এ কথা বলা হচ্ছে যে, বিগত এক দশকে ভারত একটি অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার হিসাবে উঠে এসেছে। ভারতের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পগুলো ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রধান ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পগুলো হল, প্রধানমন্ত্রী ধন জন যোজনা (২০১৪), মেক ইন ইন্ডিয়া (২০১৪), স্টার্ট আপ (২০১৫), ডিজিটাল ইন্ডিয়া (২০১৫), উৎপাদন সংযুক্ত প্রণোদনা (২০২১) প্রভৃতি। বলা হচ্ছে, এই ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ও ব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই ভারত ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠবে।
এই বিষয়টার একটা রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার হিসাবে গড়ে ওঠার পাশাপাশি ভারত সাবেকি কল্যাণকর রাষ্ট্রের ধারণা থেকে সরে এসে অতিরাষ্ট্রের ধারণার দিকে চলেছে। অতিরাষ্ট্রের ধারণার বৈশিষ্ট্য হল বিদ্যমান সমস্যাগুলোর (যথা বেকারত্ব, অসাম্য, অপুষ্টি ইত্যাদি) প্রতি যথাযথ নজর না দিয়ে উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধির হার বজায় রাখার চেষ্টা করা। অতিরাষ্ট্রের ধারণাতে মানুষের প্রয়োজনেই যে রাষ্ট্র বা সরকারের উদ্ভব, তাকে গুরুত্বহীন করে দেখানো হয়। এই রকম একটা বিষয় হল দেশের সর্ববৃহৎ উৎপাদক গোষ্ঠী অর্থাৎ ভারতীয় কৃষকের সমস্যা। ভারতীয় কৃষকের জ্বলন্ত সমস্যা হল ঋণগ্রস্ততা ও আত্মহত্যা।
কৃষকের ঋণগ্রস্ততা
এই বিষয়টিকে চারটি দিক থেকে আলোচনা করা হবে। (ক) ২০১৭-১৮ থেকে ২০২৩-২৪ এর পরিসরে ভারতীয় অর্থনীতিতে কৃষির সার্বিক অবদান। (খ) কৃষক সমাজের স্তর বিন্যাসের ধরন ও তার রূপান্তর। (গ) স্তরভেদে গ্রামীণ পরিবারগুলোর কৃষি নির্ভরতা বা মজুরি নির্ভরতার মাত্রা নিরূপণ এবং (ঘ) গ্রামীণ পরিবারগুলোর ঋণের উৎস, ঋণের উদ্দেশ্য ও ঋণগ্রস্ততার মাত্রা অনুধাবন করা।
ভারতবর্ষের উন্নয়ন কার্যক্রমে কৃষির ক্ষেত্র ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে থাকলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখনও মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল। ভারত সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় ২০২৪-২৫ সালে প্রদত্ত তথ্য অনুসারে কর্মসংস্থানের বিবেচনায় কৃষি ক্ষেত্রের প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। ২০১৭-১৮ সালের মোট কর্মরত জনসংখ্যার ৪৪.১ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত ছিল। ২০২৩-২৪ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৪৬.১ শতাংশ। অন্যদিকে, শিল্প ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে। ওই একই পর্বে শিল্প উৎপাদনে কর্মসংস্থান ১২.১ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১১.৪ শতাংশ। সংক্ষেপে বললে, কর্মসংস্থানের নিরিখে আলোচ্য সময়ের পরিসরে শিল্প বা পরিষেবার ক্ষেত্রে কর্মসংকোচন দৃশ্যমান হলেও, কৃষির ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। বরং ৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রসঙ্গত বলা দরকার, পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভের ২০২৩-২৪ সালের হিসাব অনুসারে ভারতের গ্রামাঞ্চলে কৃষিতে নিযুক্তির হার ছিল ৫৯.৮ শতাংশ।
ভারতের কৃষক সমাজ সমগোত্রীয় ছিল না। এখানে একটা স্তরবিন্যাস বরাবরই ছিল এবং তার রূপও ছিল ভয়াবহ। ভয়াবহতা প্রশমিত হলেও তার বিন্যাস সুস্পষ্ট। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ থেকে ভারতের কৃষক সমাজের স্তরভিত্তিক বিন্যাসের ছবি সহজেই অনুধাবন করা যায়। সাধারণভাবে জোতের আয়তন (হেক্টর) অনুযায়ী কৃষি পরিবারগুলোকে ছয়টি স্তরে বিন্যস্ত করা হয়। এগুলি হল, ভূমিহীন (০.০০২ হেক্টর এর কম), প্রান্তিক কৃষক (০.০০২ থেকে ১ হেক্টর জমি), ক্ষুদ্র কৃষক (১ হেক্টর থেকে ২ হেক্টর জমি), আধা মধ্য কৃষক (২-৪ হেক্টর), মধ্য কৃষক (৪-১০ হেক্টর) ও বৃহৎ চাষি (১০ হেক্টর বা তার বেশি)। ২০১৯ সালের এনএসএস রিপোর্ট অনুসারে, গ্রামীণ জনসাধারণের ৮.২ শতাংশ ভূমিহীন। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকই ভারতের কৃষি সমাজের প্রধান শক্তি, প্রায় ৮৬ শতাংশ। প্রসঙ্গত বলা দরকার ২০০৩ সালে এই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের অনুপাত ছিল ৮০.৭৪ শতাংশ । অর্থাৎ ২০০৩ থেকে ২০১৯ এর পরিসরে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। একটু খুটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, মধ্য কৃষক জমি হারিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আরও বোঝা যায়, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষি জোতের আয়তন ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। ২০০৩ সালে পরিবার কিছু কৃষি জোতের গড় আয়তন ছিল ০.৭২৫ হেক্টর এবং ২০১৯ সালে তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ০.৫১২ হেক্টর। সার্বিকভাবে জোতের গড় আয়তন হ্রাস ঘটলেও জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি থেকে মোট মূল্যমান সংযোজন এক নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছে। ২০১১-১২ সালের জিডিপিতে কৃষি থেকে সংযোজিত আয় ছিল ১৫০২ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ১৮.৫ শতাংশ)। ২০২২-২৩ সালে কৃষি থেকে সংযোজিত আয় হয় ৪৪৮৪ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ১৮.২ শতাংশ)। অর্থাৎ এই ১১ বছরে জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কম বেশি একই আছে। এটা প্রমাণ করে, কৃষি বা কৃষক এখনও অর্থনীতির বোঝা নয়।
এবার দেখা যাক কৃষিকাজ কীভাবে সংগঠিত হচ্ছে।
ভারতীয় কৃষির একটা বৈশিষ্ট্য হল বর্গা চাষ। এক্ষেত্রে কোনও কৃষক জমি বর্গাতে নিতে পারেন বা দিতেও পারেন। প্রান্তিক কৃষক অনেক ক্ষেত্রে নিজের জমি কোনও বড় চাষীকে বর্গায় দিয়ে নিজে অন্যত্র মজুরি খাটতে যেতে পারেন। এটা দেখা গেছে ক্ষুদ্র কৃষক গোষ্ঠীর মাত্র ২২ শতাংশ নিজের জমিতে চাষবাস করেন এবং ৫৫ শতাংশ মজুরি খাটেন। এর একটা অন্যতম কারণ হল অধিকাংশ জোত অলাভজনক। মধ্য ও বড় কৃষকদের একটা বড় অংশ নিজের জমিতে কৃষিকাজ থেকে প্রাপ্ত আয়ের উপর নির্ভরশীল। সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ পরিবারগুলোর ৪২ শতাংশ কৃষি নির্ভর এবং সমপরিমাণ অংশ মজুরি নির্ভর।
কৃষক সমাজের ঋণগ্রস্ততার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় সার্বিকভাবে কৃষক সমাজের ৫০ শতাংশ ঋণগ্রস্ত। যা বলা দরকার তা হল, ক্ষুদ্র কৃষক থেকে বড় জোতদার — উভয় ক্ষেত্রেই ঋণগ্রস্ততার আনুপাতিক হার এবং পরিবার পিছু ঋণের পরিমাণ দুটিই ধাপে ধাপে বেড়েছে। এনএসএস-এর সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালে ঋণগ্রস্ত পরিবারের শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষকের ক্ষেত্রে ছিল ৪০.৮ শতাংশ এবং মাঝারি কৃষকের ক্ষেত্রে ছিল ৬৯.৭ শতাংশ ও বড় কৃষকদের ক্ষেত্রে ছিল ৮১.৪ শতাংশ। তবে ঋণের উৎস ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র, মাঝারি এবং বড় কৃষকদের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। ভূমিহীন কৃষকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৫৬ শতাংশ) এখনও গ্রামীণ সুদখোর মহাজনদের কাছে বাঁধা পড়ে আছেন। সরকারি ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার প্রসার সত্ত্বেও মাত্র ১৫.২ শতাংশ ভূমিহীন কৃষক এর আওতায় এসেছে। বিপরীতে, বড় জোতের মালিকদের ঋণ করেন প্রধানত ব্যাঙ্ক ইত্যাদি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে। ঋণের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা যায় ছোট কৃষক ঋণের বেশির ভাগটাই গৃহনির্মাণ, বিবাহ, উৎসবাদি, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি, অন্যান্য ভোগ্য পণ্যের জন্য ব্যয় করেন। এর থেকে দুটি জিনিস স্পষ্ট হয়। গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারগুলির শিক্ষালাভ করে উন্নত পেশায় যাওয়ার ব্যগ্রতা রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণ হওয়ার ফলে এই খাতে খরচ বেড়েছে। বিপুলভাবে বেড়েছে চিকিৎসার খরচও। এর বিপরীতে বড় জোতের মালিকরা গৃহীত ঋণের বড় অংশটাই (৭০ শতাংশর ওপরে) কৃষি উৎপাদনে ব্যবহার করেন। ক্ষুদ্র চাষিদের ক্ষেত্রে ঋণের উৎস গ্রামীণ মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের বেশিরভাগটাই ব্যবহৃত হয় অনুৎপাদক ক্ষেত্রে। এই পার্থক্য সত্ত্বেও উভয় গোত্রেরই মিলের জায়গা হল ঋণগ্রস্ততা। এই ঋণগ্রস্ততার কারণ ছোট কৃষকদের ক্ষেত্রে অনুৎপাদক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি আর বড় কৃষকদের ক্ষেত্রে উৎপাদনের উপকরণের লাগামছাড়া দামবৃদ্ধি। সব মিলিয়ে ভারতীয় কৃষকরা একদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অপরদিকে উৎপন্ন ফসলের অনায্য দামের সাঁড়াশি আক্রমণে পিষ্ট। এরই পরিণতি কৃষক আত্মহত্যা।
কৃষক আত্মহত্যা
সাংবাদিক পি সাইনাথ এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন । ২০০৫ সালে সাইনাথ ভারতের ক্রমবর্ধমান কৃষি দুর্দশার সমস্যাটি তুলে ধরেন। ২০০৬ সালে স্বামীনাথন কমিশনে এবিষয়ে বহু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরে এ নিয়ে বহু গবেষণাও হয়েছে। এই রকম একটা গবেষণায় দেখা গেছে দেশের মোট আত্মহত্যার গড়ে ১৪ শতাংশ হল কৃষকের আত্মহত্যা। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমিকের প্রায় ২৫ শতাংশ কৃষক (প্রধান ও প্রান্তিক চাষী)। এখানে প্রধান বলা হচ্ছে তাদের যারা বছরে ১৮০ দিনের বেশি চাষ করেন। এবং ৩০ শতাংশ কৃষি শ্রমিক। প্রধান ও প্রান্তিক চাষি এবং কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সালের পরিসরে কৃষকের আত্মহত্যার সংখ্যা ১০৭২০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৮২৯০ হয়েছে। তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বিগত এক দশকে এই আত্মহত্যার সংখ্যা এক লক্ষের বেশি। অর্থাৎ বিগত এক দশকে প্রতি বছরে গড়ে ১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ইত্যাদি সবুজ বিপ্লবের রাজ্যগুলিতে এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি কঠিন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কৃষিজীবী পরিবারের আত্মহত্যার সর্বশেষ পরিসংখ্যান পাওয়া যায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত। এই বছরে ২৩০ জন ক্ষেতমজুরের আত্মহত্যার খবর সরকারিভাবে স্বীকৃত হয়। তারপর পালা বদলে এইসব খবরের ইতি ঘটে।
আত্মহত্যা একটা সংবেদনশীল বিষয়। তবে এটার মধ্যে দিয়ে জাতীয় কৃষির দুর্দশার চিত্রটি ফুটে ওঠে। ভারতীয় কৃষকরা বর্তমানে একদিকে উৎপাদনের উপকরণের লাগামছাড়া দাম বৃদ্ধি এবং অপরদিকে উৎপাদিত ফসলের অনায্য দামের সাঁড়াশি আক্রমণে পিষ্ট হচ্ছেন। বিষয়টাকে ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে চিত্রিত করে সবকা সাথ সবকা বিকাশ, বিকশিত ভারতের জয়গান গাওয়া হচ্ছে। মোদির আমলে এটাই হচ্ছে ভারতের কল্যাণকর রাষ্ট্র থেকে অতিরাষ্ট্রের দিকে অভিবাসন।
শ্রমজীবী ভাষা পত্রিকায় ১লা ডিসেম্বর ২০২৫ এ প্রকাশিত।










