
এককালে চিকিৎসা পরিষেবার অপ্রতুলতার কারণে মায়েরা সন্তান প্রসব করতেন বাড়িতে, অপটু ধাইমাদের হাতে। সবার ক্ষেত্রে না হলেও অনেক মহিলাই এই ব্যবস্থার কারণে বিপদে পড়তেন। বিপন্ন হতো সদ্যোজাত সন্তানের জীবন। এ যেন পাঁপড়ি মেলার আগেই কুঁড়ি ঝরে যাওয়া।
এই অবস্থার অনেকটাই বদল হয়েছে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে। যতোদিন যাচ্ছে,ততোই মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যার সুযোগ বাড়ছে, বেড়েছে নাগরিক সচেতনতা। অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে প্রসবকালীন অপমৃত্যুর সংখ্যা। আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ গ্রহণে আগ্রহ বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে। একালের মহিলাদের মধ্যে গর্ভবতী হওয়ার বিষয়টিকে সরকারি চিকিৎসালয়ে নথিভুক্ত করার তাগিদ বেড়েছে, গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন গভীর আগ্রহে, এককালের ধাইমা কেন্দ্রিক প্রসবের ব্যবস্থা এখন প্রায় গল্প কথায় পরিণত হয়েছে। এসব সংবাদ মনকে খুশি করে বৈকি। সমস্ত ব্যবস্থা আরও আরও প্রসারিত হবে, কার্যকর হবে সকল গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এই আশায় বুক বাঁধতে কার না ইচ্ছে করে? হবু মায়েরা আরও বেশি বেশি সংখ্যায় ক্লিনিকে যাচ্ছেন – এই খবরে মন ভালো হলেও প্রশ্ন জাগে ক্লিনিকে যে যত্ন আত্তি পাচ্ছেন তাঁরা,তা কি পর্যাপ্ত এবং গুণগত উৎকর্ষতার বিচারে সর্বোত্তম?
এই কাজটি কিন্তু মনগড়াভাবে করা হয়নি বরং বলা যায় রীতিমতো ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের নির্দিষ্ট সমীক্ষা রূপরেখাকে অনুসরণ করে তৈরি ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভের নিয়ম বিধির অনুসরণে ( NFHS – 5 ,2019- 2021)। এই বিধিতে প্রসূতিদের শারীরিক পরিস্থিতি সংক্রান্ত মোট সাতটি বিষয়ে পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে , যেমন: প্রসূতিদের ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা, রক্তের নমুনা পরীক্ষা, মূত্রের নমুনা পরীক্ষা, টিটেনাস টক্সয়েড ভ্যাকসিনেশন, আয়রন – ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্টেশনের ব্যবস্থা করা, ওজন পরীক্ষা করা এবং এইসব পরীক্ষা নিরীক্ষার ভিত্তিতে সঠিক পরামর্শ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। সংশ্লিষ্ট গবেষকরা খোঁজ খবর করে জানতে চেয়েছেন যে ক্লিনিকে আগত প্রসূতিদের প্রস্তাবিত সাত দফা প্রাক্ প্রসব পরীক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কমপক্ষে পাঁচটির সুযোগ পাচ্ছেন কি না?
সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে তাঁরা জানিয়েছেন যে জাতীয় স্তরে প্রতি ১০ জন মহিলার মধ্যে ৯ জনই এই নুন্যতম স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে এই চিত্র রাজ্যওয়ারি হিসেবনিকেশকে প্রতিফলিত করছে না অর্থাৎ রাজ্যে রাজ্যে এই সরকারি স্বাস্থ্য পরিচর্যার হাল হকিকত সমান নয়, ভৌগোলিক অসঙ্গতি রয়েছে।
দেশের অনেক এলাকাতেই ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে antenatal care ( Q – ANC) ব্যবস্থার আওতায় সমস্ত গর্ভবতী মহিলাদের আনা সম্ভব হয়নি। এই প্রাকৃতিক অসুবিধাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই এখনও অনতিক্রম্য রয়েগেছে ফলে অনেক মহিলাই এই স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ গ্রহণ করতে পারছেন না। সমীক্ষকরা দেশের ১৫৬ টি জেলাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন যেখানে গর্ভবতী মহিলারা Q – ANC এর সুবিধা উপভোগ করতে পারছেন যথাযথভাবে। এই জেলাগুলোর সংলগ্ন এলাকাতে এই সুবিধা উচ্চ হারে পাচ্ছেন মহিলারা। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া গেছে সন্তোষজনকভাবে। দক্ষিণী রাজ্য কেরলম, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং আমাদের ঘরের পাশের ওড়িশা – এই রাজ্যগুলোর ৮৫ % বেশি এলাকায় বসবাসরত গর্ভবতী মহিলাদের কাছে এই সুযোগ সুবিধাগুলো পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে দেশের ৮৮ টি জেলাকে কোল্ড স্পট বা অনগ্রসর জেলা হিসেবে নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলাবাহুল্য এদের ঘিরে থাকা জেলাগুলোতেও এই পরিষেবার সুযোগ সুবিধা এখনও সন্তোষজনক নয়। এমন পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ এবং নাগাল্যান্ড। প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতিবন্ধকতার কারণে এই পিছিয়ে পড়া বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। এমন আঞ্চলিক অসমতার পাশাপাশি অন্ত আঞ্চলিক বৈষম্যও রয়েছে লক্ষণীয়ভাবে। এই অসাম্য দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন সকলেই।
তথ্যসূত্র: ডাউন টু আর্থ পত্রিকা।












