কোভিডের সময় – বিশেষত লকডাউনের সময় – আমরা জানতে পারলাম, পরিযায়ী শ্রমিক বলে একটা প্রজাতি বর্তমান। আমরা, অর্থাৎ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ – যাদের দেখার বৃত্তটুকু ভয়ানক ছোট, কিন্তু মন্তব্য করার পরিধিটি বিপুল – আমরা, যারা বিশ্বাস করি, আমাদের মতো করে সবকিছু আর কেউই বোঝে না – জানতামই না, আমাদের গ্রামগুলো থেকে কত হাজার, কত লক্ষ যুবক-যুবতী ভিনরাজ্যে যান কাজের আশায়। ‘গ্রামের ডাক্তার’-এর ক্ষেত্রে অবশ্য পরিস্থিতিটা অতখানিও খারাপ নয় – কেননা আমরা জানি তাঁরা আছেন (অন্তত থাকা উচিত বলেই আমাদের বিশ্বাস, যদিও বাড়ির ছেলেটিকে যাতে ‘গ্রামের ডাক্তার’ হতে না হয়, সে বিষয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন), কিন্তু ‘যথেষ্ট পরিমাণে’ নেই – যদিও তাঁদের দেখতেশুনতে কেমন অথবা তাঁদের কীভাবে কাজ করতে হয়, বা তাঁরা আদৌ কিছু করেন কিনা, এসব বিষয়ে সম্যক ধারণা নেই।
গ্রামের ডাক্তার নিয়ে লিখতে বসে গুরুত্বপূর্ণ কথা ছেড়ে এইসব হাবিজাবি ভাবনা, খানিক অবান্তরভাবেই, মাথায় আসছে। কেননা আমার জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা কলকাতা থেকে দূরের একটি মফস্বল শহরে, ডাক্তারি পড়াও মফস্বলের একটি মেডিকেল কলেজে, চাকরিজীবনের বেশির ভাগটাই কাটছে শহর থেকে দূরের মেডিকেল কলেজগুলোয় – অথচ গ্রামের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ঠিক কীভাবে চলে, সে নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা প্রায় শূন্য (যদিও তাত্ত্বিক জ্ঞান অল্পবিস্তর রয়েছে)। এটুকু অবশ্যই বুঝি, যে, গ্রামের স্বাস্থ্যব্যবস্থার হাল – শহরের তুলনায় – খুব ভালো নয়। বিশেষ করে স্বাস্থ্য-চিকিৎসা বলতে শহরে যা বোঝানো হয়, সেই চোখ দিয়ে দেখলে গ্রামের চিকিৎসাব্যবস্থা বেশ নড়বড়ে। তার কারণ বহুবিধ। শুধু ডাক্তার থাকা বা না-থাকার উপর স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক ভালোমন্দ নির্ভর করে না – ডাক্তার থাকলেও আরও অনেক খামতি সেখানে থেকেই যায়। তদুপরি চাকরিক্ষেত্রে গ্রামে পোস্টিং পাওয়া ডাক্তার ‘গ্রামের ডাক্তার’ হয়ে উঠতে পারলে অনেক ফাটল ডাক্তারের পক্ষে মেরামত করে ফেলা সম্ভব হয় – কিন্তু সবার ক্ষেত্রে সবসময় তেমনটা হয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।
গ্রামে ডাক্তার নেই – বারবার শুনতে শুনতে প্রায় সবাই কথাটা সত্যি বলে বিশ্বাস করেন – কিন্তু সবক্ষেত্রে তা তো সত্যি নয়। অনেক গ্রামেই ডাক্তার রয়েছেন – ইদানীং টেলিমেডিসিন চালু হওয়ার মাধ্যমে যেখানে ডাক্তার নেই, সেখানেও স্বাস্থ্যকর্মীদের হাত ধরে চিকিৎসকের মতামত পৌঁছে যাচ্ছে, এমনকি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামতও পাওয়া যাচ্ছে – কিন্তু তার পরও, গ্রামে ডাক্তার নেই, কথাটা এক অর্থে সত্যি। আসল সমস্যাটা লুকিয়ে আছে চিকিৎসা-শিক্ষার মধ্যে। মেডিকেল শিক্ষার সিলেবাস ও কাঠামোটা এমনই, যেখান থেকে পাস করার পর একজন নব্য-চিকিৎসক শহরের পাঁচতারা হাসপাতালের উচ্চমধ্যবিত্ত রোগীর স্বাস্থ্যসমস্যার সমাধানে যতখানি স্বচ্ছন্দ থাকেন, গাঁয়ের গরীবগুর্বোদের সমস্যার ব্যাপারে তাঁর সেই দক্ষতা ভগ্নাংশে এসে ঠেকে। প্রত্যাশিতভাবেই, প্রতি বছর মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর যে ঝকঝকে ছেলেমেয়েরা ডাক্তার হয়ে ‘সাধারণ মানুষের সেবা করা’-র স্বপ্নের কথা বলেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় কেউই ‘গ্রামের ডাক্তার’ হয়ে ওঠেন না, উঠতে পারেন না। ‘গ্রামের ডাক্তার’ তো দূর, ডাক্তারি ছাত্রদের মধ্যে উজ্জ্বলতর যাঁরা, তাঁরা এখন আর সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে চান না। দৈবাৎ যুক্ত হয়ে পড়লে এবং গ্রামে গিয়ে পড়লেও, এমনকি গ্রামে বড় ওঠা ছেলেটিও, খুব ব্যতিক্রমী কিছু উদাহরণ বাদে, সেখানে অস্বস্তি বোধ করতে থাকে – কেননা, তার ডাক্তারিশিক্ষা তাকে শহরের ডাক্তার হতেই শিখিয়েছে, যে শিক্ষা গ্রামের পরিবেশে বেমানান।
সমস্যাটা কোথায়? এককথায় বলতে গেলে, চিকিৎসাভাবনার যে দর্শনটি বর্তমানে মান্যতা পেয়েছে, সেখানেই। জনস্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনাচিন্তা ইদানীং পেছনের সারিতে – কিন্তু তার চাইতেও বড় সমস্যা, জনস্বাস্থ্য বিষয়টা যে মন দিয়ে পড়তে হয়, দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যপরিস্থিতির হাল ফেরানোর জন্য যে ব্যক্তি-রোগীর চিকিৎসার চাইতেও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব ঢের বেশি, এই বোধটাই বর্তমান প্রজন্মের মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের নেই। নেই, কেননা সেই বোধটা তাঁদের অধ্যাপকদের মধ্যে – অর্থাৎ আমাদের প্রজন্মের চিকিৎসকদের মধ্যেও – সেভাবে নেই। আদতে ডাক্তারি পড়তে গিয়ে যা যা পড়তে হয়, জনস্বাস্থ্যের গভীরে ঢুকতে গেলে বুঝতে হয় তার চাইতে ভিন্ন কিছু বিষয়। বুঝতে হয় সামাজিক নৃতত্ত্ব, আর্থসামাজিক বিভিন্ন বিষয়, বুঝতে হয় পরিবেশ-তত্ত্ব, কৃষি ও শ্রম-আইন, অনুধাবন করতে পারতে হয় অসাম্য ও তার অভিঘাত ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। সামগ্রিকভাবে জনগোষ্ঠী বা সমাজের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তো গুরুত্বপূর্ণ বটেই, নিজের অভ্যস্ত বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে পৃথক ভৌগোলিক এলাকার মানুষের চিকিৎসার সময়ও জনস্বাস্থ্যের দু-চারটে শিক্ষা কাজে লাগে। উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে রুডলফ ভির্খ যখন বলেছিলেন – আমজনতার সমস্যা ও সঙ্কট নিয়ে কথা বলার পক্ষে সবচাইতে উপযুক্ত মানুষ হলেন ডাক্তাররা – তখন জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন চিকিৎসকদের কথা-ই তাঁর মাথায় ছিল, কেননা গবেষণাগারমুখী চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা হয়েও ভির্খ ছিলেন জনস্বাস্থ্যের হয়ে অতিমাত্রায় সরব।
তো এই সময়ে, ‘গ্রামের ডাক্তার’ – মানে, গ্রামের মানুষের “কাছের মানুষ, কাজের মানুষ” হয়ে উঠতে পেরেছেন এমন ডাক্তার – বলতে আমাদের মনে যে ছবিটি ভেসে ওঠে, তার সঙ্গে গ্রামে কর্মরত অধিকাংশ চিকিৎসককেই মেলানো মুশকিল – এবং দোষটা শুধু চিকিৎসকদের দিকে ঠেললে চলবে না। কেননা, আগের কারণটি তো বললামই, তাছাড়াও পূর্বতন সে ছবি, যা আজও আমাদের রোমান্টিকতার সঙ্গে মিশে রয়েছে – সম্ভবত সেই ইমেজের বশেই এখনও বেশ কিছু কিশোর ‘গ্রামের ডাক্তার’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখে, অলীক স্বপ্ন – যেখানে চিকিৎসক গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসমস্যার সমাধান করতে গিয়ে গ্রামটিকেই অন্যরকম করে ফেলতে পারেন – সে ছবির গ্রামও এখন অতীত। বিভূতিভূষণের সেই গ্রাম, যেখানকার সিঁদুরচরণ গ্রামের বাইরে কিছুদূর ঘুরে এসেই পর্যটক হিসেবে খ্যাতি পায়, সে গ্রাম কবেই হারিয়ে গিয়েছে। গ্রাম আর বিচ্ছিন্ন কোনও জনপদ নয়। শহরের সঙ্গে তার নিত্য যাতায়াত। তদুপরি বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসনের সদভাবনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে গজিয়ে উঠেছে স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্র ও অজস্র উপকেন্দ্র – দাদাগিরি ও কারণে-অকারণে ক্ষমতাপ্রদর্শন সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা – ধরা যাক, এমন বিরল গোত্রের কোনও চিকিৎসক গ্রামে এসে পড়লেন, যিনি জনস্বাস্থ্যের আদর্শে ভয়ানক উদ্বুদ্ধ, বেগতিক পরিস্থিতিতে তেমন চিকিৎসকেরই বা কী দায় পড়েছে চাকরির বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে বাড়তি ঝঞ্ঝাট পোয়ানোর?!
আর সত্যি বলতে কি, সফল ‘গ্রামের ডাক্তার’ হয়ে লাভটাই বা কী? মানে, কোনোকিছু হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখার তো একটা ইনসেনটিভ থাকে, তাই না? ‘গ্রামের ডাক্তার’ হয়ে ধনী হয়ে ওঠা যায় না – প্রাপ্তি বলতে মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান। অথচ, আজকাল তো সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠাটবাট বাড়ি-গাড়ি বিদেশভ্রমণ ইত্যাদি – সাফল্যের পরিমাপের জন্য ইদানীং চমৎকার অবজেক্টিভ ক্রাইটেরিয়া বর্তমান, ব্যাঙ্ক-ব্যালান্স। সম্মানও তদনুসারী। মানুষ স্বপ্নও দেখে তেমন করেই। ডাক্তারি পাস করতে করতেই এই কঠোর সত্য উপলব্ধি করে ফেলার পরেও কে আর ‘গ্রামের ডাক্তার’ হয়ে থাকতে চাইবে?
আগেই বললাম, গ্রাম আর বিচ্ছিন্ন কোনও জনপদ নয়। গ্রামের ছেলেটি দূর-রাজ্যের কোনও শহরে চাকরি করে – ফোনে সেখানকার গল্প শোনায়। গ্রামেই রয়েছেন যাঁরা, তাঁরাও কেবল টিভি, ওটিটি ইত্যাদি দেখেন – টেলিভিশনের মাধ্যমে শহুরে জীবনের বিভিন্ন উপাদান সেখানেও ‘অ্যাসপিরেশনাল এলিমেন্ট’, যার মধ্যে স্বাস্থ্যও পড়ে। টিভি-তে দেখা পাঁচতারা হাসপাতাল, সেখানকার স্যুটবুট পরা ডাক্তারের পাশে গাঁয়ের মলিন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ভাঙাচোরা কোয়ার্টারে থাকা সন্ধেবেলায় লুঙ্গি পরে চপমুড়ি খাওয়া ডাক্তারকে কে-ই বা সম্মানের চোখে দেখবে? অতিবিরল ক্ষেত্রে নিজের লোক হিসেবে দেখলেও বড়জোর ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো টাইপের আপনজন। তাতে সম্মান আর কতটুকু? শহুরে হাসপাতালে কর্মরত সহপাঠীদের ঝকঝকে জীবনযাপন দেখতে দেখতে ‘গ্রামের ডাক্তার’’-টির মনেও হতাশা আসে। জীবনে কিছুই হলো না, এমন অনুভূতি জাগে।
আর সহপাঠী/সহকর্মীদের চোখে ‘গ্রামের ডাক্তার’? ‘সবার উপরের এমডি সত্য’ এমন দর্শনে অভ্যস্ত সমাজে গ্রামের এমবিবিএস ডাক্তারের বরাতে অল্পবিস্তর অনুকম্পা জুটলেও জুটতে পারে, সম্মান নয়। কর্পোরেট হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা ‘গ্রামের ডাক্তার’ সহপাঠীর পাঠানো ‘রেফার পেশেন্ট’ পেলে খুশি হন বটে, কিন্তু সম্মান? আর সরকারি ক্ষেত্রে উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করলে? নড়বড়ে স্বাস্থ্যপরিকাঠামোয় কর্মরত গ্রামের চিকিৎসককে রেফার করতেই হয়। কিছু ক্ষেত্রে রেফার-এর কারণটা মেডিকেল – অর্থাৎ ওই পরিকাঠামোয় সেই রোগের চিকিৎসা তো দূর, রোগনির্ণয়ই ভালো করে সম্ভব নয় – রেফার না করে উপায় নেই। আবার কিছু ক্ষেত্রে রেফার-এর কারণটা সামাজিক বাস্তবতা নির্ভর – যেমন, দাপুটে পঞ্চায়েত-প্রধানের পুত্রবধূর সন্তানপ্রসব স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে করাতে যাওয়াটা চিকিৎসকের পক্ষে নিরাপদ নয়। অথচ রেফার করলেই শহরের ঠান্ডা ঘরে বসে থাকা আধিকারিকদের ভারি গোঁসা হয়, মিডিয়াও ইদানীং ‘রেফার রোগ’ নিয়ে অত্যন্ত বিচলিত। তো রোববার সকালে পড়ার পক্ষে লেখাটা বড্ড জটিল হয়ে যাচ্ছে। গুটিয়ে আনার আগে একটা গল্প বলি। গল্প বলতে, এক সিনিয়র দাদার একটা ছোট্ট মন্তব্য। সামগ্রিক পরিস্থিতিটা বুঝতে ওই কথাটুকুই যথেষ্ট।
তখন আমি, এখনকার মতোই, মফস্বলের একটি মেডিকেল কলেজে কর্মরত। সন্ধেবেলার অলস আড্ডার মাঝে এটাসেটা কথার মধ্যে সেই দাদাটি বলেছিল – “জানিস বিষাণ, আমাদের এই মেডিকেল সিস্টেমটাই গোলমেলে। ধর হেলথ সেন্টার থেকে একজন পেশেন্ট রেফার হয়ে মেডিকেল কলেজের আউটডোরে দেখাতে এসেছেন। তো যিনি রেফার করেছেন, তিনি হয়ত পাস করার পর কুড়ি-পঁচিশ বছর ধরে ডাক্তারি করছেন, গ্রামেই। পেশেন্ট দেখে তাঁর হয়ত মনে হয়েছে, না, এই পেশেন্টের এখানে রেখে ডায়াগনোসিস বা ট্রিটমেন্ট করা যাবে না, মেডিকেল কলেজ থেকে একটা ওপিনিয়ন নেওয়া দরকার। তারপর কী হলো? মেডিকেল কলেজে সেই পেশেন্টকে দেখল একজন হাউসস্টাফ, কখনও বা ইন্টার্ন। শুধু দেখলই না, অনেকসময় যিনি রেফার করেছেন, সেই ডাক্তারের নামে দুটো মন্তব্যও করে দিল!!”
তো ‘গ্রামের ডাক্তার’ হওয়ার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকলেও সে বিষয়ে পরোক্ষ অভিজ্ঞতা কম নয়। তাঁর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভাবার মতো ‘এমপ্যাথি’’ জাগাতে না পারলেও বেদনাটুকু অনুভব করতে সমস্যা হয় না।










