ভেঙে পড়া বাড়ি ও কুমড়ো পটাশ
এমন খবর প্রায়শই আমাদের চোখে পড়ে , সংবাদপত্র অথবা টেলিভিশনের পর্দায়। খবরটা কী? নির্মিয়মান বহুতলের আকস্মিক ভেঙে পড়া।বলা নেই কওয়া নেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ছে বাড়ি। আমাদের কলকাতার বুকেই এমন ঘটনা ঘটতে দেখেছি আমরা। এমন ঘটনার জেরে প্রাণহানিও হতে দেখেছি আমরা। কিছুদিন হৈচৈ, মিডিয়া সরগরম। তারপর সবই কেমন যেন মিইয়ে যায়। তদন্ত করতে গিয়ে অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায়, নির্মাণের ত্রুটির কারণেই এমন বিপর্যয়, লিকলিকে কমজোরী পিলারের ওপর তলার ওপর তলা তুলে যাবার ফলেই এমনটা ঘটেছে। যার ওপর ভর করে একটা আকাশছোঁয়া অট্টালিকার নির্মাণ সেই পিলার বা স্তম্ভ গুলোই যদি দুর্বল হয়ে পড়ে তাহলে তো এমনটাই ঘটবে। আসুন আমাদের আলোচনার প্রেক্ষিতটাকে সামান্য বদলে নিই।
এই সময়ের রাজনৈতিক নেতাদের দেখলে আমার মাথার ভেতরে মাঝেমাঝে ঐ নড়বড়ে পিলারের ওপর মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল আকৃতির অট্টালিকার কথাই মনে পড়ে। কারও শরীরী অবয়ব নিয়ে কটাক্ষ করার দুঃসাহস আমার নেই, তবুও কেন জানিনা তেমনই মনে হয় – আলিগড়ি চোস্ত চুড়িদারে মোড়া অপেক্ষাকৃত নড়বড়ে একজোড়া পায়ের ওপর ভর করে বেড়ে উঠেছে সযত্নে লালিত কর্মহীন এক বিশাল বপু। এমন চেহারা সুকুমার রায়ের কুমড়ো পটাশের চেহারার সঙ্গেই কেবলমাত্র তুলনীয়। হালকা পাতলা পিলারের ওপর বাড়ি গড়লে যেমন তার ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে ঠিক একইভাবে মানুষটির পা দুটো ধীরে ধীরে অশক্ত হয়ে যায়। পায়ের পেশি শিথিল হয়ে যাবার ফলে মানুষটি চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে একসময় জড়ভরতে পরিণত হয় । চিকিৎসা শাস্ত্রের পরিভাষায় এমন শারীরিক উপসর্গকে বলা হয় সারকোপেনিয়া। আমাদের আজকের আলোচনা এই সমস্যাকে নিয়েই।
সারকোপেনিয়া কী?
একেবারে গোড়াতেই বলি সারকোপেনিয়া একটি বার্ধক্য জনিত সমস্যা, অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শারীরিক সক্ষমতা ক্রমশই কমতে থাকে মাংসপেশীর শিথিলতার কারণে। পেশি শক্তির ওপরই নির্ভর করে আমাদের কার্যক্ষমতা। বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহের পেশিগুলো স্বাভাবিক ভাবেই ক্রমশ শিথিল হয়ে পড়ায় আমাদের সক্রিয়তা বা শরীরী তৎপরতা লক্ষণীয় ভাবে কমে যায়। দিনযাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলায় একজন মানুষ তাঁর শরীরী স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে স্থবিরতার শিকার হয়। অবশ হয়ে আসা পেশিতে পুনরায় বলসঞ্চার করতে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও যত্নের প্রয়োজন হয়।
আসলে সারকোপেনিয়ার কারণে প্রাথমিকভাবে আমাদের মাসকিউলোস্কেলিটাল সিস্টেম বা পেশি কাঠামো তন্ত্রের কার্যকারিতা প্রভাবিত হয় যার ফলে বাড়তে থাকে শরীরের দুর্বলতা, আকস্মিক পতন এবং অস্থিভঙ্গের মতো ঘটনা। এর ফলে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার সাথে সাথে ক্ষেত্রবিশেষে শল্যচিকিৎসারও দরকার হয় যার ফলে শরীরী জটিলতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।এমনকি জীবনের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
যে সমস্ত মানুষের Body Mass Index স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি, তাঁরা সারকোপেনিক ওবিসিটি বা স্থুলতায় আক্রান্ত হতে পারেন। স্থুলতা ও পেশির দৌর্বল্য দুইই যদি থাকে তাহলে সেইসব ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি ও জটিলতা কেবলমাত্র একটি সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন এমন ব্যক্তির তুলনায় অনেক বেশি হয়। আসলে একটি সমস্যার কারণে অন্য অনেক সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের। বার্ধক্য কালের কর্মহীনতা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
কাদের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে?
গোড়াতেই বলেছি সারকোপেনিয়া একটি বার্ধক্য ঘটিত সমস্যা, সুতরাং বরিষ্ঠ মানুষজনেরই , যাঁদের বয়স ৬০ বছর বা তার ঊর্ধ্বে,এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশি । বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কর্মহীনতার মাত্রা বেড়ে যায় ফলে সারকোপেনিয়ায় আক্রান্ত হবার হারও বেড়ে যায় আনুপাতিক ভাবে। এই রোগটি লিঙ্গ নিরপেক্ষ অর্থাৎ স্ত্রী, পুরুষ উভয়েই এই সমস্যায় পড়তে পারেন। যে সমস্ত মানুষ কোনো স্থায়ী রোগের কারণে প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে রয়েছেন তাঁদের মধ্যেও এই সমস্যার প্রকোপ অনেক বেড়ে যায় সচলতার অভাবে। রোগ বা বয়সের কারণে কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়া হলে আমাদের পেশির কার্যক্ষমতা দ্রুত লোপ পায় বলে সারকোপেনিয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।
শরীরে সারকোপেনিয়ার প্রভাব
সারকোপেনিয়া হলো পেশি শিথিল ও দুর্বল হয়ে যাবার অসুখ। দেখা গেছে এই সমস্যার কারণে আমাদের আমাদের শরীরের পেশির সংখ্যা ও পেশির আকার কমে যায় ফলে পেশিগুলো পাতলা হয়ে পরে। এই অবস্থা মাসল অট্রফি নামে পরিচিত চিকিৎসক মহলে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরের গঠন ও দৈহিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। এর দরুণ পেশি তন্তুগুলো বিশেষ করে পায়ের পেশি শিথিল হয়ে যায়। এমন অবস্থা সারকোপেনিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা তৈরি করে। মাংস পেশির বৃদ্ধি হ্রাস পায় কারণ দেহযন্ত্র পেশি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় রসদ তথা প্রোটিনের জোগান দিতে পারে না। এরফলে মাসল্ তথা পেশি কোশ ছোট হতে শুরু করে। আর এই ছোট হবার অর্থ হলো পেশি শৈথিল্যের শিকার হওয়া বা সারকোপেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া।
বয়স্ক মানুষদের এই সমস্যায় আক্রান্ত হবার আরও একটি বড়ো কারণ হলো এই যে, বার্ধক্য শরীরে ছায়া ফেলার সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহে হরমোনের চরিত্র অনেকটাই বদলে যায় ; যেমন টেস্টোস্টেরন এবং ইনসুলিন জাতীয় হরমোনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া যা (IGF–1) নামে পরিচিত, তা
দেহের আভ্যন্তরীণ পেশি তন্তুর সামর্থ্য কমিয়ে দেয়। এটাও বয়স্কদের সারকোপেনিয়ায় আক্রান্ত হবার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই শৈথিল্যের প্রাথমিক শিকার হয় আমাদের দেহ মন্দিরের স্তম্ভ বা পিলার স্বরূপ পরিচিত পদযুগল। পা অচল অসার হয়ে পড়লে আমাদের নড়েচড়ে বেড়ানোর ইচ্ছেটাই বেমালুম গায়েব হয়ে যায়। বেড়ে যায় শুয়ে বসে দিন কাটানোর প্রবণতা। আর এর অনিবার্য ফল হিসেবে শরীরকে বিপন্ন করে তোলে সারকোপেনিয়ার মতো শারীরিক উপসর্গ তথা ব্যাধি। ২০১৬ সালে সারকোপেনিয়াকে একটি চিকিৎসা যোগ্য রোগের স্বীকৃতি দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা নিয়ামক সংস্থা।
সারকোপেনিয়ার রোগ লক্ষণ
বয়সের কারণে পেশি শক্তির ক্ষমতা কমে যাওয়া একটি সাধারণ সমস্যা হলেও সবাই এই রোগের শিকার হয়েছেন এমনটা কিন্তু নয়। বর্তমান সময়ের বদলে যাওয়া কর্মসংস্কৃতির ফলেও বহু সংখ্যক মাঝবয়সী মানুষের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। তাই এই রোগের সাধারণ লক্ষণ চিহ্নগুলো একটু দেখে নেওয়া যাক্।
সারকোপেনিয়ার সবচেয়ে বড়ো লক্ষণ হলো পেশি শক্তির ক্ষমতা কমে যাওয়া। অন্য কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই চলাফেরার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলাটা এই রোগের লক্ষণ হতে পারে। যেমন –
- শরীরের স্ট্যামিনা বা কর্মক্ষমতা হারিয়ে যাওয়া।
- প্রতিদিনের রুটিন বাঁধা কাজকর্ম করার ব্যাপারে অসুবিধা অনুভব করা।
- হাঁটাচলার গতি হঠাৎ করে কমে যাওয়া।
- সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠানামা করতে সমস্যা।
- চলার সময় শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে পড়ে যাওয়া।
- পেশির আকার কমে যাওয়া , ইত্যাদি।
এই প্রসঙ্গে বলা যায় যে উল্লিখিত কোনো সমস্যা দেখা গেলেই তাকে সারকোপেনিয়ায় আক্রান্ত বলে দেগে দেওয়া কখনোই ঠিক হবেনা। সমস্যার প্রকৃত প্রেক্ষিতটা বুঝে নিয়েই রোগাক্রান্তকে চিহ্নিত করতে হবে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
আর কারা সতর্ক হবেন?
সারকোপেনিয়ার শিকার মূলত বয়স্ক মানুষেরা হলেও কমবয়সী আরও কিছু মানুষ আছেন যারা এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে যারা– ১) শারীরিকভাবে খুব সচল নন তাঁদের মধ্যে এই রোগটির প্রকোপ লক্ষ করা যেতে পারে। এই সময়ের আই টি কোম্পানিতে কর্মরত বহু অল্পবয়সী মানুষের মধ্যেও ইদানিং সারকোপেনিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এজন্যই বলা হয় শরীর সঞ্চালনই হোলো এই রোগকে দূরে রাখার সহজ উপায়।
২) স্থূলতা এই রোগটিকে আহ্বান জানায়। স্থূল মানুষের পক্ষে যথেচ্ছভাবে নড়াচড়া করার সামর্থ্য অনেকসময়ই থাকেনা। ফলে পেশির নমনীয়তা ও সামর্থ্য দুইই কমে যায়।
৩) যাঁদের মধ্যে ক্রনিক কিছু রোগ যেমন ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিস্ , কিডনির অসুখ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার বা এইচ্ আই ভি ইতিমধ্যেই বাসা বেঁধেছে তাঁদেরও সারকোপেনিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪) রিউমাটয়েড আর্থাইটিস এর রোগীদের মধ্যে হাঁটাচলার ক্ষমতা বিশেষ থাকেনা, ফলে তাঁরাও হয়ে ওঠেন এই রোগের সহজ শিকার।
৫) এছাড়াও যাঁরা ইতিমধ্যেই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন অথবা যাঁদের শরীরের হরমোন ভারসাম্যের পরিবর্তন হয়েছে তাঁরাও কিন্তু সারকোপেনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।
৬) পেশির সামর্থ্য বা শক্তি নির্ভর করে পুষ্টিকর খাবারের ওপর। সেই কারণে যাঁরা পর্যাপ্ত এটাপরিমাণে পুষ্টিকর খাবার পাননা বিশেষ করে যাঁদের শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি রয়েছে তাঁদের মধ্যেও এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
শরীর থাকলেই রোগব্যাধির আক্রমণ ঘটতে পারে এই কথা ভেবে চুপ করে বসে থাকলে কিন্তু বিপদ আমাদের । ভাবছেন তো , তাহলে উপায় কি? আসুন আমরা জেনে নিই চিকিৎসকদের পরামর্শ।
কীভাবে ঠেকাবেন সারকোপেনিয়াকে?
শুরুতেই বলি সারকোপেনিয়াকে সম্পূর্ণভাবে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব নয় কেননা বয়স বাড়তেই প্রাকৃতিক নিয়মে পেশির সামর্থ্য কমতে থাকবে। কিন্তু আমরা যেটা করতে পারি তাহলো আমাদের শরীরে সারকোপেনিয়ার আগমনকে খানিকটা বিলম্বিত করতে পারি। চিকিৎসকদের অভিমত হলো –
১) ভালো স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার খান। খাবারের তালিকায় অবশ্যই ঠাঁই পাবে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার।
২) নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। এরজন্য বিরাট কিছু করতে হবে এমনটা কখনও নয়। নিয়মিত হাঁটুন । টিভির সামনে এক ঠাঁয় বসে না থেকে ক্ষাণিক বিরতি দিয়ে এ ঘর ও ঘর ঘুরাঘুরি করুন। এতেই কাজ হবে।
পছন্দ আপনার, পরামর্শ আমাদের। মানা অথবা না মানা সম্পূর্ণভাবে আপনাদের।
মধ্যমগ্রাম
১ জুলাই,২০২৪














সুললিত ভাষায় সতর্কবার্তা। 🙏
সাধ্যমত ওয়েট লিফটিংও কাজ দেয়।
সহজ ভাষায় কঠিন বিষয় সম্পর্কে জানলাম। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ধন্যবাদ।
অতএব সময় নষ্ট না করে শরীর চালনা শুরু করা প্রয়োজন।তথ্য সমৃদ্ধ এঅটি বিশেষ প্রয়োজনীয় বার্তা র জন্য লেখক কে ধন্যবাদ।