“প্রতিটি ভোর মৃত্যু এগিয়ে আসার খবর জানায়”
নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে জানকবুল লড়াই করেছেন নাদিরা।
নাদিরার কবিতায় ভাতের গন্ধ, রক্ত আর বারুদের গন্ধ, তিস্তার জল আর হলুদ ফুলের গন্ধ। তারাখসা সন্ধ্যায় গাঢ় চকচকে লিপস্টিকের নিচে শৈশব কৈশোরের পবিত্রতাকে ঘুম পাড়িয়ে, অনাবৃত স্বেদক্লিষ্ট বুকের ভাঁজে আতর লাগিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকে যে ছায়ামানবীরা, বুড়ো বটতলায় মৃত শিশু কোলে কেঁদে ওঠে যে মেয়েটি, যে মেয়েটিকে খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো হয় ধর্ষিত হবার অপরাধে এবং বটবৃক্ষ হয়ে উঠতে চায় যে নারী – এরা সবাই ঘুরে বেড়ায় নাদিরার কবিতার অলিন্দে, এদের নিশ্বাস প্রশ্বাসে আন্দোলিত হয় নাদিরার চেতনা। কবিতার আনাচে কানাচে একবিংশ শতকের ভারতের কীটদষ্ট কুৎসিত নগ্নতা কশাঘাত করে মধ্যবিত্তের নিরাপদ বোধের জগতকে
“আমরা সাড়ম্বরে প্রতিদিন ভারতীয় হয়ে উঠছি/ জাত্যাভিমানে নিজেদের নাম নয় ধর্মগ্রন্থের নাম উচ্চারণ করছি /পরশু সন্ধ্যায় একজন ক্ষমতাবান আমাদের ঘরের কাছ ঘেঁষে বোমা ফেলেছিল/ সৌভাগ্যবশত মাত্র কিছু কোকিল পাখি, নারী হাঁস ও সবুজ ঘাস পুড়ে গেছে/ আমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমাদের বিবেক ছাড়া আর কিছু পুড়ে যায়নি।”
‘রাতকথা’য় মহানগরী ধর্ষণের যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় “আমি এখন সন্ধের পর বড় রাস্তা ধরে হাঁটি না/ …এক রাতে মহানগরীর বুকে মেয়ে বেড়ালের ধর্ষণ হলে …/ আমি প্রতিরাতে যৌনাঙ্গ ঘরে রেখে কর্মক্ষেত্রে যাই।” আমাদের মনে পড়ে যায় কিছু ‘অপ্রাসঙ্গিক কথা’- ‘অত রাতে মেয়েটি সেমিনার রুমে কী করছিল?’, মুখ্যমন্ত্রীর রাতের সাথী প্রকল্প, রাতে বাইরে না বেরোনোর নিদান ইত্যাদি আরো অনেক কিছু।
যন্ত্রণায় নির্বাক নীল হয়ে যেতে যেতে প্রশ্ন করেন নাদিরা “রাষ্ট্রের মেরামত কি আপাতত বন্ধ আছে কিছুদিন বা বছরের জন্য?/ আমি চোখ বন্ধ করে সীমানা কাঁটাতার ছেঁড়া সম্পর্ক দেখি।”
ক্ষণজীবী কবি ভালবাসার ওমে জীবনকে ভরিয়ে নেবার চেষ্টা করেছিলেন আপ্রাণ “হৃদয় অনেকটা বিড়ির মতন/ এক মনে ওম নিলেই কখন ফুরিয়ে আগুনের আঁচ লাগে বোঝা যায় না / কোন রূপালী বা সোনালী বালুর দ্বীপে পৌঁছে নিশানা পুঁতব /তোমরা এপার থেকে অঞ্জলি দিও যুগেদের ব্যথা কান্না… “ নিশ্চিত পরিণতির সামনে দাঁড়িয়ে এই অমোঘ উচ্চারণ মনে করিয়ে
দেয় হযবরল কাব্যগ্রন্থের কবিকে, ৩৫ বছরে অকালমৃত্যুর দ্বারে দাঁড়িয়ে যিনি লিখেছিলেন “ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর / গানের পালা সাঙ্গ মোর”
নাদিরার গানের পালা সাঙ্গ হবার নয়, কারণ তিনি জানেন ‘বছর বছর শিমুল ফুলেই বসন্ত এসেছে’ –
“বুকে যত বিদ্রোহ পুষেছিলে এতকাল / ভাসুক মিছিলের মতো / এভাবে ধীরে ধীরে বিপরীতকামী একটা নদী হবে/… আমরা ভুলে যাইনি চৈত্রের অপর নাম আগুন ও মাটি/ হ্যাঁ মাটিতেই আমরা অন্য মানুষ হবো কারণ মাটি পুড়ে ছাই হয় না…”
সত্তার অবিনশ্বরত্ব আর বসন্তের স্পর্ধা শাশ্বত হয়ে ওঠে নাদিরার কবিতার ছত্রে ছত্রে।
নাদিরার ক্ষতবিক্ষত হৃদয় কোন হালভাঙ্গা নাবিককে দারুচিনি দ্বীপের দিশা দেখায় না –
“কোন এক ভোরে রক্ত মেখে মার্শাল দ্বীপে যাব/ যুদ্ধবিধ্বস্ত অবাধ্য বলাকার মতো/…
ঋতুস্রাব এর দাগ ধুয়েছি চৈত্র মাখবো বলে/ মাস্তুলের পতাকায় মিছিল আঁকার সুখে/ পেট জুড়ে হেঁটে ছিল একটা দেশ কিছু শ্রমিক ও কালো নারী/ মাটিতে বৃষ্টি পড়েনি কতদিন/…রক্ত মোছেনি / এবছর পশ্চিমী ঝঞ্ঝা হবে/ সুনামির মতো জীবন নদীর মতো /…মিছিলে ভরা…”
নাদিরার কবিতায় ‘থৈ থৈ ভালোবাসার জল’। চোখ জুড়ে নামে শান্তি। নাদিরার কবিতায় চাপ চাপ রক্ত আর বারুদ, ঈশ্বরের পাঠানো উল্কায় ঝাঁঝরা হওয়া নারীর ধর্ষিত শরীর, দীর্ঘদিনের অভূক্ত শিশু ও পরিযায়ী শ্রমিকের লাশ আর বিদ্রোহের মশাল। তবু নাদিরার কবিতা স্লোগান হয়ে ওঠেনা। ঘুমের ভিতর ভাতের গন্ধে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। নিহত দেহখন্ডে জ্বলে ওঠে অবাধ্য নদী-জোনাকি। ছাই মাখা চিতাদের পাশে জেগে থাকে প্রবল জীবন তৃষ্ণা। দেশ জুড়ে নিরন্ন নিঃসম্বল মানুষের হাহাকার আর বাঁচার লড়াই , ধর্ষিত নারীর আর্তনাদ আর স্পর্ধা ভাষা পায় নাদিরার লেখায়। ধ্বংসস্তূপে শুয়ে আলোর স্বপ্ন দেখেন নাদিরা-
“আমার কবর নীরবে খুঁড়বো/ পাখিদের শান্তি ভাঙতে চাই না/ সূর্য উঠলে আবার আসবো আলো নিতে /ততদিন মশালে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে দাও”।
শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে। নাদিরা মৃত্যুর কথা হলে ঘোড়ার লাগামের স্বপ্ন দেখেন। পক্ষীরাজের পিঠে করে লোকান্তরে যাওয়া মেয়ে হারিয়ে যেতে পারেনা, নাদিরার মৃত্যু নেই –
“বিদীর্ণ গাছের বুকে লেগে থাকে রক্ত/ আজও বুড়ো অশ্বত্থ যুদ্ধের স্বপ্ন দেখে/… একদিন অশ্বত্থ মরে যায় নীরবে/… অন্তঃসত্ত্বা কবর পায় সেই গর্তে/ বৃষ্টি পড়ে- কাদা হয় সমাধিতে।/ শ্রাবণে আরেকটি শিশু অশ্বত্থ জন্মেছে।”












কোলকাতা থেকে যত দূরত্ব বাড়ে, আলোটা ততই কমে আসে । কমে আসা আলোয় আবছা সেই উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক শহর দিনহাটা । অভয়া মঞ্চ এবং প্রণতি প্রকাশনীকে ধন্যবাদ দিনহাটার মেয়ে নাদিরা আজাদ এর কবিতা সংকলন প্রকাশ করার জন্য । অনেক বই ই কেনা হয়, তারপর একটু উল্টে পাল্টে দেখে রেখে দেওয়া হয় । নাদিরার কবিতাভুবন নিয়ে গোপার ছোটো কিন্তু অসাধারণ লেখাটা বাধ্য করলো বইটা আবার খুলে বসতে । অনেক ধন্যবাদ।