“আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে –
ও মা, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি…….”
আমাদের রবি ঠাকুরের গান, আমাদের পাশের দেশ ‘বাংলাদেশ’ এর জাতীয় সংগীত – জাতি – ধর্ম – সীমার ভেদরেখা ছাপিয়ে মানুষে মানুষে সৌভ্রাতৃত্বের সেতু গড়তে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি! এই গানটির অনবদ্য সুরমূরচ্ছনা এখনও আমাদের মনকে আন্দোলিত করে!
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসাধারণ সৃষ্টি এই গানটিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত বিতর্ক।
গত ২৭ শে অক্টোবর, সোমবার আসামের, বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি (পূর্বতন করিমগঞ্জ) জেলার, জেলা সদর শহরের কংগ্রেস দপ্তর, ইন্দিরা ভবনে আয়োজিত জেলা সেবাদলের সভার শুরুতেই, অন্যতম বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা, প্রাক্তন সেবাদল চেয়ারম্যান, শ্রী বিধু ভূষণ দাস বক্তৃতা রাখবার আগে এই গানটি পরিবেশন করেন।
এই সভার ভিডিও, খবর সমাজ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই শুরু হয়ে যায় এক অদ্ভুত বিতর্ক! আসাম মন্ত্রী সভার অন্যতম সদস্য শ্রী অশোক সিংঘল, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের জন্য কংগ্রেসকে তুলোধুনো করে বিবৃতি দেন। ২৮ শে অক্টোবর, আসামের মৎস্য মন্ত্রী শ্রী কৃষ্ণেন্দু পাল পুলিশী তদন্তের দাবী জানান। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা শ্রী বিধুভূষণ দাস কি কারণে এই গান কংগ্রেস সভায় গাইলেন, সেই নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিজেপি দলের কেন্দ্রীয় মুখপাত্রের মুখে এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, কংগ্রেস দল আসামে অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থন করেন বলেই এই গানটি গেয়েছেন। আসামের মূখ্যমন্ত্রী শ্রী হিমন্ত বিশ্ববর্মা, এই ঘটনার নিন্দা করে বলেন, এই গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে ভারতের জনগণকে নির্লজ্জ ভাবে অপমান করা হয়েছে। এর সাথে সাথে তিনি রাজ্যের পুলিশ বিভাগকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্ৰহণেরও নির্দেশ দেন।
আসামের শ্রীভূমি জেলার কংগ্রেস দলের জেলা মিডিয়া বিভাগের চেয়ারপার্সন শ্রী সাহাদৎ আহমেদ চৌধুরী (স্বপন) আসাম সরকারের এইরকম কাজের তীব্র নিন্দা করেন এবং রবীন্দ্রনাথের গানের বিরুদ্ধে এই জাতীয় আক্রমণ ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী বলে মনে করেন। আসাম প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতা সাংসদ শ্রী গৌরব গগৈও গৌহাটিতে সাংবাদিক সম্মেলনে বিজেপি পরিচালিত সরকারের জঘন্য ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেন।
“আমার সোনার বাংলা” গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক ঐতিহাসিক ক্ষণে সৃষ্টি করেছিলেন। রবিজীবনীকার শ্রী প্রশান্ত কুমার পালের মত অনুযায়ী এই গানটি কবি ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ বিরোধী আন্দোলনের সময় লেখেন। ১৯০৫ সালের ২৫ শে আগস্ট, কোলকাতার টাউন হলে এক প্রবন্ধ পাঠের আসরে প্রথম গাওয়া হয়েছিলো। বাউল রাগের উপর, দাদরা তালের এই গানটির সুর বিশ্বকবি দিয়েছিলেন ঐ সময়কার বিখ্যাত বাউল গায়ক গগণ হরকরা’র ” আমি কোথায় পাবো তারে ” এই গানের অনুকরণে। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী, ইন্দিরা দেবী এই বিখ্যাত গানটির স্বরলিপিকার। ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কবিগুরুর এই গানটিকে হাতিয়ার করেই মুক্তিযোদ্ধারা এক অভূতপূর্ব বাঙালী জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি করেছিলেন। ভারতের প্রত্যক্ষ সহায়তায় পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের সৃষ্টি হওয়ার পরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে ( ১৩ই জানুয়ারি,১৯৭২ ) এই গানটিকেই বাংলাদেশের জাতীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই গানের প্রথম দশ লাইন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।
“আমার সোনার বাংলা” এই গানটির সাথে অখন্ডিত ভারতের বাংলা ও বাঙালীর এক আত্মিক সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। এক ঐতিহাসিক আবেগ, এক ঐতিহাসিক ঘটনা ক্রমের সাথে এই গানটির যোগ রয়েছে যা বাঙালী জাতিসত্ত্বার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ ও ভারত – দুই দেশের জাতীয় সংগীতেরই জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – তিনিও বাঙালী। এই দিক দিয়ে বিচার করলে এই বিশেষ গানটি এক বাঙালী আত্মশ্লাঘার প্রতীক বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না !
রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য, কৌশলগত বিভেদ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থাকবে, এটাই গণতান্ত্রিক স্বাভাবিকতা। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথকে এই রাজনৈতিক চাপান উতোরে ব্যবহার করাটা কি রুচিসম্মত ?
আসাম সরকারের মন্ত্রী, ক্ষমতাসীন বিজেপি দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যখন বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কান্ডারী মহঃ ইউনুস, পাকিস্তানের সেনানায়কের হাতে বৃহত্তর বাংলাদেশের মানচিত্র, যার মধ্যে আসামসহ উত্তরপূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে সংযুক্ত দেখানো আছে , তুলে দিচ্ছেন, ঐ সময়কালে আসামে বসে কংগ্রেস নেতাদের বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গাওয়া, দেশদ্রোহিতার সামিল। কংগ্রেস আদর্শগত ভাবে বৃহত্তর বাংলাদেশ গঠনে মদত দান করছে – এই কথা গুলি বলা কতদূর বাস্তব ইতিহাস সম্মত? এই বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবার দরকার আছে বৈ কি!
এই বিষয়টি অস্বীকার করবার কোনো উপায় নেই, “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রূপে যখন ঠিক করা হচ্ছিলো,তখন তার বিরুদ্ধেও জনমত তৈরী করা হয়েছিলো কোনো বিশেষ মহল থেকে। এই গানটি ইসলামী চেতনার সাথে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে ব্যাপক আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত বাঙালী জাতি সত্ত্বার জনক স্বরূপ এই গানটিই ঐ দেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে মর্যাদা পায়। ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির কাছে ঐ সময়কালের বাংলাদেশের জাতীয় নেতারা আত্মসমর্পণ করেন নি,এও এই উপমহাদেশের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের এক অনন্য নজির।
শ্রীভূমি জেলা সহ আসামের কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে বারংবার বলা হচ্ছে এই গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ঐ সভায় গাওয়া হয় নি, ঐতিহাসিক দেশাত্মবোধক সংগীত হিসেবেই বক্তৃতা শুরুর আগে বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা গানটি গেয়েছিলেন। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ঘটনা ক্রমের সাথে সহমর্মিতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে এই গানটি গাওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই বলে কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে দ্বিধা হীন ভাবে বলা হয়েছে। কিছুদিন আগে বিজেপি পরিচালিত আসাম সরকারের মন্ত্রীসভা সাবেক ‘করিমগঞ্জ’ জেলার নাম পরিবর্তন করে ‘শ্রীভূমি’ করবার সময় রবীন্দ্রনাথকেই ব্যবহার করেন। প্রায় ১০০ বছর আগে অবিভক্ত ভারতের ,বাংলাদেশের শ্রীহট্টের করিমগঞ্জ জেলাকে গুরুদেব ‘শ্রীভূমি’ নামে ডেকে ছিলেন বলে করিমগঞ্জের নাম ‘শ্রীভূমি’-তে রূপান্তর। আর এখন সেই রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার জন্য, আইনি প্রক্রিয়া নেওয়ার ঘোষণা – অদ্ভুত বিচিত্র এক বৈপরীত্য!
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ভারতে গাওয়া বা তা নিয়ে আলোচনা করা কি আইনবিরুদ্ধ বিষয়? একসময় আজকের বাংলাদেশ তো অখণ্ড ভারতেরই অংশ ছিলো! বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ হাসিনা এখন তো ভারতের আশ্রয়েই রয়েছেন। নানা ধরনের প্ররোচনায় বাংলাদেশের জামাতপন্থী মৌলবাদী শক্তির সাম্প্রতিক যে উথ্থান তা এই গোটা উপমহাদেশের কাছেই এক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে এখানে যে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন, সেই বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে শাসক ও বিরোধী দুই পক্ষই ভুলে যাচ্ছেন, যা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।
গোটা দেশ জুড়ে, দেশভক্তি, দেশপ্রেম, স্বদেশীয়ানার নামে যে ধরনের উগ্ৰ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভাবনা বিকাশ করবার উদগ্ৰ চেষ্টা চলছে তারই প্রতিফলন, “আমার সোনার বাংলা” গানটি গাওয়ার জন্য আইনী প্রক্রিয়া অবলম্বনের বিষয়টি। বহু ভাষাভাষী ভারতবর্ষে,”হিন্দী-হিন্দু-হিন্দুস্থান” বানানোর প্রক্রিয়া বহুত্ববাদের ভিত্তিমূলেই আঘাত করছে যা আদতে আমাদের দেশের সমন্বয়ী ভাবনাকে দুর্বল করছে। “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” ……. সত্যিই তো আমরা ভালোবাসি, আরও ভালোবাসতে চাই…. এই উজাড় করা ভালোবাসাই তো অস্তমিত বাঙালীর শেষ অহংকার!










