রাজ্যের বর্তমান সরকারের আমলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কর্মপদ্ধতি যেমন দীর্ঘসূত্রিতা ও রাজনৈতিক অনীহাকে প্রতিষ্ঠিত করে, তেমনই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতিসক্রিয়তা তার রাজনৈতিক অভিসন্ধির স্পষ্ট পরিচায়ক। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের তরুণী চিকিৎসকের ওপরে অমানুষিক নির্যাতন তথা প্রাতিষ্ঠানিক খুনের ঘটনায় প্রশাসনের অমানবিক ও অসংবেদনশীল ভূমিকা আমরা কেউই ভুলে যাইনি [যদিও এই ধরনের বিষয়ে আমাদের স্মৃতি বড়োই স্বল্পস্থায়ী,এটাও ঠিক]। এবং ঐ মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটা কথা প্রতিবাদীদের আন্দোলনে এক রক্ষাকবচ হিশেবে প্রতীয়মান হয়েছিল, যে আন্দোলনকারীদের ওপরে প্রশাসনিক নিপীড়ন চালানো যাবে না।
কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এই রাজ্য প্রশাসনের একাংশের ব্যবহার দেখে মনে হয় না যে তারা দেশের সর্বোচ্চ আদালতকেও যথেষ্ট পাত্তা দেয়।তারা যেমন জনগণের করের টাকা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো (অপ)ব্যবহার করে এই মামলায় অপরাধীদের আড়াল করতে চেষ্টা করছে, তেমনই আন্দোলনকে বাধা দিতেও চেষ্টা করছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে তাদের এই ধরনের পদক্ষেপ রাজ্যের মহামান্য বিচারালয়ে পরাজিত হয়েছে, এতদসত্ত্বেও,চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি!
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শুরু হয়েছে আন্দোলনের ওপরে নতুন পদ্ধতিতে আক্রমণ। পদ্ধতি খুব একটা অভিনব,তেমনটা নয়; আর উদ্দেশ্যও পরিষ্কার: সেই ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা।যে হুমকির অপসংস্কৃতি সম্পর্কে রাজ্যবাসী জানতে পেরেছেন অভয়া কাণ্ডের মতো এক নৃশংস ঘটনার পরে, সেই _থ্রেট কালচার_ প্রশাসনিক তথা শাসকদলের মদতে আবারও আক্রমণ করছে আন্দোলনকে, আন্দোলনকারীদের — যা আসলে শুধুমাত্র অভয়ার ন্যায়বিচারের অধিকার ও দাবিকে অস্বীকার করে না, যাবতীয় সামাজিক নির্যাতনকে বৈধতা দেয়, দুর্নীতি ও দুষ্কৃতীদের প্রশ্রয় ও নিরাপত্তা দেয়।
সেই _থ্রেট কালচার_ -এর সাম্প্রতিক নিদর্শন অভয়া আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন চিকিৎসককে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ [যদিও ঠিক _জিজ্ঞাসাবাদ_ শব্দটা দিয়ে এই উদ্দেশ্যটা ধরা যায় না, ইংরেজি _ইন্টারোগেশন_ শব্দটাই ঐতিহাসিকভাবে এক্ষেত্রে সুপ্রযোজ্য]। গতবছরের কোনো ঘটনা অথবা এ বছরের — নানান অজুহাতে চিকিৎসকদের ডেকে পাঠানো হচ্ছে থানায়,যে রাজ্যে থানায় কর্মরত পুলিশকর্মীকে দেখা গেছে শাসকদলের প্রশ্রয়পুষ্ট দুষ্কৃতীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে টেবিলের তলায় লুকিয়ে পড়তে, অথবা এই কয়েক মাস আগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে জনৈক পুলিশকর্মীকে টেলিফোনে শাসকদলের এক কর্তার অশ্লীল হুমকির বৃত্তান্ত। এমনকি গতবছর ১৪ আগস্ট পেরিয়ে ১৫ তারিখে পৌঁছনোর পথে সেই অভূতপূর্ব রাতদখল আন্দোলন চলাকালীন যখন দুষ্কৃতীরা তাণ্ডব চালিয়ে ভাঙচুর করেছিল আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, সেদিনও এই পুলিশরা কেউই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এইবেলা প্রতিবাদকারী চিকিৎসকদের ডেকে নিয়ে সমাজে ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করতে তারাই বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ উদ্দেশ্য একটাই,যাতে সাধারণ মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আর আন্দোলনে না নামে, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে। ঠিক যেভাবে নির্বাচনের সময়ে সন্ত্রাস চালিয়ে অবাধে ভোট লুঠ করা হয়, ঠিক একই লক্ষ্যে একটু অন্য কায়দায় শাসকদল প্রশাসনকে ব্যবহার করছে। হ্যাঁ,এটা খুবই পরিচিত ব্যাপার যে ক্ষমতায় থাকলে শাসক তার নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে প্রশাসনকে ব্যবহার করে। কিন্তু অভয়ার ন্যায়বিচারের আন্দোলন দমন করতে,অভয়াদের ন্যায়বিচারকে বিলম্বিত ও প্রতিহত করতে এই শাসক যেভাবে হিংস্র হয়ে উঠেছে তা সামাজিক অশান্তি ও অস্থিরতার পরিবেশ সৃষ্টি করছে। এ রাজ্যের সাম্প্রতিক দুর্নীতির মতো এই ধরনের প্রশাসনিক জিঘাংসা সত্যিই অভূতপূর্ব।
যে পুলিশ প্রশাসন রাজ্যের মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, যেখানে পার্ক স্ট্রিট কামদুনি থেকে শুরু করে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ জয়নগর জয় গাঁ যাত্রাগাছি …. পরের পর মেয়েদের ওপরে নির্যাতন চলতে থাকে, সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে গ্রামে মফসসলে মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে এইভাবে চিকিৎসকদের ওপরে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা ও প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে মানসিক নির্যাতন করা অত্যন্ত হতাশাজনক, লজ্জাজনক ও ভবিষ্যতের পক্ষে চরম দুর্ভাগ্যজনক।এর বিরুদ্ধে শুধুমাত্র চিকিৎসক সমাজের প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়, যাবতীয় আন্দোলনকারী ব্যক্তি ও সংগঠনের যূথবদ্ধ প্রতিরোধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও জরুরি।
আশ্চর্যের ব্যাপার,যে ঘটনার পারম্পর্যে এই ডাক্তারবাবুদের এভাবে হয়রানি করা হচ্ছে তা এক স্বাভাবিক সামাজিক আন্দোলন যা গড়ে উঠেছে অভয়া ও অভয়াদের ন্যায়বিচারের দাবিতে। অথচ হীন উদ্দেশ্যে এঁদের নামে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধারায় মিথ্যে মামলা। এটা শাসকদল তথা সরকারের প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির পরিচায়ক।এই আগ্রাসী হিংস্রতাকে ,আজ থেকে এক বছর আগে ঘটে যাওয়া আরজি কর হাসপাতালের সেই তরুণী চিকিৎসকের ওপরে হওয়া হিংস্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।
এটা হয়তো স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হতেই পারে যে আমলাদের কাজই হলো প্রশাসনের কাজে সহযোগিতা করা। এবং যেহেতু সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রশাসন আসলে দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত হতে পারে না তাই পুলিশ কিংবা অন্যান্য আমলাদের প্রকারান্তরে সেই দলীয় রাজনৈতিক লক্ষ্যে, ইচ্ছে করে বা অনিচ্ছাসত্ত্বেও শামিল হতে হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেটা মানুষকে, তার চাকরি বা পেশানির্ভরতার ক্ষেত্রেও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে বিশিষ্ট করে,তা হলো মানুষের মানবিক গুণাবলী, চারিত্রিক দৃঢ়তা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকতে সচেষ্ট থাকা, এবং অন্য মানুষ বিশেষত নিপীড়িত প্রান্তিক মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতা।এই সময়ে, যখন অনেকেরই মনে হচ্ছে যে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদছে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আর রাজ্য সরকারের পুলিশ প্রায় একইভাবে ন্যায়বিচারের দাবিকে ব্যাহত করছে, তখন বোধহয় মনের গভীরে সেই কবিতার লাইনগুলো আবারও বেঁচে উঠছে,
_যে পিতা তার সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়/আমি তাকে ঘৃণা করি/যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে/আমি তাকে ঘৃণা করি –…._
শিরদাঁড়া বন্ধক না রেখে শাসকের চোখরাঙানি সত্ত্বেও অনেকেই তাই এখনও রাজপথে, তিলোত্তমাকে ভয়মুক্ত করার অঙ্গীকারে।
যে হিংসা ও ভয়ের পরিবেশ থেকে মুক্তির কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, যে দমবন্ধ করা অন্ধকার থেকে আজাদির জন্য মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছিলেন ঐ তরুণী চিকিৎসক, সেই ভয়কে জয় করতে চাই আমরা।









