২০২৪ এর সেই নির্মম ৯ই আগস্টের পর ১৯ মাস পেরিয়ে এসে “অভয়া” আবার সংবাদ শিরোনামে। আবার রাজনৈতিক তরজার কেন্দ্রে আর জি করের নারকীয় খুন, ধর্ষণ এবং তারপর রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের গাফিলতির অভিযোগ। তরজার উপলক্ষ্য পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে অভয়ার মা’র আত্মপ্রকাশ। এরপর থেকেই আমাদের সংগঠনগত ভাবে এবং সংগঠনের বহু সদস্যদের ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে যে এই বিষয়ে আমাদের অবস্থান কী।
প্রথমেই খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার যে কে কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে ভোটে দাঁড়াবেন সেটি একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এই নিয়ে আমাদের সমর্থন বা আপত্তি, কোনো কিছুই থাকার কথা নয়, উচিতও নয়। যারা মনে করছেন যে এই পদক্ষেপের ফলে আন্দোলনের অবমাননা হচ্ছে, তারা আগে প্রশ্ন করুন যে এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সেই ব্যবস্থাই কি দায়ী নয়, যে ব্যবস্থা একজন সন্তানহীনা মাকে এই অনুভূতিতে পৌঁছে দিয়েছে যে ক্ষমতার অলিন্দে না গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না।
এই দেশে প্রতি সতেরো মিনিটে একটি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বহু ঘটনার অভিযোগ পর্যন্ত জানানো সম্ভব হয়না আক্রান্তের। এই প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্ষণ এবং যৌন হেনস্থার মামলায় যদি বিচার পেতে গেলে মানুষকে ভোটে দাঁড়িয়ে জিতে নিজেকে “প্রভাবশালী” বানাতে হয় তবে নির্বাচিত সরকারগুলোর ভূমিকা কী রইল? প্রশ্ন তো উঠবেই যে যেসব দল বছর বছর ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসে তাদের দায়িত্ব কি নয় নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্যাতনের ঘটনায় সঠিক তদন্ত করে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা?
এই আন্দোলন ছিল মানুষের তীব্র ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ। মানুষ অভয়ার বিচার চাইতে যেমন পথে নেমেছিল, তেমনই নিজের ঘরের মেয়েদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নেমেছিল। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি মানুষের এই যন্ত্রণা নিজেদের পতাকাতলে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ তাদের সবাই কোনো না কোনোভাবে একই অপরাধ, ক্ষমতাকাঠামো কে ব্যবহার করে চালিয়েছে বা চালাচ্ছে। সেই কারণেই এই ঐতিহাসিক গণ আন্দোলন দলীয় পতাকা বিহীন ও অদলীয় ছিল।
তাই বলে কি রাজনৈতিক দলগুলি আন্দোলনে ছিল না? অবশ্যই ছিল। CPM, BJP, SUCI, Congress সহ (এমনকি তৃণমূলের) সমস্ত রাজনৈতিক দলের কর্মীরাই ছিলেন, কিন্তু নির্বাচনের সময় প্রতিটি দলই নিজেদের কর্মীদের উপস্থিতিকে আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে দেখাতে চাইছে এবং সেখান থেকে নির্বাচনী মাইলেজ পেতে চাইছে যেটা কার্যত অসততা। কিন্তু এটাকে নির্বাচনী রাজনীতির স্বাভাবিক প্রবণতা বলেই মেনে নিতে হবে।
আমাদের আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। CBI কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এবং কেন্দ্র সরকার অর্থাৎ বিজেপি সরকার তাকে যে সরাসরি চালনা করে তা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি। এবং এই ঘটনার তদন্তে CBI এর ভূমিকা কতটা ন্যক্কারজনক ছিল আমরা দেখেছি। খুন ধর্ষণের তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার ওসি ৯০ দিন হেফাজতে থাকার পরেও কোনো অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে CBI তাদের বিরুদ্ধে সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দাখিল করেনি। ফলে তারা এই মামলায় জামিনে মুক্ত। (যদিও দুর্নীতি মামলায় সন্দীপ ঘোষ এখনও জেলে আছেন)। এখন যদি সেই CBI এর সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দেওয়ার পূর্বশর্ত হয়ে দাঁড়ায় যে নির্যাতিতার পরিবার বিজেপির হয়ে ভোটে দাঁড়াবে তবে তা গণতন্ত্রের জন্য শুধু লজ্জাজনক নয় তা ভয়ানক।
এই জায়গাতেই আমাদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে হয়। আমাদের অদলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই অভয়ার মা যে কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচন লড়ার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে সমর্থন করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। সেটা বিজেপি হোক, সিপিএম হোক, SUCI হোক বা কংগ্রেস হোক। তবে এটাও সত্যি যে, তিনি রাজ্যের প্রধান নির্বাচনী বিরোধীশক্তি হিসেবে একটি দলকে বেছে নিয়েছেন শাসকদলকে ক্ষমতা থেকে উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে, সেখানে অংশগ্রহণ করে তিনি বিচার ছিনিয়ে আনবেন বলে ভাবছেন। কিন্তু সেই দল অন্যান্য বহু রাজ্যে ক্ষমতায়। এবং সেই রাজ্যগুলোতে বিভেদকামী রাজনীতির উদাহরণ বাদ রাখলেও কেবল নারী নির্যাতনের সাপেক্ষে রেকর্ড ও তাদের ভূমিকা ভয়ানক।
তারা এমন একটি দলের হয়ে দাঁড়াচ্ছেন যারা ধর্ষকের গলায় মালা পরিয়ে উল্লাস করে এবং যাদের বহু প্রভাবশালী নেতা নারী নির্যাতনের ঘটনায় সরাসরি যুক্ত থেকেও ক্ষমতার বলে দমন পীড়ন চালিয়েছে নির্যাতিতা ও তার পরিবারের ওপর। সেই দল শর্তসাপেক্ষে ন্যায়বিচার এনে দেবে এই ধারণা সোনার পাথরবাটি ছাড়া কিছু নয়।কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতাও স্বীকার করতে হয় যে একজন সন্তানহীনা মা কতটা অসহায় অবস্থায় থাকলে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হতে দেন তা তার জায়গায় না থাকলে বোঝা অসম্ভব। তাই যারা সামাজিক মাধ্যমে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন তাদের কাছে আবেদন যে অন্তত তার অসহায়তার অনুভূতিটুকু মনে রাখুন।
কিন্তু আন্দোলনকারীরা সবাই নিজের স্বার্থে আন্দোলন করেছে – কাকু কাকিমার এই বক্তব্য আমাদের গভীরভাবে আহত করেছে। রাজনৈতিক দল গুলোর কথা জানা নেই, আমরা কেবল আমাদের অবস্থান বলতে পারি। এই আন্দোলনে আমরা যাদের আমাদের প্রতিনিধি বলে মনে করি, যারা টানা বৃষ্টি ভিজে রাত জেগে রাস্তায় ছিলেন তারা কেউই ক্ষমতা বা নির্বাচনী “স্বার্থের” জন্য নয় বরং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষায় নেমেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল অভয়ার মতো নারকীয় অপরাধের পেছনে যে রাজনৈতিক প্রশাসনিক পরিবেশ কাজ করেছে তা সামনে আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তন দাবি করা।
এখন নির্বাচনের আবহে আমরা ভুলে যেতে পারি না যে সন্দীপ ঘোষ এবং তার মাফিয়া চক্র কীভাবে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে প্রভাব বিস্তার করেছিল। শাসকদলের প্রত্যক্ষ মদতে অবাধ দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, অবাধ ভয়ের রাজনীতি, যৌন হেনস্তার মত অপরাধের স্বভাবিকীকরণ চলেছে দিনের পর দিন। ঘটনার দিন আর জি কর মেডিকেল কলেজ যখন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ডাক্তার এবং ছাত্রছাত্রীতে ভরে উঠেছে তখন সংগঠিত না থাকা সত্ত্বেও হাজারো মানুষ উপস্থিত ছিল। সেই সময় সন্দীপ ঘোষ বাহিনী এবং বিরূপাক্ষ, আশীষ পাণ্ডের গুণ্ডাদল এটিকে “ইন্টার্নাল ম্যাটার” বলে অন্যদের বের করে দিতে চাইছিল, হুমকি দিচ্ছিল। পরদিন জেনারেল বডি মিটিংয়ে সন্দীপ ঘোষের পদত্যাগের দাবি উঠতেই তাদেরই বহুজন “সম্মানীয় প্রিন্সিপাল দারুণ তদন্ত করছেন” বা “দাবি মেনে নতুন রেস্ট রুম তৈরি করে দেবেন” বা “সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে কোনও কথা বলা যাবে না” বলে মিটিং পন্ড করে দেয়, সেখানে তখন সমস্ত মেডিকেল কলেজের অন্তত তিনশো জুনিয়র ডাক্তার ও মেডিকেল পড়ুয়া।তখনই হঠাৎ লেকচার থিয়েটারের আলো বন্ধ করে গুণ্ডা ও পুলিশ দিয়ে জিবি ভন্ডুল করার ঘটনাও আমাদের মনে আছে। এত বাধা পেরিয়েও কিন্তু আন্দোলনকে সংগঠিত করা গিয়েছিল কারণ সকলে নিজেদের সবটুকু বাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এরপর মুখ্যমন্ত্রী সন্দীপ ঘোষকে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল করে পাঠালেন। কিন্তু সেখানকার জুনিয়র ডাক্তার এবং ছাত্রছাত্রীদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধে পুলিশি প্রহরা থাকা সত্ত্বেও সন্দীপ ঘোষ প্রিন্সিপালের অফিসে পৌঁছতে পারেননি এবং রণেভঙ্গ দিয়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই সব কথা বলার কারণ একটাই। আন্দোলন কোনো এক-দুজন ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে নি, রাস্তায় থাকা প্রতিটি মানুষই আন্দোলনের নির্মাতা।
আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। ক্ষমতায় লাল সবুজ গেরুয়া যে রঙই থাকুক ক্ষমতার ভাষা একই। তার তীব্রতা বদলাতে পারে কিন্তু ক্ষমতায় টিকে থাকতে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতারই ভাষায় কথা বলতে হয়। আমরা সেই ক্ষমতার রাজনীতির বিপরীতে একটি স্বাধীন সচেতন নাগরিক স্বর। যে স্বর ভুলকে ভুল বলবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে ক্ষমতাসীন দল যেই হোক না কেন।
আমরা বিশ্বাস করি নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে একটি নিরপেক্ষ নির্ভীক অদলীয় ও রাজনৈতিক নাগরিক কণ্ঠ থাকা অত্যন্ত জরুরি যাতে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেই ইচ্ছেমতো সব কিছু করতে না পারে এবং যাতে স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়ে যেতে না পারে।
#wbjdf #justiceforRGKar #justiceforabhaya











