আজকের পুস্তক পর্যালোচনার শুরুতেই একটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ দিল্লিতে অভিশপ্ত সেই রাতের ঘটনা। বাইশ বছর বয়সী এক মহিলা ফিজিওথেরাপি ইন্টার্ন সিনেমা দেখার পর রাতে তাঁর বন্ধুর সঙ্গে বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু তাঁর আর বাড়ি ফেরা হয়নি। বাসের মধ্যে তাঁকে গণধর্ষণ করা হয়। মেয়েটিকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লির সাফদারজং হাসপাতালে। এদিকে এই ঘটনার ফলে জনরোষ বাড়তে থাক। সেই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী সদ্যপ্রয়াত মনমোহন সিং। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত। ঘটনার এগারো দিনের মাথায় নির্যাতিতাকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। দুদিন পরে ২৯ ডিসেম্বরে মারা যান মেয়েটি। ভারতীয় আইন সংবাদমাধ্যমে ধর্ষিতার নাম প্রকাশের অনুমতি দেয় না। মেয়েটি সকলের কাছে হয়ে ওঠেন দামিনী বা নির্ভয়া। নির্ভয়ার মৃত্যুর পরে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল আন্দোলন। আন্দোলনের চাপে রাষ্ট্র তড়িঘড়ি করে এক বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করেছিল। কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল সরকার ও পুলিশ নারীর ওপর হওয়া অত্যাচার রুখতে ব্যর্থ।
এরপর নারীর নিরাপত্তার জন্য সংশোধন করা হয়েছে দেশের ফৌজদারী আইন। পাশ হয়েছে নতুন আইন। কিন্তু নারীর ওপরে অত্যাচার-ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। কামদুনি (২০১৩), উন্নাও (২০১৭), হাথরাস (২০২০) ঘটনার কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। প্রতিক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি এই ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ধর্ষিতাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলো করেনি। এই আন্দোলন করেছেন নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন। রাধা কুমারের গবেষণা দেখিয়েছে ভারতে মহিলাদের ওপর হওয়া অত্যাচারগুলির মধ্যে অন্যতম হল ধর্ষণ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, সারা দেশে ৩১,৬৭৭টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
নারীদের নিরাপত্তা দিতে বা নারীর জীবনের অধিকার রক্ষা করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে বারবার। এই ব্যর্থতার চরমতম ও কলঙ্কজনক বহিঃপ্রকাশ হল আরজি কর হাসপাতালের ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানীতে প্রথম সারির সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এই বছর ৯ আগস্ট এক মহিলা জুনিয়র ডাক্তার ডিউটি চলাকালীন হাসপাতালের মধ্যেই ধর্ষিতা ও নিহত হন। এই ঘটনা চিকিৎসক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। যে হাসপাতালে মানুষ যায় জীবন বাঁচানোর জন্য, সেই হাসপাতালেই নারী চিকিৎসকের জীবনের নিরাপত্তা নেই! এর চেয়ে লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে! তাই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা এবং অভয়া-তিলোত্তমা হত্যার ন্যায়বিচারের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন।
এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল চিকিৎসকদের আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু তা অতি দ্রুত পরিণত হয় গণ-আন্দোলনে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ পা মেলান এই আন্দোলনে। এ এক স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ। আন্দোলনের ঢেউ রাজ্য থেকে দেশে, তারপর আছড়ে পড়ে দেশের বাইরে। এই গণ-আন্দোলনের ফলে এই রাজ্যের স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত রূপের কথা সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে জানতে পারেন। জানা যায় চিকিৎসা-দুর্নীতি, চিকিৎসা-শিক্ষায় হুমকি সংস্কৃতি ও হেলথ সিন্ডিকেট বা স্বাস্থ্য-মাফিয়ারাজের কথা।
এই চলমান আন্দোলনের ১০০ দিনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে ‘দ্রোহকাল ২০২৪’ নামের নিবন্ধ সংকলনে। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস’ ফোরামের প্রচেষ্টায় আন্দোলনের ডাক্তারদের লেখা নিয়ে এই সংকলন-গ্রন্থ। বইটি সম্পাদনা করেছেন দু’জন চিকিৎসক – জয়ন্ত দাস ও সৌরভ তালুকদার। এই নিবন্ধ সংকলনের লেখকেরা আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তাঁরা বলেছেন তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা, আন্দোলনের গণভিত্তির কথা; সাধারণ মানুষকে জানাতে চেয়েছেন স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর সংকটের কথা। কারুর কারুর লেখায় উঠে এসেছে এই রাজ্য-দেশের ধর্ষণ সংস্কৃতি (রেপ কালচার)-এর কথা।
জয়ন্ত ভট্টাচার্য ঔপনিবেশিক ভারতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী চিকিৎসকেদের স্থান সম্পর্কে বলতে গিয়ে কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, রুক্মাবাই রাউত ও হৈমবতী সেনের জীবন সংগ্রাম ও আন্দোলন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, হৈমাবতী যখন হুগলির ইমামবাড়া হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন তখন এক অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জেন তাঁকে যৌন হেনস্থা করেন। ফলে বোঝা যাচ্ছে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বারবার অত্যাচারিত হয়েছেন নারী। তাই কৌশিক দত্ত আরজি কর ঘটনা এবং এর আগে-পরে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে লিঙ্গ-রাজনৈতিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। দায়ী করেছেন পিতৃতান্ত্রিক অত্যাচার-সংস্কৃতিকে। তিনি মনে করেন এর পিছনে রয়েছে রাষ্ট্রের মদত। নারীসুরক্ষার জন্য এই কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা তাই অতি প্রয়োজনীয়। এদেশে ১৯৭০-এর দশক থেকে নারীবাদী আন্দোলন জোরদার হয়েছে। শর্মিষ্ঠা দাস নারীদের জোটবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের ইতিহাসের কথা বলেছেন। তবে তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন অভয়ার মৃত্যুর পরবর্তী ঘটনাবলী পূর্বের আন্দোলনকে ছাপিয়ে গিয়েছে। ১৪ আগস্ট মেয়েরা রাতের দখল নিয়ে তাদের অধিকার বুঝে নিতে চেয়েছিলেন এবং চ্যালেঞ্জ করেছিলেন পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে। মেয়েদের এই ‘রিক্লেম দ্য নাইট’ আন্দোলনে পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অংশগ্রহণ অতিরিক্ত শক্তি যুগিয়েছে।
বিষাণ বসু আলোচনা করেছেন জুনিয়র ডাক্তারদের দশ দফা দাবি ও তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। এই দাবিগুলির মধ্যে প্রায় সব দাবি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের অধিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল হাসপাতালগুলিতে কেন্দ্রীয়ভাবে ‘রেফারেল’ ব্যবস্থা; হাসপাতালে কত বেড ফাঁকা, তার ডিজিটাল মনিটরিং; হাসপাতালগুলিতে শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ ইত্যাদি। স্বচ্ছ রেফারেল ব্যবস্থার অভাবে রোগীর পরিবারের হয়রানি সম্পর্কে খবর মাঝে-মধ্যেই সংবাদপত্রে হয়তো আপনি পড়ে থাকবেন। হাসপাতালে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে মানুষ বঞ্চিত হন সুচিকিৎসা থেকে।
এর সঙ্গে যখন যুক্ত হয় চিকিৎসা-দুর্নীতি তখন মানুষের বঞ্চনা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। দুর্নীতি দেখা গিয়েছে হাসপাতালে চিকিৎসা বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে মেডিকেল কাউন্সিলের নির্বাচনে পর্যন্ত। শিক্ষক-চিকিৎসক বিদ্যুৎ বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক বছরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিবেশের বদল সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, “পরীক্ষার আগেই হেলথ ইউনিভার্সিটি থেকে পেপার লিক হয়ে যায়। সেই পেপারের মডেল উত্তরপত্র তৈরি হয়। পেপার আর মডেল উত্তরপত্র পৌঁছে যায় বিভিন্ন কলেজের নেতাদের হাতে।… এই পেপার আর মডেল উত্তর নগদ টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয় অন্যান্য পরীক্ষার্থীর কাছে। স্রেফ টাকা আর রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলে সারা বছর না পড়েই ফাইনালে দারুণ রেজাল্ট করা যায়। কেউ এর বিরোধিতা করলে মনোনীত নেতাদের তাকে ফেল করিয়ে দেবার ক্ষমতা আছে। রেজিস্ট্রেশন আটকে দেবার ক্ষমতাও আছে। এরা শুধু ভালো রেজাল্ট করেছে তাই নয়, সেই রেজাল্টের জোরে কয়েকজন শিক্ষক চিকিৎসক হয়েও গেছেন”। আরজি কর হাসপাতালে দীর্ঘদিনের থ্রেট কালচারের শিহরণ জাগানো বিবরণ দিয়েছেন চন্দ্রমৌলি ঝা। শুনিয়েছেন তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কথা। এই স্বাস্থ্য মাফিয়ারাজ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সীমাহীন দুর্নীতির কাহিনি পড়তে পড়তে স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রতি আপনার ক্রোধ ও ঘৃণা জন্মাবে।
বেরসিক, ঐন্দ্রিল ভৌমিক, প্রলয় বসু প্রমুখের লেখা থেকে বোঝা যায় এই চলমান আন্দোলনে জনতা হয়ে উঠেছেন আসল নায়ক। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে এই আন্দোলন রাজনৈতিক নাকি অরাজনৈতিক? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন অর্জুন দাশগুপ্ত। আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে লালবাজার অভিযান, স্বাস্থ্যভবন ঘেরাও, ধর্মতলায় অনশন, দ্রোহের কার্নিভাল, অভয়া মঞ্চ গড়ে তোলা এবং শাসককে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিভিন্ন নিবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। আন্দোলনের অন্যতম মুখ রুমেলিকা কুমারের অনশন কর্মসূচি নিয়ে লেখা আপনার মনকে নাড়া দেবে। এই সংকলনে আছে আন্দোলন সম্পর্কে বেশ কিছু কবিতা ও অত্যাচারী শাসক সম্পর্কে একটি নাটক।
চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস’ ফোরাম’র জন্ম ও তার আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কেও জানা যায় এই সংকলন থেকে। ডাক্তারদের যৌথ মঞ্চ ‘জয়েন্ট প্ল্যাটফর্ম অফ ডক্টরস’-এর প্রেস বিজ্ঞপ্তি, চিঠি ও আবেদন নথিবদ্ধ করা রয়েছে এই বইতে। অভয়াকে ঘিরে আন্দোলনের ইতিহাস রচনায় এইসব নথি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রোহকাল ২০২৪।
জয়ন্ত দাস ও সৌরভ তালুকদার (সম্পাদিত)।
প্রকাশক: ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস’ ফোরাম, কলকাতা।
প্রথম প্রকাশ: ২০২৪।
মূল্য: ১৫০ টাকা।









