Skip to content
Facebook Twitter Google-plus Youtube Microphone
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Menu
  • Home
  • About Us
  • Contact Us
Swasthyer Britte Archive
Search
Generic filters
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Menu
  • আরোগ্যের সন্ধানে
  • ডক্টর অন কল
  • ছবিতে চিকিৎসা
  • মা ও শিশু
  • মন নিয়ে
  • ডক্টরস’ ডায়ালগ
  • ঘরোয়া চিকিৎসা
  • শরীর যখন সম্পদ
  • ডক্টর’স ডায়েরি
  • স্বাস্থ্য আন্দোলন
  • সরকারি কড়চা
  • বাংলার মুখ
  • বহির্বিশ্ব
  • তাহাদের কথা
  • অন্ধকারের উৎস হতে
  • সম্পাদকীয়
  • ইতিহাসের সরণি
Search
Generic filters

শ্যামাপ্রসাদ স্মৃতিপক্ষ: বিভাজন-রাজনীতির উদযাপন

chittaprasad
Gopa Mukherjee

Gopa Mukherjee

Teacher of History, Social activist
My Other Posts
  • July 7, 2026
  • 8:00 am
  • No Comments

There is probably no time and place with which historians are concerned, which has not seen the invention of tradition…For all invented traditions, so far as possible, use history as legitimator of action and cement of group cohesion. (Eric Hobsbawm, ‘Invention of Traditions’)

বিংশ শতকের প্রথম কয়েকটি দশকে বাংলার এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। প্রায় চার দশক ধরে সমকালীন বাংলায় শিক্ষাবিদ এবং রাজনীতিবিদ হিসাবে পরিচিত হলেও পরবর্তী কালে বাংলার ইতিহাসচর্চায়  খুব দৃশ্যমান ছিলেন না শ্যামাপ্রসাদ। ২০২৩ সাল থেকে একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন এবং ২০২৪ এ সরকারি ভাবে স্মৃতিপক্ষ পালনের মাধ্যমে  শ্যামাপ্রাসাদ আবার ইতিহাসের সারথির ভুমিকায়। এই বক্তৃতায় শ্যামাপ্রাসাদের জীবন ও কর্মের আলোচনা করে আমরা এই অতীত পুনরাবিষ্কারের বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করবো।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম এক অসামান্য পরিবারে, বাংলার শিক্ষা সংস্কৃতিতে যে পরিবারের অবদান বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য । তাঁর পিতা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিচারক স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং মাতা যোগমায়া দেবী।   ১৯০১ সালের ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ইংরেজিতে সাম্মানিক  স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ইংরেজি তে প্রথম শ্রেণী তে প্রথম হওয়া সত্ত্বেও পিতা আশুতোষের ইচ্ছায় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার এম.এ. তে ভর্তি হন। ইংরেজির আধিপত্যে উপেক্ষিত মাতৃভাষার উন্নতি ও প্রসারের জন্যই মেধাবী পুত্রকে বাংলা পড়াতে চান আশুতোষ। ১৯২৩ এ এম এ পাশ করে তিনি ১৯২৪ এ আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯২৬ এ তিনি ব্যারিস্টারি পড়তে লন্ডনের লিঙ্কনস ইনএ যান এবং ১৯২৭ সালে দেশে ফিরে আসেন।

পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি তরুণ বয়সেই শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে, ১৯৩৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব চেয়ে কম বয়সে  Vice-Chancellor পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৩৮ সাল এই পদে বহাল থাকেন। তাঁর সময়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ানোর প্রথা চালু হয়। ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়।

হিন্দি এবং উর্দু তে অনার্স এবং কৃষিবিদ্যায় ডিপ্লোমা তাঁর সময় চালু হয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণের একটি পাঠ্যক্রমও তিনি চালু করেন। চিনা এবং তিব্বতি চর্চা বাড়ানোর জন্য তিনি স্কুল অফ চাইনিজ এবং স্কুল অফ টিবেটান স্টাডিজ তৈরি হয়। আশুতোষ মিউজিয়াম অফ ইন্ডিয়ান আর্ট এন্ড ফাইন আর্টস গড়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের কাজ শুরু হয়। সেন্ট্রাল লাইব্রেরির নতুন হল তৈরি হয় তাঁর সময়।

১৯৩৭ সালে তদানীন্তন উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুরোধ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি “বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত” রচনা করে দেওয়ার জন্য। ১৯৩৭ সালে বাংলায় সমাবর্তন ভাষণ দেবার জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথ কে আমন্ত্রণ জানান।

শ্যামাপ্রাসাদ সম্পর্কে স্মৃতিচারণা মূলক একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন সাহিত্যিক লীলা মজুমদার। আশুতোষ কলেজে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে তিনি প্রথম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে দেখেন। লীলা মজুমদারের ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর পৈতৃক বাড়ির দোতলার ঘরের সামনে।একটা দুটো মামুলি প্রশ্ন করে তিনি সরাসরি লীলা মজুমদারকে বললেন

” তা হলে সোমবার থেকে, কেমন?”। লীলা মজুমদার নমস্কার করে চলে যাচ্ছিলেন, তিনি তাঁকে ডেকে বললেন ” এতটুকু কোথাও অসুবিধা মনে আমাকে জানাবেন”। এই ঘটনা ১৯৩২ সালের যখন আশুতোষ কলেজে মেয়েদের বিভাগ নতুন খুলছে।

লীলা মজুমদার লিখেছেন ” এই প্রথম শ্যামাপ্রসাদবাবুকে দেখলাম। ছোটবেলায় দেখা সেই আমাদের বাংলার বাঘের ছেলে। আমার মাস্টার মশাই রমাপ্রসাদবাবুর ছোট ভাই। তখন বয়সটা তাঁর তেত্রিশ – চৌত্রিশের বেশি নয়। দিব্যি গেঞ্জি গায়ে তরুণ বয়স্কা অপরিচিতার ইন্টারভিউ নিলেন।…. একবারও মনে হল না এর মধ্যে কোথাও এতটুকু সৌজন্যের অভাব আছে। তাঁকে যখনি দেখেছি, যেখানেই দেখেছি,মনে হয়েছে সৌজন্যের প্রতিমূর্তি”। (‘আর কোন খানে’)

আন্তঃবিশ্ব বিদ্যালয় বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স কাউন্সিলের সদস্য হিসাবে শ্যামাপ্রাসাদ প্রশংসনীয় কাজ করেন। ১৯৪২ এ মহাবোধি সোসাইটির সভাপতির পদ গ্রহণ করেন। ১৯৪৯ এ মহাবোধি সোসাইটির সভাপতি হিসাবে বুদ্ধ শিষ্য সারিপুত্ত এবং মোগগলানের দেহাবশেষ নেহরুর কাছ থেকে গ্রহণ করেন এবং সাঁচি স্তূপে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

১৯২৯ সালে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা । বিশ্ববিদ্যালয় সংরক্ষিত কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী হিসাবে বাংলার আইন সভায় নির্বাচিত হন শ্যামাপ্রাসাদ। ১৯৩০ এ কংগ্রেস হাই কম্যান্ডের পক্ষ থেকে দেশ জোড়া আইন অমান্যের আহবান জানান হয় এবং পূর্ণ স্বরাজের দাবিতে আন্দোলন  শুরু হয়।  সমস্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পদত্যাগ করে ব্রিটিশ প্রশাসনকে বয়কট করার নির্দেশ দেওয়া হয়। শ্যামাপ্রাসাদ পদত্যাগ করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রার্থী হিসাবে পুনর্নির্বাচিত হন এবং তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসনকে সাহায্য করেন।

তিরিশের দশকের শুরুর দিকে ১৯৩৭ থেকে আবার সক্রিয় হন শ্যামাপ্রাসাদ। হিন্দু মহাসভার সঙ্গে শ্যামাপ্রাসাদের সম্পর্ক তৈরি হয়। বাংলার আইন সভার প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ সালে সাভারকরের নেতৃত্বে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হিন্দু মহাসভার অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪০ এ বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি ছিলেন।  হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক হিসাবে মহাসভার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৪৪ সালে সর্বভারতীয় হিন্দু মহাসভার সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে এর মধ্যে তাঁর মুসলিম বিরোধী অবস্থান এক রৈখিক ছিল না। পরিস্থিতির পরিবর্তনে প্রয়োজন মত তাঁর অবস্থান বদলায়। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লিগের জোট সরকার ছিল। হিন্দুত্ববাদী শ্যামাপ্রাসাদ বিরোধী নেতা ছিলেন।  ১৯৪০ সালে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয় লিগের লাহোর অধিবেশনে। প্রস্তাব উত্থাপন করেন ফজলুল হক।  ১৯৪১ এ লিগের বিভিন্ন দাবি না মানার প্রতিবাদে জিন্না প্রশাসনের সঙ্গে অসহযোগিতায় যান। সিকান্দার হায়াত খান আর ফজলুল হককে বাধ্য করেন জাতীয় প্রতিরক্ষা পর্ষদের সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করতে। এর জেরে লিগ-হক মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে যায়। ফজলুল হকের নেতৃত্বেই নতুন মন্ত্রীসভা তৈরি হয়।  শ্যামাপ্রসাদ অর্থমন্ত্রী এবং উপপ্রধানমন্ত্রী হিসাবেএই মন্ত্রী সভায় যোগ দেন। হিন্দু মহাসভার সর্ব ভারতীয় সভাপতি সাভারকর কানপুর অধিবেশনে  বলেন

“ব্যবহারিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও মহাসভা জানে যে আমাদের অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত আপসেরমধ্যে দিয়ে এগোতে হবে। “

১৯৪২ এর ৮ অগাস্ট AICC র বোম্বাই অধিবেশনে নেওয়া হয় ভারত ছাড়ো প্রস্তাব। গান্ধীর  ঐতিহাসিক করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে ভাষণ ব্রিটিশ বিরোধী গণ আন্দোলনের জমি প্রস্তুত করে। ৯ অগাস্ট ভোরে গ্রেফতার হয়ে যান কংগ্রেসের প্রথম সারির সব নেতারা। সারা দেশ জুড়ে শুরু হয় স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ, দেশ জুড়ে গণরোষের বন্যা বয়ে যায়। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে থানা লুট, রেললাইন উপড়ে ফেলে ছাত্র-যুব। ব্রিটিশ পুলিশ গুলি চালায়। মাতঙ্গিনী হাজরার বুকে গুলি লাগে।  আন্দোলনে উত্তাল বাংলা । আর তখন বাংলার অর্থমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ কী করছেন? ১৯৪২-এর ২৬ জুলাই, আন্দোলন শুরুর  কয়েক দিন আগেই, তিনি গভর্নর জন হার্বার্টকে চিঠি লিখছেন। মূল বক্তব্য: “The question is how to combat this movement in Bengal? The administration should make it clear that in war-time anybody who impedes the war effort must be resisted… Congress movement must be suppressed.”

অর্থাৎ, কংগ্রেসের আন্দোলনকে দমন করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি । ভারতবর্ষের গভর্নর জন হার্বার্টকে লিখছেন যুদ্ধ চলার সময়ে যদি কেউ জনতার আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে, অভ্যন্তরীণ শান্তি ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটায়, সরকার যেন তা প্রতিরোধ করে। ব্রিটিশ গভর্নরকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আপনাদের একজন মন্ত্রী হিসেবে, আমি পূর্ণ সহযোগিতা জানাচ্ছি।’’ কংগ্রেস যাতে জনসমর্থন না পায় তার জন্য পাল্টা প্রচারের কথাও বলেন।  দেশ যখন স্বাধীনতার জন্য জীবন দিচ্ছে, শ্যামাপ্রসাদ তখন ব্রিটিশ প্রভুকে স্ট্র্যাটেজি শেখাচ্ছেন কীভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পেটাতে হবে। এই চিঠি আজও ন্যাশনাল আর্কাইভসে সংরক্ষিত।

সাভারকরের মত তিনিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে বলেছিলেন, ” এখন যুদ্ধকালীন অবস্থায় জাতীয় গভর্নমেন্ট এমনভাবে গঠিত হবে যাতে মিত্রপক্ষের সাথে নিবিড় সহযোগিতায় যুদ্ধ করা সম্ভব হয়। “( রাষ্ট্র সংগ্রামের এক অধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ, পৃষ্ঠা ১১৬) হিন্দু মহাসভার ঘোষণা অনুযায়ী শ্যামাপ্রসাদও ৪২ এর আগস্ট আন্দোলনের বিরোধিতা করে বলেছিলেন :” আমি মনে করি না, গত তিন মাসের মধ্যে যেসব অর্থহীন উশৃংখলতা এবং নাশকতামূলক কাজ করা হয়েছে তার দ্বারা আমাদের দেশের স্বাধীনতা লাভে সহায়তা হবে। “( ঐ, পৃ:৬১)

এখানেই শ্যামাপ্রসাদ থেমে যাননি। আগস্ট আন্দোলনে তার ভূমিকার কথা আলোচনা করতে গিয়ে ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার লিখেছেন :” ওই পত্রের শেষ অংশে তিনি কংগ্রেস কর্তৃক ঘোষিত গণ আন্দোলন সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছেন। যুদ্ধের সময় এই আন্দোলন জনমতকে উত্তেজিত করিয়া অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি করিবে আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন এবং যেকোনো সরকারের পক্ষেই বর্তমান পরিস্থিতিতে এই আন্দোলন দমন করা উচিত বলিয়া অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন।—— তিনি এই আন্দোলনের মোকাবিলা করিবার জন্য কি কার্যপন্থা গ্রহণ করা উচিত তাহারও একটা তালিকা এই পত্রে সন্নিবেশ করিয়াছেন।”( বাংলাদেশের ইতিহাস, শ্রীরমেশ চন্দ্র মজুমদার, প্রথম সংস্করণ, পৃ:৩৭৬-৭৭) আগস্ট আন্দোলন শ্যামাপ্রসাদ এর কাছে ‘ অর্থহীন উশৃংখলতা ” নাশকতা মূলক কাজকর্ম ‘। তিনি মনে করেন ‘ এই আন্দোলন দমন করা উচিত ‘। কিভাবে এই আন্দোলন দমন করা যায় সে সম্পর্কে একটা তালিকাও তিনি ইংরেজদের কাছে পেশ করেছেন। তৎকালীন হিন্দু মহাসভার দুই নেতা সাভারকর ও শ্যামাপ্রসাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতা করার সমস্ত উদ্যোগ নিয়েছিলেন,’ ৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন দমনে সরকারকে পরিকল্পনা করতে সাহায্য করেছিলেন।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) বা হিন্দু মহাসভা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি এটা ঐতিহাসিক ভাবে প্রমাণিত। এই ভাব ধারায় অনুপ্রাণিত  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শ্যামাপ্রাসাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ছাত্রদের কুচকাওয়াজের সময় ইউনিয়ন জ্যাকের সামনে মাথা নোয়াতে অস্বীকার করার জন্য বিদ্যাসাগর কলেজের এক ছাত্রকে বেত্রাঘাত করেন। প্রতিবাদে সব ছাত্র ধর্মঘটে শামিল হয়। শ্যামাপ্রসাদ ধরিত্রী গঙ্গোপাধ্যায় এবং উমাপদ মজুমদার নামে দুই ছাত্র কে বহিষ্কার করেন।

১৯৪৩ সাল। বাংলায় দেখা দেয় ভয়াবহ মন্বন্তর। এই দুর্ভিক্ষ শুধু মাত্র বন্যার ফলে ঘটেনি। এর মুল দায়িত্ব ব্রিটিশ নীতির। যুদ্ধের জন্য বর্মা থেকে চাল আমদানি বন্ধ করে বাংলার গ্রাম গ্রামান্তর থেকে ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধরত সৈনিকদের জন্য প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে থাকে। এর সঙ্গে প্রশাসনিক প্রশ্রয়ে অবাধে চলে কালোবাজারি আর মজুতদারি। মণিকুন্তলা সেন আত্মজীবনীতে লিখছেন বাংলার অন্নদাতা কৃষক শহরে ঘরে ঘরে ফ্যানভিক্ষা করে ঘুরছেন এ দৃশ্য অসহনীয় । প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণ যায় এই দুর্ভিক্ষে।  ১৯৪৩-এ  কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, ছাত্র ফেডারেশন সবাই লঙ্গরখানা খুলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে। হিন্দু-মুসলমান এক সারিতে বসে খায়।  কমিউনিস্ট পার্টির মহিলা সদস্যদের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে  ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’। দুর্ভিক্ষ পীড়িত অসহায় মেয়েদের যৌন নির্যাতন থেকে রক্ষা করা, বুভুক্ষু মানুষের জন্য দু মুঠো অন্নের ব্যবস্থা করা – নিরলস ভাবে এই কাজ গুলো করে যায় MARS। এই সংগঠনে যোগ দেন কংগ্রেসের মহিলা নেত্রী এবং কর্মীরাও।

সেসময় শ্যামাপ্রসাদের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বঙ্গদুর্ভিক্ষের ভয়াবহতম দিনগুলিতে বাংলার গভর্নরের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠই ছিল সবচেয়ে জোরালো। ভারতের চার কোণা থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা এসে জমা পড়েছিল হিন্দু মহাসভার বেঙ্গল রিলিফ কমিটির তহবিলে বাংলাকে বাঁচানোর জন্য। কী ভাবে বাংলাকে বাঁচাতে চেয়েছেন সেটা একটু দেখা যাক।

শ্যামাপ্রসাদের নিজের লেখা _Leaves from a Diary_ পড়লেই তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হয়। ১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, ছাত্র ফেডারেশন, মুসলিম লিগের ছাত্রশাখা  সবাই লঙ্গরখানা খুলে খাওয়াচ্ছে। হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে বসে খাচ্ছে।

এই দৃশ্য দেখে শ্যামাপ্রসাদ লিখছেন:  “The system of feeding Hindus and Muslims together in the same kitchen was resented by a large section of Hindus… It was not proper to hurt religious sentiments at a time of distress.”

মানুষ না খেয়ে মরছে, আর উনি চিন্তিত “হিন্দুর ধর্মীয় ভাবাবেগ” নিয়ে। একসঙ্গে খেতে বসলে জাত যাবে! দুর্ভিক্ষের মধ্যেও যিনি অস্পৃশ্যতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কথা ভাবেন, তিনি কোন ভারতের স্বপ্ন দেখতেন? অন্যরা যখন দুর্ভিক্ষপীড়িত দের খাওয়াচ্ছে, শ্যামাপ্রসাদ খুঁজছেন “হিন্দু-মুসলিম আলাদা উনুন” ।

হিন্দু মহা সভা বেছে বেছে হিন্দু প্রধান অঞ্চলে ত্রাণকেন্দ্র স্থাপন করে। অন্য ত্রাণ কেন্দ্র গুলিতে অধিকাংশ ‘ছোট জাত’ এবং মুসলমান তাই বর্ণহিন্দুরা খাবার খেতে চাইছেন না এই যুক্তি তে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের রান্নাই পরিবেশিত হত হিন্দু মহাসভার ত্রাণকেন্দ্রে।  ভয়াবহ মন্বন্তরেও শ্যামাপ্রসাদ ও তাঁর দল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দ্বিধা করেন নি।

চিত্রশিল্পী চিত্তপ্রসাদ মন্বন্তরের বাংলা ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকেন, লেখেন, তুলে ধরেন মন্বন্তরের বাংলার যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। ১৯৪৪ সালের জুন মাসের এক ভোরে চিত্তপ্রসাদ পাড়ি দেন হুগলি জেলার জিরাটে—আশুতোষ ও শ্যামাপ্রসাদের জন্মভূমিতে। তিনি যা চাক্ষুস করেছিলেন, তার বর্ণনা খানিকটা এরকম। পথে বালাগড়ের যে ছ’- সাতটি অঞ্চল দিয়ে তিনি যান, তার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। তেতাল্লিশের বেহুলা নদীর উপচে পড়া জলে ছয়টি গ্রাম টানা বারো দিন জলের তলায় ছিল। প্রায় সাত হাজার গ্রামবাসী সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিল। কৃষকেরা সেই মাটি খুঁড়ে চাষ করার সুযোগই পায়নি। বন্যার ধ্বংসলীলার পরপরই সমগ্র বাংলাকে দুর্ভিক্ষ গ্রাস করেছিল। বালাগড়ের প্রায় ২৫% পরিবার বেঁচে ছিল বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া আম গাছগুলোর আম আর আমের আঁটি খেয়ে।

চিত্তপ্রসাদ লিখছেন, উনি যে গ্রামেই গেছেন, সেখানেই ম্যালেরিয়া, কলেরা, বসন্ত এবং আরো নানাবিধ চর্মরোগের প্রকোপ দেখেছেন। চিত্তপ্রসাদ উদাহরণ হিসেবে রাজাপুর গ্রামের কথা বলছেন, যার ৫২টি পরিবারের মধ্যে মাত্র ছয়খানা পরিবার বেঁচে ছিল, যারাও খাদ্য, বস্ত্রের অভাবে কিংবা ম্যালেরিয়ার প্রকোপে ভুগছিল। এই পরিবারের কাছে গিয়ে শ্যামাপ্রসাদের সাহায্যের কথা জিজ্ঞেস করলে, চিত্তপ্রসাদ একজনের মুখেও শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে ভালো কথা শোনেননি

তাদের মুখেই চিত্তপ্রসাদ শোনেন, সরকারী সাহায্য কিছু পেয়েছিলেন ওই গ্রামবাসীরা। তাঁরা ছাত্র ফেডারেশন (Students’ Federation) এবং মুসলিম স্টুডেন্টস লিগেরও প্রশংসা করছিলেন। বন্যার ঠিক পরে এই সংগঠনগুলি কিছু গ্রামে কাপড়, ১২ মণ বীজ, প্রচুর পরিমাণে সবজি এবং প্রতি পরিবারকে ৫ টাকা করে অনুদান দিয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টিও দু’বার করে মাথাপিছু এক পাও (এক-চতুর্থাংশ সের) চাল এবং এক পাও আটা বিতরণ করেছিল। দুমুরদহ উত্তম আশ্রম তিন মাস ধরে প্রতিটি পরিবারকে ২ টাকা করে এবং নিয়ন্ত্রিত দামে ৮ সের আটা সরবরাহ করেছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, সকলেই সাহায্য করার চেষ্টা করেছিল—শুধুমাত্র জেলার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠনটি বাদে– অর্থাৎ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এবং তাঁর হিন্দু মহাসভা।

শ্রীকান্তি গ্রামের এক বিশিষ্ট গ্রামবাসীকে চিত্তপ্রসাদ সরাসরি প্রশ্ন করে—বেঙ্গল রিলিফ কমিটি তাঁদের জন্য কী করেছিল? তিনি জানান, বেঙ্গল রিলিফ কমিটি বা শ্যামাপ্রসাদের নাম তিনি শোনেননি।

চিত্তপ্রসাদ লিখেছেন একটি গ্রামের স্বাভাবিক নেতা যখন বিপদে তাদের ছেড়ে চলে যায়, তখন সেই গ্রামটির কী অবস্থা হয়! বাইরে থেকে যে রিলিফ আসতো, তাও লুটে নিতো দুর্বৃত্তরা।

শ্যামাপ্রসাদের নিজের গ্রাম জিরাটে শ্যামাপ্রসাদের নিজের হাটে মুনাফাখোরি চলত দেদার। চিত্তপ্রসাদ সেখানে গিয়ে দেখলেন, গ্রামে শ্যামাপ্রসাদের ত্রাণকার্যও প্রহসন মাত্র। সপ্তাহে একদিন হিন্দু মহাসভা তাদের চারটি ত্রাণকেন্দ্রের মাধ্যমে মোট ২৮ সের আটা এবং ২৮ সের চাল বিতরণ করত। এছাড়া শ্যামাপ্রসাদের দুই ভাই একটি দোকান খুলে বাজারদরের অর্ধেক মূল্যে চাল বিক্রি করতেন। কিন্তু তাতেও কারও কোনো উপকার হতো না, কারণ তখন বাজারে এক মণ চালের দাম ছিল ৪০ টাকা!

গ্রামের দরিদ্র কৃষক এবং জেলেরা চিত্তপ্রসাদকে জানায়, “সব দান-খয়রাত ছিল বাবুদের জন্য। ২০ টাকা মণ দরে চাল কিনে যে দয়া দেখানো হচ্ছিল, তা মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া কারও সাধ্যের মধ্যে ছিল না।”  জিরাটের ত্রাণকেন্দ্রগুলিতে চাল ও আটা বিতরণের দায়িত্বে থাকা বীরনলেন্দু গোস্বামী চিত্তপ্রসাদকে বলেছিলেন যে, ত্রাণ কেবল রবিবারে বিতরণ করা হতো।

শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে গ্রামের মানুষের অপরিচয়ের দূরত্ব ছিল যোজনসমান।  শ্যামাপ্রসাদ সারা জীবনে তাঁর নিজের গ্রামের মানুষের কাছের মানুষ হতে পারেন নি।

এর পর আসা যাক বহু বিতর্কিত বাংলা বিভাজনের প্রশ্নে। ১৯৩৭ এর প্রাদেশিক নির্বাচনে কংগ্রেসের বিপুল জয়, বাংলায় ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি ও পাঞ্জাবে ইউনিয়নিস্ট  পার্টি- এই প্রাদেশিক  দল গুলির জয় মুসলিম লিগের ওপর চাপ তৈরি করে। জয়ের আত্মবিশ্বাস কংগ্রেসকে মুসলিম লীগের সঙ্গে কোন ধরণের ক্ষমতা ভাগাভাগিতে অনাগ্রহী করে তোলে। নেহরু ঘোষণা করেন ভারতের রাজনৈতিক চালচিত্রে দুটি দলই আছে – ব্রিটিশরাজ এবং কংগ্রেস।  মুসলিম সমাজের নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়। কংগ্রেস এর তরফ থেকে মু্সলমানদের সঙ্গে যোগাযোগের যে পরিকল্পনা করেছিলেন নেহরু  তা ব্যর্থ হয় হিন্দু মহাসভার অন্তর্ঘাতে। ১৯৪০ এ পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয় যদিও নির্দিষ্ট ভাবে এই দাবি সম্পর্কে ধারণা লিগের নেতাদের ও ছিল না। ১৯৪৪ এ গান্ধী-জিন্না আলোচনায় সমাধান সূত্র  বেরোয় না। এর পর থেকেই মুসলিম সমাজের বৃহৎ অংশ জিন্নার নেতৃত্বে লীগের পতাকার তলায় জোট বাঁধতে শুরু করেন। যে মুসলিম নেতারা ১৯২১ সালেও নিজেদের মুসলিম সত্তা এবং ভারতীয়ত্ব এর মধ্যে কোন বিরোধ দেখতেন না তাঁরাও এই সময় থেকে মুসলিম রাষ্ট্রের দাবিতে অনড় হয়ে উঠলেন। এই চেতনা ছড়িয়ে গেল বাংলা পাঞ্জাবের সাধারণ ও দরিদ্র মুসলমানদের মধ্যেও।

সম্প্রতি রাজ্যে শ্যামাপ্রসাদের অনুগামীরা উল্লেখ করেছেন শ্যামাপ্রসাদের সেই বিখ্যাত উক্তি: “কংগ্রেস ভারত-বিভাজন করেছিল আর আমি করেছিলাম পাকিস্তান-বিভাজন।” অর্থাৎ তাঁদের দাবি অনুযায়ী, শ্যামাপ্রসাদই বাংলা ভাগ করে পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গকে ছিনিয়ে আনেন। সেই অর্থে তিনিই হলেন পশ্চিমবঙ্গের স্থপতি তথা সৃষ্টিকর্তা।

সম্প্রতি ২০শে জুন তারিখটিকে এরাজ্যের নবাগত রাজ্য সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ভাবে তা পালনের ফরমান জারি করেছে। বিজেপি-আরএসএস -এর দাবি হলো ১৯৪৭ সালের এই গৌরবময় দিনে বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল।

বাংলা তথা ভারতভাগের ইতিহাস সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক।

১৯৪০ সালে মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হবার বহু আগে ১৮৯৯ সালে লালা লাজপত রাই হিন্দুস্তান রিভিউ নামক পত্রিকায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্য একটি লেখায় লিখছেন “ হিন্দুরা নিজেরাই একটি নেশন, কারণ তারা নিজেরা একটি সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে।“ ১৯২৪ সালে তিনি ভারত বিভাজনের একটি খসড়াও উপস্থিত করেন যা তখন মুসলিম লিগ বা ব্রিটিশ শাসকের চিন্তাতেও আসেনি।

হিন্দুত্ববাদীদের নেতা সাভারকর ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের বিষয়টি এদেশে সর্বপ্রথম ১৯২৩ সালে তার লেখা বই “Hindutva: who is a Hindu” তে উত্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে আছে ‘হিন্দু’ জাতির ধারণা এবং ‘ভিন্ন জাতি’ মুসলমানদের প্রতি তীব্র ঘৃণা, যা ব্রিটিশ প্রশাসকদের কাছে বিশেষ লাভজনক বিবেচিত হয়।

প্রথম জীবনের বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকর আন্দামান সেলুলার জেলে নয় বছর কাটান। এই নয় বছরের মধ্যে সাভারকর ক্ষমা প্রার্থনা করে সরকারকে পাঁচটি মুচলেকা দেন,যা অন্য আর কোন বিপ্লবী করেন নি। (সম্প্রতি বোম্বে হাই কোর্টের একটি মামলায় সাভারকরের নাতি এই সমস্ত অভিযোগকে স্বীকার করে বলেন যে তার ঠাকুরদা যে মুচলেকাগুলি  দিয়ে মৃত্যুদণ্ড ও আন্দামানের জেলের অত্যাচার থেকে রেহাই পেয়েছিলেন, সেগুলো আজও সরকারি নথি হিসেবে সংরক্ষিত আছে)

সাভারকর প্রতিশ্রুতি দেন-  “যে সব যুবক ভারতে ও বিদেশে পথ প্রদর্শক হিসাবে আমার দিকে তাকিয়েছিল, সাংবিধানিক পথে আমার রূপান্তরের ফলে সেই সব বিপথ গামী দের ফিরিয়ে আনা যাবে।“ ১৯২৪ সালে মুচলেকার বিনিময়ে সাভারকর মুক্তি পান। ১৯৩৭ সালে সাভারকরের উপর থেকে রাজনৈতিক কার্যকলাপের নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ১৯৩৭ সাল থেকেই সাভারকর হিন্দু মহাসভার সভাপতি বোঝাই যায় সাভারকরকে ব্রিটিশ প্রশাসন ব্যবহার করেছিল এবং বিনিময়ে সাভারকর ব্রিটিশ শাসকদের তাঁর প্রতিশ্রুত সাহায্য করেছিলেন।

ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাজন এবং তৎপরবর্তী সময়ে দাঙ্গা, বিদ্বেষ, প্রাণহানি ও ব্যাপক উদ্বাস্তু সমস্যা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কলঙ্কিত অধ্যায়। ১৯৪৫-৪৬ এ দেশ জোড়া ধর্মীয় উন্মত্ততা আর বিধ্বংসী দাঙ্গা দেশ ভাগ কে অনিবার্য করে তোলে। ১৯৪৭ এর ২২শে মার্চ সর্বশেষ ভাইসরয় হিসাবে যখন লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতে পৌঁছান, দাঙ্গাবিধ্বস্ত ভারত তখন এক আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়ে আছে। বাংলা ও অন্ধ্রে তেভাগা তেলাঙ্গানা কৃষক অভ্যুত্থান ব্রিটিশ সরকারের সামনে কঠিন সমস্যা তৈরি করেছিল। ১৯৪৭ এর ২০শে ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করেন ১৯৪৮ এর জুন এর মধ্যে ভারতকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। ১৯৪৭ এর মার্চ মাস থেকেই পাঞ্জাবের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে।

এই পরিস্থিতিতে দেশভাগই যে একমাত্র পথ সেইটা মোটামুটি সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বই মেনে নিয়েছিলেন। ১৯৪৭ এর মার্চ এপ্রিল মাস ধরে মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেস মুসলিম  লিগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি মেনে নিয়ে মে মাসে তিনি মাউন্ট ব্যাটেন পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।

লর্ড মাউন্টব্যাটেন  কংগ্রেসের তরফে বল্লভ ভাই প্যাটেল, জওহরলাল নেহরু, লিগের তরফে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, লিয়াকত আলি  আর শিখদের প্রতিনিধি সর্দার বলদেব সিংহকে নিয়ে বৈঠক করলেন। সেখানে তিনি ভারত ও পাকিস্তান দুটি পৃথক রাষ্ট্রের বিষয়টি চূড়ান্ত করলেন।  ২ জুন মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা কংগ্রেস, লিগ এবং শিখ নেতাদের সমর্থন পায়।

৩রা জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি সরকারি ভাবে ঘোষণা করেন যে দশ সপ্তাহের মধ্যে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাবে। ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের দুই উত্তরসুরীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হবে। দুই মুসলমান প্রধান রাজ্য, বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করে মুসলমান অধ্যুষিত পাশাপাশি জেলাগুলো দেওয়া হবে পাকিস্তানকে, আর অ-মুসলমানপ্রধান বাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে। বাংলা ও পঞ্জাব কে ভাগ করার জন্য সীমান্ত কমিশন গঠনের কথা বলা হয়।

৩রা জুন কংগ্রেস কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা গৃহীত হয়। দেশভাগের বিরোধী গান্ধী ও নিরুপায় হয়ে মেনে নেন। ১৪ জুন অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিতির মিটিং এ ২৯-১৫ ভোটে দেশভাগের প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবের স্বপক্ষে বক্তব্য রাখেন নেহরু ও প্যাটেল। তীব্র বিরোধিতা করেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। যে কোন পরিস্থিতিতে ভারত বিভাজন মেনে নেওয়া দুঃখজনক এবং কংগ্রেসের রাজনৈতিক ব্যর্থতার পরিচায়ক।

বাংলা আর পাঞ্জাব, দুই জায়গাতেই চারজন বিচারককে নিয়ে তৈরী হয়েছিল বাউন্ডারি  কমিশন, দুই কমিশনেই চেয়ারপার্সন ছিলেন সিরিল র‍্যাডক্লিফ। আর চারজন বিচারককে মনোনীত করেছিল  কংগ্রেস আর মুসলিম লিগ। বাংলা কংগ্রেসের তরফে এই কমিশনে ছিলেন জাস্টিস বি.কে. মুখার্জী এবং জাস্টিস সি.সি. বিশ্বাস। মুসলিম লিগের মনোনীত সদস্য ছিলেন জাস্টিস আবু সালেহ মহম্মদ আক্রম, এবং জাস্টিস এস.এ. রহমান। এবং স্বাভাবিকভাবে সকলেই রীতিমত অনুগতভাবে নিজের নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং দলগত নীতির প্রতিনিধিত্ব করে গেছিলেন পুরো সময়টা জুড়ে। মাসখানেক ধরে ৩৬জন উকিল ৩৬টা আবেদন এই কমিশনের সামনে হাজির করলেও (সময়াভাবে আরো ৭১টা আবেদন পেশই করা যায়নি) র‍্যাডক্লিফ পুরো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শুধুমাত্র কমিশনের চার সদস্যের আনা দাবী আর পাল্টা-দাবীর ওপর ভিত্তি করে – মানে বাস্তবে কংগ্রেসের “সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি” আর মুসলিম লিগের পেশ করা বক্তব্যের ওপরেইএই পুরো পর্বটা জুড়েই কংগ্রেস হাইকম্যান্ড বাউন্ডারি কমিশন থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছিল, রাজ্যের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিয়ে। বাবাসাহেব আম্বেদকর কংগ্রেসের   এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন – তাঁর বক্তব্য ছিল এই সীমানা নির্ধারণ রাজ্যের নয়, দেশের সরকারের দায়িত্ব হওয়ার কথা, এবং এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বদলে সেনাবাহিনীর লোকজনের থাকা প্রয়োজন, কারণ শেষ অবধি, সীমানার দেখভালের দায়িত্ব তাদেরই। অবশ্যই আম্বেদকরের এই কথায় বিশেষ কেউ কান দেয়নি – না কংগ্রেস হাইকম্যান্ড, না ব্রিটিশ রাজ, না প্রতিরক্ষা দপ্তরের কেউ (ওই দপ্তর থেকে কেউ বাউন্ডারি কমিশনের সামনে হাজির পর্যন্ত হননি)।

দুই বাংলার সীমা নির্ধারণের দায়িত্ব প্রাপ্ত সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটিতে ছিলেন বারো সদস্য। এতে দুজন ছিলেন বাংলা কংগ্রেস থেকে (এই দুজনের একজন ব্যারিস্টার অতুল চন্দ্র গুপ্ত – কমিটির চেয়ারম্যান), বাকি দশজন ছিলেন হিন্দু মহাসভা, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের তরফে। বারোজনের মধ্যে দশজন দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী ! এই অল্প কয়েকটা দিনের মধ্যে দুই দেশের সীমা নির্ধারণ সম্পদের বণ্টন সহজ কথা নয়।

এই সময় নেতা  হিসাবে কতটা শক্তিশালী ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ? বাংলায় হিন্দু মহাসভারই বা কতটা জনসমর্থন ছিল? আমরা দেখতে পাই, ১৯৪৫-এর শেষের দিকে কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে কংগ্রেস প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ছিল ১০,২১৬ এবং শ্যামাপ্রসাদ পেয়েছিলেন মাত্র ৩৪৬টি ভোট। ওই নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ-সহ হিন্দু মহাসভার প্রতিটি প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।

শুধু তা-ই নয়, ১৯৪৬-এর প্রথম দিকে প্রাদেশিক নির্বাচনেও চিত্রটা খুব বেশি আলাদা ছিল না। অবিভক্ত বাংলায় হিন্দু মহাসভা ২৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, কিন্তু একটি ছাড়া সব ক’টি আসনে তাদের সমস্ত প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। একমাত্র শ্যামাপ্রসাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। সাধারণ নির্বাচনী এলাকায় মহাসভা সাকুল্যে পায় শতকরা ২.৭ ভাগ ভোট। বাংলার হিন্দু ভোটাররা যে হিন্দু মহাসভার বদলে কংগ্রেসকে বেছে নিচ্ছেন, এ বিষয়ে আক্ষেপের বিষয়টা শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরির পাতায় পাতায় চোখে পড়ে।

শ্যামাপ্রসাদ ১৯৪৪ সাল থেকেই বাংলা বিভাজনের জন্য সরব হয়ে ওঠেন। বিভাজনের দাবিকে শক্তিশালী করার জন্য ১৯৪৭ এর ২ মে তিনি ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনকে চিঠি লেখেন ভারত ঐক্যবদ্ধ থাকলেও যেন বাংলার বিভাজন হয়। হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণীর সংখ্যাগরিষ্ঠ তখন বিভাজনকামী। অবিভক্ত বাংলায় সংখ্যালঘু না হয়ে হিন্দু বাংলাকে স্বতন্ত্র রাজ্যের মর্যাদা দিতে চান। ভারত ভাগ না হলেও তাঁরা বাংলার ভাগ চান। শ্যামাপ্রসাদ বলেন বাংলাকে কিছতেই মুসলমান প্রদেশে পরিণত করা চলবে না- “ বাংলা যদি পাকিস্তানে রূপান্তরিত হয়… বাঙালি হিন্দুদের চিরকাল মুসলমানদের অভিভাবকত্বে । এর অর্থ হল বাঙালি সংস্কৃতির ধ্বংস”

একই সময় বাংলার কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায় এবং বাংলা মুসলিম লিগের আবুল হাসিম, সোহরাওয়ারদি ভারত এবং পাকিস্তানের থেকে স্বতন্ত্র একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। নেহরু এবং প্যাটেল এর তীব্র বিরোধী ছিলেন। গান্ধীর সম্মতিও মেলেনি। ১৯৪৭ এর ১১ মে শ্যামাপ্রাসাদ বল্লভভাই প্যাটেলকে চিঠি লেখেন-  “ আপনি সার্বভৌম বাংলা গঠনের পরিকল্পনার প্রতি কোন গুরুত্বই দেবেন না … “  এই চিঠিতেই  লেখেন- “ঘটনার চাপে মিঃ জিন্না যদি [ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা] অবশেষে গ্রহণ করতে বাধ্য হন, তাহলে বাংলা ভাগের প্রশ্ন যেন পরিত্যক্ত না হয়, তা অনুগ্রহ করে দেখবেন। …পাকিস্তান হোক আর না হোক, আমরা বর্তমান বাংলার সীমানার মধ্যে দুটো প্রদেশ গঠিত হোক, এই দাবি করি।” একই মর্মে তিনি নেহরুকেও একটি চিঠি পাঠান।

এর উত্তরে প্রথমে নেহরু শ্যামাপ্রসাদকে লেখেন, “[ভারতীয়] ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন সার্বভৌম বাংলার ধারণা ব্যক্তিগতভাবে আমি মোটেই পছন্দ করি না। … ৩১ মে দিল্লিতে কংগ্রেস কাযনির্বাহী কমিটির বৈঠক হবে। ওই সময়ে আপনি দিল্লিতে উপস্থিত থাকলে সুবিধা হবে।” এর তিন দিন পরে অর্থাৎ ১৭ মে, শ্যামাপ্রসাদকে আশ্বস্ত করে প্যাটেল লেখেন: “কার্যকরী ও সুষ্ঠুভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য আপনি আমাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন। বাংলার হিন্দুরা যতক্ষণ দৃঢ় থাকবেন এবং যে সাহায্য তাঁরা শুধু আমাদের দিতে পারেন সেই সাহায্য দেবেন, ততক্ষণ তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ নিরাপদ।”

কিন্তু আসল ব্যাপার হল এই যে, প্যাটেল ও নেহরুকে শ্যামাপ্রসাদের চিঠি লেখার বহু আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি প্যাটেল ওয়াভেলকে জানান যে, তিনি মুসলমানদের— যদি তাঁরা যোগ দিতে ইচ্ছুক হন— পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং পূর্ব বাংলা ছেড়ে দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত আছেন।, ১৯৪৭ সালের ১০ মার্চ নেহরুও প্যাটেলের মতোই বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাজনের প্রস্তাব দিয়ে ওয়াভেলকে জানান, “যদিও রূপায়িত করতে পারলে ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনাই সবচেয়ে ভালো সমাধান ছিল— এ ছাড়া বাংলা ও পাঞ্জাবের ব্যবচ্ছেদই একমাত্র বাস্তব বিকল্প।”

অর্থাৎ বাংলা বিভাজনের জন্য শ্যামাপ্রসাদ যখন নেহরু ও প্যাটেলের দ্বারস্থ হচ্ছেন কিংবা মাউন্টব্যাটেনকে গোপনে চিঠি পাঠাচ্ছেন, তার অনেক আগে বাংলা ভাগের ব্যাপারে ভাইসরয় ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের চূড়ান্ত নীতি গ্রহণ সারা। এরপরে ১৬ মে ভি.পি. মেনন তাঁর খসড়াটি ভাইসরয়ের কাছে জমা দিলে তা নেহরু, প্যাটেল, জিন্না, লিয়াকত আলি খান এবং বলদেব সিং কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ১৮ মে মেননকে সঙ্গে নিয়ে মাউন্টব্যাটেন এই খসড়া-সহ লন্ডনে রওনা হন। ব্রিটিশ সরকারও কালবিলম্ব না করে এই নতুন পরিকল্পনাটি অনুমোদন করে। ২৬ মার্চ দিল্লি আইন সভার অমুসলমান সদস্যরা একটি বৈঠকে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনকে আটকানোর জন্য বাংলা কে ভাগ করে স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব করেন। কয়েক দিন পর নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি এই প্রস্তাব গ্রহণ করে।   এই গোটা কার্যক্রমে শ্যামাপ্রসাদ কোথাও ছিলেন ইতিহাসে তেমন উল্লেখ পাওয়া যায় না।

প্রকৃতপক্ষে দেশ ভাগের অনিবার্যতা যত স্পষ্ট হয়ে ওঠে,  অবিভক্ত বাংলার  হিন্দুপ্রধান অঞ্চল গুলিকে নিয়ে ভারতের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের উদ্যোগ শুরু হয়। এই উদ্যোগে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার মধ্যে খুব পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়না। কংগ্রেসের বিধান চন্দ্র রায়, নলিনীরঞ্জন সরকার, ফরওয়ার্ড ব্লকের হেমপ্রভা মজুমদার, হিন্দু মহাসভার নির্মল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলা বিভাজনের স্বপক্ষে একাধিক যৌথ সভা  করেছেন। মার্চ মাসের মধ্যে কলকাতা ও পশ্চিমের জেলাগুলির হিন্দু মধ্যবিত্ত দল মত নির্বিশেষে বাংলা ভাগের পক্ষে মনস্থির করে ফেলেছিলেন। পূর্ববঙ্গের নেতাদের মধ্যে খুব স্বাভাবিক কারণেই এতে সায় ছিল না। কুমিল্লা, বরিশাল, নোয়াখালি প্রভৃতি জেলার হিন্দু নেতা, আইনজীবী, ব্যবসায়ীরা বঙ্গ বিভাজনের বিরোধিতা করে বলেন এই দাবি মুসলিম লিগের বিভাজনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকেই সমর্থন করছে। এর জবাবে ১৯শে মার্চ শ্যামাপ্রসাদ এক দীর্ঘ বক্তৃতায় বলেন  পৃথক প্রদেশ গঠিত হলে ভারতের অধীনে বাংলার দুই তৃতীয়াংশ মানুষ নির্বিঘ্নে বাস করতে পারবে। ভারত সরকার আর পশ্চিম বঙ্গ পূর্ব ভারতের হিন্দুদের রক্ষাকবচ হবে।

সাম্প্রতিক কালে ১৯৪৭ এর এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসম্মেলন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ২০২৬ এর  ২০ জুন বর্তমান প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তারকেশ্বরে সভা করে দাবি করেছেন ১৯৪৭ এর মার্চে শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিমবঙ্গের স্বপক্ষে যে জনমত গড়ে তোলেন তার চাপেই পৃথক পশ্চিম বঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতিহাস দেখলে বোঝা যায় এই দাবি কোনমতেই সত্য নয়। সম্মেলনের প্রথম দিন শ্যামাপ্রসাদ কলকাতায় ছিলেন। বাংলা প্রদেশ কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সভায় তিনি আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। এই সভায় একটি প্রস্তাব গৃহীত হয় যে বাংলার কোন অংশ যদি প্রদেশের থেকে পৃথক হয়ে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যোগ দিতে চায় তাকে সেই অধিকার দিতে হবে। এই প্রস্তাবটি দিল্লিতে নেহরুর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পাঠানো হয়। এই দিন তারকেশ্বরে হিন্দু মহাসভার নেতা নির্মল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা বিভাজনের যৌক্তিকতা ব্যাখা করেন। পরের দিন ৫ এপ্রিল শ্যামাপ্রাসাদ এই একই কথা বলেন।

২০শে জুন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন ১১৩ জন, কংগ্রেসের ৮৭ জন, সিপিআই -এর ৩ জন এবং হিন্দু মহাসভার ১ জন (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি)। ২৫ জন ইউরোপীয় সদস্য সে দিন অনুপস্থিত ছিলেন। মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং হিন্দুগরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের যৌথ অধিবেশনে নুরুল আমিনের সভাপতিত্বে ২১৯ জন নির্বাচিত সদস্য দের মধ্যে ২১৬ জন  ভোটে অংশ গ্রহন করেন। বাংলা ভারতে থাকবে না পাকিস্তানে যোগ দেবে এই প্রশ্নে ৯০ জন ভারতীয় গণ পরিষদের পক্ষে এবং ১২৬ জন পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেন। পরবর্তী অধিবেশন অর্থাৎ হিন্দুদের সংখ্যা গরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভায় বাংলা ভাগ এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় গণপরিষদে যোগ দেবার  পক্ষে ৫৮ টি ভোট পড়ে, ২১ টি ভোট অখণ্ড বাংলার পক্ষে। ৫৫ জন কংগ্রেস, দুজন কমিউনিস্ট পার্টি এবং হিন্দু মহাসভার একজন। মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ জেলাগুলি থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশনে বাংলা ভাগ এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেবার প্রস্তাব ১০৭-৩৫ ভোটে হেরে যায়। পূর্ব বঙ্গে সিলেটকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ১০৭ জন ভোট দেন, ৩৪ জন বিপক্ষে । হিন্দু সংখ্যাধিক্য অঞ্চলের ভোটে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। বাংলা ভাগ এবং ভারতের অধীনে  পশ্চিমবঙ্গ যে ৫৮ জনের মধ্যে হয় তাঁদের মধ্যে ৫৫ জন কংগ্রেস সদস্য, দু’জন কমিউনিস্ট (জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মণ) এবং হিন্দু মহাসভার একজন – শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এই ভোটে দল নির্বিশেষে প্রায় সব বাঙালি হিন্দুর মত ছিল বাংলা ভাগ এবং ভারতের অধীনে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে। এই ঐক্যমত্য গড়ে উঠেছিল ভারত তথা বঙ্গ বিভাজনের প্রায় ছয়মাস আগে বঙ্গ বিভাগ আন্দোলনের মাধ্যমে।  তাই  শ্যামাপ্রসাদ বাংলা বিভাজনের পক্ষে এক শক্তিশালী কণ্ঠ হলেও তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের জনক বলা সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছুই না। কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি এবং হিন্দু মহাসভা একযোগে বাংলা ভাগের পক্ষে রায় দিলেও এই তিনটি গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য এক ছিল না। কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চিমবঙ্গকে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের অংশ করার জন্যই কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি বাংলা বিভাজনে রাজি হয়, হিন্দু হোম ল্যান্ড বানানোর জন্য নয়।

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ছাড়া বাংলার এই বিভাজন সম্ভব ছিল না। ১৯৪৬ সালের কলকাতা ও নোয়াখালির দাঙ্গা, পরবর্তী প্রতিশোধমূলক হিংসা এবং সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া অনিশ্চয়তার আবহ সাধারণ মানুষের মধ্যে সহাবস্থানের সম্ভাবনা সম্পর্কে গভীর সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল। যে শহরে কয়েক মাস আগেও আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দিদের মুক্তির দাবিতে বা নৌবিদ্রোহের সমর্থনে হিন্দু-মুসলিম ছাত্র-শ্রমিক একসঙ্গে আন্দোলন করেছিলেন, সেই সমাজকেই ক্রমশ ধর্মীয় বিভাজনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।এই দিনটি আদৌ গৌরবের দিন ছিল, নাকি পরাধীন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি কালো দিন ছিলো, বিচার করে দেখা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে “পশ্চিমবঙ্গ দিবস” পালনের সরকারি উদ্যোগের মধ্যে অনেকেই এমন এক প্রবণতা দেখতে পাচ্ছেন, যেখানে বাংলার বিভাজনকে একটি ইতিবাচক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বঙ্গভাগ বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসে এক গভীর ট্র্যাজেডি, যার অভিঘাত আজও শেষ হয়ে যায়নি।

মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য থেকে শুরু করে বৈষ্ণব আন্দোলন, শাক্তধর্ম থেকে বাংলার সুফি-ঐতিহ্য— সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল এক বিশেষ সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসর। এই কারণে বঙ্গভাগকে কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা যায় না। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক ভূখণ্ড, অর্থনীতি ও সমাজের বিভাজন। যে বাংলা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নদী, বাণিজ্য, কৃষি ও সংস্কৃতির সূত্রে একসূত্রে গাঁথা ছিল, তাকে রাজনৈতিক রেখা টেনে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল পশ্চিমবঙ্গ কত বড় হবে এবং কী কী ভাবে অর্থনৈতিকভাবে কার্য্কর হবে। । হিন্দু মহাসভা আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন এর দাবি ছিল আকাশপ্রমাণ এগারোটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা (বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, হাওড়া, হুগলী, কলকাতা, ২৪ পরগণা, খুলনা, দার্জিলিং আর জলপাইগুড়ি) ছাড়াও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অনেক অংশও এদের দাবীর মধ্যে ছিল – যেমন নদীয়ার বড় অংশ, ফরিদপুর, দিনাজপুর, এবং রংপুর আর রাজশাহীর বেশ কিছু অঞ্চল। মহাসভা আর নিউ বেঙ্গলের দাবী মানলে পশ্চিমবঙ্গে আসতো অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের প্রায় তিন ভাগ।

উল্টোদিকে, অতুল চন্দ্র গুপ্তর নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্যাম্পের দাবী তুলনামূলকভাবে অনেক নিচু স্কেলে বাঁধা ছিল। তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন যে অহেতুক অযৌক্তিক দাবীর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত দাবীই লঘু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলগুলোর প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাব নাকচ করলে অতুল চন্দ্র গুপ্ত স্ট্র্যাটেজি বদলে দুটো প্রস্তাব রাখেন – একটা “কংগ্রেস স্কিম”, যেখানে অনেক বড় আকারে দাবী পেশ করা হয়েছিল – মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অংশ জুড়ে (যদিও সেটাও মহাসভার দাবীর চেয়ে কমই ছিল), আর দ্বিতীয়টা “কংগ্রেস প্ল্যান”, যেখানে প্রথম স্কিমের চেয়ে কম এলাকা চাওয়া হলেও সেটা মোটামুটিভাবে ওই মৌলিক তত্ত্ব মেনেই, অর্থাৎ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোকেই নিয়ে।

যে কয়েকটা পিটিশন জমা পড়েছিল কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার তরফে, তার প্রতিটাতেই কলকাতা ছিল পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই। অর্থাৎ, হিন্দুত্ববাদীদের দ্বিতীয় দাবী, যে শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছে, সেই দাবীটিকেও সহজেই নস্যাৎ করে দেওয়া যায়।

বস্তুতঃ প্রোপাগান্ডাই ছিল মহাসভার মূল উদ্দেশ্য। উল্টোদিকে কংগ্রেসের হাতে এই কল্পনাবিলাসের সুযোগ ছিল না। নতুন যে রাজ্য তৈরী হবে, তাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, আর তাদের প্রতি পদক্ষেপ ছিল সেই লক্ষ্যে। অতুল গুপ্তের তত্ত্বাবধানে কংগ্রেসের কমিটি রাজ্যের প্রতিটা থানার জনসংখ্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব করেছিল সেন্সাস রিপোর্টের সাহায্য নিয়ে। কংগ্রেসের প্ল্যানাররা মোটামুটিভাবে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির কথা ভেবেই সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন। দার্জিলিং এর চা-বাগান এলাকা, ভাগিরথী-হুগলীর নদীপথ, এবং কলকাতা বন্দরের কথা ভেবে মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদীয়া – এগুলো সব তাঁদের প্ল্যানে ধরা ছিল। প্রথমে মুসলিম প্রধান মালদা মুর্শিদাবাদ পূর্ব বঙ্গে যাবে ঠিক হলেও ভাগিরথী সহ দক্ষিণ বঙ্গের নদীগুলির উৎস মুখ পশ্চিমবঙ্গে রাখার জন্য মালদা মুর্শিদাবাদ ভারতে থাকে, তাই হিন্দুপ্রধান যশোর খুলনা চলে যায় পূর্ববঙ্গে। বঙ্গীয় কংগ্র এর বাংলা বিভাজন কমিটির সভাপতি অতুল গুপ্তের দেওয়া প্রস্তাব এবং র‍্যাডক্লিফের চূড়ান্ত সীমানা প্রায় এক।

পরবর্তী কালে দেখা যায় পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের কাছে পশ্চিমবঙ্গ কে রক্ষা কবচ বানানোর জে প্রতিশ্রুতি শ্যামাপ্রসাদ দিয়েছিলেন তা ভুল ছিল। ১৯৪৭ এর ১৫ অগাস্ট শ্যামাপ্রসাদ নেহরু মন্ত্রী সভায় শিল্প ও বানিজ্য মন্ত্রী হিসাবে যোগ দেন।

বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়ার পরে পূর্ববঙ্গ থেকে যে হিন্দুরা ভিটেমাটি ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য হন যে হিন্দুরা তাঁদের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ কোন বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়না।

১৯৪৯-এর ১ ডিসেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে লেখেন: “আপনার ধারণা ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য আপনার সরকার বিরাট টাকা দান করেছে। আপনি কী উপলব্ধি করেন যে, আপনার সরকারের কাছ থেকে ১৯৪৮-৪৯ ও ১৯৪৯-৫০ এই দুই বছরের জন্য ওই উদ্দেশ্যে মোট অনুদান পাওয়া গেছে ৩ কোটি টাকার সামান্য কিছু বেশী ও বাকি প্রায় ৫ কোটি টাকা ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়েছে। আমি বলছি, ২৬ লক্ষ বাস্তুহারাদের জন্য এ পর্যন্ত যে অনুদান দেওয়া হয়েছে তা তুচ্ছ, কারণ দু’বছরে জনপ্রতি তার পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ টাকার মতো।” স্বাধীনতার পরের দুই দশকে প্রায় আশি লক্ষ উদবাস্তু পশ্চিমবঙ্গে এসে জবরদখল কলোনি স্থাপন করতে বাধ্য হন। জীবন ও জীবিকার জন্য মরণপণ সংগ্রাম চালান।

১৯৫০ এর ২ এপ্রিল দুই দেশের সংখ্যালঘুদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থে সম্পাদিত নেহরু- লিয়াকত চুক্তির প্রতিবাদে শ্যামাপ্রসাদ  মন্ত্রিত্ব ছাড়েন।

ইতিমধ্যে ১৯৪৮ এর ৩০শে জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ এবং হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত নাথুরাম গডসের গুলিতে নিহত হন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী।

গান্ধীহত্যার পরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। হিন্দু মহাসভার কাজকর্মে নানাবিধ নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হয়। এই পরিস্থিতি তে শ্যামাপ্রাসাদ হিন্দু মহাসভা থেকে পদত্যাগ করে  গোপনে আর এস এস প্রধান গোলওয়ালকরের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং ১৯৫১ র ২১ অক্টোবর ভারতীয় জন সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিস্থিতি বুঝে রাজনৈতিক মিত্র নির্বাচন এবং পরিবর্তনে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ১৯২৯ এ কংগ্রেস, ১৯৩০ এ নির্দল,   ১৯৪১-এ লিগের সঙ্গে, ১৯৪২-এ ব্রিটিশের সঙ্গে,  ১৯৪৭-এ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে, ১৯৫০-এ নেহেরুর মন্ত্রিসভায়, ১৯৫১-তে আবার কংগ্রেস-বিরোধী জনসঙ্ঘ। শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক আনুগত্য প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে তাঁর একটি কথোপকথন উল্লেখযোগ্য –“আমি তাকে সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করি, “আপনি কংগ্রেসে যোগ না দিয়ে হিন্দু মহাসভায় যোগ দিলেন কেন?”  

শ্যামাপ্রসাদ অকপটে স্বীকার করেন, “কংগ্রেসের আগে থেকে যারা রয়েছেন তারা কি আমাকে এত সহজে এত উচ্চে উঠতে দিতেন?” হিন্দু মহাসভায় গিয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে দলপতি হয়েছিলেন।

এ বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল না যে প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস নেতারা তাকে রাতারাতি উপরে উঠতে দিতেন না। তবে পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে তার যেমন যোগ্যতা, একবার কংগ্রেসের টিকিটে আইনসভায় যেতে পারলেই তিনি নিজ গুণে স্থান করে নিতেন।

কিন্তু কংগ্রেস তো যেকোনো দিন জেল যাত্রা করতে পারে। কে জানে কত কাল জেলে পচতে হবে? জেলে না গেলে কেউ কংগ্রেস নেতা হয় না। হিন্দু মহাসভা সে দিক থেকে শ্রেয়। মুসলিম লীগ ও। কংগ্রেসের এ দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল অন্য পন্থা বেছে নিয়েছে।” (যুক্তবঙ্গের স্মৃতি )

হিন্দু মহাসভার অন্তহীন ব্রিটিশ চাটুকারিতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিকে বাংলার মানুষ ভালো চোখে দেখেননি। হিন্দু মহাসভা স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে সারা বাংলায় কতটা শক্তি বিস্তার করতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন আসেনি।  ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচনে জনসংঘ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মাত্র ৪ শতাংশেরও কম আসনে জয়লাভ করে।

সংবিধানে কাশ্মিরকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদানকারী ৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে তিনি সরব হন। এই ধারা  অমান্য করে তিনি কাশ্মিরের সীমান্ত অতিক্রম করেন এবং গ্রেফতার হন। শ্রীনগরে একটি বাড়িতে তাঁকে গৃহবন্দী রাখা হয় ৪৫ দিন। ১৯৫৩ সালের ২৩শে জুন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু কে ঘিরে নানা রহস্য, বিতর্ক তৈরি হয়। শ্যামাপ্রসাদের মা যোগমায়া দেবী প্রধান মন্ত্রী কে চিঠি লেখেন,এই মৃত্যুকে অস্বাভাবিক মৃত্যু দাবি করে তদন্তের দাবি জানান।   এই বিতর্কে আমরা ঢুকবোনা। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে শুধু এই টুকুই বলা যেতে পারে ১৯৫২ র নির্বাচনে ৪ শতাংশ ভোট পাওয়া দলের কেন্দ্রীয় নেতাকে সরিয়ে দিয়ে কারোরই খুব রাজনৈতিক লাভ হত বলে মনে হয় না।

যে আলোচনা দিয়ে শুরু করেছিলাম সেখানেই ফিরে আসি। আজ হঠাৎ কোন প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের নতুন আইকন হিসাবে শ্যামাপ্রাসাদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছেন সেটা ভাবা খুব জরুরি। হিন্দু মহাসভা, RSS, ভারতীয় জন সংঘের আরব্ধ কাজ সমাপ্ত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে রাজ্যে এবং দেশের সর্বত্র। বাংলার মিশ্র সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে চলছে কৃত্রিম একরৈখিক হিন্দুত্বকে চাপিয়ে দেবার সচেতন প্রয়াস। শ্যামাপ্রসাদকে জানতে গেলে একটা অন্ধকার সময়ের ইতিহাসকে জানতে হবে। বুঝতে হবে কী ভাবে বিভাজনের বিষ শিক্ষিত মননকে বিষাক্ত করে দেয় । শ্যামাপ্রসাদ স্মৃতিপক্ষ পালন তখনই সার্থক হবে যখন শ্যামাপ্রসাদের  বিভাজন পন্থী সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মূলোৎপাটন করা যাবে, যখন বাংলা তথা  ভারতের এই কঠিন বিক্ষুব্ধ সময়ে চিৎকার করে বলতে পারা যাবে –

“হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন

কাণ্ডারি বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র”

তথ্যসূত্র 

১। সঙ্ঘ পরিবার ও হিন্দুত্ব বাদ- ভিত্তি উদ্ভব বিকাশ (আপডেট স্টাডি গ্রুপ)

২। হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ – সাম্প্রতিক কাল ( আপডেট স্টাডি গ্রুপ)

৩। আর এস এস –বিজেপির হিন্দুরাষ্ট্র প্রকল্প , সুকান্ত দাশ, সুদীপ্ত ব্যানার্জি, অভীক মুখার্জী (সম্পাদিত)

৪। Modern India, Sumit Sarkar

৫। From Plassey to Partition: A History of Modern India, Sekhar Bandyopdhyay

৬। Leaves from a diary, Syamaprasad Mookerjee

৭। ‘Painful Sights’: Chittaprosad on BJP Icon S.P. Mookerjee’s Bengal Village, The Wire 4.7.2016

৮। ইতিহাস শিক্ষার বিড়ম্বনা, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আনন্দ বাজার পত্রিকা, ২৬.৬.২৬

৯। বাংলা ভাগের উদযাপন : দ্বি জাতি তত্ত্বের ভূত, সম্পূরক আচার্য, গণ শক্তি, ২০.৬.২৬

১০। যুক্ত বঙ্গের স্মৃতি, অন্নদাশঙ্কর রায়

১১। সেদিনের কথা, মণিকুন্তলা সেন

১২। The Bengal Files: The Birth of West Bengal and ShyamaPrasad, Arijit Mukherjee

১৩। ১৯৪৬-৪৭ : কলকাতা হত্যাকাণ্ড, যুক্তবঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ, কাঞ্চন সরকার

ফেসবুক পোস্ট
সৌম্য শাহীন, জহর সরকার, অরিজিৎ মুখার্জী, দেবাশিস ঘোষ

ফিচার ছবিঃ চিত্তপ্রসাদের আঁকা মন্বন্তরের ছবি।

PrevPreviousবারুইপুরের খুনী-ধর্ষকদের শাস্তি চাই।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

সম্পর্কিত পোস্ট

বারুইপুরের খুনী-ধর্ষকদের শাস্তি চাই।

July 7, 2026 No Comments

৬ জুলাই, ২০২৬ সংবাদ মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি,বারুইপুরের সূর্যপুরে এক নাবালিকা শিশু কন্যার গণধর্ষণ এবং নৃশংস খুনের ঘটনার কথা। আমরা বাকরুদ্ধ। আর কত, আর কত?

পশ্চিমবঙ্গ যে আরো অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে বারুইপুর দেখিয়ে দিল

July 7, 2026 No Comments

বারুইপুরে এগারো বছরের একটি বালিকার ধর্ষণ ও খুনের মতো অতি নিন্দনীয় ন্যাক্কারজনক কাণ্ডে ততোধিক নিন্দনীয় ন্যাক্কারজনক অবস্থান নিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। নির্যাতিতা বালিকার পরিবারের সব দাবি

পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন ও অর্থ ব্যবস্থা: বাজেটিয় ঘোষণা এবং অন্যান্য প্রকল্প

July 6, 2026 No Comments

বড়ো পাপ হে: স্বাধীনতার আগে পরে ভারতের সবচাইতে শিল্পোন্নত রাজ্য যা কর্মসংস্থানের জন্য সারা ভারতের কর্ম প্রার্থীদের আহ্বান করত, আমাদের সেই রাজ্য বাংলা (অবিভক্ত) এবং

পুঁজিবাদের আওতায় মানুষের ‘উচ্ছেদ’ নতুন কিছু না

July 6, 2026 No Comments

বাংলায় একটা কথা চালু আছে, “ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই”। দশকের পর দশক ধরে, হকার সমস্যা নিয়ে সরকারগুলোর মনোভাব আমাদের বারবার সেই কথাটা

যোগ: অন্তর্জাগরণের সাধনা নাকি প্রদর্শনীর উপকরণ?

July 6, 2026 No Comments

যোগের প্রকৃত দর্শন, ভিত্তি এবং সমকালীন বিকৃতির সমালোচনা ভূমিকা একবিংশ শতাব্দীতে ‘যোগ’ শব্দটি বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক যোগ দিবস, কর্পোরেট ওয়েলনেস কর্মসূচি,

সাম্প্রতিক পোস্ট

শ্যামাপ্রসাদ স্মৃতিপক্ষ: বিভাজন-রাজনীতির উদযাপন

Gopa Mukherjee July 7, 2026

বারুইপুরের খুনী-ধর্ষকদের শাস্তি চাই।

Abhaya Mancha July 7, 2026

পশ্চিমবঙ্গ যে আরো অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে বারুইপুর দেখিয়ে দিল

Parichay Gupta July 7, 2026

পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন ও অর্থ ব্যবস্থা: বাজেটিয় ঘোষণা এবং অন্যান্য প্রকল্প

Bappaditya Roy July 6, 2026

পুঁজিবাদের আওতায় মানুষের ‘উচ্ছেদ’ নতুন কিছু না

Dipak Piplai July 6, 2026

An Initiative of Swasthyer Britto society

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

Contact Us

Editorial Committee:
Dr. Punyabrata Gun
Dr. Jayanta Das
Dr. Chinmay Nath
Dr. Indranil Saha
Dr. Aindril Bhowmik
Executive Editor: Piyali Dey Biswas

Address: 

Shramajibi Swasthya Udyog
HA 44, Salt Lake, Sector-3, Kolkata-700097

Leave an audio message

নীচে Justori র মাধ্যমে আমাদের সদস্য হন  – নিজে বলুন আপনার প্রশ্ন, মতামত – সরাসরি উত্তর পান ডাক্তারের কাছ থেকে

Total Visitor

646868
Share on facebook
Share on google
Share on twitter
Share on linkedin

Copyright © 2019 by Doctors’ Dialogue

wpDiscuz

আমাদের লক্ষ্য সবার জন্য স্বাস্থ্য আর সবার জন্য চিকিৎসা পরিষেবা। আমাদের আশা, এই লক্ষ্যে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও আপামর মানুষ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের আলোচনা ও কর্মকাণ্ডের একটি মঞ্চ হয়ে উঠবে ডক্টরস ডায়ালগ।

[wppb-register]