গত পরশু চোরবাগান সার্বজনীন পুজোয় প্রশাসন ও উদ্যোক্তাদের ভয়ানক অব্যবস্থা ও গাফিলতিতে যে হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটল, প্রাণ হারালেন আমাদের ১৯ জন সহনাগরিক, তার ভয়াবহতার রেশ থেকে আমরা কেউই এখনও বেরোতে পারিনি। কিন্তু ইতিমধ্যেই গোটা শাসক শিবির এই অব্যবস্থা সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন উঠলেই সমস্বরে ‘রাজনীতি করবেন না’ বলে কণ্ঠরোধ করতে উদ্যত! সরকার নতুন হলেও অস্বস্তিকর প্রশ্নে কণ্ঠরোধের অভ্যেসটি বেশ পুরনো!
মেডিক্যাল কলেজের যে জুনিয়র ডাক্তারেরা আহতদের চিকিৎসা করছিলেন, তাঁরা সমস্ত রোগীর চিকিৎসা সম্পূর্ণ করার পর তাঁদের অ্যাপোলো হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার ঘটনা এবং তার পিছনে থাকা হাসপাতালের পরিকাঠামোগত ঘাটতির কথা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। কেন রাজ্যের অন্যতম প্রধান সরকারি টার্শিয়ারি হাসপাতাল থেকে আহতদের কর্পোরেট হাসপাতালে পাঠাতে হল, সেই প্রশ্নও তোলেন তাঁরা। আর তারপরেই গোটা আইটি সেল নেমে পড়েছে, জুনিয়র ডাক্তাররা কেন সাংবাদিকদের সামনে এসব কথা বলবেন, এখন নাকি রাজনীতি করার সময় নয়, এই ন্যারেটিভ নিয়ে। এমনকি সন্দীপ ঘোষের স্নেহধন্য বিরূপাক্ষ সোশ্যাল মিডিয়ায় এক জুনিয়র ডাক্তারকে পিটিয়ে মারার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন!
মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য প্রশ্নগুলি এড়িয়ে বলেছেন, বাচ্চা ছেলে ওরা, কিস্যু জানে না। আসলে নাকি রোগীরাই চেয়েছেন মেডিক্যাল কলেজ থেকে অ্যাপোলো চলে যেতে, তাই তাঁদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুব ভালো কথা! আপৎকালীন পরিস্থিতিতে রোগীদের মনের ইচ্ছেমতো চিকিৎসার জায়গা বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমরা সাধুবাদ জানাই। যদিও সবাই কেন একযোগে একই হাসপাতালে যেতে চাইলেন, সেই ব্যাখ্যা এখনও অজানা।
উন্নত চিকিৎসা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। আহতদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। কিন্তু এই ঘটনায় কয়েকটি জরুরি প্রশ্ন উঠবেই।
প্রথমত, মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি মেনে নিলেন যে এশিয়ার প্রাচীনতম এবং ভারতবর্ষের ইতিহাসের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মেডিক্যাল কলেজে উন্নতমানের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই? ঠিক যেটা আমরা অভয়া আন্দোলনের সময় থেকে বারবার বলে আসছি? সরকারে আসার পর একাধিকবার হাসপাতাল পরিদর্শন করেও ইমার্জেন্সির সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে সমাধানের রাস্তা বের করা গেল না কেন? সময়ের অভাব থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের সহযোদ্ধা জুনিয়র ডাক্তার সমস্ত রোগীর চিকিৎসা সম্পূর্ণ করে তাঁদের অ্যাপোলোতে স্থানান্তরের পর সাংবাদিক বৈঠক করে সেই সমস্যাগুলিই তো তুলে ধরছিলেন। তাতে আপনারা ‘ওরা রাজনীতি করছে’ বলে চিৎকার করছেন কেন? সরকারি হাসপাতালের উন্নতি কি সরকারেরই সাফল্য নয়? কাদের স্বার্থে মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তাররা এই সমস্যাগুলি সামনে আনছিলেন?
দ্বিতীয়ত, চোরবাগানের দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সিতে পথ দুর্ঘটনায় আহত কয়েকজন রোগী আসেন। তাঁদের কিন্তু অ্যাপোলোতে পাঠানো হয়নি। কেন? একটু আগেই যখন সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোর অভাবের কথা বলে আহতদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হল, তখন পরবর্তী রোগীদের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হল না কেন? ইমার্জেন্সিতে জরুরি রক্ততঞ্চনকারী ওষুধ ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড নেই, ABG মেশিন নেই, পর্যাপ্ত ট্রমা কেয়ারের ব্যবস্থা নেই, এই ঘাটতিগুলির কথা জুনিয়র ডাক্তাররা জানিয়েছিলেন। তখন তাঁদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করার অভিযোগ তোলা হল। তাহলে পরবর্তী আহত রোগীরা যদি দাবি করেন যে তাঁদেরও অ্যাপোলোতে পাঠাতে হবে, সেই জুনিয়র ডাক্তাররা তাঁদের কী উত্তর দেবেন? ‘এখানে কিছু নেই, কিন্তু আপনারা রাজনীতি করবেন না?’
তৃতীয়ত, রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে বর্তমান শাসকদল অতীতে বিরোধী অবস্থানে থেকে বারবার যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তুলেছে। সেই রেফার-নির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থাই আজ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে যে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা আপৎকালীন পরিস্থিতিতে রোগীদের সামলাতে সামলাতে তাঁদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। মেডিক্যাল কলেজের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে সচল নিউরোসার্জারি বিভাগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং পর্যাপ্ত পরিকাঠামো-সহ ট্রমা কেয়ারের অভাব কেন? এই প্রশ্ন কি কেবল রাজনৈতিক, নাকি পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারানো ও আহত হওয়া সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রশ্নও?
যে জুনিয়র ও সিনিয়র চিকিৎসকেরা ঢাল-তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দারের মতো ইমার্জেন্সিতে ছুটে বেড়িয়ে আহতদের চিকিৎসা করছিলেন, তাঁদের ভর্তি করাচ্ছিলেন, ওষুধ লিখছিলেন, তাঁদের কাজের তদারকির নামে অযথা প্রশ্ন করা বা বেসরকারি হাসপাতালে রেফার লিখতে বাধ্য করা কি স্বাস্থ্য প্রশাসনের তরফ থেকে একপ্রকার ‘রাজনীতি করা’ নয়? সমস্ত রোগীর চিকিৎসা সম্পূর্ণ করে নিজেদের অসহায়তার কথা সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরলে সেই বক্তব্যকে রাজনৈতিক আখ্যা দেওয়াটা কেমন সভ্যতা?
মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয়, এ কথা আমরাও মানি। কিন্তু সেই দায় কি শুধু নাগরিকদের, চিকিৎসকদের কিংবা ফ্রন্টলাইনারদের? সরকার বদলের পর যাঁরা দায়িত্বশীল প্রশাসন ও উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তাঁদের প্রশ্ন করলেই কি ‘রাজনীতি করছেন’ বলে চুপ করিয়ে দেওয়া হবে?
ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট চোরবাগান সার্বজনীন পুজোর দুর্ঘটনায় মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সিতে কর্মরত সমস্ত জুনিয়র ডাক্তারদের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। একই সঙ্গে সমস্ত আপৎকালীন রোগীর চিকিৎসা সম্পূর্ণ করে, কোনও রোগীর প্রতি অবহেলা না করে, তাঁরা যে সাংবাদিক বৈঠক করেছেন, তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব WBJDF গ্রহণ করছে। আমরা তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত।
আমরা চাই, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সঠিক তদন্ত হোক, মৃতদের পরিবার যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাক এবং আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে বেহাল পরিস্থিতি এই ঘটনা সামনে এনেছে, স্বাস্থ্য দপ্তর তার যথাযথ সমাধান করুক। ভবিষ্যতে যেন অসহায় মানুষকে উন্নত চিকিৎসার আশায় দিশাহীনভাবে বেসরকারি হাসপাতালে ছুটে যেতে না হয়।
প্রশ্ন তোলা রাজনীতি নয়। মানুষের জীবন, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার। সেই অধিকারকে ‘রাজনীতি করবেন না’ বলে দমন করা যায় না।












প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে ১০০ ভাগ সহমত। WBJDF এর এই প্রতিবাদী স্পর্ধা অটুট থাক।