গতকাল রাত এগারোটা পঞ্চাশে দিল্লি স্টেশন থেকে উঠেছিলাম ‘ত্রিপুরা সুন্দরী’ ট্রেনে। গন্তব্য: নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। পাঁচজন আমরা আসছি। আজ রাত ( ১০/০৩/’২৬) এগারোটা নাগাদ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন পৌঁছানোর কথা থাকলেও, পৌঁছোবে না। পৌঁছোতে পৌঁছোতে রাত দুটো বেজে যাবে। তারপর আবার ওখান থেকে জলপাইগুড়ি শহরে যাওয়া… সেও ঘন্টা দেড়েক লেগে যাবে। একেবারে ব্রহ্ম মুহূর্তে জলপাইগুড়ি পৌঁছাবো।
আমাদের টিকিট তিন ধাপের বাতানুকূল কামরায় থাকলেও এখন কামরাটা প্রকৃত পক্ষে এক নরক কুন্ডে পরিণত হয়েছে। কাটিহার থেকে ছেড়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমাদের কামরার চারটি শৌচাগারের অবস্থা এক কথায় দুর্বিসহ! তারমধ্যে একটি শৌচাগারের দরজা কোনো ভাবেই আটকায় না। গোটা কামরা জুড়ে ‘এমোনিয়া’-র ঝাঁঝালো এক বিকট গন্ধ লেগে আছে। শৌচাগারের এরকম হতশ্রী অবস্থা বারবার আমরা টিকিট পরীক্ষক, কামরা তত্ত্বাবধায়ক – কাউকে বলেও কিছু করতে পারি নি। রাগ, ক্ষোভ এখন অনেকটাই দ্রবীভূত। এরকমটাই স্বাভাবিক তা ধরে নিয়ে ধাতস্থ হয়ে গেছি!
অভয়া মঞ্চের উদ্যোগে অভয়া’র ন্যায়বিচারের দাবী, লিঙ্গবৈষম্যের দূরীকরণ, থ্রেট কালচারের অবসানের জন্য যন্তরমন্তরে অবস্থান ও সুপ্রীম কোর্টের মহামান্য প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি প্রেরণ করতে আমরা জলপাইগুড়ি অভয়া মঞ্চের পক্ষ থেকে গিয়েছিলাম।
এই ট্রেন যাত্রার দুর্ভোগ, বিরক্তি, ক্লান্তির মাঝেও এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার স্বাক্ষী হলাম। এই অভিজ্ঞতার অনুপুঙ্খ বিবরণ এত কষ্টের মাঝেও এক অপূর্ব পাওয়া বলে মনে করি।
এবার আসা যাক মূল আখ্যানে।
আমাদের পাঁচজনের আসন বিন্যাসটা এরকম – দুজনের লোয়ার, একজনের মিডল, একজনের সাইড লোয়ার ও আরেকজনের সাইড আপার। পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের এক জায়গায় আর দুই জনের আরেক জায়গায়। আমাদের তিনজন যেখানে আছি সেখানে আপারের দুই জনের সাথে বেশি কথা হচ্ছে না। তবে আরেকজন যার নাম “মনসুর হোসেন”; ওর সাথে বেশ ভাব হয়েছে।
এবার মনসুরের একটু পরিচয় দেই। ওর বাড়ি আসামের বরাক উপত্যকার বাংলাদেশ সীমান্ত বর্তী করিমগঞ্জ শহরে। মনসুর ওর বাবা – মা এর চতুর্থ সন্তান। ওর উপরে তিন, নিচে এক জন আছে। খুব সুন্দর দেখতে মনসুর । পরণে সাদা পাজামা, হাঁটু পর্যন্ত প্রলম্বিত পাঞ্জাবি। মাথার চুল ছোটো করে ছাঁটা। মুখের থুতনিতে বেশ গোছা দাড়ি।
মনসুর উত্তরপ্রদেশের ‘দেওবন্দ মাদ্রাসা’ তে ইসলামী ধর্ম শিক্ষা পড়ছে। কঠিন-কঠোর ধর্মীয় শিক্ষার অনুশাসনে মনসুর সম্পৃক্ত। ওর হাতে সম্পূর্ণ উর্দুতে লেখা একটি বই, ও পড়ছে মাঝে মাঝে। ওর সাথে একটা, দুটো কথা বলতে বলতে আমাদের সখ্যতা তৈরী হয়ে গেছে।
ট্রেনে যেতে যেতে মনসুর রোজা পালন করছে, গোটা দিন জল পর্যন্ত খায় নি। এক্কেবারে ভোরবেলা মনসুরকে দেখি ট্রেনের মেঝেতে ‘মুসাল্লা’ (নামাজ পড়বার জন্য শতরঞ্চি ধরনের বসবার আসন) পেতে ফজরের নামাজ পড়ছে একেবারে নীরবে। নামাজ পড়া শেষ করে ও আমাকে বলে করিমগঞ্জের কথ্য সিলেটি ভাষায়, “আপনার অসুবিধা হচ্ছে না তো?” আমি হেসেই জবাব দিলা : “অসুবিধার কি আছে?” এইভাবে মনসুর পাঁচবার নামাজ পড়ছে। পবিত্র মক্কা শরীফের ভৌগোলিক অবস্থান জানবার জন্য ও কম্পাস দিয়ে দেখে নিয়ে সেই অনুযায়ী নামাজ পড়ছে। ট্রেনের মধ্যেই ও আমাদেরকে সাথী করে রোজা ভাঙলো, ইফতারও হলো।
মনসুরের সাথে হরেক রকমের কথা আমাদের হলো। ওর সাথে কিভাবে যে আমরা অন্তরঙ্গ হয়ে গেলাম, তা নিজেরাই জানি না।
ওকে আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কেন দেওবন্দের মাদ্রাসায় পড়ছো?” ওর বিনম্র অথচ স্পষ্ট জবাব – “গ্রামের মসজিদের মৌলবী হবো জন্য ইসলাম ধর্ম পড়ছি।” সমস্ত পড়াশোনা ও উর্দুতে পড়ছে। মনসুর বলে, ইসলাম ধর্ম টা জানার ইচ্ছে ওর ছোটো বেলা থেকেই। ওর বাড়ি সহ কেউই ওকে বলেন নি মৌলবী বা ইমাম হতে ।
মনসুর আমাদের সামনে বলে, একেবারে ছোটো বেলা থেকেই ও ‘কোরান’ ও শরিয়ৎ এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানার আগ্ৰহ থেকেই ওর এই পড়াশোনা। কয়েকদিনের জন্য ও বাড়িতে যাচ্ছে রমজান মাসের জন্য। কষ্ট না করলে, চেষ্টা না করলে তো আল্লাহ-র স্বরূপ রহস্য জানা যাবে না!
ওকে আমি বললাম, এত কষ্ট করে শরীরকে কষ্ট দিয়ে ধর্ম করার কি দরকার? মনসুর বলে, কষ্ট না করলে তো ঈশ্বরের সন্ধান পাওয়া যাবে না! এই মতবাদের সম্পূর্ণ বিরোধী অবস্থানে থেকে আমি মনসুর কে বলি, “মনসুর, তুমি এটা পড়া শেষ করে প্রথাগত শিক্ষায় আসবে।” ও ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানায় আমার কথায়।
দেওবন্দ মাদ্রাসায় মনসুর উর্দুতে কথা বলে, ওর মাতৃভাষা বাংলা শিখবার কোনও উপায় নেই! মনসুরের কাছে ওর মাতৃভাষা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। মনসুরের সাথে ধর্ম নিয়ে, ধর্মের রীতি-নীতি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলো খুব খোলামেলা ভাবেই । করিমগঞ্জ শহরে ওর বাড়ির আশেপাশে থাকা হিন্দু পরিবার গুলোর সাথে ওদের সম্পর্ক কিরকম জানতে চাইলাম। মনসুর অকপটে সব বলতে থাকলো!
সব মানুষের মঙ্গল সাধন, মানুষের ইহলৌকিক জীবনের আধ্যাত্মিক বিকাশ সাধন করবার জন্য ও ভবিষ্যতে কাজ করবে। ওকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “দাঙ্গা কেন হয়?” মনসুর উত্তর দেয়, “আমি, আপনি, আপনারা চাই বলেই দাঙ্গা হয়!”
রাতে শোওয়ার সময়, তিন ধাপের মধ্যিখানের শোওয়ার তক্তাপোষ মনসুর উঠিয়ে লাগিয়ে দিলো। আমি লোয়ার বার্থে ঢুকে যাওয়ার পর নীল আলো- আঁধারিতে ভুল করে গায়ে দেওয়ার চাদরটি খুলে গায়ে দেই নি। আমি মনসুরকে বললাম, “মনসুর চাদরটি খুলে দেবে?” মনসুরকে এই কথাটি বলতে আমার কোনো জড়তা আসে নি, কোনো দ্বিধা আসে নি। মনসুর আমার গোটা দেহে চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়। মনসুর বলে, “পানির বোতলটা আছে সাথে?”
ও যখন বলে, দিল্লি কেন এসেছেন আপনারা? অভয়া’র পুরো ঘটনা ওকে আমরা বলি। মনসুর পুরো ঘটনাটি মন দিয়ে শুনে বলে, “আপনারা ভালো মানুষ।” আমি ওকে বলি, “তুমি ভালো বলেই , আমাদের ভালো বলছো।”
মনসুর আমাদের সকলকেই বলে, এন জি পি স্টেশন আসলে, আমরা যখন নামবো, তখন ওকে ডেকে দিতে। মনসুর এন জে পি স্টেশনে নেমে রোজা শুরুর আগের খাওয়া-দাওয়ার জন্য কিছু কিনবে।
মনসুর, ভবিষ্যতে মৌলবী হবে, মৌলবী হয়ে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে প্রকৃত ইসলামের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে তাঁদের মানবিক উত্তরণ ঘটাতে পারবে কি না, জানি না। উত্তরপূর্বের আসামের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামের কোনো মসজিদের ইমাম/মৌলবী হয়ে মনসুর মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করবে না বিভেদের উপাদান হিসেবে কাজ করবে তার উত্তর অনাগত সময়ের গর্ভে।
যে সুন্দর মানবিক গুণ সম্পন্ন ‘মনসুর’ কে আজ খূঁজে পেলাম, তাকে মনে হয় ঈশ্বর ও আল্লাহ শলা-পরামর্শ করেই আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন!
মনসুর ঘুমিয়ে পড়েছে । ওকে আমাদের ডেকে দিতে হবে। সুন্দর মনের মনসুর আমাদের মনে বেঁচে থাকবে অনেক দিন।










