২০২৬ সালের ৫/৬ জুলাই কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের একটি অংশের (প্রবেশদ্বারের কাছের একটি পুরনো টিকিট কাউন্টার/নিরাপত্তা কক্ষ) রং রাতারাতি বদলে দেওয়া হয়।
হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত কিছু নাট্যকর্মী ও সদস্যরা কাঠামোটিকে গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেয় এবং এর পাশে সিংহ বাহিনী ভারতমাতার একটি প্রতিকৃতি স্থাপন করে। গেরুয়া রঞ্জিত দেওয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বন্দেমাতরমের পঞ্চ স্তবক লেখা একটি ফ্লেক্স।
এই পদক্ষেপটি কলকাতার নাট্য ব্যক্তিত্ব ও শিল্পীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়, সঙ্গত কারণেই সংস্কৃতি প্রেমীরা এই ঘটনাকে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানের রাজনীতিকরণ হিসেবে দেখেছিলেন। বিভাস চক্রবর্তী, অরুণ মুখোপাধ্যায়, মেঘনাদ ভট্টাচার্য, চন্দন সেন এবং দেবাশিস মজুমদার – পাঁচজন বরিষ্ঠ নাট্যকার, পরিচালক এবং অভিনেতা এই গৈরিকীকরণের নিন্দা করে একাডেমির সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিজেপির রাজ্য সভাপতি সংস্কৃতিপ্রেমী ভট্টাচার্য মহাশয়ের কাছে একটি আবেদন করেন । ভট্টাচার্য মহাশয় ভারি বিস্মিত হন এসব শুনে। বিজেপির রাজ্যস্তরে, এমন কি জাতীয় স্তরেও এমন শিল্পবোদ্ধা, কাব্যনাট্যপ্রেমী বুদ্ধিজীবিভাবাপন্ন নেতা খুব বেশি নেই। স্বভাবতই অদ্বিতীয় বাচস্পতি ঘাড় নেড়ে ঘোষণা করেন এসব কাজ ওনাদের নয়। সদলবলে দলবদলুদের আশ্রয় দেওয়া নেতা সকলকে আশ্বস্ত করে বলেন তাঁরা রং বদলের রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না! তিনি একাডেমির দেওয়াল থেকে গেরুয়া মুছে দেবার প্রতিশ্রুতি দেন।
এর পর কেটে যায় আরো একটি মাস। ভট্টাচার্য পণ্ডিতের কথা অনুসারে গেরুয়া দলের কেউ একাডেমির রং গেরুয়া না করলেও রংটা গেরুয়াই থেকে যায়। বদল হয় না।
এর মধ্যে ঘটে যায় আর একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা। ২৮ শে জুলাই মাঝরাতে এক নাট্যকর্মী শুভঙ্কর দাশশর্মা, ভারভারা রাও এর একটি নাটক ‘কসাই’ অভিনয় করে শ্যামনগর ফেরার পথে বিজেপি গুণ্ডাদের আক্রমণের মুখে পড়ে। নিজেকে মুসলিম পরিচয় দেবার ফলে ভয়ঙ্কর ভাবে নিগৃহীত হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে নাট্যকর্মীরা ১১ আগস্ট একটি প্রতিবাদী সভা করার সিদ্ধান্ত নেন। রোদঝলসানো দুপুরে ছাতা মাথায় সংস্কৃতি কর্মী ও তাঁদের বন্ধুরা হাজির হন একাডেমির সামনে। অভয়া মঞ্চের অন্যতম কনভেনর, বিশিষ্ট নাট্যকর্মী মণীষা আদক সহ মঞ্চের বেশ কিছু সদস্য এই সভায় উপস্থিত ছিলেন।
প্রবীণ নাট্যকর্মী সীমা মুখোপাধ্যায় এই সভাতেই ঘোষণা করেন গেরুয়া রঙ বদলানোর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে থিয়েটারের শিল্পীরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে রং করে দেবার ব্যবস্থা করেছেন এবং আজই কাঠামোটিকে তাঁরা পুনরায় সাদা রঙে ফিরিয়ে দেবেন।
প্রশাসনের উদাসীনতায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত শহরের বিশিষ্ট নাট্য ও শিল্পব্যক্তিত্বরা নিজেরাই তুলি হাতে নেন। একাডেমি গেরুয়া থেকে সাদা হয়ে যায়, তৈরি হয় এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। অসংখ্য মানুষ ঘিরে থাকেন একাডেমি চত্ত্বর, একদিকে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, কুশল দেবনাথ বক্তৃতা দিচ্ছেন, নাটক, গান চলছে রানুচ্ছায়া মঞ্চে, এই সময় সবাই তুলি, কাপড় হাতে গেরুয়ার উপর শান্তির সাদা রং করছেন। মানুষের ভিড়ে পুলিশ এসে ফিরে যায়।
এই জয় মানুষের জয়। সংস্কৃতি, শুভবুদ্ধি আর প্রতিবাদী নাট্যকর্মীদের জয়। সংগ্রামী ঐক্যের জয়! বিজেপি আর এস এস গুণ্ডাদের হাতে প্রহৃত শুভঙ্কর সভার শুরুতে বলেছিলেন সেদিন যদি প্রাণ বাঁচাতে নিজের হিন্দু পরিচয়টা দিয়ে ফেলতাম তাহলে হয়তো শারীরিক নিগ্রহের হাত থেকে বাঁচতাম কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে যেতাম, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেলতাম। এই সাহস, এই স্পর্ধা নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখায়। ঘৃণার বাষ্পে উত্তপ্ত ভারত আমাদের নয়, যে ভারতে যে কোন ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণভিত্তিক পরিচয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচা যায়, সেই ভারতবর্ষই আমাদের দেশ। গৈরিকীকরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সংগ্রামী মানুষ যে শ্বেত শুভ্র শান্তির ছবি আঁকলেন একাডেমির দেওয়ালে, সেই রং দিনবদলের আহ্বান নিয়ে এল যে আহ্বান কাঁপিয়ে দিল হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীদের। আগের গেরুয়া রং হয়েছিল রাতের অন্ধকারে, কারা করেছে রাজ্য সভাপতি মহাশয়ের জানা ছিল না কিন্তু কারা করেনি সেটা বিলক্ষণ জানতেন। তাই সগর্বে ঘোষণা করেছিলেন আমাদের দলের কেউ এই সব কাজ করে না। ভট্টাচার্য মশাই এর মুখে ঝামা ঘষে নাকের ডগায় মিথ্যেবাদীর লেবেল ঝুলিয়ে ১২ অগাস্ট হিন্দুবীর বিধায়কের ক্ষমতাবলে জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে দিনের আলোয় প্রকাশ্যে আবার গেরুয়া করে দিয়ে এসেছেন একাডেমির পুরোনো টিকিট কাউন্টার। স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন একাডেমির রাজনীতিকরণ তিনিও পছন্দ করেন না। একাডেমির ঘরের দেওয়ালে ঝুলবে শুধু শ্যামাপ্রসাদ আর রাতের রিলমাস্টারের ছবি। কোন রাজনীতির রং বরদাস্ত করা হবে না, অর্থাৎ বামপন্থীদের দখলদারি চলবে না। এই হিন্দুবীর আবার পেশায় অভিনেতা, সেইরকম অভিনেতা যাদের কাছে পেশা শুধুই টাকা রোজগারের উপায়, যাদের কাছে পেশার সঙ্গে মনন ও হৃদয়ের কোন যোগ নেই। এই ভাড়াটে অভিনেতা এখন হিন্দুবীরের ভূমিকায় অভিনয় করছেন। অনন্ত লোভ এবং অপার ভয় এদের মেরুদণ্ডকে চিরতরে ‘ভ্যানিশ’ করে দিয়েছে, যেমন করে সোনার কেল্লা ছবিতে ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিল ‘দুষ্টু লোক’। মেরুদন্ডহীন সরীসৃপরা কখন যে কোন দলের হয়ে অভিনয় শুরু করবে, অথবা দিনের আলোর ভয়ে কখন নিজেই অন্ধকারে চিরনির্বাসন নেবে সে বোঝা ভারি দায়।
গেরুয়া আর হর ঘর তিরঙ্গার দাপটে সংক্ষেপে দুটো কথা বলে নেওয়া যাক। আর এস এস এর গুরুঠাকুররা তিরঙ্গা কোনোদিন পছন্দ করেন নি। তিরঙ্গার ভাবনা ভারতের জাতীয়তাবাদীদের। জাতীয় পতাকায় গেরুয়া ত্যাগ, তিতিক্ষা আর কৃচ্ছসাধনের প্রতীক। গেরুয়া নিয়ে এই নির্লজ্জ ক্ষমতা প্রদর্শন গেরুয়া রং এর চরম অবমাননা সেটা বোঝার ক্ষমতা এই অন্ধকারের সরীসৃপদের নেই সে কথা বলাই বাহুল্য।
বিনয়ের মুখোশ পরা ভণ্ড সংস্কৃতিজ্ঞকে আমরা স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই আপনি না বিশ্বাস করলেও আমরা রং বদলের রাজনীতিতেই বিশ্বাস করি। আগ্রাসন আর বিভাজনের রংকে মুছে দিয়ে আমরাই আনব শান্তি আর ভালোবাসার রং। আর এই বদলানোর প্রক্রিয়াটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।










