গত দেড় দশকে রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা হাল ঠিক কীরকম তা নিয়ে লিখতে বসে বেজায় ধন্দে পড়েছি। কী লিখব? কীসের ভিত্তিতে লিখব? দশ বছর বাদে বাদে যে সেনসাস হয়, ২০২১ সালে তা হওয়ার কথা ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার সেদিকে যাননি – সেনসাস হয়নি। এবছর সেনসাস হওয়ার কথা – তথ্যাদি সামনে আসতে আসতে আরও বছরতিনেক – ততদিন অব্দি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য (অন্তত আপাতদৃষ্টিতে) তথ্য পাওয়া মুশকিল। মাঝে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে হয়েছে বটে, কিন্তু স্যাম্পলিং-নির্ভর তথ্যের সঙ্গে সেনসাস-এর সামগ্রিক তথ্যভাণ্ডার গুণগত মানের প্রভেদ রয়েছে – তদুপরি সর্বশেষ ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-র তথ্যসংগ্রহের ধরন নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে, অ্যাকাডেমিক পত্রপত্রিকায় সেসব খামতি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। তবু, অন্তত কিছু তথ্য ছাড়া এধরনের লেখা নামিয়ে বসাটা অনুচিত। কিন্তু যে রাজ্যে উত্তরোত্তর স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ে, কিশোরী-বিবাহের সংখ্যা বাড়ে, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভবতী মায়েদের সংখ্যা বাড়ে – অথচ তথ্যচয়নে অত্যন্ত দক্ষ আমলাদের হাতের অতিদক্ষ কারিকুরির চোটে কিশোরী-কল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্য জাতীয় স্তর ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পায় – সেখানে শুধুমাত্র জনসমক্ষে প্রকাশিত তথ্যের উপর ভরসা করা মুশকিল। সুতরাং, পরিস্থিতির সামগ্রিক বিচারে তথ্যের পাশাপাশি অভিজ্ঞতা ও কাণ্ডজ্ঞানের ব্যবহারও জরুরি। এ লেখা, অতএব, সেভাবেই লিখছি।
একটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল খাঁচা তৈরি হয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে – বড়সড় বিল্ডিং, সে নীল-সাদা-ই হোক বা অন্য কোনও রঙের, সেসব, জরুরি হলেও, পরবর্তী ধাপ। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পর্যাপ্ত সংখ্যক চিকিৎসক পাওয়া যেত না, এই আক্ষেপ রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের মুখে কৈশোরাবধি শুনে এসেছি। কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তার একটা কারণ হতে পারে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যোগদানের ব্যাপারে চিকিৎসকদের অনীহা। আরেকটা কারণ হতে পারে, দেশে যতজন চিকিৎসক থাকা উচিত, তার চাইতে কম রয়েছেন, অর্থাৎ মোট সংখ্যাগত অপ্রতুলতা। কিন্তু চিকিৎসকের সংখ্যা অনেকখানি বাড়িয়ে ফেলা গেলে দুটি দিক থেকেই সমস্যা মেটে – কেননা সংখ্যায় প্রচুর চিকিৎসক তৈরি করা গেলে, শতাংশের হিসেবে তার বড় অংশ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যোগদানে অনাগ্রহী হলেও, যোগদানে আগ্রহী চিকিৎসকের সংখ্যায় কমতি হয় না। সেদিক থেকে গত পনের বছরে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই অত্যন্ত সফল। দেশে বছর বছর লক্ষাধিক ডাক্তার তৈরি হচ্ছে – রাজ্যে কয়েক হাজার (নির্দিষ্ট করে সংখ্যা বলা গেল না, কেননা সংখ্যাটা প্রতি বছরই বাড়ছে – তবে রাজ্যে এমবিবিএস আসনের সংখ্যা, এই মুহূর্তে, সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি তো বটেই)। স্বাধীনতার পরের পঁয়ষট্টি বছরে এই রাজ্যে যতগুলো মেডিকেল কলেজ তৈরি হয়েছিল, গত এক দশকে তৈরি হয়েছে তার কয়েকগুণ – আপাতত সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে এই রাজ্যে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা চল্লিশটিরও বেশি। সুতরাং, রাজ্যে চিকিৎসকের আকাল, এমন বলার সুযোগ আর নেই। যদিও নেতা-মন্ত্রীরা, এখনও, প্রায়শই, সম্ভবত অভ্যাসবশত, বলে থাকেন যে ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চান না – অন্তত এই সময়ে দাঁড়িয়ে, কথাটা সর্বৈব মিথ্যা। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ছাড়াই একের পর এক মেডিকেল কলেজ তৈরি করে – রাতারাতি গজিয়ে ওঠা সেসব মেডিকেল কলেজের সীমিত ও অনুপযুক্ত পরিকাঠামোয় বছর বছর ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি করে – পরীক্ষাব্যবস্থায় ঢালাই দুর্নীতির অবকাশ রেখে (এই দুর্নীতি নিয়ে আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি, কিন্তু অভয়া কাণ্ডের সময় রাজ্যের স্বাস্থ্যশিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতির ছবিটা প্রকাশ্যে এসেছে) – খাপছাড়া ও অসম্পূর্ণ ট্রেনিং দিয়ে বছর বছর অজস্র চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে, যারা যেকোনও মূল্যে যেকোনও জায়গায় চাকরি করতে যেতে তৈরি, বা তৈরি থাকতে বাধ্য।
এমন বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে – এবং তাল মিলিয়ে বেড়ে চলেছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যাও – গত কয়েক বছরে এমডি আসনের বৃদ্ধির সংখ্যাটি আরও চমকপ্রদ (ইদানীং এমডি আসন এতই বেশি যে সব আসন ভর্তি অব্দি হচ্ছে না – আসন ভর্তি না হওয়ায় পোস্ট-গ্রাজুয়েট মেডিকেল এন্ট্রান্স পরীক্ষার কাট-অফ মার্কস শূন্যের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে – কেন্দ্রের সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পরীক্ষায় যারা মাইনাস চল্লিশ পেয়েছে, এবারে তারাও এমডি পড়তে পারবে) – আরেকদিকে রাজ্যের আমজনতার আর্থিক অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ডাক্তারি ডিগ্রি ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করে সংসার চালানো উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে যাচ্ছে – সবমিলিয়ে পরিস্থিতি এমন যাতে এমনকি যোগ্য ও দক্ষ চিকিৎসকরাও চাকরির নিরাপত্তা খুঁজছেন, আর যারা এই বর্তমান ‘ব্যবস্থা’-র সুযোগে তালেগোলে ডাক্তার হয়ে পড়ল তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য। অতএব, সরকারি চাকরিতে ঢোকার জন্য অত্যাবশ্যক যে হাউসস্টাফশিপ, সেখানে কুড়িটা আসনের জন্য চার-পাঁচশ আবেদন জমা হচ্ছে। একেবারেই গ্রামেগঞ্জে ডাক্তারির জন্য যে মেডিকেল অফিসারের চাকরি – কয়েক বছর বাদে বাদে সে চাকরিতে নিয়োগের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হলে বারোশো আসনের জন্য সাড়ে আট হাজার চিকিৎসক আবেদন করেন, যাঁদের বড় অংশই ‘স্পেশালিস্ট’। সুতরাং গ্রামে যাবার ব্যাপারে চিকিৎসকদের অনাগ্রহের পরিবর্তে একেবারে উদগ্র ব্যাকুলতা প্রকাশের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে – অথচ এরপরেও সরকার তথা নেতারা বলে চলবেন যে ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চায় না!
স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের অবস্থাও তথৈবচ। বিপুল সংখ্যক শূন্যপদ থাকলেও স্থায়ী পদে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ উত্তরোত্তর বিরল হয়ে উঠেছে। মোটামুটি চুক্তিভিত্তিক কর্মী দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে কাজ চলছে। এছাড়া নতুন নতুন মেডিকেল কলেজে নিত্যনতুন টেকনিশিয়ান কোর্স খুলে সেখানে যাঁরা ট্রেনিং নিতে আসছেন, তাঁদের দিয়েই স্থায়ী কর্মীদের কাজ করানো হচ্ছে। ঠিক যেমন করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ না করে সদ্য পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন পাস করা চিকিৎসকদের বন্ডের মাধ্যমে বাড়তি রেসিডেন্সি/ট্রেনিং-এর মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব পূরণ হচ্ছে, এ-ও প্রায় তেমনই।
এককথায় বলতে গেলে, নিত্যনতুন বিল্ডিং তৈরি করা বা নিত্যনতুন যন্ত্রপাতি কেনার ব্যাপারে সরকারবাহাদুর যতখানি আগ্রহী (আর কেনাকাটা বা নির্মাণের কন্ট্র্যাক্ট দেবার ব্যাপারে সরকারের অত্যুৎসাহ তথা বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রহের পেছনে রহস্য যে ঠিক কী, তা বর্তমান সরকারের কার্যপদ্ধতি বিষয়ে যাঁরা তিলমাত্র অবগত, তাঁরা অবশ্যই জানেন – সুতরাং বিশদ ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না), সেই বিল্ডিং-এ চিকিৎসার কাজটা যাঁরা করবেন বা সেই যন্ত্র যাঁরা রোগী-পরিষেবার কাজে ব্যবহার করবেন, অর্থাৎ চিকিৎসক টেকনিশিয়ান স্বাস্থ্যকর্মী, এককথায় ম্যানপাওয়ার বা হিউম্যান রিসোর্স, অর্থাৎ এমন নিয়োগ যাঁদের মাসে মাসে বেতন দিতে হয়, তেমন ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত আগ্রহাতিশয্যের ভগ্নাংশও দেখা যায় না।
এমতাবস্থায়, প্রতি ধাপে উপযুক্ত সংখ্যক যোগ্য চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী না থাকার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে, স্বাস্থ্যপরিষেবাই বলুন বা জনস্বাস্থ্য, কোনোটিই ঠিকভাবে চলতে পারে না, চলছেও না। এটুকু অনস্বীকার্য যে ইঁট-কাঠ-বালি-সিমেন্টের যে কাঠামো, অথবা হাসপাতালে যন্ত্রপাতির উপস্থিতি – দুই দিক থেকেই বর্তমান সরকারের আমলে খুব বিশেষ কমতি নেই। তারপরও, হিউম্যান রিসোর্স নিয়োগের অভাবে রাজ্যের স্বাস্থ্য পেছনপানে এগিয়ে চলেছে। মুশকিল হলো, স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচক এমনই যে, ভালো কিংবা খারাপ কোনও বদলই তাতে রাতারাতি প্রতিফলিত হয় না। দশকব্যাপী লাগাতার প্রয়াস (বা লাগাতার অবহেলা) ভিন্ন সূচকে উন্নতির (বা অবনতি) প্রতিফলন ঘটে না। আবারও মনে করিয়ে দিই, ২০২১ সালে সেনসাস না হওয়ায় সাম্প্রতিককালের নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই – ২০২৬-এর সেনসাসের পর তথ্য সাজিয়ে-গুছিয়ে সামনে আসতে আসতে হয়ত ২০২৮-২৯ হয়ে যাবে, আশঙ্কা হয় যে তখন আমরা রাজ্যের স্বাস্থ্যের বেহাল দশা একেবারে স্পষ্ট করে দেখতে পাব। কেননা, মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সূত্রে যেসব তথ্য ভেসে আসে, তাতে খারাপ ছাড়া ভালো কিছু আশা করার সুযোগ বিশেষ নেই।
যেমন ধরুন, গত বছরে দেশের রেজিস্ট্রার জেনারেল যে তালিকা প্রকাশ করেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রসূতি-মৃত্যুর হারে আমাদের রাজ্যের অবস্থান জাতীয় গড়ের চাইতে ঢের খারাপ। প্রতি এক লক্ষ শিশুজন্মে মাতৃমৃত্যুর হার, এই রাজ্যে ১০৪, যেখানে জাতীয় গড় ৮৮ – ঝাড়খণ্ড হরিয়ানা উত্তরাখণ্ড সবাই আমাদের আগে – আপাতত আমরা বিহারের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় আছি। এই তথ্য জানাজানি হওয়ার পর স্বাস্থ্যভবনের বড়কর্তারা নড়েচড়ে বসেছেন – মাতৃমৃত্যুর হার কমানোর জন্য বিভিন্ন রকম উদ্যোগ নিচ্ছেন, হাসপাতালে হাসপাতালে দেখভাল কঠোরতর হয়েছে – কিন্তু গাছের গোড়ার দিকে নজর না দিয়ে শুধু আগায় জলের ছিটে দিলে কাজ হবে কী?
বেশ কয়েক বছর ধরেই এই রাজ্যে কিশোরী-বিবাহ বাড়ছে, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে, প্রত্যাশিতভাবেই, বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়স্কা মায়েদের সংখ্যা। অপুষ্ট ও অপরিণত দেহে সন্তানের জন্ম দিতে হলে মাতৃমৃত্যু এবং সদ্যোজাত-মৃত্যু, দুইই যে বাড়বে, এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে কি? এবং বছর বছর স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়তে থাকলে, একের পর এক সরকারি ইশকুল বন্ধ হতে থাকলে, অপ্রাপ্তবয়স্ক-বিবাহের সংখ্যা যে বাড়বে, তাতেও অবাক হওয়ার কারণ আছে কি? এবং শিক্ষার শেষে কর্মসংস্থান তো দূর, কর্মসংস্থানের অতিদূর সম্ভাবনাটুকুও না থাকলে, দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যে ইশকুলে যেতে বা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী হবে না – এটুকু আন্দাজ করতে পারার জন্য নিশ্চয়ই রকেট সায়েন্স বোঝার প্রয়োজন পড়ে না? স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, দুটো বিষয় এতখানিই পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে একটি যখন ভগ্নস্তূপ, তখন অপরটি হর্ম্যসম হতে পারে না – আর রাজ্যের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার হাল যে ঠিক কীরকম, সে নিয়ে আদ্যন্ত সরকারপন্থীরাও ঢোঁক না গিলে উত্তর দিতে পারবেন না।
কিন্তু পূর্বোক্ত সত্যের পাশাপাশি আরও একটি অপ্রিয় সত্যি হলো – অন্যান্য অনেক তথ্যের মতোই, এই রাজ্যে কিশোরী-বিবাহ এবং অপ্রাপ্তবয়স্কা প্রসূতির সংখ্যা ঠিক কত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও সঠিক পরিসংখ্যান, অনুমান করা যায়, স্বাস্থ্যভবনের বড়কর্তাদের কাছে নেই। নেই কেননা, সরকারবাহাদুর এমন চমৎকার প্রশাসনিক বন্দোবস্ত নির্মাণ করেছেন যা জলের মতো – সর্বদাই নিম্নগামী। মুখ্যমন্ত্রী শীর্ষ আমলাদের ধমকান, শীর্ষ আমলা মেজ আমলাদের, মেজ আমলা সেজ-দের – এমনি করে নামতে নামতে স্বাস্থ্যভবনের হর্তাকর্তারা হাসপাতালের স্থানীয় প্রশাসকদের এমন চমকে রাখেন যে সকলেই উপরমহলকে তুষ্ট করতে শশব্যস্ত হয়ে থাকেন, ধমকানি খাওয়ার ভয়ে কেউই উপরতলায় সমস্যার কথা জানান না।
একটা অদ্ভুত ঘটনা বলি। গ্রামের একটি মেয়ে গলায় দড়ি দিয়েছে। পনের-ষোলো বছরের মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামে – সেখানে থাকতে না পেরে মেয়েটি বাপের বাড়ি ফিরে এসেছিল। বাপের বাড়িতেও ওই কারণে গঞ্জনা শুনতে হতো। মেয়েটি উত্তরোত্তর বিষণ্ণ হয়ে পড়ছিল। তারপর আত্মহত্যা। কিন্তু এই আত্মহত্যায় বিপদে পড়লেন কে জানেন? মেয়েটির বাপ-মা বা তার স্বামী কিংবা তার ছেড়ে আসা শ্বশুরবাড়ির লোকজন? না। বিপদে পড়লেন স্থানীয় বিডিও। কেননা, তিনি গত কয়েক বছর ধরে ওই অঞ্চলে কিশোরী-বিবাহের হার শূন্যে নেমে এসেছে এমন রিপোর্ট পাঠাচ্ছিলেন – এখন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও পুলিশ রিপোর্টে এই বিয়ের কথা লিপিবদ্ধ থাকায় তাঁর এতদিন যাবত চালিয়ে আসা রিপোর্ট যে মিথ্যে তা প্রমাণ হয়ে গেল।
তো ওই বিডিও-র মতো করেই, উপরমহলকে তুষ্ট রাখার অদম্য তাড়নায়, হাসপাতালের প্রশাসকরা সচরাচর কিশোরী-মায়েদের ব্যাপারে উপরমহলে রিপোর্ট করেন না, যদিও এবিষয়ে নিয়মিত রিপোর্ট পাঠানোর কথা। এই প্রসঙ্গ নিয়ে অনেকক্ষণ কথা বলে ফেললাম, কেননা এই কিশোরী-বিবাহ এবং কিশোরী-মাতৃত্বের সংখ্যা চেপে যাওয়াটা একটি উদাহরণ মাত্র – স্বাস্থ্যের প্রতি ক্ষেত্রেই, পাছে উপরমহল চটে যান এই ভয়ে, হাসপাতালে কাজ করার সুবাদে নিত্যদিন দেখতে পাওয়া এবং হাসপাতালের একান্ত নিজস্ব বাস্তব সমস্যাগুলো হাসপাতালের চিকিৎসক বা স্থানীয় চিকিৎসক-প্রশাসকরা রিপোর্ট করেন না – ঠিক যেমন করে ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বা মৃত্যুর সংখ্যা চেপে যাওয়া হয়, তেমনই। কদাচিত কোনও চরম পরিস্থিতিতে সত্যিটা সামনে এসে পড়লে হইচই পড়ে – এবং তখন ধামাচাপা দেবার দায়িত্বটা ন্যস্ত হয় উচ্চস্তরের আমলাদের উপর। সুতরাং, লেখার একেবারে শুরুতে যেকথা বললাম, যেহেতু তথ্য ও সত্যের বিকৃতি প্রতিটি ধাপেই ঘটে চলেছে, সঙ্কটের সঠিক রূপ স্রেফ তথ্য ঘেঁটে বুঝতে পারা মুশকিল।
একদিকে উপরমহলের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য নেই – এবং সমস্যা না জানা থাকলে সমাধানের জন্য নড়েচড়ে বসার চাপও নেই – আরেকদিকে তথ্য যেটুকু রয়েছে, সেটুকু তথ্য সর্বসমক্ষে আনার চেষ্টাটুকুও নেই। ২০১৮ সাল থেকেই রাজ্য সরকার স্বাস্থ্যবিষয়ক সামগ্রিক তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছে (একই ধরনের কাজ করেছে দেশের সরকারও)। দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য-পরিস্থিতির নিরিখে রাজ্যের অবস্থানটি বুঝতে চাইলে ভরসা বলতে সেই ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে, অর্থাৎ এনএসএইচএস – আর যেকথা আগেও বলেছি, সেই সার্ভে-র তথ্যসংগ্রহের পদ্ধতি এবং সেই তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বারবারই প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া তথ্য বলতে আইন-আদালতে বিবিধ মামলা-মোকদ্দমায় দাখিল করা তথ্য – যা মোটামুটি নির্ভরযোগ্য হলেও সামগ্রিক ছবি তুলে ধরার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সুতরাং বিস্তর কথাবার্তার পর আমরা সেই একই জায়গায় ফিরে আসছি – স্রেফ তথ্য দিয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যপরিস্থিতির কোনও পূর্ণাঙ্গ ছবি তুলে ধরা সম্ভব নয়।
তথ্য গোপনের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের প্রয়াসের একটি কদর্য রূপ আমরা দেখতে পেয়েছিলাম কোভিডের দিনগুলোতে – কিন্তু তার জন্য আমাদের রাজ্যকে আলাদা করে দোষী ঠাউরানোর মানে হয় না, কেননা বিরল ব্যতিক্রম দু-একটি রাজ্য বাদে দেশের বাকি সব রাজ্যের সরকার তো বটেই, এমনকি দেশের কেন্দ্রীয় সরকারও যথাসাধ্য তথ্য গোপন করে গেছেন – কোভিড-পরিস্থিতি বিষয়ে, মোট আক্রান্তের সংখ্যা থেকে কোভিডে মৃত্যু বিষয়ে সঠিক তথ্য কখনোই জানা যায়নি, এখনও না। তবে বিশ্বজোড়া অতিমারী হলো বিরলের মধ্যেও বিরলতম ঘটনা – সেই মুহূর্তে দিশেহারা হয়ে সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও নিতে পারেন – তাই ওই দিনগুলোকে হিসেবে ধরছি না। কিন্তু আরেকটা রোগ? ডেঙ্গু? ২০০৮ সালে রাজ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১০২০ জন, ২০১০ সালে ৮০৫ জন – কিন্তু তার পর থেকেই সংখ্যাটা বাড়তে শুরু করে। ২০১২ সালে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৬৪৫৬-য়। ২০১৫ সালে ২২৮৬৫ জন, দুহাজার উনিশ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় পঁয়তাল্লিশ হাজারে, ২০২২ সালে ৬৭২৭১-এ। মাথায় রাখুন, এসব তথ্য সরকার জনগণের সামনে আনার প্রয়োজনবোধ করেননি – তথ্যগুলো পাওয়া গিয়েছে বিভিন্ন আদালতে দাখিল হওয়া মামলার সুবাদে।
ছেলেবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। গল্প বলতে গল্পই। কোন এক ডিক্টেটরের রাজ্যে কোনও এক বোকা নাগরিক একান্তে, বন্ধুমহলেই, কোনও একটি বিশেষ ঘটনা প্রসঙ্গে দেশের মহামান্য ডিক্টেটরকে অপদার্থ বলেছিলেন। ডিক্টেটরের শাসন, সেখানে দেওয়ালেরও কান থাকে। বন্ধুদের মধ্যেই কোনও একজন ছিল সরকারের চর। তো উপরমহলে খবর চলে গেল। খবর যেতে না যেতেই সেই বোকা মানুষটিকে রাজপেয়াদা এসে ধরে নিয়ে গেল। অভিযোগ, তিনি স্বয়ং ডিক্টেটরকে অপমান করেছেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যেতে বোকা মানুষটি কাতর হয়ে জানালেন যে তিনি তো ভুল কিছু বলেননি, ওই বিশেষ ঘটনা প্রসঙ্গে একেবারে সত্যি কথাটাই বলেছেন। বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই – আর সেটাই তোমার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ – গুরুতর অভিযোগ। তুমি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস করার চেষ্টা করেছ।
রাজ্যের ডেঙ্গু-পরিস্থিতি নিয়ে মেডিসিন-বিশেষজ্ঞ ডা অরুণাচল দত্তচৌধুরীর একটি ফেসবুক-পোস্ট ঘিরে সরকারের পদক্ষেপ – সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে দীর্ঘদিন সাসপেন্ড করে রাখা এবং বিস্তর আন্দোলন-ডেপুটেশনের পর সাসপেনশন তুলতে বাধ্য হলেও অবসরের মাসকয়েক আগে তাঁকে কালিম্পং-এ বদলি করে দেওয়া – এবং ডেঙ্গু-প্রতিরোধে যতখানি, তার কয়েকগুণ বাড়তি উদ্যোগ রোগের খবর গোপন করার জন্য নেওয়া – সবমিলিয়ে উপরের গল্পটির চাইতে প্রাসঙ্গিক কিছু মনে পড়ছে না। তারপরও বলি, তথ্যাভাব এবং তথ্যের অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও যেটুকু তথ্য এদিক-ওদিক ফাঁকফোকড় গলে বেরিয়ে আসছে, তা খুবই আশঙ্কাজনক।
যেমন ধরুন, এনএফএইচএস-৫-এর তথ্য (২০১৯-২০২১ সালে সংগৃহীত তথ্য) ধরলে দেখা যাচ্ছে, কিশোরী-বিবাহ এবং কিশোরী-মাতৃত্বের হারে আমাদের রাজ্য দেশের মধ্যে প্রায় শীর্ষে (একটু আগেই কিশোরী-বিবাহের সংখ্যা গোপন করার ব্যাপারে প্রশাসনিক উদ্যোগের গল্প শুনিয়েছি)। বলাই বাহুল্য, রাজ্যের স্বাস্থ্য-দফতর এ বিষয়ে বিশেষ তথ্যটথ্য প্রকাশ করেনি। ইদানীং অধিকাংশ প্রসবই হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে – এবং যেহেতু এমন কিশোরী-মাতৃত্ব সাধারণভাবে আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণির মানুষের মধ্যেই বেশি ঘটে এবং তাঁরা, স্বাভাবিক কারণেই, সরকারি হাসপাতালে আসেন – সুতরাং কিশোরী-প্রসবের হার যখন বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে তখন স্রেফ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার নিজস্ব রিপোর্টিং সিস্টেম যদি তথ্যসংগ্রহ ও যথাস্থানে সেই তথ্য জানানোর ব্যাপারে স্বচ্ছ থাকত, তাহলে শুধু তার মাধ্যমেই সেবিষয়ে যথেষ্ট সাবধানবার্তা উপরমহলের কাছে পৌঁছাতে পারত – কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি – কিশোরী-প্রসবের হার বিষয়ে সরকারের তরফে কোনও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার ভাবনা দেখা যায়নি। আবারও বলি, কিশোরী-মাতৃত্ব বিষয়ে যথাযথ তথ্য রাজ্যের প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এমনকি প্রান্তিক মেডিকেল কলেজগুলোর প্রশাসনের তরফেও স্বাস্থ্যভবনে জানানো হয় না (কারণটা আগে বলেছি) – অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, একেবারে তৃণমূল স্তর লেভেলেই, তথ্য চেপে যাওয়া হয়েছে।
যেমন ধরুন, পর পর এনএফএইচএস-এর তথ্য যদি দেখি, তাহলে দেখতে পাব যে রাজ্যে বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়েদের মধ্যে রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এনএফএইচএস-৩ (২০০৫-০৬ সালে সংগৃহীত তথ্য) অনুসারে এই হার ছিল ৪৭ শতাংশ – এনএফএইচএস-৪-এ (২০১৫-১৬ সালে সংগৃহীত তথ্য) তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২.২ শতাংশ। আর সাম্প্রতিক এনএফএইচএস-৫ এই হার একেবারে সত্তর শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালীন রক্তাল্পতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একদিকে যা আগামীদিনের নারীদের স্বাস্থ্য কেমন দাঁড়াবে তা চিহ্নিত করে, আরেকদিকে তা আগামীদিনের শিশু তথা ভবিষ্যতের নাগরিকদের স্বাস্থ্যও নির্ধারণ করে। এই সূচকে প্রতিফলিত হয় মেয়েদের অপুষ্টি, আবার প্রতিফলিত হয় প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধী ব্যবস্থা (যেমন আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট সাপ্লাই, বা উপযুক্ত ক্ষেত্রে কৃমির ওষুধ সাপ্লাই) যথাযথভাবে নেওয়া হচ্ছে কিনা, অর্থাৎ জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার কুশলতাও।
সরকারি স্বাস্থ্যপরিষেবা বিষয়ক কিছু তথ্যও রীতিমতো উদ্বেগজনক। যেমন, গর্ভনিরোধক অপারেশন – ল্যাপারোস্কোপিক টিউবেকটমি। সরকারি হাসপাতালে সংখ্যাটা প্রতি বছরই কমছে। ২০১০-১১ সালে সরকারি হাসপাতালে সংখ্যাটা ছিল ৩৭৯১০ – ২০১১-১২ সালে তা নেমে দাঁড়ালো ৩০৩৬৯-য়। ২০১২-১৩ সালে তা অনেকটা কমে নামল ২৩৯০৩ – ২০১৩-১৪ সালে ১৮৪০২ জন মহিলা সরকারি হাসপাতালে ল্যাপারোস্কোপিক টিউবেকটমি করাতে সক্ষম হয়েছেন। এভাবেই ক্রমশ কমতে কমতে ২০১৭-১৮ সালে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৮৪৪৬ – এই পর্যন্তই জানা গিয়েছে, কেননা এরপর সরকার আর তথ্য প্রকাশ করেননি।
যেমন, রাজ্যে সরকারি পরিকাঠামোয় ছানি-কাটানোর অপারেশনের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে ২০১১-১২ সালের পর থেকেই। অন্ধত্ব নিবারণের জন্য একটি ন্যাশনাল প্রোগ্রাম রয়েছে – প্রতি রাজ্যে ছানি-কাটানোর অপারেশনের জন্য নির্দিষ্ট টাকা কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দ করে থাকে – একটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থাকে, রাজ্যের কাজ অধিক সংখ্যক ছানি-কাটানোর অপারেশন করে কেন্দ্রের সরকারের কাছ থেকে টাকাটা আদায় করা। নতুন শতাব্দীর প্রথম দশ বছরে আমাদের রাজ্য লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছিই ছিল – সর্বনিম্ন পারফরম্যান্স যেবছর, সেবছর লক্ষ্যমাত্রার চুরাশি শতাংশ পূরণ হয়েছি – সেরা পারফরম্যান্সের বছরে তা লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে পৌঁছেছিল একশ তিরিশ শতাংশে (এক্ষেত্রেও, লক্ষ্যমাত্রার বেশি অপারেশনের খরচ, কেন্দ্রীয় সরকারই দেয়)। কিন্তু ২০১১-১২ সাল থেকে কমতে কমতে ২০১৬-১৭ সালে রাজ্যে ছানি-কাটানোর অপারেশনের সংখ্যা গিয়ে নেমেছে লক্ষ্যমাত্রার সাতচল্লিশ শতাংশে। তারপর থেকেই সরকারি হাসপাতালে ছানি-কাটানোর অপারেশনের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে সরকার ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন – হাসপাতাল-পিছু টার্গেট বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, রীতিমতো হুলিয়া জারি হচ্ছে – কিন্তু, এসব করে পরিস্থিতির খানিক উন্নতি ঘটলেও পুরোপুরি সুরাহা হবে না। ছানি-কাটানোর অপারেশন হয়ে চলেছে অবশ্যই – কিন্তু হচ্ছে সরকারি স্বাস্থ্য-পরিকাঠামোর বাইরে – এনজিও-আয়োজিত ক্যাম্পে, প্রাইভেট হাসপাতাল কিংবা নার্সিংহোমে।
কেন? আসলে, রাজ্যের মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দ্বিতীয়-শ্রেণী হিসেবে গণ্য করতে শুরু করেছেন। মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চ-মধ্যবিত্ত সরকারি হাসপাতাল থেকে মুখ ঘুরিয়েছেন অনেক আগেই – সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মুখ্য উপভোক্তা বলতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তরাই। এই পরিস্থিতি শুধুই গত দেড় দশকে নির্মিত, এমন বললে সত্যের অপলাপ হবে। বলা যেতে পারে যে এই পরিস্থিতির পেছনে জটিল আর্থসামাজিক ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার প্রাইভেট হেলথকেয়ার-কে প্রথম শ্রেণির বন্দোবস্ত হিসেবে জনমানসে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে যেভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উদ্যোগ নিয়েছে, ভূভারতে তার তুলনা মেলা ভার। এজন্যই বারবার বলছি, শুধুমাত্র তথ্য দিয়ে রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধঃপতনের পরিমাপ করতে চাইলে বড় খামতি রয়ে যাবে – আপাত-তথ্যের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা সত্যিটা বুঝতে চাইলে রীতিমতো বিশ্লেষণী চোখ নিয়ে সরকার ও সরকারে আসীন দলের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করার চেষ্টা করতে হবে।
আপনাদের কারও কারও হয়তো মনে আছে যে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিসাধনের লক্ষ্যে একটি ‘হাই-পাওয়ার কমিটি’ গঠন করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে উদ্দেশ্য মহৎ – কেননা, সেসময় জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকে আমাদের রাজ্য দেশের প্রথম সারিতে থাকলেও (২০১১ সালের সেনসাসে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মৃত্যুহার ছিল সবচাইতে কম, জন্মহার নিয়ন্ত্রণের সূচক টোটাল ফার্টিলিটি রেট ছিল দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, শিশুমৃত্যুর বিভিন্ন সূচক যেমন নিওন্যাটাল মর্টালিটি রেট, ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট, আন্ডার-ফাইভ মর্টালিটি রেট, তিনটিতেই রাজ্যের স্থান ছিল জাতীয় গড়ের চাইতে ঢের উন্নত – আমরা ছিলাম শ্রেষ্ঠত্বের তালিকায় চার নম্বরে), রাজ্যের সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে জনমানসে যথেষ্ট অসন্তোষ ছিলো। মধ্যবিত্ত বাঙালি সরকারি হাসপাতালে আসা কমিয়েছে সেই গতশতকের নব্বইয়ের দশকের পর থেকেই – তখনও তাঁরা সবাই বড় প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সাহস (বা সামর্থ্য) সঞ্চয় করে উঠতে না পারলেও, তাঁরা নার্সিংহোমে চিকিৎসা করাতেই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। আর যেকোনও ব্যবস্থার ত্রুটিবিচ্যুতি-অব্যবস্থা নিয়ে বিরক্তিপ্রকাশ করে সোচ্চার হন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নাগরিকরাই (প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শোষিত-বঞ্চিত হতদরিদ্ররা সবকিছুই মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যান) – তদুপরি, শিক্ষার সুবাদে তাঁদের ক্ষমতা থাকে সেই ক্ষোভ-বিরক্তির কথাটা যথাস্থানে পৌঁছে দেবার। এমতাবস্থায় মধ্যবিত্ত-সমাজ সরকারি হাসপাতাল বিমুখ হলে হাসপাতালের পরিচালনগত অব্যবস্থা বা ত্রুটিবিচ্যুতি প্রকাশ্যে আসা কমে যায় – ত্রুটিগুলো ক্রমেই বড় হতে থাকে। সুতরাং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার হাল খতিয়ে দেখে কীভাবে সেই ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করা যায়, সরকারি স্তরে এমন ভাবনা সাধুবাদ জানানোর মতো।
কিন্তু সরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি হেলথকেয়ার দুইয়ের মধ্যে মূলগত প্রভেদ রয়েছে। ঝলমলে প্রাইভেট হাসপাতাল বনাম রঙচটা সরকারি হাসপাতাল – আপাতদৃষ্টিতে ফারাকটা বহিরঙ্গে কিংবা ম্যানেজমেন্ট দক্ষতায় – কিন্তু মূল ফারাক লক্ষ্যে। একটির উদ্দেশ্য, বাজেটের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক মানুষকে সুস্থতার পথে আনা – অপরটির লক্ষ্য, অর্থোপার্জন, এবং সেই অর্থোপার্জনের সর্বোত্তম উপায় হলো আগত রোগীদের চিকিৎসা করে চলা, যত গুরুতর রোগ এবং যত বেশিদিন চিকিৎসা করানো যায় অর্থোপার্জনের সুযোগ ততোই বেশি। সুতরাং জনস্বাস্থ্য কিংবা রোগ-প্রতিরোধ নিয়ে বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিশেষ ভাবনা থাকার কথা নয় – কেননা রোগ না হলে চিকিৎসা করার সুযোগ নেই, আর চিকিৎসা না হলে অর্থোপার্জনের সুযোগ নেই – রোগ-প্রতিরোধ বলতে তাঁরা বোঝেন বিভিন্ন ধরনের চেক-আপ, যা কিনা সুস্থ মানুষকে বিভিন্ন ধরনের ব্যয়বহুল পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে ফেলা, সে-ও আরেকভাবে অর্থোপার্জনের সুযোগ। এবিষয়ে বিশদ আলোচনা বর্তমান নিবন্ধে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে, তাই প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। মোদ্দা কথাটা হলো, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা, দুটি যেহেতু উদ্দেশ্যগতভাবে ভিন্ন, সেহেতু দুইয়ের পরিচালনব্যবস্থা ভিন্ন হতে বাধ্য। এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা যত নড়বড়ে হয়, বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসার ততই রমরমা হতে পারে। কেননা সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো জনস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য – লক্ষ্য এই, যাতে রোগ যথাসম্ভব কম হয় এবং হলেও তা যেন শুরুতেই ধরা পড়ে, যাতে স্বল্প-আয়াসেই সে অসুখ সারিয়ে তোলা যায় – আর সেটি ঠিকঠাক করে চলা গেলে বেসরকারি হাসপাতালে যথেষ্ট সংখ্যায় খরিদ্দার (রোগী যেখানে চিকিৎসা কিনতে যান, সেখানে তিনি খরিদ্দার বইকি) জোটে না। সুতরাং, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নড়বড়ে হলে বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবসার লাভ – এমনকি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে তোলার ব্যাপারে বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের রীতিমতো ‘ভেস্টেড ইন্টারেস্ট’ রয়েছে। এমতাবস্থায়, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিচালকদের দায়িত্ব হওয়া উচিত, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটিকে যথাসম্ভব কুশলী করে তোলা, যথেষ্ট পরিমাণ অর্থের জোগান দিয়ে চলা এবং সেই অর্থ যাতে ফুটো পাত্রস্থিত জলের মতো এদিক-ওদিক বেরিয়ে অপচয় না হয়ে ঠিক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে, তা দেখা। দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের শাসনক্ষমতায় বসে কোনও সরকারেরই সাধ্য ছিল না – নেইও – বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উত্তরোত্তর ফুলেফেঁপে ওঠার পথ বন্ধ করার (যদিও বাম সরকার, দ্বিতীয়ার্ধে, ঠিক কেন প্রায় সরকারি উদ্যোগে প্রাইভেট হাসপাতাল গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়েছিলেন বা টিবি হাসপাতালের জমিতে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলার পথ সুগম করেছিলেন, তার যুক্তিসঙ্গত উত্তর পাওয়া সহজ নয়), কিন্তু অসুস্থ মানুষের চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা যাতে অনৈতিক ও লাগামছাড়া না হয়ে ওঠে, সেই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করাটাও সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত।
তো মোদ্দা কথাটা হলো, রাজ্য কিংবা কেন্দ্র, যেকোনও সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে যথাসম্ভব মজবুত (গুণমান, দক্ষতা এবং অ্যাক্সেসিবিলিটি, সবদিক থেকেই) করা এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর নজরদারি বজায় রাখা। পূর্বতন সরকারের আমলে স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছিল বটে, কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা সর্বাঙ্গসুন্দর ছিল এমন দাবি অতি বড় বাম-সমর্থকও করবেন না। সুতরাং, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিকল্পে রাজ্যের নতুন সরকার চটজলদি একটি কমিটি গঠন করলেন তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু ছিল না – কিন্তু চমৎকৃত হলাম এই দেখে যে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিকল্পে নিবেদিত যে কমিটি সেই কমিটিতে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের বড় অংশই বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এবং অধিকাংশেরই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনও অভিজ্ঞতাই নেই। অর্থাৎ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা কোন পথে উন্নত হতে পারে, সে বিষয়ে উপদেশ দিতে এলেন বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা।
কোনও বিষয়ে উপদেশ গ্রহণের জন্য বাইরে (সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিষয়ে উপদেশ দেবার জন্য বেসরকারি ডাক্তারবাবুদের নেমন্তন্ন করা হলে তাঁরা ‘বাইরের লোক’ বইকি!) থেকে কাউকে ডেকে আনার অর্থ কী? উত্তরটা খুবই সহজ। যাঁকে ডেকে আনা হয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এখানে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী বা অভিজ্ঞ। একইভাবে, রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিষয়ে উপদেষ্টা হিসেবে যদি বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ডাক্তারদের নেমন্তন্ন করা হয়, তাহলেও জনসাধারণের কাছে ওই একই বার্তা যায় – বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারদের তুলনায় অধিক দক্ষ বা পারদর্শী।
আগের সরকারের আমলে নেতা-মন্ত্রীরা অসুস্থ হলে ভর্তি হতেন সরকারি মেডিকেল কলেজে (সাধারণত পিজি হাসপাতালে) – খুবই মনে আছে যে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় উৎপল দত্ত শান্তিদেব ঘোষ প্রমুখ বিখ্যাত মানুষরাও পিজি-তেই ভর্তি হতেন – উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাম আমলে কোনও নেতামন্ত্রীই প্রাইভেট হাসপাতালে মারা গিয়েছেন বলে মনে পড়ে না (একমাত্র অনিল বিশ্বাসের মৃত্যু বেসরকারি হাসপাতালে ঘটেছিল, যদ্দূর মনে পড়ছে), যদিও বেলভিউ-উডল্যান্ডস-কোঠারি-সিএমআরআই ইত্যাদি অনেক বছর ধরেই ছিল, নারায়ণা অ্যাপোলো ফর্টিস অব্দি বাম-আমলেই তৈরি হয়। কিন্তু নতুন সরকারের আমলে দেখলাম, মন্ত্রী-সান্ত্রীরা তো বটেই, এমনকি ছুটকো নেতারা অব্দি কর্পোরেট হাসপাতাল বাদে চিকিৎসা করাতে চান না (অথচ, সিবিআই-ইডি তাড়া করলেই তাঁরা আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেসময় সেধরনের ‘অসুস্থতা’-র চিকিৎসার জন্য পিজি-র উডবার্ন ওয়ার্ডের চাইতে উপযুক্ত হাসপাতাল খুঁজে পাওয়া যায় না!)। একদিকে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপদেষ্টা হিসেবে বেসরকারি হাসপাতালের “নামী চিকিৎসক”-দের নিয়োগ, আরেকদিকে নেতা-মন্ত্রীদের চিকিৎসার দরকার পড়লে কর্পোরেট হাসপাতালে ভর্তি হওয়া (এবং এর সঙ্গে সিবিআই-ইডি তাড়া করলেই রাজ্যের সর্বোচ্চ সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে নেতাদের ভর্তি হতে পারা নিয়ে সর্বসাধারণের হাসাহাসির চোটে সার্বিকভাবে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থারই সম্মানহানি) – দুইয়ে মিলে বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে আদতেই উন্নততর, এমন বিভ্রম জনসাধারণের চোখে অনপনেয় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি পরামর্শক্রমে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতিসাধন প্রকল্প শুরু হয়ে গেল। উপদেষ্টারা প্রাইভেট হাসপাতালে সাপে-কাটা অপুষ্টি পেটখারাপ ইত্যাদির চিকিৎসা করেন না – সুতরাং তাঁদের মনে হলো, গ্রামেগঞ্জে গরীবগুর্বোদের জীবনে অভাব যদি কিছু থাকে, তা হলো হাইটেক চিকিৎসা ও ‘স্পেশালিষ্ট’-এর। দিকে দিকে গজিয়ে উঠল মস্ত বড় বড় বিল্ডিং – সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল – স্পেশালিষ্ট নিয়োগ না করেই। রঙচঙে সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতালের পাশে টিমটিম করে চলা গ্রামীণ হাসপাতালের সরকারি ডাক্তারবাবু এমনকি জনসাধারণের চোখেও হয়ে উঠলেন ছাই-ফেলতে-ভাঙা-কুলো গোত্রের অনুকম্পার পাত্র – মিডিয়ার চোখে ‘পাতি এমবিবিএস’। এই অবজ্ঞার অভিঘাত যে কতখানি গভীর, তার প্রমাণ মেলে সরকারি ‘দুয়ারে ডাক্তার’ প্রকল্পের আপাতদৃষ্টিতে যা সাফল্য, তা নিয়ে একটু খুঁটিয়ে ভাবলেই – যেখানে শহরের মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা রোগী দেখতে আসবেন খবর পেলেই গ্রামের রোগীদের ঢল নামে, যদিও সেসব অঞ্চলে গ্রামীণ হাসপাতালের চিকিৎসকরা সারাবছর ধরেই যথাসাধ্য সুচিকিৎসা করে থাকেন।
বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার তুলনায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা দ্বিতীয়-শ্রেণীর – এই কথাটুকু সর্বসাধারণের মনে গেঁথে দিতে সক্ষম হওয়ার ঠিক পরেই চালু হলো স্বাস্থ্যসাথী। জনসাধারণের করের টাকা ঘুরপথে বেসরকারি মালিকের পকেটে স্থানান্তরিত করার এর চাইতে উপযুক্ত উপায় কল্পনা করা কঠিন (কেন্দ্রের ‘আয়ুষ্মান ভারত’-ও একই ব্যাপার)।
সরকারি ডাক্তাররা যে সেকেন্ড ক্লাস – বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যারা অক্ষম শুধু তারাই সরকারি হাসপাতালে যায় – সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা গেলেও, রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু গরীব (কর্মসংস্থান নেই, চিটিংবাজি তোলাবাজি বাদে আয়ের উপায় নেই – ভাতার টাকায় কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসা করানো যায় না), সেহেতু রাজ্যের অধিকাংশ নাগরিকই বেসরকারি হাসপাতালের খরিদ্দার হয়ে উঠতে পারছিলেন না। প্রায় নাচার হয়েই সরকারি হাসপাতালে দেখাচ্ছিলেন – আর নাচার হয়ে চিকিৎসা করাতে একরকম বাধ্য হতে হলে যা হয়, তাঁদের সেই সরকারি হাসপাতালে আসার মধ্যে মিশে থাকে বিরক্তি, একধরনের হতাশাও – চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত ফল না মিললেই মনে হয়, ‘বড় হাসপাতালে’ নিয়ে যেতে পারলেই সেখানে সব অসুখের নিরাময় সম্ভব। প্রান্তিক সরকারি হাসপাতালে বেড়ে চলে ভাঙচুর অশান্তির ঘটনা – চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের মারধর ইত্যাদিও।
এই মোক্ষম মুহূর্তে সরকারবাহাদুর ঝুলি থেকে বের করেন – স্বাস্থ্যসাথী। হোক না হতদরিদ্র, পাঁচতারা হাসপাতালের কাচের দরজা খুলে যাবে তাঁর জন্যও।
২০২১ সালের বাজেট যদি দেখি, সেখানে স্বাস্থ্যখাতে রাজ্য সরকার বরাদ্দ করেছেন মোট ১৬৩৬৮ কোটি টাকা। তার মধ্যে ১০৯২২ কোটি টাকা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের খাতে বরাদ্দ, ৫২৪৬ কোটি টাকা প্রাথমিক স্বাস্থ্য খাতে (যদিও সকলেই বোঝেন যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যখাতে খরচ বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে বড় অসুখগুলোর চিকিৎসাখাতে ব্যয় কমানো সম্ভব) – এর পাশাপাশি ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের জন্য এবং বাজেটের বাইরে আরও ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ সরকারি কর্মী ও অবসরপ্রাপ্তদের চিকিৎসার বিল মেটানোর জন্য।
বরাদ্দ যা-ই থাক, ওই অর্থবর্ষেই স্বাস্থ্যসাথী বাবদ খরচ হয়েছিল ২২৬৩ কোটি টাকা – পরের বছর খরচ হয়েছিল ছাব্বিশশো কোটি টাকারও বেশি, তার পরের বছর প্রায় সাতাশশো কোটি টাকা। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, প্রকল্পের শুরু থেকে ধরলে, গত বছরের শেষ অব্দি রাজ্য সরকার স্রেফ স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পেই খরচ করেছেন তের হাজার কোটি টাকারও বেশি।
প্রায় নিশ্চিত হয়েই অনুমান করা যায় যে এই তেরো হাজার কোটি টাকার বেশির ভাগটাই পৌঁছেছে বেসরকারি হাসপাতালের কোষাগারে (যদিও টাকাটা জনসাধারণের করের টাকা)।
যাঁদের কঠিন অসুখের চিকিৎসা হয়েছে স্বাস্থ্যসাথী স্কিমে – এবং অনেকেরই সাধারণ অসুখ-বিসুখের চিকিৎসাও হয়েছে (যা এমনকি ব্লক লেভেলের হাসপাতালেও হওয়া সম্ভব ছিল, মেডিকেল কলেজগুলোতে তো বটেই) – তাঁরা উপকৃত হয়েছেন, অবশ্যই। কিন্তু মাথায় রাখা জরুরি, এই খরচটা স্রেফ এককালীন বিল মেটানো গোত্রের খরচ, যার কোনও দীর্ঘমেয়াদি উপকারিতা নেই। এমনকি যাঁর চিকিৎসা হলো তিনিও যদি পরের বার অসুস্থ হন, সেক্ষেত্রেও সরকার নতুন করে খরচ না করে তাঁর দ্বিতীয় অসুস্থতার চিকিৎসা করাতে পারবেন না। অর্থাৎ এই বিপুল বিল-মেটানো, তা স্রেফ খরচই। অথচ টাকাটা যদি সরকারি স্বাস্থ্য-পরিকাঠামো উন্নত করার কাজে ব্যয়িত হতো, তাহলে তার উপকার পেতে পারতেন অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ – এবং পেতে পারতেন বছরের পর বছর ধরে।
এত কথা এজন্যই, কেননা রাজ্য সরকার স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ করে না। সর্বশেষ জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি অনুযায়ী, রাজ্য বাজেটের আট শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ হওয়ার কথা (অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের মুখে এত বড়সড় প্রত্যাশা মানায় না, কেননা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের ব্যাপারে সাধারণভাবে যে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছে আমাদের দেশ বরাদ্দ করে তার অর্ধেক), সেখানে আমাদের রাজ্য বরাদ্দ করে এর অর্ধেক – বাজেটের সাড়ে চার শতাংশ, যা কেরালা তামিলনাডু রাজস্থান গোত্রের রাজ্যগুলোর থেকে পিছিয়ে তো বটেই, এমনকি জাতীয় গড়ের থেকে পিছিয়ে। এর সঙ্গে যোগ করুন, কেন্দ্রের বিভিন্ন স্বাস্থ্যপ্রকল্পের অর্থ খরচ করার ব্যাপারে সরকারের ব্যর্থতা। যেমন ধরুন, ২০২৩-২৪ সালে এই রাজ্যে কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রকল্প বাবদ বরাদ্দ ছিল ৩২৭৭ কোটি টাকা – ১৮৭৩.৬৩ কোটি টাকা খরচ করা গিয়েছে – ১৪০৩.৩৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ বরাদ্দ অর্থের প্রায় তেতাল্লিশ শতাংশই ফেরত গিয়েছে। মুশকিল হলো, এসব প্রকল্প-ভিত্তিক বরাদ্দের টাকা নির্দিষ্ট খাত ভিন্ন ব্যয় করা যায় না – এবং ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসেব দিতে হয় – নইলে আমরা আস্থা রাখতেই পারি, অপ্রয়োজনীয় সংখ্যক দামী কম্পিউটার কিনে বা স্বাস্থ্যকর্মীহীন গ্রামীণ হাসপাতালের সামনে মস্তবড় নীল-সাদা তোরণ নির্মাণ করে টাকা ঠিকই খরচ হয়ে যেত। কিন্তু সেসব কূট প্রসঙ্গ বাদ দিয়েই বলি, রাজ্য সরকারের বাজেট-বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম – কেন্দ্রীয় সরকার যে প্রচুর টাকা দিচ্ছে এমনও নয়, তবু তার মধ্যে যেটুকু জুটছে সেটুকুরও সদ্ব্যবহার না করতে পারায় টাকা ফেরত চলে যাচ্ছে – তার পরও সরকার স্বাস্থ্যসাথী খাতে বছর বছর অনেকখানি টাকা খরচ করে ফেলছেন, যাতে সীমিত সংখ্যক মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে উপকৃত হলেও রাজ্যের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের নিরিখে তার কোনও দীর্ঘমেয়াদি লাভ নেই।
তো একদিকে স্বল্প বরাদ্দ – এবং সেই স্বল্প বরাদ্দের অধিকাংশই হাইটেক চিকিৎসার পেছনে খরচ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা হচ্ছে – আবার ওই স্বল্প বরাদ্দটুকুর মধ্যেও একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরকারি স্বাস্থ্যবীমার মাধ্যমে বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবসাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলার কাজে ‘সাইফনিং’ হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ করুন সরকারের তরফে, পরোক্ষ হলেও, নিরন্তর জারি রাখা বার্তা – বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাই সেরা (এবং জনসাধারণের কাছে লাগাতার এই বার্তা দেওয়া যে সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে যাতে সরকারি হাসপাতালগুলোও পাঁচতারা কর্পোরেট হাসপাতালের মতো হয়ে যায় – যতদিন অব্দি তা সম্ভব না হচ্ছে, ততদিন জনগণ যেন একটু কষ্ট করে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে নেন, স্বাস্থ্যসাথী আছে যখন তখন বিল সরকার মিটিয়ে দেবে)। পরিস্থিতি সেদিকে যাচ্ছে যখন ক্ষয়িষ্ণু সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গিয়ে পাব্লিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, ওরফে পিপিপি মডেলে, সরকারি হাসপাতাল বেসরকারি তত্ত্বাবধানে চালাতে দিলেও জনসাধারণের সম্বিত ফিরবে না – কেননা, স্বাস্থ্যসাথীর জোরে সবার গন্তব্য প্রাইভেট হাসপাতাল।
স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের ব্যবহারকে বঙ্গজীবনের অঙ্গ করে তুলতে সরকার খুবই সচেষ্ট। যাতে এমনকি সরকারি হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসার (মানে, সরকার অনেকখানি ব্যয় করে কিন্তু চিকিৎসাটা রোগী ফ্রি-তেই পান) বেশ কিছুটা স্বাস্থ্যসাথী স্কিমে হয় (যদিও যে চিকিৎসা ঘোষিতভাবে ‘ফ্রি’, তার জন্য কোনও রোগী কার্ডের লিমিট থেকে খরচ করতে যাবেন কেন – এই সরল প্রশ্ন রোগীপরিজন চিকিৎসক কিংবা স্বাস্থ্যপ্রশাদক কেউই সাহস করে করছেন না), সে নিয়ে সরকার অত্যন্ত উদগ্রীব। সরকারি হাসপাতালের মধ্যেই কর্পোরেট হাসপাতালের ধাঁচে স্পেশাল ‘হাসপাতাল’’ চালু করার ব্যবস্থা হচ্ছে – যাতে মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত সরকারি হাসপাতাল চত্ত্বরেই প্রাইভেট হেলথকেয়ারের আরাম পেতে পারে – অর্থাৎ, একই চত্ত্বরে একই চিকিৎসক (যাঁরা সরকারের বেতনভুক) তাঁরা দুধরনের স্বাস্থ্য-পরিষেবা দেবেন – সরকারি সিদ্ধান্তগুলো ঠিক কোন লক্ষ্যসাধনের জন্য নেওয়া হচ্ছে, তা বোঝা খুব কঠিন কি? সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার রাশ স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে থাকা সত্ত্বেও সরকারে আসীন শাসকদলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা তাঁর নিজের লোকসভা কেন্দ্রে চালু করেন ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্প (যা নাকি রাজ্যের অন্যত্রও আয়োজিত হবে) – সরকারি স্বাস্থ্যকাঠামোর বাইরে অসরকারি হেলথ ক্যাম্প – যাতে নাকি রোগীর ঢল নামে। কেন এই উদ্যোগের প্রয়োজন হলো? এমন ‘সেবাশ্রয়’ সর্বসাধারণের কাছে ঠিক কোন বার্তা পৌঁছে দেবার জন্য আয়োজিত হলো? দেশের সব রাজ্যে আয়-বিচার-নির্বিশেষে সব নাগরিকের বিনেপয়সায় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। আমাদের গর্ব, এই রাজ্যে তেমন ব্যবস্থা ছিল – এখনও আছে। কিন্তু থাকবে কি? ক্ষমতায় এসে যে সরকার সরকারি হাসপাতালের পেয়িং বেড (যেসব বেডে নামমাত্র খরচে চিকিৎসা হতো) তুলে দিল – আজ তারাই সরকারি হাসপাতালের মধ্যে আলাদা করে দামী ওয়ার্ড খুলছে! সে ওয়ার্ডে কর্পোরেট হাসপাতালের তুলনায় খরচ অনেক অনেএএক কম হলেও (হ্যাঁ, ঘটা করে তেমন প্রচারই চলছে, কেননা সরকারের সামনে বেঞ্চমার্ক বলতে কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবসা মডেল) স্পষ্টতই যার খরচ নিম্নবিত্ত তো দূর, নিম্ন-মধ্যবিত্তের সামর্থ্যের বাইরে। সরকারি হাসপাতালে তথাকথিত ফ্রি-তে চিকিৎসা করাতে গেলেও স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে বিলিং করানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কেন? পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সরকার কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা আন্দাজ করা কি খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে?
লক্ষ করুন, এই নিবন্ধে রাজ্যজোড়া সর্বক্ষেত্রে ঢালাও দুর্নীতি, অর্থ নয়ছয় ইত্যাদি প্রসঙ্গে আমি ঢুকলামই না। চিকিৎসার নৈতিকতা রক্ষিত হচ্ছে কিনা সেসব দেখার দায়িত্ব যে মেডিকেল কাউন্সিলের, এই রাজ্যে তার শাসনভার যাদের হাতে, তাদের প্রায় প্রত্যেকের নামে দুর্নীতির অভিযোগ। নির্বাচনে জালিয়াতি, ডাক্তারদের ব্ল্যাকমেইল, তোলাবাজি, স্বজনপোষণ – বর্তমান মেডিকেল কাউন্সিলের বিরুদ্ধে সবরকমের অভিযোগই রয়েছে। কাউন্সিলের বর্তমান সভাপতি আবার স্বাস্থ্য-দফতরে নিয়োগেরও মাথা – মাঝেমধ্যেই শুনি ইডি তাঁর বাড়িতে বা নার্সিংহোমে তদন্ত করতে যাচ্ছেন। দুর্নীতির কথা নিয়ে আলোচনা করতে বসলে নিবন্ধ দীর্ঘতর হয়ে ছোটখাটো পুস্তিকার দৈর্ঘ্যে পৌঁছে যাবে। কিন্তু ওসব দুর্নীতির চাইতেও ঢের বড় বিপদ হলো, রাজ্যসরকার সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটিকে যেখানে পৌঁছে দিতে চাইছে – এবং সেই লক্ষ্যে সরকার খুব নিশ্চিত ও অবিচল পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে – সেই বিপদকে চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ না করা গেলে আগামী দিনে আমরা বড় সঙ্কটে পড়ব। পড়বই।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বা মডার্ন মেডিসিন বলতে আমরা যা বুঝি, তার একেবারে আদিপুরুষদের অন্যতম হিপোক্রেটিস। চিকিৎসকের কর্তব্য বলতে কী তা বোঝাতে তিনি বলেছিলেন – “Declare the past, diagnose the present, foretell the future”.
সবার নাগালের মধ্যে গ্রহণযোগ্য একটি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নির্মাণের লক্ষ্যে আমরা এগোচ্ছিলাম – দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের শাসনে থেকে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলা সম্ভব না হলেও চোখে পড়ার মতো উন্নতি করার জন্য একটানা চৌঁত্রিশ বছর সময় হিসেবে খুব কম নয় – পূর্বতন বাম-সরকার বেশ কিছুদূর এগোলেও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির ব্যাপারে যতখানি প্রত্যাশিত ছিল, তার কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
বর্তমান সরকার, খুব পরিকল্পিতভাবেই, জনস্বাস্থ্যে আমাদের যেটুকু অর্জন তা ধ্বংস করে ফেলছে – বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মডেল শিরোধার্য করে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে মুনাফাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনুসারী করে তুলছে – এবং আবারও বলি, পুরোটাই হচ্ছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে। দুর্ভাগ্য আমাদের, রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পরেও রাজ্যের নাগরিকদের সম্বিত ফেরেনি। শিক্ষা-দীক্ষা না জুটলেও কায়িক শ্রম দিয়ে বেঁচে থাকা যায়, ভাতার টাকায় সংসার-নির্বাহ হলেও হতে পারে (শাসক শ্রেণী ঠিক এমনই ভোটারসমাজ নির্মাণ করতে চায় – যারা শিক্ষার আলোকহীন, এবং ধর্ম ও উৎসবে মত্ত) – কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ার মুহূর্তে চিকিৎসা না করানো গেলে?
হিপোক্রেটিস যেমন বলেছিলেন, Diagnose the present – অর্থাৎ বর্তমানকে সঠিকভাবে চেনা। কিন্তু সেই চেনার পথে যা যা চিহ্ন জ্বলজ্বল করছে, তাতে তাঁর পরামর্শমতো ভবিষ্যতের পূর্বাভাস (‘Foretell the future’) দিতে গিয়ে আশার কথা শোনাতে পারা তো দূর, রাজ্যের ভবিষ্যৎ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তথা ভবিষ্যতে রাজ্যের নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য যে আয়োজন থাকার সমূহ সম্ভাবনা, সেসব কথা কল্পনা করতেও আতঙ্ক জাগে।









