কার্নিভাল শব্দের মাঝেই ইতিহাসগতভাবে আছে প্রতিবাদ আর বিরুদ্ধতার স্বর। বরঞ্চ কার্নিভালকে আনন্দের মঞ্চে পর্যবসিত করা হয় কোন এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন লোককথা এবং মধ্যযুগের বিভিন্ন উদযাপনের মাঝে আছে শৃঙ্খলিত দাস কিংবা নিগ্রোদের মুক্ত করার জন্য কার্নিভালের আয়োজন। ইতিহাস জানায়, আফ্রো-ক্যারিবিয় সংস্কৃতিতে “Carnival performance rebelled against the dehumanizing violence of slavery.”
ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডাক্তার ফ্রন্ট-এর আমরণ অনশনরত আমাদের সন্তানসম ডাক্তারদের পাশে দাঁড়িয়ে সিনিয়র ডাক্তারদের বেশিরভাগ অংশ এবং সংবেদী নাগরিক সমাজ ডাক দিয়েছিল – দুর্গাপুজোর সঙ্গে ধর্মীয়ভাবে সঙ্গতিবিহীন সরকারের প্রবর্তিত ও আয়োজিত মানুষের ট্যাক্সের টাকায় নিজেদের “সাংস্কৃতিক মান” দর্শনী হিসেবে তুলে ধরার যে মর্মান্তিক চেষ্টা তার বিরুদ্ধতার স্বর হিসেবে বাংলার নাগরিকদের “দ্রোহ কার্নিভাল” বা “দ্রোহের কার্নিভাল”-এর।
ভেবে দেখলে বোঝা যায়, দ্রোহ প্রকৃতপক্ষে নিজেদের দ্রব করারও এক ক্যানভাস। ব্যক্তিগতভাবে অচেনা মানুষের হাতে হাত রেখে, বুকে জড়িয়ে ধরে নিজেরা এক অন্যরকমের আবেগ আর পবিত্র ক্রোধের আগুনে গলে যেতে যেতে আবিষ্কার করি – ঐ আমাদের কার্নিভাল। আমাদের নিজেদের মধ্যে লালিত ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আমরা যদি পথের নতুন আলো চাই? কার্নিভালের এই যূথ, এই সমষ্টি, এই হৃদয়ের আবেগ-মথিত জমায়েত আমাদের পথের আলো হয়তো দেখাবেও বা!
এর মাঝেও সবার জানা আরেক কাহিনি আছে। কার্নিভালের আগের রাতে কলকাতার পুলিশ কমিশনার, যিনি আবার প্রশাসনিক ক্ষমতার বলে কলকাতা জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতারও অধিকারী, এক “শিব ঠাকুরের আপন দেশের”র মতো হুলিয়া বের করে জানালেন যে জনতার এই কার্নিভাল কার্যত করা যাবেনা। তারপর হাইকোর্ট যাত্রা। হাইকোর্টে পুলিশ এবং রাজ্য প্রশাসনের গালে একটি বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়। যেসব মস্ত বড়ো বড়ো ব্যারিকেড তৈরি হয়েছিলে যেগুলো আবার মোটা লোহার শেকলে বাঁধাও ছিল, সব খুলে নিতে হল। নাগরিক সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশকে অবরুদ্ধ করার জন্য আনা মোটা মোটা লোহার শেকল পড়ে রাস্তার ধারে ধুলোর মাঝে। সমস্ত “সাধ্ন ভজন” ধুলোয় পড়ে রইল। নিয়তির কী পরিহাস!
ঠিক এরকম মুহূর্তে নতুন নতুন কবিতারও জন্ম হতে পারে –
দেখ, এই আমার স্বদেশ –
বন্ধুদের হাতে হাত, ধমনীতে উষ্ণ রক্ত,
সময়ের প্রসারিত রেখা ছুঁয়ে যায় বুক
করতলে বেড়ে ওঠে রৌদ্রের শিশুরা। (সব্যসাচী দেব, ‘সময় বাহুতে বাঁধে প্রচ্ছন্ন স্বদেশ’)
এরকম কবোষ্ণ কাব্যভাযাকে অতিক্রম করে আরেকটি কাব্যভাষার জন্ম নেয় আমাদের বুকের বাঁদিকের সে অত্যাশ্চর্য দেহযন্ত্রটি থেকে –
“এলোমেলো হারিয়ে যাচ্ছ তুমি
লেগে আছে দাগ
মাটিতে ঘষটে নিয়ে যাওয়ার
এই দাগ ধুয়ে যায় না
আরও চেপে বসে
যতদিন না তুমি প্রশ্ন করছ
নিজেকেই
যতদিন না, তুমি ঘুরে দাঁড়াচ্ছ
নিজের বিরুদ্ধে।” (হিন্দোল ভট্টাচার্য, তৃতীয় নয়নে জাগো)
এভাবেই নিরন্তর প্রশ্ন করা চলে। বীরেন্দ্র এক দম বন্ধ করা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেন আমাদের।
কিবা আসে যায় চাঁদ যদি ফেরে লজ্জায় ঘরে উঁকি দিয়ে
কড়িকাঠে ঝোলে বিবসনা নারী হোবু-কবিদের ফাঁকি দিয়ে
কিংবা সাগর ফুলে ফেঁপে ওঠে, গর্জায় আর চোখ রাঙায়
উজিরের ঘুম ভাঙে অসময়ে, কোটাল সভয়ে বিদেশ যায়
আমাদের চলা এতেই কি শেষ হয়?
দাঁতালো পেরেক তালি-খাওয়া জুতো অনেক কথাই কয়!
এরপরেই আমাদের হাত ধরে বীরেন্দ্র নিয়ে যান এক শুভ্র, ক্লেদহীন জগতের দুয়ারে। এক স্বপ্নসন্ধানও বটে –
কোথাও মানুষ ভাল রয়ে গেছে ব’লে
আজও তার নিঃশ্বাসের বাতাস নির্মল;
যদিও উজীর, কাজী, শহর-কোটাল
ছড়ায় বিষাক্ত ধুলো, ঘোলা করে জল
তথাপি মানুষ আজ শিশুকে দেখলে
নম্র হয়, জননীর কোলে মাথা রাখে,
উপোসেও রমণীকে বুকে টানে; কারও
সাধ্য নেই একেবারে নষ্ট করে তাকে।
আবার এক ঝাঁকুনি দেন নিজেকে, তাঁর পাঠককে, পাঠক-বাহিত হয়ে সমস্ত মানুষকে –
কার পাপ আমাদের রক্তের ভিতর;
কার অন্ধকার?
কণ্ঠস্বর
ভেসে আসে, ‘জোর যার’…
মানুষ কি এখনো তোমার
চোখ-রাঙানো প্রেমের চাকর?
অথচ কোথায় যাব? এ পৃথিবী আমার, তোমারো
‘মারো! যতো পারো!’
“এ পৃথিবী আমার, তোমারো” এ কাহিনী ১৮৩৫ সালের পটভূমিতেও লেখা হয়েছিলো। ১৮৩৫ সালে লেখা একটা প্রবন্ধ/বই-এর উদাহরণ আমাদের কাছে আছে – A Journal of Forty-Eight Hours of the Year 1945। লেখক হিন্দু কলেজের ছাত্র কৈলাশ চন্দ্র ঘোষ। প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল Calcutta Literary Gazette (or, Journal of Belles Letters, Science, and Arts)-এ (vol. III, new series, number 75, June 6, 1835)।
দীর্ঘ কাহিনীতে না গিয়ে সংক্ষেপে বলা যায় এ গল্পের নায়ক ২৫ বছরের যুবক ভুবনমোহন এবং তার দুজন বিশ্বস্ত সাথী হল গঙ্গানারায়ণ এবং পার্বতীচরণ। এ গল্পের সময় ভাইসরয়ের নামও তাৎপর্যপূর্ণভাবে দেওয়া হয়েছে Lord Fell Butcher এবং তার সামরিক জেনারেলের নাম John Blood-Thirsty। হিন্দু কলেজের হোস্টেলে (১৯৪৫-এ নামকরণ হয়ে গেছে প্রেসিডেন্সি কলেজ, যদিও ১৮৩৫-এ লেখা বলে কৈলাশচন্দ্র ঘোষ এ নাম জানতেন না) এক অসম যুদ্ধের কাহিনীর বর্ণনা আছে।
কর্নেল ভাইসরয়কে ২৫ জন গোরা সৈন্যের মৃত্যু ও ২৫ জনের আহত হবার সংবাদ দিচ্ছে। কিন্তু দেশপ্রেমিক বিদ্রোহীরা মারা গেছে ৬ জন, ১৩ জন আহত। যুদ্ধ শুরু হবার আগে ভুবনমোহন ইংরেজ প্রতিনিধিকে স্পষ্ট স্বরে, নিরুদ্ধ কণ্ঠে জানায় – “Worthy Magistrate, I am sorry we are not able to comply with your proposition; we defy you to do your worst. You see before you men who will neither be terrified by the neighing of a steed, the waving of a sword nor the flashing of a gun. We are determined to assert our liberties, when every other resource has failed, by the strength of our arms. Go tell them that sent thee that we have resolved to hurl Fell Butcher from his seat, we have renounced the allegiance of the feeble and false Harry of England, and that we mean to abide by our own laws and parliaments!”
শেষ অবধি অসম স্বাধীনতার যুদ্ধে ভুবনমোহন ও তার বাহিনী হেরে যায়। আক্ষরিক অর্থে যূপকাষ্ঠে তাকে প্রাণ দিতে হয়। তাকে যূপকাষ্ঠে নিয়ে যাবার মূহূর্তে তার শেষ কথাগুলো ছিল – “আমার সহযোদ্ধা এবং দেশবাসী! জন্মভূমির বুকে মৃত্যু হবার সান্ত্বনা বহন করছি আমি। আর যদিও বধ্যভূমিতে আমার জীবন দেওয়াই ছিল ঈশ্বরের অভিপ্রায়, সহযোদ্ধাদের উপস্থিতি আমার শেষ মুহূর্তগুলোকে আনন্দোচ্ছল করে তুলেছে। দেশরক্ষার জন্য আমার জীবনের শেষ রক্তবিন্দু আমি ঢেলেছি এবং যদিও এখন সেই ক্ষণ সমাগত যে আমার ভঙ্গুর দেহকাঠামোর মধ্যেকার দুর্বল জীবন-স্ফুলিঙ্গ আমাকে ছেড়ে চলে যাবার মুখে, আমার আশা যে গৌরবোজ্জ্বল পথের সূচনা তোমরা করেছ সে পথেই তোমরা হাঁটবে।” ভাইসরয় এরকম বীরত্বের সঙ্গে পূর্বপরিচিত ছিলনা, যেমন নগ্ন দ্রৌপদীর উপচে পড়া তেজ দেখতে একেবারেই প্রস্তুত ছিলনা “সেনানায়ক”।
এভাবেই সময়ের বদল হলেও কিছু কাঠামো আর উপাদান হাজারো সংস্কারের পরেও একরকমই রয়ে যায়। যাহোক, “While he (ভুবনমোহন) was going on in this strain, the viceroy struck with awe at the energy of the young patriot, dispatched an officer to conclude the scene immediately.” নিরুদ্ধ কণ্ঠের এই অবারিত দার্ঢ্য বহন করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য, “His hands were powerfully arrested, his head forcibly thrust between two wooden pillars and severed from his body at a single blow.”.(প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার, ভারতে ১৮৫৭ পূর্ববর্তী সময়ে প্রতিশোধ নেবার জন্য প্রকাশ্যে ফাঁসীতে ঝোলানোর ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার খুব আগ্রহীছিলোনা, বিশেষ করে ১৮৩৫ সালে তো নয়ই। এখানে লেখকের মাথায় ফ্রান্সের গিলোটিনের ছবি কাজ করেছে বলে মনে হয়।)
মনে হয় যেন, এর প্রতিরূপ হিসেবে এরপরে বুঝি বীরেন্দ্র লেখেন –
“আসমান ছেয়ে গেছে
পতাকায়, ফেস্টুনে, গর্জনে;
মনে হয় দৃশ্যের দর্পণে
বুঝি দ্রুত পৃথিবী বদলায়!
কূয়াষায়
ও শুধু চোখের ভুল, যা দেখিস,
ভিক্ষার মিছিল যায়।”
২০২৪-এ আমরা লিখছি নতুন কার্নিভালে মতুন জীবনের গান।
মিখাইল বাখতিন তাঁর Rabelais and His World গ্রন্থে বলছেন –“the unofficial carnival is people’s second life, organized on the basis of laughter.” হ্যাঁ, জীবনের এই আনন্দ হাসি গান প্রানোচ্ছলতা সমাজ জীবনের সর্বত্র ছড়িয়ে যাক। কোন ভয় নয়, হুমকি নয়, সন্ত্রাস নয় – মুক্ত স্বাধীন মানুষের কলকাকলি।
তবে আমরণ অনশনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের স্মরণে রাখব নিশ্চয়ই। স্মরণে রাখব, আমরা একটি মানুষমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জীবন্ত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা চাই। চাই সমস্ত চিকিৎসক মহলে এথিকাল প্র্যাক্টিস। কার্নিভাল তো আমাদের আত্মশুদ্ধির উৎসবও বটে।














Good one sir. Completely agree with you.
অসাধারণ। লেখাটা পড়ে মনে আগুন ধরে যায়।
আসাধারণ লেখা দাদা🙏🙏🙏
বাঃ। সুন্দর। ঠিক এমনই তথ্য সমৃদ্ধ discourse- র মাধ্যমে আমাদের সমৃদ্ধ করুন।
ডাক্তার বাবু আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
Sundor.
Bujhte pari kon shaktite tnra shorirke otikram korechilen.
Tabey judhho, jodi judhho i hoy ( se nijer sangey i hok ba onyo kichu) taholey kabita periey jete hobey ⚡
জুনিয়র ডাক্তাররা দেখিয়েছেন কার্নিভাল এরকম ও হয় যার প্রতীকি ধুলোয় মেশা লোহার শেকল। সুন্দর লেখনী।