্রাচীনকালে –
All is fair in love and war.
কেন এত কথা লিখছে খুকু, যুদ্ধ নিয়ে?
সম্প্রতি পুনর্পাঠ সম্পন্ন হলো বিমল কর মশায়ের উপন্যাস ‘দেওয়াল’এর। আর সেই সঙ্গে ফিরে দেখা হলো মার্গারেট মিশেলের ধ্রুপদী সাহিত্য থেকে তৈরি করা ছবি ‘গন উইথ দ্য উইণ্ড’।
দেওয়াল মহাকাব্যিক উপন্যাস নয়। উনিশশো চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ সালের শহর কলকাতার পটভূমিকায় নিতান্ত সাধারণ কয়েকটি মানুষের ততোধিক সাধারণ দিনযাপনের কাহিনী, যার চরিত্র অনেক, কিন্তু নায়ক একজনই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মেয়ে, প্রেমিকা সুধাকে ফেলে সাধারণ যুবক সুচারু স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগ দিতে যায়, ক্লেদাক্ত নাগরিক জীবনের ক্লান্তিকর পৌনপুনিকতার বাইরে বৃহত্তর কিছু অভিজ্ঞতার খোঁজে। তার অবর্তমানে বাহ্যিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যোজন দূরে থাকা সুধা আর তার পরিবারের জীবনযুদ্ধ চলতে থাকে। কলকাতার অশান্ত বিক্ষুব্ধ ক্যানভাসে লেখকের তুলির টানে আঁকা হয় আরো অনেক চরিত্র – সুধাদের ভাড়াবাড়ির একতলার ভাড়াটে গিরিজাপতিবাবু, তাঁর বিকলাঙ্গ ভাইঝি উমা, কমিউনিস্ট ভাইপো নিখিল, সুধার বিধবা সন্তানমুখাপেক্ষী রুগ্না মা রত্নময়ী, বিপথগামী ভাই বাসু, বাসুর শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু গৌরাঙ্গ, বোন আরতি, ডাক্তার দেবব্রত, সুধার অফিস কলিগ অমলাদি – এইরকম বহুকৌণিক, নানা বর্ণের চরিত্র।
যুদ্ধের পায়ে পায়ে আসে আকাল, গাঢ় হয় দারিদ্র্যের অন্ধকার, রাজনীতিরও রঙবদল হয়। সুধার শরীরকে গ্রাস করে ব্যাধি, বাসুর অসামাজিক মনকে গ্রাস করে সংশয়। হতাশ উমা আত্মহত্যা করতে যায়, কাকার কথা ভেবে কেরোসিনে ভেজা কাপড়ে অগ্নিসংযোগ করা আর হয়ে ওঠে না শেষ পর্যন্ত। মুখচোরা রত্নময়ী অর্থাভাবে, মানসিক সংকীর্ণতায় হয়ে ওঠেন চূড়ান্ত স্বার্থপর – রুগ্ন অসহায় মেয়েকে চরিত্রের খোঁটা দিতে তাঁর বাধে না।
একমাত্র আরতি একটা সম্মানজনক কাজ নিয়ে সুস্থভাবে বাঁচতে চেষ্টা করে।
এর মধ্যে যুদ্ধে তার ডান হাত খুইয়ে ফিরে আসে সুচারু। নিজের অঙ্গহানি, অসংখ্য অকারণ মৃত্যু আর হত্যালীলার সাক্ষী হয়ে, মনের স্থৈর্য হারিয়ে, সে বুঝে যায়, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কিছু দেয় না, যুদ্ধের একটা লার্জার দ্যান লাইফ ছবি তৈরি করে রাষ্ট্র বা সরকার, আবেগমথিত হয়ে সাধারণ মানুষ তাতে ঝাঁপ দেয়। গিরিজাপতিবাবু উমাকে নিয়ে ফিরে যান গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে। সুধা জেনে যায়, সে আর কোনোদিনই ভালো হবে না।
এরই মধ্যে প্রায় নিঃশব্দে গৃহত্যাগ করে বাসু। সে যুদ্ধে যায়। যেতেই হয় তাকে। যেমন যুদ্ধ হয়ত করতে হয় আমাদের সকলকেই। কখনও সমাজের সঙ্গে, কখনও নিজের সঙ্গে, আর অব্যবহিত ভাবে প্রকৃতির সঙ্গেও। কি ঘটবে তা জেনেও এই অর্থহীন, নিষ্ঠুর, অশিব যুদ্ধের হাত থেকে মানুষের নিস্তার নেই। আমরা সবাই নেপোলিয়ন – জীবনের কোন বাঁকে যে কার ওয়াটার্লু লুকিয়ে রয়েছে, এক মুহূর্ত আগের পদক্ষেপও বুঝি তার খবর রাখে না।
গন উইথ দ্য উইন্ড, মার্গারেট মিশেল রচিত একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস। জীবদ্দশায় এই একটি উপন্যাসই লিখেছিলেন তিনি।
মিশেল এটি লিখতে শুরু করেন ১৯২৬এ। শেষ করেন ১৯৩৬এ। ১৯৩৭ সালে এই উপন্যাসের জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন।
এই উপন্যাসকে ওয়ার ড্রামাও বলা যায়। কাহিনীর সূত্রপাত ১৮৬১ সালে। ঘটনাস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণে জর্জিয়া এবং আটলান্টা। জর্জিয়া সহ দক্ষিণের সাতটি প্রদেশ তখন আব্রাহাম লিঙ্কনের আমেরিকার সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে কনফেডারেসি তৈরি করেছে। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়েছে এর পরেই। এই গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় এক উচ্ছল, স্বাধীনচেতা, প্রায় উচ্ছৃঙ্খল নারী স্কারলেট ও’হারা-র বিচিত্র জীবনকাহিনী বর্ণিত হয়েছে এই সুবৃহৎ উপন্যাসে।
মেয়েটি রূপসী নয়। কিন্তু অসম্ভব আকর্ষণীয়া। সেই কারণেই তার ধারণা, এই পৃথিবীতে তার অপ্রাপ্য কিছুই থাকতে পারে না। প্রেমে আঘাত পায় স্কারলেট – যাকে ভালবাসে, সে তারই তুতো বোনের অনুরক্ত। এই আঘাতের ফলে জীবন নিয়ে খেলা করার প্রবণতা পেয়ে বসে তাকে। সে বিয়ে করে, অবশ্য প্রেমজ বিবাহ নয় – মা হয়, কিন্তু ভুলতে পারে না তার প্রথম ভালবাসাকে। তার জীবনে বন্ধনমুক্তির স্বাদ নিয়ে অকালবৈধব্য আসে। উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের মধ্যেই তার জীবনে আসে রেট বাটলার – এই উপন্যাসের নায়ক। সে-ও সমান উচ্ছৃঙ্খল। অনেক উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে তাদের বিয়ে হয়। এর আগে আরো একটি ব্যর্থ বিবাহ, দ্বিতীয় সন্তান এবং পুনর্বৈধব্য এসেছে তার জীবনে। পাল্টে গিয়েছে কাহিনীর পটভূমিকাও। কখনও আটলান্টা শহর। কখনও জর্জিয়ার গ্রাম-গ্রামান্তর, যেখানে অবাধে চলছে যুদ্ধপরবর্তী নৈরাজ্য, লুঠতরাজ, খাদ্যাভাব। এইসব প্রতিকূলতার সঙ্গে সাহস করে লড়তে নামে মেয়েটি। জিতেও যায়। এখানেই রয়েছে সৈন্যদের পুড়িয়ে দেওয়া, লুন্ঠিত শস্যক্ষেত্রের সামনে দাঁড়িয়ে স্কারলেটের সেই অবিস্মরণীয় উক্তি –
‘I will never be hungry again!’
একা লড়াই করা মেয়েটির তখন একটাই মন্ত্র, অস্তিত্বরক্ষা।
এই যুদ্ধে তার পাশে থাকার সুবাদে উঠে আসে আমেরিকার কালো মানুষদের কথা। অত্যন্ত দক্ষ লেখনীতে বর্ণবৈষম্যের প্রসঙ্গ এনেছেন মিশেল – বর্ণনা করেছেন রেড আর গ্রিন শব্দের প্রয়োগে।
যুদ্ধ শেষ হয় একদিন। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে সস্ত্রীক গ্রামে ফিরে আসে স্কারলেটের প্রথম প্রেম, অ্যাশলি উইল্কস। স্কারলেট তখন রেটের এক সন্তানের জননী, এবং দ্বিতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু উইল্কসকে দেখা মাত্র তার পুরোনো প্রেম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অন্ধ আবেগে সে দাম্পত্য ভুলে যায়, মূল্যবোধ ভুলে যায়, ভুলে যায় বোন মেলানি-কেও।
ঘরোয়া ঝগড়াঝাঁটির পরিণামে গর্ভপাত হয়ে যায় স্কারলেটের – অনাহূত যে সন্তানকে সে পৃথিবীর আলো দেখাতে চায়নি। এর কিছুদিন পরে তার ও রেট-এর একমাত্র জীবিত সন্তান এক দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তাদের দু’জনের চোখের সামনেই শেষ হয়ে যায়।
মারা যায় তার তুতো বোন, উইল্কসের স্ত্রী, মেলানি-ও।
অবশেষে স্কারলেট সম্পর্কে রেট-এর মোহভঙ্গ ঘটে। ঠিক যখন সহস্র দুঃখের সাধন প্রাপ্তমনস্ক করে তুলছে স্কারলেটকে, ঠিক যখন সে বুঝতে শিখছে প্রেমের অর্থ, ঠিক যখন সে প্রকৃতভাবেই ভালবাসতে চাইছে স্বামীকে, তখনই রেট বাটলার তাকে ছেড়ে চলে যায়।
কাহিনীর শেষে স্কারলেটের আকুল জিজ্ঞাসা ‘এখন আমি কী করব’-র উত্তরে রেট বাটলারের নিরাসক্ত উক্তি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল এককালে –
‘Frankly my dear,I don’t give a damn’.
জীবন কখনো কাউকে অনন্ত সুযোগ দেয় না। প্রেমকেও না, যুদ্ধকেও না।
বিধ্বস্ত, সর্বহারা স্কারলেট এর পরেও কিন্তু হারতে চায় না। সবরকম নেতি সরিয়ে সে উঠে দাঁড়াতে চায়, বাঁচতে চায়, লড়াই করতে চায়, যে লড়াইয়ের শেষে হয়ত তার কাঙ্ক্ষিতকে সে পেয়েও যেতে পারে একদিন।
এই কাহিনীর শেষ সংলাপ সেই চূড়ান্ত ইতিবাচকতার কথা বলে, রাত ফুরোলে নির্ভুল ভোর আসার খবর দেয়।
After all, tomorrow is another day!
প্রায় একযুগের বিস্তৃতি ধরা আছে কাহিনীতে। আর ছড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত, ধূসর বিষণ্ণতা – যার সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারি ভীষণভাবেই। অথচ শেষ পর্যন্ত এটি সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে, নিজের এবং পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে কঠিন যুদ্ধের শেষে, ততটা আদর্শ নয়, এমন এক নারীর বেঁচে থাকার গল্প বলে। এটা এই কাহিনীর প্যারাডক্স বলা যায়।
১৯৩৭ সালে, ভিক্টর ফ্লেমিংএর পরিচালনায় সিডনি হাওয়ার্ডের চিত্রনাট্যে, তৎকালীন হলিউডি সুপারস্টার ক্লার্ক গেবল ও ভিভিয়েন লি অভিনীত গন উইথ দ্য উইন্ড ছবিটি দশটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল, যার মধ্যে স্কারলেট ও’হারা-র চরিত্রচিত্রণে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন ভিভিয়েন লি।
গন উইথ দ্য উইণ্ড যুদ্ধ, প্রেম, সারাজীবনের ঘাত প্রতিঘাত এবং সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে একজন মানুষের নিজেকে বুঝে ওঠা এবং প্রতিকূল বাতাবরণের ভিতরেও তার বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক বহুবর্ণ দলিল হয়ে থেকে যাবে চিরকাল।
বিশ্বসংসারের বিশালতার চালচিত্রে আমি ক্ষুদ্র মানবী – প্রতিদিন ছোট ছোট যুদ্ধক্ষেত্র মাড়িয়ে পথ চলি। ছোট ছোট সাবধানী পদক্ষেপে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করি সংঘাতের রণভূমি – বেশির ভাগ সময়ই পারি না।
রোজ নিজের সঙ্গে লড়াই বাধে – বর্তমানের সঙ্গে অতীতের, মনের সঙ্গে শরীরের, কাজের সঙ্গে অবকাশের। বাঁও মেলে না। অদৃশ্য প্রতিপক্ষের কাছে হার মেনে লজ্জা পাই না, ক্বচিৎ জিতে গেলেও আনন্দিত হই না। আমি সামান্য মানুষ – বিশ্বব্যাপী নানা অর্থহীন মহাযুদ্ধের ন্যায় অন্যায়ের হিসেবের থই পাই না মোটে।
যুদ্ধ বললে আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু ছেঁড়া ছবির কোলাজ – পালস অক্সিমিটারে জ্বলজ্বলে অক্সিজেন স্যাচুরেশন, নীল মাস্ক আর সাদা পিপিই, কালো প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি মানবদেহ, সুনসান পিচগলা রাস্তায় একলা ভুখা পাগল আর রুক্ষ প্রান্তর দিয়ে হেঁটে চলা পরিযায়ী মানুষের পালের ছবি।
কোন পক্ষ যেন জিতেছিল সেই ধর্মযুদ্ধে? কোন রাষ্ট্র? কোন জাত? কী রঙ?
(ক্রমশ)
সঙ্গের ছবি:
২০২০র সেপ্টেম্বর। জীবনের অন্যতম কঠিন যুদ্ধ পেরিয়ে ঘরে ফেরার পরে।











