এখানে ‘ভগবন’ অশরীরী কেউ নন। মানবসমাজের মধ্যে জন্ম নেওয়া এক যুগদ্রষ্টা মহামানব। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে জম্বু দ্বীপের এই সেরা রত্নের আবির্ভাব। তিনি গৌতম বুদ্ধ ( খ্রিস্ট পূর্ব ৫৬৩ – ৪৮৩)। সুগত বুদ্ধ সাধারণের মধ্যে প্রচলিত পালি ভাষায় সহজ ও সংক্ষিপ্ত ভাবে তাঁর দেশনা (Sermon) জানাতেন। দু;খ, শোক, জড়া, ব্যাধি, মৃত্যু পরিবৃত জীবনে মানুষ তাঁর দর্শনের (Philosophy) মাধ্যমে মুক্তির (Enlightment) বাণী অনুভব করে। তাঁরা সংস্কৃত ও প্রাকৃত – পালি মিশ্রিত ভাষায় তাঁকে শ্রদ্ধাসুলভ ‘ভগবন’ সম্বোধন করতেন। তথাগত বুদ্ধকে বিশ্বের সর্বকালের সেরা দার্শনিক (Philosopher) বলা হয়ে থাকে কারণ জাগতিক কিছু বিষয় ত্যাগ (Renunciation) ও আত্মনিয়ন্ত্রণের (Self Control) মাধ্যমে তিনি মুক্তির পথ প্রদর্শন করতে সক্ষম হন। অমিতাভ বুদ্ধের জন্ম লুম্বিনীতে (নেপাল), বোধি লাভ গয়ায় (বিহার), প্রথম দেশনা সারনাথে (উত্তরপ্রদেশ), মূল কর্মভূমি মগধের রাজগৃহে (বিহার) ও কোশলের শ্রাবস্তীতে (উত্তরপ্রদেশ), অন্তিম দেশনা বৈশালীতে (বিহার) এবং মহাপরিনির্বাণ কুশীনারায় (উত্তরপ্রদেশ)। ভজ্জি রাজ্যের লিচ্ছবিদের ঐশ্বর্যশালী বৈশালী নগরীতে (বিহার) তিনি তিনবার গিয়েছিলেন। কৈশোরে পাঠ নিতে, মধ্যগগনে বৈশালীর নাগরিকদের আকুল আহবানে সেখানকার মহামারী নিয়ন্ত্রণ করতে (Plague Epidemic) ও সদধম্ম প্রচার করতে এবং বার্ধক্যে জম্বুদ্বীপের সুবিখ্যাত জনপদশোভিনী আম্রপালির একান্ত অনুরোধে তাঁকে এবং তাঁর সহচরীদের দেশনা প্রদান করে সংঘে (Buddhist Hermitage) অন্তর্ভুক্ত করতে। আর একদা মহাবীর, বুদ্ধ, সারিপুত্ত, মোগগোলান, সম্রাট অশোক প্রমুখের পদধূলি প্রাপ্ত নালন্দায় (শিলাও, বিহার) বুদ্ধ-পরবর্তীকালে নালন্দা মহাবিহার এবং তদানীন্তন বিশ্বের সবচাইতে বৃহত্তম, খ্যাতনামা এবং দীর্ঘস্থায়ী নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। তাই সারনাথের পর ভগবন বুদ্ধের পদরেণু ধরে আমাদের এবারের অভিযাত্রা বোধগয়া, রাজগীর, নালন্দা, বৈশালী এবং বুদ্ধের পরিব্রজনধন্য পাটলিপুত্র বা পাটনায়(বিহার)। সেইসঙ্গে সমসাময়িক অপর শক্তিশালী দার্শনিক মহাবীরের পদরেণু ধরে পাওয়াপুরী (নালন্দা, বিহার) এবং বাসুকুণ্ড (বৈশালী, বিহার)।
‘সব্যে জীবা সুখিত্তা হোন্তু, নিব্বানম পরম সুখম।‘
হিমালয়ের পাদদেশে বর্তমান নেপালের তরাই অঞ্চলে কপিলাবস্তু নামক এক ক্ষুদ্র রাজ্যের লুম্বিনীতে ক্ষত্রিয় শাক্য বংশের নৃপতি, মতান্তরে পশ্চাদপদ কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের নায়ক বা দলপতি, শুদ্ধোধনের গৃহে সিদ্ধার্থের জন্ম। শৈশবে মাতা মায়াদেবীর মৃত্যুর কারণে মাতৃস্বসা গৌতমী কর্তৃক মানুষ। সেই থেকে সিদ্ধার্থের নাম গৌতম। পিতার ইচ্ছা ছিল গৌতম বড় যোদ্ধা এবং দেশনায়ক হবেন। সেইমত তাঁকে মল্লযুদ্ধ, যুদ্ধবিদ্যা সহ রাজপাটের উচ্চাঙ্গ তালিম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গৌতমের অভিনিবেশ ছিল মানুষকে কিভাবে যাবতীয় দুঃখ – বেদনা থেকে পরিত্রাণ দেওয়া যায় সেই বিষয়ে। এমতাবস্থায় শুদ্ধোধন তাঁকে গোপা বা যশোধরা নামক এক সুন্দরী কন্যার সঙ্গে বিবাহ দিয়ে সংসারী করার চেষ্টা করেন। রাহুল নামে তাঁদের এক পুত্রের জন্ম হয়। কিন্তু সংসারের সমস্ত মায়ার বন্ধন কাটিয়ে ২৯ বছর বয়সে এক গভীর নিশীথে সারথি ছন্দকের সহায়তায় তিনি গৃহত্যাগ করে গভীর অরণ্যে চলে যান।
কথিত আছে কপিলাবস্তু থেকে দীর্ঘপথ পরিব্রজন করতে করতে গৌতম বর্তমান গয়ার কাছে পৌঁছন। অরহৎ (Insight) লাভের উদ্দেশ্যে সেখানে গয়াশির পাহাড়ের একটি গুহায় আলারা কালামা, উদক রামপুত্ত প্রমুখ যোগীদের নির্দেশিত পথে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। কিন্তু দীর্ঘ তপস্যার পরেও বোধি (Knowledge) লাভ হয়না, বরং তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কথিত আছে পাহাড় থেকে নেমে অরণ্য ও মোহনা নদী পেরিয়ে তিনি ভগ্নদেহে উরুবিল্ব গ্রামে পৌঁছে এক বট বৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেন। তাঁকে ঐ অবস্থায় দেখে সুজাতা নাম্নী এক স্থানীয় রমণী পয়সান্ন খাইয়ে তাঁর প্রাণ রক্ষা করেন। গৌতম উপলব্ধি করেন শুধুমাত্র দেহকে কষ্ট দিয়ে সিদ্ধিলাভ হয়না, প্রকৃত জ্ঞানলাভই মুক্তি (Liberation through Enlightment)। এরপর তিনি নৈরঞ্জনা নদী অতিক্রম করে নদীতীরে একটি অশ্বত্থ বা পিপুল বৃক্ষের (বোধি বৃক্ষ) নিচে বজ্রশিলায় অধিষ্ঠান করে ধ্যানে (Meditation) বসেন। ৪৯ দিনের মাথায় বৈশাখী পূর্ণিমায় দিব্যজ্ঞান (বোধি) অর্জন করে বুদ্ধ (Buddha) বা জ্ঞানী নামে পরিচিত হন। স্থানটির নাম হয় বোধগয়া। পরে সেখানে সম্রাট অশোক মহাবোধি মন্দির নির্মাণ করেন। পরবর্তিতে সমস্ত বৌদ্ধ দেশ ও সম্প্রদায় তাঁদের এই পবিত্রতম এই তীর্থে বহু মঠ,মন্দির, স্তূপ নির্মাণ করেন।
“মানুষের দুঃখের মূল কারণ হল কামনা – বাসনা। এর থেকে মুক্তি পেলেই দুঃখের অবসান হয়।“
বুদ্ধত্ব লাভ করে গৌতম অন্যদের মুক্ত করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। প্রথমে দুই শ্রেষ্ঠী কে সদধম্ম দর্শন বিষয়ে সংক্ষিপ্ত উপদেশ বা দেশনা (Sermon) প্রদান করেন। প্রথম সংগঠিতভাবে দেশনা প্রদান করেন বারানসীর কাছে ইসিপাটান বা সারনাথের মৃগদাবে। তাঁর প্রথম দিকের শিষ্যদের মধ্য উল্লেখযোগ্য অসসজী। তাঁর প্রবর্তিত সদধম্ম ভগবন বুদ্ধের পদরেণু ধরে (সৎ অনুশীলন) প্রচারের প্রথম সহযোগী শ্রমণরা (Monks) ছিলেন সারিপুত্ত, মোগগলান, মহাকাশ্যপ, আনন্দ এবং অনিরুদ্ধ। বুদ্ধ এবং তাঁরা তদানীন্তন ষোড়শ জনপদের অন্তর্গত মগধ, কোশল, কাশী, বৎস, অবন্তী, চেদি, ভজ্জি প্রমুখ এবং উত্তর ও পূর্ব জম্বু দ্বীপের লিচ্ছবি, নায়, মল্ল, কোলিরয়, শাক্য, মৌরিয় জাতি রাষ্ট্রগুলিতে এবং তপোবন, জেটিয়ান, রাজগৃহ, পাটলিগাম, বৈশালী, পাবা, ভোগনগর, কুশীনারা, কপিলাবস্তু, শ্রাবস্তী, কোশাম্বি, সাকেত, বিদিশা, উজ্জেনি, সাঁচি, সাঙ্কাশ্য প্রভৃতি নগরীগুলিতে পরিব্রজন এবং সদধম্ম প্রচার করে চলেন। রাজগৃহ (রাজগীর) এবং শ্রাবস্তী ছিল বৌদ্ধ সংঘের প্রধান কেন্দ্র। বুদ্ধ এবং তাঁর সহযোগী শ্রমণরা (Monks) সংঘের আশ্রমে (Monasteries) অনাড়ম্বর সমতাভিত্তিক জীবনযাপন করতেন এবং নগর পরিক্রমায় ভিক্ষান্নে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতেন। গৌতম বুদ্ধের সিংহের ন্যায় দেহসৌষ্ঠব, মুখমণ্ডলের উজ্জ্বল দীপ্তি,ব্যক্তিত্বের অমোঘ আকর্ষণ, জ্ঞান, বিচক্ষণতা, নেতৃগুণ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে ভারতের প্রথম সাম্রাজ্যের স্থপতি মগধাধিপ জৈন উপাসক শেনীয় বিম্বিসার তাঁকে সিংহাসন ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং তারপর বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বুদ্ধের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। বিম্বিসারের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং পরবর্তীতে বিম্বিসারকে বন্দী ও হত্যা করে মগধের সিংহাসন দখল করা পরাক্রমশালী অজাতশত্রু প্রথমদিকে বুদ্ধের ঘোর বিরোধিতা করলেও পরে বুদ্ধের অনুরাগী হয়ে ওঠেন। তার উদ্যোগে বুদ্ধের নির্বাণের পর রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহায় প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
শাক্যমুনি বুদ্ধের ভাবধারায় (School of Thoughts) উদ্বুদ্ধ হয়ে মগধ ও কোশলের পরাক্রমশালী রাজা বিম্বিসার ও প্রসেনজিৎ, লিচ্ছবি সেনাপতি সিহ, জগৎবিখ্যাত চিকিৎসক জীবক, অতিধনী শ্রেষ্ঠী অনাথপিন্ডক ও মিগর, গুনবতী শ্রেষ্ঠীকন্যা বিশাখা, মহাপ্রজাবতী ক্ষেমা, রূপবতী উপ্পলবন্যা, ভুবনবিখ্যাত বৈশালীর জনপদকল্যাণী আম্রপালি বা অম্বাপালি প্রমুখ স্বনামধন্য ব্যক্তিরা ছাড়াও অগুন্তি সাধারণ মানুষ বৌদ্ধ দর্শনের (Buddhist Philosophy) অনুগামী হয়ে ওঠেন। এদের অনেকেই সংসারত্যাগী ভিক্ষু হয়ে বৌদ্ধ সংঘে যোগ দেন। বাকিরা সংসার জীবনের মধ্যে উপাসক থেকেই বৌদ্ধ দর্শন অনুশীলন করতে থাকেন। অতিকথা (Myth) ছাড়াও বিভিন্ন বৌদ্ধ সাহিত্যে বলা হয়েছে গৌতম বুদ্ধ ছিলেন সুনিয়ন্ত্রিত, সংযমী, সহিষ্ণু, সুভাষিনী, স্নিগ্ধময়, শৌর্যবান এক সৌম্য পুরুষ, সকলের কাছে যার আকর্ষণ ছিল দুর্মর। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড জ্ঞানী, বুদ্ধিমান এবং প্রত্ত্যুতপন্নী, যার মাধ্যমে সমকালীন বহু সমস্যা, বাধা এবং জটিলতাকে তিনি অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন সতর্ক, ক্ষিপ্র ও দক্ষ এক মল্লবীর, যার কারণে ঈর্ষান্বিত খুল্লতাত ভ্রাতা দেবদত্ত, রাজতন্ত্রে বিরোধী শক্তি, ব্রাহ্মণ – পুরোহিত গোষ্ঠী সহ বিভিন্ন অশুভ শক্তি নিয়োজিত আততায়ীদের প্রাণঘাতী আক্রমণগুলি প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন তিনি ভাল ইন্দ্রজাল জানতেন, প্রয়োজনে অলৌকিকতা (Miracle) প্রদর্শন করে সম্মোহিত করতে পারতেন। ঘাতক দস্যু কিংবা অতি কৌতূহলী রাজা প্রসেনজিতের সহস্র বুদ্ধ দর্শন এগুলির উদাহরণ। প্রায় অর্ধ শতাব্দী অভিযাত্রার অন্তে শেষবারের মত পরিব্রজনায় বৈশালীতে অন্তিম দেশনা শেষে চলার পথে মল্ল রাজ্যের পাবা গ্রামে এক কর্মকারের গৃহে থাকার সময় সম্ভবত আন্ত্রিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। কেউ কেউ সন্দেহ করেন তাঁকে প্রদান করা শূকরের মাংসে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। বর্তমান গোরক্ষপুরের নিকট কুশীনারা পৌঁছে ৮০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। বৌদ্ধ মতে মহানির্বাণ বা মহাপরিনির্বাণ (Ultimate End)।
“হে শ্রমণ, জাগতিক যাবতীয় যন্ত্রণার কারণ কোনও কিছু পাওয়ার, ভোগের ও ক্ষমতার প্রতি তীব্র কামনা এবং লোভ ও লালসা। তাই তীব্র কামনা, লোভ ও লালসাকে দূর করতে হবে। সঠিক বিশ্বাস, প্রতিজ্ঞা, বক্তব্য, কর্ম, জীবনযাপন, প্রচেষ্টা, চিন্তা ও মনসংযোগ অবলম্বন করতে হবে। তাহলেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। “
গৌতম বুদ্ধ প্রাচীন ভারতের দ্বন্দ্ব তত্ত্বের (Dialectics) সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। বুদ্ধ নাস্তিক (Athiest) ছিলেন এবং কোনরকম আত্মার অস্তিত্ব মানতেন না। তিনি বেদ, অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার, ধর্মীয় যাগ – যজ্ঞ, আচার – অনুষ্ঠান, পশুবলি ইত্যাদির বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু তিনি পুরোদস্তুর বস্তুবাদী ছিলেন না। আত্মার পরিবর্তনশীল অবস্থানের অস্তিত্ব মানতেন। তিনি বর্ণাশ্রম, জাতিভেদ এবং দাস ব্যবস্থা মানতেন না। তাঁর সংঘে পশ্চাদপদ জাতিদের গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর দর্শন ও জীবনপথ ছিল সহজ ও সাধারণের জন্য। মানুষকে মুক্তির পথ দেখানোই ছিল তাঁর লক্ষ্য। সেইসময়ের নিরিখে প্রতিটি যুদ্ধবাজ, ক্ষমতা ও ভোগলিপ্সু রাজতন্ত্র এবং তাদের সহযোগী ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পুরোহিততন্ত্রের ধর্মীয় জাঁকজমকপূর্ণ আচার – অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে এগুলি ছিল বিপ্লবী সিদ্ধান্ত ও ঘটনা। প্রথম দিকে নারীদের সংঘে গ্রহণ না করলেও পরে জনদাবিতে নারীদের জন্য পৃথক সঙ্ঘ গঠন করেন। মাতা গৌতমি, স্ত্রী গোপা এবং পুত্র রাহুল সংঘে যোগ দেন। তিনি মনে করতেন মানুষের দুঃখ কষ্টের কারণ ভোগ – লিপ্সা – লোভ। ভোগ – লিপ্সা – লোভকে জয়ের মাধ্যমে মানুষের দুঃখ কষ্টকে জয় করা যায়। তাঁর পথ অষ্টাঙ্গিক মার্গ – (১) সঠিক বিশ্বাস, (২) সঠিক সঙ্কল্প, (৩) সঠিক বক্তব্য, (৪) সঠিক কর্ম, (৫) সঠিক জীবনযাপন, (৬) সঠিক প্রচেষ্টা, (৭) সঠিক চিন্তা এবং (৮) সঠিক একাগ্রতা বা সমাধি। দেহকে অতিরিক্ত কষ্ট না দেওয়া, আবার ভোগসুখে গা ভাসানো নয়, তিনি মঝঝিম পথ বা মধ্য পথ গ্রহণ করতে বলেছেন। তাঁর বর্ণিত পঞ্চশীল নীতি হল – (১) অহিংসা, (২) অচৌর্য, (৩) সততা, (৪) সৎ চরিত্র এবং (৫) সঠিক জীবনযাত্রা যেখানে অস্ত্র, প্রাণী, মাংস, মদ ও বিষ নিষিদ্ধ। বৌদ্ধ দর্শনে চারটি অরহৎ (সর্বোচ্চ সত্য) – (১) জন্ম, জড়া, ব্যাধি, মৃত্যু সবকিছুতেই আছে যন্ত্রণা। (২) যন্ত্রণার রয়েছে কারণ । ১২ টি কারণ (দ্বাদশ নিদানঃ লোভ, ক্রোধ, অসুয়া, দম্ভ, মিথ্যাভাষণ, চৌর্যবৃত্তি, ভোগ, অনাচার (অবৈধ যৌন সংসর্গ), ব্যাভিচার (যথেচ্ছ যৌন সংসর্গ), নিগ্রহ, হত্যা, নেশা এবং উৎকোচ – উপহার গ্রহণ। (৩) যন্ত্রণা থেকে মুক্তি প্রয়োজন। (৪) মুক্তির পথ অষ্টাঙ্গিক মার্গ। অন্তিম মুক্তি ‘নির্বাণ’।
বুদ্ধের তত্বকে ‘প্রতীত্য সম্যুৎপাদ’বা বস্তুর নির্ভরশীল উদ্ভবের ধারণা বলা হয়। সারা বিশ্ব নিরবিচ্ছিন্ন গতিতে আছে। কোনও বস্তুর ধ্বংস, কোনও বস্তুর অবিচল সৃষ্টি হয়ে চলেছে। …… বুদ্ধের মতে ‘নির্বাণ’ হল ভোগ – লিপ্সা, লোভ – লালসার বিলোপ সাধন এবং পুনর্জন্মের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি। বুদ্ধ বাস্তব জগতকে গ্রহণ করেছিলেন। বৌদ্ধ দর্শনে ‘নির্বাণ’ হল সকল কামনা থেকে মুক্তি। বুদ্ধের দর্শনে আধুনিক দুটি আবিস্কার ছিল ‘অনিত্যবাদ (কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়)’ এবং ‘অনাত্মাবাদ (দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন আত্মা নামক স্থায়ী কিছু নেই)’। বৌদ্ধ দর্শন প্রাচীন ভারতে প্রথম দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism) নিয়ে আসে। গৌতম বুদ্ধের দর্শন প্রচারের অগগশাবকরা ছিলেন (১) সারিপুত্ত, (২) মোগগলান, (৩) তিসস, (৪) কৌদিন্য, (৫) অরহৎ, (৬) যশ, (৭) উপালি, (৮) অনঘ, (৯) সুভদ্দ এবং (১০) আনন্দ। আবার জাপানি তৈবৎসু প্রমুখ ধারার মতে সারিপুত্ত, মোগগলান, আনন্দ, অনিরুদ্ধ, মহাকাশ্যপ, মহাকাত্যায়ন, উপালি, পুণ্য, শুবুদ্ধি এবং রাহুল। তাঁদের এবং তাঁদের শিষ্যদের মাধ্যমে পূর্ব, মধ্য, উত্তর, উত্তর – পশ্চিম, দক্ষিণ, উত্তর – পূর্ব ভারতে, সমগ্র জম্বুদ্বীপে বৌদ্ধ দর্শন ছড়িয়ে পড়ে এবং জনপ্রিয়তা পায়। ক্রমে প্রসারিত হয় লাদাখ, কাশ্মীর, গান্ধার (পাকিস্তান), কম্বোজ (আফগানিস্তান), কুচি, খোটান, কাশগড় (মধ্য এশিয়ার সিন কিয়াং, তাজিকিস্তান, কিরঘিজিয়া অঞ্চল), তিব্বত, ভূটান, চিন, মঙ্গোলিয়া, কোরিয়া, জাপান, ব্রহ্ম (মায়ানমার), শ্যাম (তাইল্যান্ড), সুবর্ণ দ্বীপ (সুমাত্রা), জাভা, মালয়, চম্পা (ভিয়েতনাম – লাওস), কম্বোজ (খমের বা কম্বোডিয়া), তাম্রপর্ণী (সিংহল) প্রভৃতি দেশে। বুদ্ধ নিজে কোন উত্তরাধিকারী স্থির করে দিয়ে যান নি। বুদ্ধ নিজে কোন কিছু লিখে না গেলেও তাঁর দর্শন, উপদেশাবলী এবং তাদের নিয়ে পরবর্তীকালে লেখা হয় তিন পেটিকা বা ত্রিপিটক, ধম্মপদ সহ অজস্র পুথি, কোষ গ্রন্থ ইত্যাদি। তাদের নিয়ে ক্রমে বিভিন্ন ভাষায় বিপুল বৌদ্ধ শাস্ত্র ও সাহিত্য গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে তক্ষশীলা (পাক পাঞ্জাব), নালন্দা, বিক্রমশীলা (ভাগলপুর), ওদন্তপুরী (নালন্দা), সোমপুর বা পাহাড়পুর (রাজশাহী), জগদ্দল (নওগাঁ, দিনাজপুর) প্রমুখ খ্যাতিমান বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়। পুস্পগিরি (অন্ধ্র), বিক্রমপুর (ঢাকা), শালবন (কুমিল্লা), অজন্তা (মহারাষ্ট্র), সাঁচি (মধ্যপ্রদেশ), মোগলমারি (তমলুক) প্রমুখ বিখ্যাত বৌদ্ধ মঠ ও মন্দির। বহিরভারতে গোমতী, বামিয়ান, বরবুদুর, আঙ্করভাট, আঙ্করধাম প্রভৃতি সুবিখ্যাত বৌদ্ধ মঠ ও মন্দির।
“বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, ধরমং শরণং গচ্ছামি, সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি”
বধগয়া অথবা বুদ্ধগয়াঃ পাটনা থেকে গাড়ির পথে বোধগয়া ১৮৫ কিমি, রাজগীর থেকে ৭৬ কিমি, গয়া থেকে ১৬ কিমি এবং কলকাতা থেকে ৪৮৯ কিমি। নিকটস্থ বিমানবন্দর গয়া, দুরত্ব পাঁচ কিমি। কলকাতা থেকে গাড়িতে, ট্রেনে, বাসে যেতে হয়। ট্রেনে গয়া স্টেশনে নেমে গাড়ি বা অটো তে চেপে যেতে হবে। সময় বাঁচাতে হাওড়া থেকে ২২৩০৩ হাওড়া – গয়া বন্দেভারত এক্সপ্রেসে যাওয়া যেতে পারে। ব্রেকফাস্ট ও লাঞ্চ মেলে। বৃহস্পতিবার বাদ দিয়ে প্রতিদিন সকাল ৬.৪৫ এ হাওড়া থেকে ছেড়ে গয়াতে ১২.৩০ এ পৌঁছনোর কথা। ৪৫৮ কিমি। পথে দুর্গাপুর, আসানসোল, ধানবাদ, পরেশনাথ এবং কোডারমায় থামে। পরেশনাথ – কোডারমা – গয়া নিসর্গ দৃশ্য ভারী সুন্দর ও উপভোগ্য। পুরাতন গয়া নগরী ঘিঞ্জি ও অপরিষ্কার হলেও বোধগয়া যাওয়ার পথে একই অটোতে সামান্য দক্ষিণা বাড়িয়ে হিন্দুদের পবিত্র তীর্থ বিষ্ণুপাদ মন্দির ও সীতাকুণ্ড দেখে নেওয়া যেতে পারে। রাস্তা খুবই ভাল। রাস্তার সমান্তরাল বয়ে চলেছে ফলগু নদী। বেশ বড়। তবে ছোটনাগপুর মালভূমি থেকে উৎপন্ন অন্যান্য নদীর মত শীত ও গ্রীষ্মে শুষ্ক, বর্ষায় তরঙ্গময়। হাজারীবাগ থেকে লীলাজান ও চাতরা থেকে মোহনা নদী উৎপন্ন হয়ে উত্তর প্রবাহিনী হয়ে বোধগয়ার তিন কিলোমিটার উত্তরে মিলিত হয়ে ফল্গু নাম নিয়ে পরে পুনুপুন নদীতে মিশে গঙ্গায় মিশেছে। লীলাজান বৌদ্ধ শাস্ত্রে নৈরঞ্জনা নামে পরিচিত এবং নৈরঞ্জনা ও মোহনা বৌদ্ধদের কাছে খুবই পবিত্র নদী।
মহাবোধি মন্দির (Mohabodhi Temple Complex) প্রধান দর্শনীয় স্থান। এটি এবং সংলগ্ন স্তূপগুলি সম্রাট অশোকের সময় নির্মিত হলেও কালের মন্দিরায় ক্ষয়, আক্রমণ, সংস্কারের মধ্যে দিয়ে গেছে। এর পিছনের দিকে রয়েছে চতুর্থ প্রজন্মের পবিত্র বোধি বৃক্ষ। লুম্বিনী, বোধগয়া, সারনাথ এবং কুশীনারা বৌদ্ধদের কাছে পবিত্রতম তীর্থস্থান। তারমধ্যে বুদ্ধের বোধিলাভের জন্য বোধগয়া বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে। তাই সমস্ত বৌদ্ধ দেশগুলি এবং বিভিন্ন বৌদ্ধ সম্প্রদায় এখানে সুন্দর সুন্দর বৌদ্ধ মঠ ও মন্দির (Monastery) এবং সুন্দর সুন্দর বুদ্ধমূর্তি গড়ে তুলেছেন। প্রতিটিই দেখার মত। এর মধ্যে টিবেটান, থাই, জাপানিজ, ভূটানিজ, বার্মিজ, চাইনিজ মনাস্ট্রিগুলি অবশ্যই দর্শনীয়। বোধগয়া বেশ জমজমাট জায়গা। দেশবিদেশের পুণ্যার্থী এবং পর্যটকদের ভিড়ে সরগরম। মহাবোধি মন্দির প্রাঙ্গণে প্রত্যুষ, অপরাহ্ন, সন্ধ্যা একেকরকম মন আবিষ্ট করা পরিবেশ। বর্ণাঢ্য, ভাবগম্ভীর, শান্তিময়। অসংখ্য ভিক্ষু ও পুণ্যার্থী প্রার্থনারত। কিন্তু কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা হৈচৈ নেই। মহাবোধি মন্দির পায়ে হেঁটে এবং অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলি ব্যাটারি চালিত টোটোতে করে ঘুরে নেওয়া সুবিধাজনক। বোধগয়াতে কম দামি থেকে বহুমূল্যের আধুনিক সব হোটেল রয়েছে। মহাবোধি মন্দিরের কাছে থাকাই সুবিধাজনক।
বোধগয়া থেকে ১২ কিমি দূরে নৈরঞ্জনা ও মোহনা নদীর সেতু পেরিয়ে ১২ কিমি দূরে গয়া শির পাহাড়ের উপর বুদ্ধের প্রাগবোধি তপস্যার গুহাটি অবশ্য দ্রষ্টব্য। টোটো বা গাড়ি পাহাড়ের গোড়ায় যায়। তারপর হেঁটে উঠতে হয়। অক্ষম ও বয়স্কদের জন্য ডুলির ব্যবস্থা রয়েছে। এখন রোপওয়ে তৈরি হচ্ছে। পথটুকুতে হকার, ভিখারি এবং হনুমানের উৎপাত আছে। গুহাকে ঘিরে একটি সুন্দর বৌদ্ধ মনাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। হিন্দু পুরোহিতরাও গুহার মধ্যে ঢুকে দুটি দেবী মূর্তি রেখে দর্শনার্থীদের থেকে টাকা তুলছে। পাহাড়টির নামই হয়ে গেছে দুঙ্গেশ্বরী। মহাবোধি মন্দিরের মধ্যেও কিছু হিন্দু পুরোহিত ঢুকে পড়ে মন্ত্র আউড়ে টাকা তুলছে। আবার ভিক্ষা ব্যবসায়ীরা দেওয়ালের পাশে লাইন দিয়ে অন্ধ মানুষকে দাঁড় করিয়ে টাকা তুলছে। প্রাচীন উরুবিল্ব বর্তমান বকরোর গ্রামে সুজাতার গৃহে একটি বিশাল স্তূপ নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্ভবত দেবপালের সময়। সেটি অবশ্য দ্রষ্টব্য। জায়গাটির নাম হয়ে গেছে সুজাতাগড়।
রাজগীর: রাজগীরের সঙ্গে পাটনা ও কলকাতার ট্রেন যোগাযোগ আছে। বোধগয়া থেকে গাড়িতে যাওয়ার সুবিধা। দূরত্ব ৭৬ কিমি। সমগ্র বিহারের রাস্তাঘাট এখন খুব ভাল। আইনশৃঙ্খলাও আগের চাইতে অনেক ভালো। সুতরাং যাতায়াত সহজ হয়ে গেছে। সময়ও অনেক কম লাগে। সকালে বোধগয়া থেকে গাড়িতে করে নালন্দা ও পাওয়াপুরী ঘুরে বিকেলের মধ্যে রাজগীর পৌঁছনো যায়। রাজগীর থেকে নালন্দা ১৪ কিমি, রাজগীর থেকে পাওয়াপুরী ১৮ কিমি এবং পাওয়াপুরী থেকে নালন্দা ১৪ কিমি। মহাভারতে উল্লিখিত রাজা জরাসন্ধের এবং পরবর্তীকালে ভারতের প্রথম প্রাচীন মগধ সাম্রাজ্যের প্রথম রাজধানী রাজগৃহ অর্থাৎ আজকের রাজগীর। বৈভব, বিপুল, রত্নগিরি, উদয়গিরি ও শোনগিরি – পাঁচটি পাহাড় দিয়ে ঘেরা। তাই একে পাঁচপাহাড়িও বলা হয়। ২০১০ সাল থেকে নতুন করে এখানেই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। গাড়িতে ছাড়াও অটো, টোটো ও ঘোড়ায় টানা টাঙ্গায় ঘোরার ব্যবস্থা আছে। টোটোতে ঘোরাই সুবিধাজনক। থাকার জন্য কম দামি থেকে দামি ভাল ভাল হোটেল আছে। প্রাচীন শহর টি খুবই ঘিঞ্জি। একটু বাইরের দিকে থাকাই ভাল।
বেণুবন (সঙ্ঘ জীবনে বুদ্ধের ১২ বছরের বাসস্থান), অজাতশত্রুর দুর্গের ভগ্নাবশেষ (৬০০ খ্রিস্টপূর্ব), বৈভব পাহাড়ের সপ্তধারার ব্রহ্মকুণ্ড সহ সপ্তকুণ্ড বিভিন্ন উষ্ণতার প্রস্রবণ, বিম্বিসারের কারাগার, স্বর্ণভাণ্ডার, শোনভাণ্ডার, জীবকের আম্রকুঞ্জ, গৃধ্বকূট পাহাড়, সাইক্লোপিয়ান নগর প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ, সরস্বতী নদী, জৈন মন্দির, পিপাল গুহা, মনিয়ার মঠ প্রমুখ দর্শনীয় স্থান। পরবর্তীকালে যুক্ত হয়েছে বিশ্বশান্তি স্তূপ, রোপওয়ে, জঙ্গল সাফারি, গ্লাস ব্রিজ ইত্যাদি। শেষের দুটি স্থান ভ্রমণ সময়সাপেক্ষ। পাঁচদিন আগে থেকে অন লাইনে টিকিট পাওয়া যায়। আগে টিকিট কেটে নিলে সুবিধা। বেনুবন ছাড়া অন্যান্য প্রাচীন দ্রষ্টব্য স্থানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ভাল নয়। বাঁদরের উৎপাত। একদা রাজগীরের প্রধান আকর্ষণ ব্রহ্মকুন্ডকে ঘিঞ্জি নির্মাণ, অগুন্তি অপরিচ্ছন্ন মন্দির এবং নোংরা দিয়ে নরককুণ্ড বানিয়ে রাখা হয়েছে। বরং জাপানি ও ভুটানি বৌদ্ধ মন্দির, জৈনদের ভিরায়াত মন্দির কমপ্লেক্স খুবই সুন্দর।
নালন্দা মহাবিহার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ: বর্তমান দক্ষিণ বিহারের মগধ ডিভিশনের নালন্দা জেলার শিলাও শহরের কাছে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে ১৯১৬ তে এটি আবিস্কার হয়। এক কিমি ব্যাপী ধ্বংসাবশেষের নিচে নাকি আরও নয় কিমি নির্মাণ চাপা পড়ে রয়েছে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ অন্যতম দর্শনীয় স্থান এবং মহাবোধি মন্দিরের মত ইউনেস্কো বিশ্বঐতিহ্য শ্রেণীভুক্ত। এখানে একদা মহাবীর, গৌতম বুদ্ধ, সারিপুত্ত, মোগগলান প্রমুখের পদধূলি পড়েছে। সারিপুত্তের নির্বাণের পর তাঁর স্মৃতিতে ভিক্ষুরা এখানে স্তূপ রচনা করেন। সম্রাট অশোকও নির্মাণ করেন স্তূপ ও স্মৃতিসৌধ। গুপ্ত সম্রাট কুমার গুপ্ত১ এর সময় সম্ভবত ৪২৭ সালে গড়ে ওঠে এই বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। গুপ্তদের পর সুঙ্গ, হর্ষঙ্ক এবং পাল সম্রাটদের সময় এর বিস্তার এবং প্রায় হাজার বছর ধরে বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি। সম্রাট হর্ষবর্ধন এবং সম্রাট দেবপালের বিরাট ভূমিকা ছিল। বাংলার পাল রাজাদের সময় বিশেষত ধর্মপালের সময় খ্যাতির শীর্ষে ওঠে। দেশ বিদেশের দূরদূরান্ত থেকে ছাত্ররা পড়তে আসতেন। বিখ্যাত চিনা পণ্ডিত ও পরিব্রাজক হিউ এন সাং হর্ষবর্ধনের সময়ে ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে এখানে আসেন এবং এখানে থেকে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেন। তখন মহাপন্ডিত শীলভদ্র ছিলেন অধ্যক্ষ। সেইসময় ১০,০০০ আবাসিক ছাত্র এবং ২,০০০ আবাসিক শিক্ষকের বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া এবং উচ্চাঙ্গের অধ্যয়নের সুব্যবস্থা ছিল। এখানকার প্রবেশিকা পরীক্ষা ছিল কঠিন এবং নিয়মকানুন ছিল কঠোর। বিভিন্ন রাজাদের দান ও ব্যবস্থাপনায় এটি চলত। স্থানীয় ১,২০০ টি গ্রামকে এর ভরণপোষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পঞ্ছম ও অষ্টম শতাব্দীতে হূণ এবং গৌদাসের আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগের পর মহারাজ স্কন্দগুপ্ত এবং মহীপাল সংস্কার করেন। ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে কুতুবুদ্দিন আইবকের সেনাপতি বখতিয়ার খলজী পূর্ব ভারত আক্রমণ করার সময় এটি ধ্বংস করে পুড়িয়ে দেয়। অগুন্তি মূল্যবান পুথি এবং জ্ঞান সংকলন চিরতরে হারিয়ে যায়। এরপর ভিক্ষু মুদিতভদ্র কিছুটা সংস্কার করার পর দুজন ব্রাহ্মণ আবার এটি ধ্বংস করে। ক্রমে বিস্মৃতির অতলে পৌঁছে যায় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে মেরামতির জন্য এটি প্রতি শুক্রবার বন্ধ রাখা হয়। সময় নিয়ে নালন্দা দেখা উচিত এবং সরকার প্রশিক্ষিত গাইডের সাহায্য নেওয়া উচিত। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ দেখে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নালন্দা পুরাতত্ব মিউজিয়াম, নালন্দা স্তূপ, নব নালন্দা মহাবিহার, হিউ এন সাং মেমোরিয়াল ইত্যাদি দেখে নেওয়া যেতে পারে। নালন্দায় থাকার জায়গা সীমিত। রাজগীর থেকে ঘুরে নেওয়া যায়।
পাবাপুরীঃ জৈন দর্শনের ২৪ তম এবং সবচাইতে খ্যাতিমান তীর্থঙ্কর জ্ঞাতৃকপুত্র ‘জিন (বিজয়ী)’‘নিরগন্থ (গ্রন্থি বা বন্ধনহীন’) মহাবীরের (আসল নাম বর্ধমান) (খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৯ – ৫২৭) শেষ দেশনা ও নির্বাণের ক্ষেত্র। জৈনদের পবিত্র তীর্থ। কমল সরোবর, জল মন্দির, সামশরণ মন্দির, গাও মন্দির দর্শনীয় স্থান। কমল সরোবরের মধ্যে জল মন্দির এবং রাস্তার বিপরীতে শ্বেত পাথরের কারুকার্য শোভিত মন্দির দুটি খুব সুন্দর। কেউ বিরক্ত না করায় সরোবরে বেলে হাঁস, কায়েম প্রভৃতি জলচর পাখির দঙ্গল নিরুপদ্রবে বসবাস করছে। আশপাশে কয়েকটি ধর্মশালা ও নিরামিষ ভোজনালয় রয়েছে।
পাটলিগ্রাম অথবা পাটলিপুত্র বা পাটনাঃ গঙ্গার দক্ষিণে পাটলিগ্রামে গঙ্গা ও শোন নদীর সঙ্গমে মগধরাজ অজাতশত্রু একটি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং পরে রাজধানী রাজগৃহ থেকে এখানে সরিয়ে আনেন। গণ্ডক ও পুনপুন নদীও কাছাকাছি গঙ্গায় উপনীত হয়েছে। অতীতে গৌতম বুদ্ধ এই পথেই নৌকা করে গঙ্গা পার হয়ে বৈশালী গিয়েছিলেন। সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত, সম্রাট অশোক সহ মৌর্য সম্রাটদের রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র। গুপ্ত সম্রাটদের এবং হরসঙ্ক, নন্দ, শুঙ্গ এবং পাল মহারাজদেরও রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র। মধ্য যুগে পাঠান সুলতানীর সময় শের শাহ সুরী এখানে রাজধানী নির্মাণ করেন। বাংলার নবাব এবং ব্রিটিশদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও ব্যবসা কেন্দ্র ছিল পাটনা। এখন আধুনিক শহর এবং বিহার রাজ্যের রাজধানী। বিহার মিউজিয়াম, গোল ঘর, বুদ্ধ স্মৃতি পার্ক, পাটনা সাহিব গুরুদ্বার, গান্ধী ময়দান, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান। দেশের রাজধানী দিল্লি সহ বিভিন্ন শহরের সঙ্গে রেল, সড়ক ও আকাশপথে যোগাযোগ রয়েছে। জয়প্রকাশ নারায়ন বিমানবন্দর থেকে কলকাতার কয়েকটি উড়ান আছে। রাজধানী এক্সপ্রেস (ভায়া পাটনা), পূর্বা এক্সপ্রেস সহ বহু ট্রেন পাটনার উপর দিয়ে যায়। পাটনা থেকে হাওড়া জনশতাব্দী এবং বন্দেভারত এক্সপ্রেস রয়েছে। পাটনা থেকে কলকাতাররাজধানী এক্সপ্রেস (ভায়া পাটনা), পূর্বা এক্সপ্রেস সহ বহু ট্রেন পাটনার উপর দিয়ে যায়। পাটনা থেকে কলকাতার দূরত্ব ৫৮৩ কিমি।
পাটনা শহরটি বেইলি রোড, বিমানবন্দর, সচিবালয় প্রভৃতি কিছু জায়গা ছাড়া প্রচণ্ড ঘিঞ্জি ও অপরিষ্কার ছিল। এবার দেখলাম বেশ কিছু জায়গা পরিস্কার করে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে অটল এলিভেটেড রোড, গঙ্গা পার দিয়ে ২০.৫ কিমি দীর্ঘ জেপি গঙ্গা পথ এলিভেটেড রোড অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। গান্ধী ও জেপি সেতু দিয়ে মুহুর্মুহু গাড়ি যাচ্ছে উত্তর বিহারে। বোরিং রোড, পাটলিপুত্র কলোনি প্রভৃতি এলাকা জমজমাট, যাদের সঙ্গে কলকাতার চাইতে নয়া দিল্লির সাদৃশ্য বেশি। শহর জুড়ে মেট্রো রেলের কাজ চলছে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে ১৬.৮৬ কিমি দীর্ঘ রেড লাইন এবং উত্তর থেকে দক্ষিণে ১৪.৫ কিমি ব্লু লাইন নির্মাণ চলছে। কিছু অংশে যাত্রী পরিষেবা চালু হয়ে গেছে। লিট্টি চোখা, কাদরি বড়ি, খাজা, ঠেকুয়া ইত্যাদি বিহারের জনপ্রিয় খাদ্য। মোড়ে মোড়ে রয়েছে স্বাদু চম্পারণ মাটন হান্ডি র দোকান।
বৈশালীঃ পাটনা থেকে ৭০ কিমি, হাজিপুর থেকে ৩৬ কিমি এবং মুজফফরপুর থেকে ৩৪ কিমি উত্তর বিহারের ত্রিহুত ডিভিশনে বৈশালী জেলায় এই প্রাচীন নগরী অবস্থিত। একদা পৃথিবীর প্রথম গণতন্ত্র (Democracy), ভজ্জি সাম্রাজ্যের অংশ ৭৭০৭ জন শক্তিশালী লিচ্ছবি গণরাজাদের যৌথভাবে শাসিত গণরাজ্য (People’s Republic) –র ঐশ্বর্যশালী এবং গর্বের রাজধানী। মহাবীর এখানকার বাসুকুণ্ড বা কুন্দলপুর গ্রামে এক ক্ষত্রিয় রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাতা ত্রিশলা ছিলেন লিচ্ছবি দুহিতা। মহাবীরের জন্মস্থানে জৈনরা সুন্দর শ্বেত পাথরের মন্দির নির্মাণ করেছেন। বুদ্ধ জীবনের তিনভাগে তিনবার বৈশালীতে এসেছিলেন। বৈশালীর আরেক গর্ব ছিল জম্বুদ্বীপের সর্বাপেক্ষা সুন্দরী এবং সর্বগুণসম্পন্না জনপদশোভিনী আম্রপালি। বুদ্ধের শেষ দেশনা আম্রপালি এবং তাঁর সহচরীদের গণ্ডকি নদীর পশ্চিমপাড়ে কলুহাতে আম্রপালির প্রাসাদ সমীপে আম্রকুঞ্জে তাঁর পরম ভক্ত বৈশালীর গণরাজাদের অনুরোধ উপেক্ষা করে । বুদ্ধ এবং তাঁর অগ্যশাবকরা দীর্ঘসময় এই আম্রকাননে অধিষ্ঠান করেন। আম্রপালি তাঁর সমূহ সম্পদ, প্রাসাদ, আম্রকানন বৌদ্ধ সংঘে দান করেন এবং সহচরীদের নিয়ে বৌদ্ধ সংঘে প্রবেশ করেন। কথিত আছে তাঁর একমাত্র সন্তান মগধ কুমার বিমলও বৌদ্ধ সংঘে যোগ দেন। বুদ্ধের শেষ দেশনা স্মরণে সম্রাট অশোক এখানে একটি স্তম্ভ ও একটি স্তূপ নির্মাণ করেন। অশোক নির্মিত বিখ্যাত সিংহ স্তম্ভ ও স্তূপ ছাড়াও অন্যদের নির্মিত ১৩ টি স্তূপ রয়েছে এখানে। বুদ্ধের মৃত্যুর শতবর্ষ পরে এখানে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নিকটস্থ অভিষেক পুষ্করিণী, বিশাল কা গড় ইত্যাদির অবশেষগুলি দর্শনীয় স্থান। পাটনা থেকে গঙ্গার উপর দিয়ে গান্ধী বা জেপি ব্রিজ পেরিয়ে দিনের মধ্যে অনায়াসে বৈশালী ঘুরে আসা যায়।











