গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে এন আর এস মেডিক্যাল কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের লড়াইয়ের প্রতি সংহতি জানাই।
একটি মেডিক্যাল কলেজ শুধু ক্লাস, পরীক্ষা, হোস্টেল আর হাসপাতালের প্রশাসনিক কাঠামো নয়। এটি ছাত্রছাত্রীদেরও প্রতিষ্ঠান। তাই তাঁদের সমস্যা, দাবি, অধিকার, মতামত এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত সিদ্ধান্তগুলিতে তাঁদের নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব থাকা একটি গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাসের অন্যতম মৌলিক শর্ত।
সেই কারণেই গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ দরকার।
কর্তৃপক্ষের পছন্দমতো কয়েকজনকে মনোনীত করে কোনও কমিটি তৈরি করা ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের বিকল্প হতে পারে না। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই তাঁদের কাছে জবাবদিহি করবেন, তাঁদের সমস্যার কথা বলবেন এবং তাঁদের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবেন। ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধি কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত ছাত্রছাত্রীরাই নেবেন।
আর এই প্রতিনিধিত্ব শুধু একটি ছাত্র সংসদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ICC, Anti-Ragging Committee সহ ছাত্রছাত্রীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও ক্যাম্পাসের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কমিটিতে নির্বাচিত ছাত্রছাত্রী প্রতিনিধিত্ব থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাস্তবে বহু ক্ষেত্রেই এই কমিটিগুলির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকেন শাসক দলের অনুগত বা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিরাও কখনও কখনও সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অভিযোগকারীদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
এর ফলে তৈরি হয় এমন এক ভয় ও নীরবতার পরিবেশ, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়ে। যেখানে অভিযোগ জানানো মানেই প্রতিশোধের আশঙ্কা। যেখানে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও ক্রমশ সংকুচিত হয়।
অভয়ার ঘটনার পর আমরা দেখেছি, এমন একটি ভয়াবহ পরিবেশ কীভাবে তৈরি হতে পারে। তাই অভয়া আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবির মধ্যে ছিল মেডিক্যাল কলেজগুলিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কমিটিতে মনোনীত নয়, নির্বাচিত ছাত্রছাত্রী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
এই কারণেই গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন কোনও বিচ্ছিন্ন দাবি নয়। এটি ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কথা বলার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি।
বিগত শাসনামলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখে দলীয় প্রভাব, ক্ষমতার দখলদারি এবং থ্রেট কালচারের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের রায় এসেছিল। অভিক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসদের ঘিরে উঠে আসা অভিযোগগুলি সেই সময়ের মেডিক্যাল কলেজগুলির ক্ষমতার সংস্কৃতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হল, পতাকার রং বদলালেই কি সংস্কৃতি বদলে যায়?
আজ উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ থেকে মেডিক্যাল কলেজ কলকাতা, এন আর এস সহ বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে ছাত্রছাত্রীদের উপর থ্রেট কালচারের প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন আঘাতের অভিযোগ আবার সামনে আসছে। নতুন মোড়কে, নতুন রঙের পতাকায় যদি পুরনো ক্ষমতার রাজনীতিই ফিরে আসে, তাহলে তা কোনও পরিবর্তন নয়।
বিভিন্ন শাসক দলের পতাকার ধামাধরা এবং ক্ষমতার চাটুকারিতার রাজনীতির বাইরে ছাত্র সংসদ হোক সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের কথা নিজেরা বলার জায়গা। নিজেদের অধিকার বোঝার, প্রশ্ন করার, মত প্রকাশের এবং প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি দাবি করার জায়গা।
তাই আমাদের দাবি স্পষ্ট:
অতি দ্রুত এন আর এস মেডিকেল কলেজ সহ সমস্ত মেডিকেল কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন চাই, মনোনয়ন নয়। প্রতিনিধিত্ব চাই, দাদাগিরি নয়। বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ নয়, ছাত্রছাত্রীদের সিদ্ধান্ত চাই। দলীয় আনুগত্য নয়, ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ চাই। কোনো ভাবেই কোনো বিভেদকামী রাজনৈতিক শক্তির থ্রেট কালচার চলবে না, সমস্ত রকম বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করতে হবে।
তার সাথে, নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এন আর এস মেডিকেল কলেজে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পূর্ববর্তী স্টুডেন্ট কাউন্সিলকে কার্যকর রাখতে হবে এবং অবিলম্বে স্বচ্ছ, প্রত্যক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের দিন ঘোষণা করতে হবে। ফ্রেশার্স, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পসহ ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নিয়মিত কার্যক্রম কোনও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার কারণে বন্ধ হতে পারে না।
Nil Ratan Sarkar Medical College-এর ঐতিহ্য, শিক্ষার পরিবেশ এবং সিনিয়র-জুনিয়রদের সুসম্পর্ক রক্ষা করার পথ ক্ষমতার দখল নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব। ছাত্রছাত্রীদের হয়ে কথা বলার অধিকার ছাত্রছাত্রীদেরই।
তাঁদের প্রতিনিধি কে হবেন, সেই সিদ্ধান্তও তাঁরাই নেবেন।
গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ চাই। ভয়মুক্ত ক্যাম্পাস চাই।











