সিস মানুষেরা লক্ষ্য করে থাকবেন, হঠাৎ চারপাশে ট্রান্স মানুষেরা রেগে উঠেছেন। কোনো কিছুর প্রতিবাদ করছেন। অথচ বিষয়টি সিস মানুষদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে বা তাঁরা আগ্রহও দেখাচ্ছেন না। সকলের অবগতির জন্য সহজ ভাবে বিষয়টি বলার চেষ্টা করছি, কারণ আমি মনে করি না এটা শুধু ট্রান্স মানুষদের লড়াই।
অনেকের জন্যই অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করা দরকার। যেমন অনেকে হয়ত জানেন না, কিন্তু জানা দরকার:
যাঁরা নিজের জন্মগত লিঙ্গ নিয়েই সুখী, তাতে অসুবিধে হচ্ছে না, তাঁদের cis/ সিস মানুষ বলে। যাঁদের মনে হয় তাঁরা ভুল শরীরে আটকা পড়েছেন, তাঁরা trans/ ট্রান্স মানুষ।
ট্রান্স মানুষ হওয়ার জন্য সার্জারির প্রয়োজন হয় না৷ ‘সেক্স রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি’-র অনেক আগেই, বা তা ব্যতিরেকে, কৈশোর থেকেই এঁদের মধ্যে এই বোধের উন্মেষ ঘটে যে এঁদের মানসিক লিঙ্গ আর জৈবিক লিঙ্গ খাপ খাচ্ছে না।
এখন, ২০১৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নালসা (NALSA) রায় ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের নিজ লিঙ্গপরিচয় নিজেই নির্বাচন করার অধিকার দিয়েছিল। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছিল—লিঙ্গ পরিচয় কোনো মেডিক্যাল বোর্ড, সার্জারি বা জৈব পরীক্ষা দিয়ে নির্ধারিত হবে না; এটি ব্যক্তির নিজের অনুভবের বিষয়। তাই তার উপর ব্যক্তিরই স্বায়ত্তশাসন থাকবে।
কিন্তু ২০২৬ সালে নতুন এক ট্রান্সজেন্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট বিল এসেছে। বিরোধীদের বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও তাকে বিজেপি সরকার লোকসভায় পাস করিয়ে নিয়েছে গতকাল। তা নালসা রায়ের থেকে একেবারে ভিন্ন পথে হাঁটছে।
তা বলছে, লিঙ্গপরিচয় স্থির করবে মেডিকাল বোর্ড আর ডিস্ট্রিক্ট অথরিটির শংসাপত্র। মানে, নালসা জোর দিয়েছিল অনুভবের উপর। নতুন বিল বলছে ডাক্তারি ভেরিফিকেশন জরুরি।
নালসা রায় বলেছিল, লিঙ্গপরিচয়-এর ব্যাপারে সংবিধানের ২১ ধারার সম্মানের ও গোপনীয়তার অধিকার মানতে হবে। ২০২৬ সালের বিল তাকে আনছে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের আওতায়। আমলার থেকে শংসাপত্র আদায় করতে হবে, সেই আমলা কি ট্রান্স মানুষদের বিষয়ে আদৌ অবগত? তিনি কি মর্যাদা ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে পারবেন তাঁদের?
নালসা রায় অনুযায়ী ট্রান্সদের প্রতি রাষ্ট্রের ভূমিকা হবে কল্যাণকামী। কিন্তু ২০২৬ সালে রাষ্ট্র চাইছে আগে শরীরকে বাজিয়ে দেখতে, কল্যাণ করা হবে কিনা, তা তার পরে বিবেচ্য।
নালসা রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় বলেছিল—“gender identity forms the core of one’s personal self”। “Biological test” নয়, ভরসা রেখেছিল “psychological test”-এর উপর। এর আগে জৈবিক নিশ্চয়তাবাদের ভিত্তিতে একটা অস্ট্রেলিয়ান রায় ছিল, যাকে ‘করবেট ভার্সাস করবেট’ রায় বলে। নালসা তাকে অস্বীকার করেছিল। কেন করেছিল? কারণ, বিশ্বের সব সভ্য দেশে সেটাই দস্তুর। বায়োলজির ভিত্তিতে কারও শরীরকে মেপে বিধান দেওয়ার আমরা কেউ নই, এই মত ক্রমে স্বীকৃত হচ্ছে। বায়োলজির ভিত্তিতে তো ওই ব্যক্তিকে ‘ছেলে’ বা ‘মেয়ে’ আগেই চিহ্নিত করা হয়েছিল জন্ম শংসাপত্রে। তা যে সব ক্ষেত্রে ঠিক নয়, তা দেখা যাচ্ছিল।
ব্যক্তি বড় হওয়ার পরও যদি তার লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ করে মেডিকাল বোর্ড, তাহলে লিঙ্গপরিচয় আর ব্যক্তিগত অধিকার থাকে না— হয়ে যায় রাষ্ট্রের অনুমতিনির্ভর পরিচয়। এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, প্রায় পাঁচ লক্ষ ট্রান্স মানুষের মধ্যে ৩৫ হাজারের এই পরিচয় পত্র আছে।
ট্রান্স মানুষের চারটি গোষ্ঠীর উল্লেখ বিলে আছে (হিজড়া, কিন্নর, যোগতা, আরাবানি), যাতে বোঝা যায়, বিস্তীর্ণ ট্রান্স সম্প্রদায় নিয়ে বিল-লেখকরা কিছুই জানেন না৷ ওই চারটি হল পেশা-গোষ্ঠী, চারটি গোষ্ঠীই নৃত্যগীত, শুভ অনুষ্ঠানে আশীর্বাদ দেওয়া ইত্যাদিতে যুক্ত। এর বাইরেও বহু ট্রান্স মানুষ আছেন। ট্রান্স মানুষ ডাক্তার হন, অধ্যাপক হন, বিজ্ঞানীও হন। আবার চাষী হন, শ্রমিক হন, ভিখারী হন৷ তাঁদের তাহলে বিলের আওতায় আনা হল না, যদি না তাঁরা মেডিকাল সার্টিফিকেট জোগাড় করেন।
মেডিকাল সার্টিফিকেট যদি আবশ্যিক হয়, তবে কি বাড়বে সেক্স রি-অ্যাসাইনমেন্ট সার্জারির প্রবণতা? সেটা কতটা নিরাপদ? নিরাপদ হলেও (যদিও নিরাপদ নয়) বাধ্যতামূলক তো হওয়া উচিত নয়! সার্জারিতে লাভ কার? উত্তর একটাই। কর্পোরেটের। সামাজিক অবহেলা যদি না থাকত, প্রেমাস্পদ যদি মন-শরীর শুদ্ধু ভালবাসত, তাহলে হয়ত অনেক ট্রান্স মানুষ ‘ছেলে’ বা ‘মেয়ে’-র খোপে পড়ার জন্য আকুল হয়ে সার্জারি করাতেন না৷ যাঁরা আর্থিক বা নানা কারণে সার্জারি করাবেন না, তাদের ‘স্বীকৃতি’ দেওয়া-না দেওয়ার ক্ষমতা তাহলে থাকল রাষ্ট্রের হাতে।
লিঙ্গ পরিচয়কে দুই বা তিন ভাগে আসলে ভাঙা যায় বলে আমরা বিশ্বাস করি না৷ অনেকে আজকাল নিজেদের স্রেফ ‘নন-বাইনারি’ বলেন কারণ ‘ছেলে’ বা ‘মেয়ে’ কোনো খোপে পড়তে চান না৷ এর সঙ্গে যৌনতাবোধ (হোমো, হেটেরো, বাই, প্যান) জুড়লে আরও নানা পারমুটেশন কম্বিবেশন তৈরি হয়। সবটা মিলে জেন্ডার ফ্লুয়িডিটি বা লিঙ্গ তারল্যের ধারণা। এর কোনো কিছুই অ-স্বাভাবিক নয়। বড়জোর বলা যায়, সিস-হেটেরো সম্পর্ক বংশবিস্তারের সুবিধের কারণে বেশি নির্বাচিত।
কিন্তু মানুষ তো আর কুকুর-ছাগল বা বাঘ-সিংহ নয় যে জৈব অভিযোজনের নিয়ম মেনেই শুধু চলে। জৈব অভিযোজনের নিয়মে শহরও গড়ে ওঠে না, শহরে বোমাও পড়ে না। সভ্য মানুষ হিসেবে সহমানুষকে মর্যাদার অধিকার, সমতার অধিকার, আত্মপরিচয় নির্ধারণের অধিকার দেওয়া হয়।
আর একটা জিনিস লক্ষ্য করবেন। এতবড় একটা জীবন-মরণ নির্ধারক বিল পাস হল, অথচ সংসদে একজনও ট্রান্স মানুষ ছিলেন না। আমাদের জ্ঞানত পুরো এলজিবিটিকিউএ সম্প্রদায়েরও কোনো মানুষ ছিলেন না৷
এটা কীরকম ন্যায় হল, সিস মানুষেরা এবার কি বুঝতে পারছেন?










