নাগরিকতাহীন কিংবা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক?
ব্রিটিশ সমাজতাত্ত্বিক T.H. Marshall নাগরিকত্বের অধিকারকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন:
নাগরিক অধিকার (Civil Rights)
রাজনৈতিক অধিকার ( Political Rights)
সামাজিক অধিকার ( Social Rights)
এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলে পাঠকদের ধৈর্য্যচুতি ঘটবে , তাই এই মুহূর্তে যেটুকু প্রয়োজন , সেইটুকুই লিখছি।
রাজনৈতিক অধিকার এর মধ্যে সবচেয়ে প্রথম অধিকার হচ্ছে- নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অধিকার । যদিও সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ভোট দেওয়ার আপাত অধিকার না থাকা মানেই নাগরিকত্বহীন- এটা ঠিক নয় এবং সেই ব্যক্তিকে সেই সময়কালের মধ্যে অন্যান্য নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত যাবে না। সুপ্রীম কোর্টের এই নির্দেশ অনেকটা সোনার পাথর বাটির মত। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার তো দূরের কথা, ভোটার কার্ড ছাড়া আপনি আপনার নিজের জমি কেনা -বেচাও করতে পারবেন না।
এস আই আর
এবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোটের আগে যে এস আই আর করা হয়, তাতে প্রায় ৯০.৫ লাখ নাম বাদ পড়ে। নির্বাচন কমিশন অনুযায়ী তার মধ্যে প্রায় ৬৩ লাখ নাম বাদ পড়েছে মুলত চারটি কারণে – নিখোঁজ, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় নাম, এবং মৃত; এবং কোনো কারণ না দেখিয়ে প্রায় ৫.৫০ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এই ৬৩ লাখের মধ্যেই। ধরে নেওয়া হয়েছিল যে এই ৬৩ লাখ প্রায় সবাই- ই স্থায়ী ভাবে বাদ। এ ছাড়া প্রায় ২৭ লাখ ( ৯০.৫- ৬৩) লোকের নাম বাদ দেওয়ার কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে – লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি, মানে নামের বানান বা উপাধিতে ভূল ইত্যাদি। সুতরাং সব মিলিয়ে ( ৫.৫০+ ২৭) দাঁড়ালো ৩২.৫ লাখ লোকের একটা সুযোগ থাকছে ভোটার লিস্টে নাম তোলানোর।
যাদের নাম বাদ গিয়েছে তাঁদের নাম তুলতে হলে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদন অনলাইনে বা ডি এম অথবা এস ডি ও অফিসে গিয়ে করা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের ১৯ টা জেলার ১৯ টা ট্রাইব্যুনাল খোলা হয়েছে, যাদের অফিস ২৪ পরগনার জোকাতে।
তথ্যের অধিকার আইন অনুযায়ী এখনও অবধি ৩৮ লাখ ১০ হাজার আবেদন জমা পড়েছে। ৩২.৫ লাখ কি করে ৩৮ লাখেরও বেশি হয়ে গেল? অনুমান করা যেতে পারে যে এরা প্রথমেই যে ৬৩ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, তাদের একাংশ এবং যাদের নাম ভোটার লিস্টে উঠেছে, তাদেরও কিছু অংশ। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার এই ৩৮ লাখের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের আবেদনও আছে এবং অনেক আবেদন আছে নাম বাদ দেওয়ারও।
ট্রাইব্যুনাল এর সাফল্য কি রকম। এখনও অবধি মাত্র দু পার্সেন্ট আবেদনকারীর ফয়সালা হয়েছে; এবং এই গতিতে ট্রাইব্যুনাল চললে কাজ শেষ হতে প্রায় ৩০/৪০ বছর লেগে যাবে। স্বয়ং সুপ্রীম কোর্টও এতে অখুশি। আর একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো আবেদনকারীর প্রায় ৯২ শতাংশের নাম ভোটার তালিকায় স্থান পাচ্ছে।
এই তথ্য দুটো জিনিষ প্রমাণ করে: এক: প্রতি ১০ জন আবেদনকারীর মধ্যে ৯ জনই ন্যায্য ভোটার; দুই: ট্রাইব্যুনাল এর শম্বুক গতির জন্য, লাখ লাখ নাগরিক হয সারা জীবনের জন্য বা বহু বছরের জন্য তাদের প্রাথমিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন অর্থাৎ তাঁরা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক হয়ে থাকবেন।
সংগ্রামী গণমঞ্চ এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি নিয়ে আগামী ২রা সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তার জন্য এই মঞ্চ দলমত নির্বিশেষে সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছে ওইদিন বেলা ১২:৩০ টায় মৌলালির রামলীলা ময়দানে জমায়েত হতে। আশা করি সবাই দলীয় এবং সাংগঠনিক লাভ ক্ষতির উর্ধ্বে উঠে, ছুতমার্গ পরিত্যাগ করে মানুষের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেবেন।











