বিষাদময় দুর্গোৎসবের শেষে প্রশ্ন অনেক, জবাবদিহি কোথায়?
সম্ভবত সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বিষাদময় দুর্গোৎসবের শেষদিন আজ, বিজয়া দশমী। ষষ্ঠী শুরু হয়েছিল সন্দীপ ঘোষের জামিন দিয়ে, সপ্তমীতে ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা, পুজো জুড়ে বইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আর গতকাল এমন এক ঘটনা দেখলাম, যাতে আমরা স্তম্ভিত।
বিরূপাক্ষ বিশ্বাস! তৃণমূল সরকারের আমলে গড়ে ওঠা থ্রেট কালচারের অন্যতম কিংপিন, বর্তমানে সাসপেন্ডেড। কিন্তু বর্তমান শাসকের স্নেহধন্য হয়ে থাকার কৌশল সে কি জেনে নিয়েছে, এই প্রশ্ন তো থেকেই যাচ্ছে।
চোরবাগানের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা করার পর তাঁদের অ্যাপোলো হাসপাতালে রেফার ও স্থানান্তরের পরে যে জুনিয়র ডাক্তারেরা সংবাদমাধ্যমের সামনে সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোগত অভাব ও নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছিলেন, বিরূপাক্ষ বিশ্বাস সেই চিকিৎসকদেরই প্রকাশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘নরকের কীট’ আখ্যা দিয়ে সুযোগ বুঝে পি*টিয়ে বের করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন!
যাঁরা বিপর্যয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আহতদের চিকিৎসা করলেন, তাঁদেরই আজ হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অভাব-অভিযোগ তুলে ধরার অপরাধে যদি চিকিৎসকদের এভাবে নিশানা করা হয়, তাহলে এই ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে কথা বলবেন কে?
WBJDF আইনি ও সর্বতোভাবে এই জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে রয়েছে। বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং আমরা তাতে আইনি সহায়তা করেছি। এখন দেখার, পুরনো সরকারের থ্রেট কালচারের এই পোস্টার বয়ের প্রকাশ্য পি*টিয়ে মারার হুমকির বিরুদ্ধে নতুন সরকারের পুলিশ কী পদক্ষেপ করে। আমরা নজর রাখব।
শুধু এই ঘটনাই নয়, বেশ কয়েকজন জুনিয়র ডাক্তারের বাড়িতে স্থানীয় শাসকদলের গুন্ডারা গিয়ে সাবধানে থাকার কথা বলে কার্যত হুমকি দিয়ে এসেছে। WBJDF স্পষ্ট জানাচ্ছে, থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে আমরা তাঁদের পাশে আছি। যে কোনও সমস্যায় সবরকম সহযোগিতা করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।
কিন্তু চিকিৎসকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
সরকারের দৃষ্টি আমরা আবারও আকর্ষণ করতে চাই, আগেও বারবার করেছি, ভবিষ্যতেও করব। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রত্যেক মানুষের সুচিকিৎসা পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এটি সরকারের অনুগ্রহ নয়, মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন।
সরকার জানিয়েছে, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও চিকিৎসক নিয়োগে দু’বছর সময় লাগবে। কিন্তু চিকিৎসক নিয়োগে দু’বছর কেন লাগবে, সেটাই এক বড় রহস্য! দু’বছর পরে নির্বাচন রয়েছে, সেটি কি এর অন্যতম কারণ? আগের সরকারও নির্বাচনের আগে কিছু নিয়োগ করে উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। কিন্তু সাধারণ মানুষ বিজ্ঞাপন আর বাস্তবের ফারাক বোঝেন।
চিকিৎসক নিয়োগকে নির্বাচনী চমক হিসেবে ব্যবহার না করে নিয়মিত, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়া হিসেবে চালু করতে হবে। আর নারায়ণ স্বরূপ নিগমকে পাশে বসিয়ে রেখে সেই কাজের আশা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। ওনাকে স্বপদে বহাল রেখে দু’বছর কেন, কুড়ি বছরেও যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না, সেই আশঙ্কার কারণ কারও অজানা নয়। ব্যতিক্রম সম্ভবত বর্তমান সরকারই।
দু’বছরের পরিকল্পনা পরে হোক, সরকারি হাসপাতালের ন্যূনতম পরিষেবাটুকু এখনই নিশ্চিত করুন।
গত পাঁচ মাসে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন করে যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর অভাব দেখা দিয়েছে, তা দ্রুত পূরণ করতে হবে। ট্রমা সেন্টার তৈরি করতে দু’বছর লাগলে লাগুক, কিন্তু পুরনো সরকার প্রবল দুর্নীতি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জন্য যে ন্যূনতম পরিষেবাটুকু চালু রেখেছিল, তার থেকেও যেন অবনতি না হয়, তা এক্ষুনি নিশ্চিত করতে হবে।
স্যালাইন, অ্যান্টিবায়োটিক, সার্জারির সেলাইয়ের সামগ্রী, প্রাথমিক স্তরের সমস্ত জরুরি ওষুধ, প্রাথমিক কেমোথেরাপির ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী, সবকিছুর দ্রুত সরবরাহ চাই। এগুলি কোনও বিলাসিতা নয়, চিকিৎসার ন্যূনতম প্রয়োজন।
সেদিন যে জুনিয়র ভাইবোনেরা সাহসের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অভাবের কথা বলেছিলেন, তাঁরা কেন বলেছিলেন, সেটাও বোঝা জরুরি। তাঁরা শুধু নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে বলেননি, আসলে রোগীদের স্বার্থে বলেছেন। কারণ তাঁরা জানেন, সংবাদমাধ্যমের ভাষায় কোনও একটি ‘হাই ভোল্টেজ’ দুর্ঘটনার সময় প্রশাসন তৎপর হয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেও, পরবর্তী দুর্ঘটনার সময় আহত রোগীরা জরুরি বিভাগে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে পাবেন না। প্রত্যেক রোগীকে অ্যাপোলোতে পাঠানোর ব্যবস্থাও হবে না।
তখন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, সরঞ্জাম ও পরিকাঠামো না পেয়ে রোগীর পরিজনদের ক্ষোভ গিয়ে পড়তে পারে সেই জুনিয়র ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপরই। অথচ তাঁরা যদি আগাম সেই অভাবের কথা তুলে ধরেন, তাঁদেরই হুমকি, অপমান ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মুখে পড়তে হয়। এই বাস্তবতা না বুঝলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়।
সরকারের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি: প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করা হোক। গঠনমূলক সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখাই উচিত ৷ চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, নিয়োগে স্বচ্ছতা এনে, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক করে এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।
সমালোচনার জবাব হুমকি দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে দিতে হয়। আর সরকারি হাসপাতালের ত্রুটি তুলে ধরা চিকিৎসকদের অপরাধ নয়। বরং তাঁদের বক্তব্য শোনা ও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই সরকারের দায়িত্ব।
এই বিজয়া দশমীতে তাই শুধু বিষাদ নয়, জবাবদিহির দাবিও থাকুক। WBJDF জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে থাকবে, থ্রেট কালচারের বিরুদ্ধে লড়বে এবং মানুষের সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার অধিকার রক্ষার প্রশ্নে আপস করবে না।










