বঙ্গ নারীদের জন্য ধর্ষণ নামক যে পিতৃতান্ত্রিক বৃক্ষের বিষফল ও সমাজ নিয়ে আমাকে কোনওদিন লিখতে হবে, ভাবিনি। আমি যেহেতু বেহালায় ছোটবেলায় ছিলাম আর তৎকালীন বেহালা ভাল জায়গা নয় হিসেবেই আখ্যায়িত ছিল সেখানেও কিন্তু এত করুণ সামাজিক অবস্থা আমার নজরে পড়েনি।
তারপর আমরা গড়িয়ায় চলে এলাম। তারপর তো বেশ গর্বের সঙ্গে বলতাম যে বঙ্গ, নারীদের নিরাপদ আস্তানা, এই বঙ্গ বা আরও স্পেসিফিক্যালি বললে কলকাতা। এই বাক্য যে শুধু কথার কথা নয় তা প্রতি বছর আমার মায়ের বছরান্তের কাজ শেষ করে প্রায় রাত বারোটার সময় বাড়ি ফেরার সময় এই উপলব্ধি হত। এমনকি বিয়ে বাড়ি থেকেও ফেরার সময় আমরা দেখেছি রাস্তায় কেউ কোনওদিন বিরক্ত করেনি। উপরন্তু মদ্যপ লোকজন নারী দেখলে মুখে রুমাল চাপা দিতেন।
এরপর নিজে প্রিন্ট মিডিয়াতে ছবি তোলার কাজ করতাম। তখন মাঝেমধ্যে রাত সাড়ে এগারোটা বারোটা বেজে যেত, বাড়ী ফিরতে। আর বিয়ে বাড়ির কাজ থাকলে তো মধ্যরাতে বাড়ি ফেরা তাও ধরে নিন রাত তিনটের আগে তো কখনোই নয়।
তা এতক্ষণ ধরে এত কিছু যে বললাম, তার কারণ একটাই যে আমাদের প্রাক্তন মাননীয়া তো বলেছিলেন যে,রাত দশটার পর যেন নারীরা ঘর থেকে বের না হয়। অথচ 2012 সালে যখন নির্ভয়া কান্ড ঘটে তখনও বঙ্গবাসী বলতো “এসব দিল্লিতে হয়। এদিক দিয়ে কলকাতায় নিরাপদে আছি।” এখানে বলে রাখি তার আগের বছর, মানে এগারো সালে বঙ্গের রাজনীতিতে পট পরিবর্তন হয়েছিল। মাননীয়া যে সম্পূর্ণ দক্ষিণপন্থা মানসিকতার, তা আমরা তার প্রতিটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ থেকে বুঝতে পেরেছিলাম। তবে সেই সঙ্গে তিনি খুব চালাকির দ্বারা বাম রাজনীতির ‘ লড়কে লেঙ্গে ‘ ব্যাপারটার বাক্যাংশের সঙ্গে অদৃশ্যে ‘ক্ষমতা’ লিখে দিয়েছিলেন। সাধারণ জনগণ তা পড়তে পারেনি। তবে রাজনীতিতে একবার অটল আরেকবার সোনিয়া করার সময় একটু বোধহয় বুদ্ধি খাটালে পুরো ব্যাপারটা চোখে পড়ত। কিন্তু বঙ্গ তখন নতুন শাড়ী ছেঁড়ার রাজনীতিতে ভেসে গেল।
এতক্ষণে আপনি হয়তো মনে করছেন ধান বুনতে শিবের গীত গাইছি কেন? কথা তো হচ্ছিল ধর্ষণ নিয়ে, মাঝখানে রাজনীতি কোন দিক থেকে এল?
পাঠক আপনারা কী কেউ অস্বীকার করতে পারবেন যে আপনার রাজনৈতিক আদর্শ, আপনার মানসিকতা বা, মতাদর্শ তৈরি করে না? দেখবেন এজন্য অনেক ছেলেরা বলে, যার সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে পারব না, তার সঙ্গে কীসের ভালবাসা বা ভাললাগা? তার প্রথম কারণ হচ্ছে আমাদের মনস্তত্ত্ব। আমাদের রাজনৈতিক পছন্দ আমাদের রুচিবোধ কিছুটা বোধহয় তৈরী করে দেয়।
একটা সময়ে বঙ্গের মাটিতে এই দক্ষিণপন্থী তৃণমূলীরা কীভাবে ধীরে ধীরে বাম মানসিকতা পুরোপুরি মুছে দক্ষিণ পন্থা এস্টাবলিশ করেছিল।আর তখন থেকেই এই ধর্ষণ সংস্কৃতির সূত্রপাত হয়।
আর জি করের মেয়েটাকে ধর্ষিত ও হত্যা করা হল, তারপর থেকেই তো আনঅফিসিয়ালি একটা ধর্ষণ সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গে চালু হয়ে গিয়েছিল। যে যাই দুষ্কর্ম করুক, তার গলাতেই শোনা যাচ্ছিল ‘দিদি সামলে নেবে’। এই উদাহরণ হয়তো আমরা শুনতে পেয়েছিলাম ল কলেজের মনোজ মিশ্রের গলায়, ভিক্টিমকে মলেস্টেশন করার পরে।, আর কথাটা যখন সামনে এসেছে তার মানে এই বাক্য তাদের মন এবং মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছিল। তারা ধরে নিয়েছিল আমরা যে যাই করি না কেন মমতা ব্যানার্জি এন্ড কোম্পানি আমাদের দুষ্কর্ম সামলে নেবেন। না হলে একটু খেয়াল করে দেখুন ১৪ তারিখ রাতে যে রাত দখল হয়েছিল সে সময় মেয়েরা বাড়ি ফেরার পথে অনেক মেয়ে ধর্ষিত হয়। এবং তাদের নাকি বলা হয়েছিল যে “আর রাত দখলে যাবি না?গেলে, এভাবে মজা বুঝিয়ে দেব”। তার পরবর্তী সময়ে তো প্রায় রোজই একটা ধর্ষণকাণ্ড আমাদের সামনে আসত। তো, সে বছর দুর্গাপূজার সময় মনে হয় একটা দিনও বাদ যায়নি যে একটা করে ধর্ষণ কাণ্ড সামনে আসেনি । আর আড়ালে আবডালে কত ঘটে গেছে তা হয়তো আমরা কখনোই জানতে পারব না।
এখন তৃণমূল গিয়ে বিজেপি এসেছে স্কুলের মেয়েরাও নিষ্কৃতি পাচ্ছে না। আমি এ কথা বলছি না যে বাম আমলে ধর্ষণ হয়নি, তবে এ কথা আপনিও মানবেন যে বিষয়টা এভাবে বিস্তার লাভ কখনোই করেনি। এ কথা সেই সময়ের মেয়েরা সগর্বে বা সজোরে বলতে পারে। আমি আবার বলছি ধর্ষণ কিন্তু একটা বাহ্যিক রূপ তার মূল শিকড় থাকে মস্তিষ্কে। আর বাম দলের মত কোথাও এই নিয়ম নেই যে ধর্ষণ বা মলেস্টেশনের খোঁজ সামনে এলে দোষীকে প্রথমেই সাসপেন্ড করা হবে। আর প্রমাণিত হলে বহিষ্কার করা হবে। আর রাজনীতি ভেদে বিভেদে সবাই এই কথাটা মানবেন যে বামদল তাদের শূন্য অবস্থানেও কিন্তু এই নিয়ম মেনে চলেছে।
এই নীতি কিন্তু আর কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শে দেখতে পাওয়া যায় বলে আমার জানা নেই। আরজিকর কাণ্ডে যে প্রতিবাদী গলার স্বর উঠেছিল তা যে আশি শতাংশ বামমনস্ক লোকজনের গলা থেকেই তা বুঝি আজ বলার বা বোঝার অপেক্ষা রাখে না।
আজ সারা ভারতে যেভাবে দক্ষিণ পন্থা এবং তার প্রতিবিম্ব পিতৃতান্ত্রিকতা প্রসারতা লাভ করেছে, মানুষ দয়ামায়া মানবিকতা সব ভুলে একটা ‘আমি’র বৃত্তে বাঁচতে চাইছে। তাই দশ বছরের শিশু মেয়েটির ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনায় কোয়াম্বুটুরেতে নারীদেহী এক পুলিশ স্বতঃস্ফূর্ত হাসিতে ভরিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি একজন পুলিশ মানে নিরাপত্তারক্ষী উপরন্ত তিনি একজন নারী । সে সবকিছু ভুলে তার হাসি ঘর ভর্তি প্রেসের সামনে বার বার করে ফোয়ারার মত বেরিয়ে আসছিল। এর মধ্যে বঙ্গের দুর্গাপুর বেহালার মত নানা জায়গা থেকেও নাবালিকা ধর্ষণের খবর উঠে আসছে। জানিনা আগামী কী বার্তা আনছে।
তবে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে আগের শাসকগোষ্ঠী যেমন এসেই একদিনে এই ধর্ষণ সংস্কৃতি চালু করতে পারেননি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষ গাছ মহীরূহ হয়েছে। ঠিক তেমনি এই বিষবৃক্ষের মূল উৎপাটন করতেও সময় লাগবে। । বিজেপি সম্পূর্ণ ঘোষিত দক্ষিণপন্থা। তাই, তাদের বিরুদ্ধে বাম শক্তির সামনাসামনি লড়াই হবে।আশা করা যায়, আবার বঙ্গ, নারী ও নারীবাদের ভূমি হয়ে উঠবে। যে নারীবাদ বামপন্থার হাত ধরে সমগ্র বিশ্বে এসেছিল। আবার হয়তো নারী চিৎকার করে বলতে পারবে নিজের ইচ্ছামতন একটা নারীর প্রাণকে এবং শরীরকে, ধ্বংস করার অধিকার কারোর নেই। এখন শুধু দাঁতে দাঁত কামড়ে, সেই দিনের অপেক্ষা।











