শরীরে ইনফেকশন হয়েছে এরকম সামান্যতম সন্দেহ হলেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা মানব সমাজ, বিশেষতঃ তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোর এক ভয়াবহ রোগ।
ভারতবর্ষে এবং তৃতীয় বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধের দোকান (ফার্মেসি) থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পাওয়া যায়। সুতরাং, একটু জ্বর হয়েছে কি হয় নি, একটু সর্দিকাশি বা পেট খারাপ হয়েছে কি হয়নি – লোকে ওষুধের দোকানদারের কাছ থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের দুটো বা চারটে ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল কিনে খায়।
এইভাবে চটজলদি সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমরা নিজেদের, পরিবারের, আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব এবং বৃহত্তর সমাজের কি প্রচণ্ড ক্ষতি করে দিচ্ছি- তা আমরা কেউ ভেবে দেখি না।
অলংকারিক আলোচনা করে লাভ নেই। বরং সমস্যার ভেতরে ঢোকা যাক-
১) অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়ার বিপক্ষে। একমাত্র ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনেই অ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা আছে বা থাকতে পারে। ভাইরাস বা ছত্রাক ঘটিত ইনফেকশনের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনও ভূমিকা নেই।
২) প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়া- যেগুলো মানুষের শরীরে রোগ সৃষ্টি করে- তার সংখ্যা হাজার হাজার। এছাড়াও অসংখ্য বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়া আছে- যেগুলো মানুষের শরীরে বাসা বেঁধে থাকে এবং ভিটামিন তৈরি করে, খাদ্যপাচন ও হজমে সাহায্য করে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাবৃদ্ধি করে। এখন সমস্যা হল, যে কোনও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হলে, তা মানুষের শরীরের এইসব বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যাকটেরিয়াগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে মুখে ঘা, হজমের গোলমাল, পেটের গণ্ডগোল হয়েই থাকে। এছাড়াও, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
৩) ডাক্তার না দেখিয়ে, কোনোরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা (বিশেষতঃ রক্তপরীক্ষা, ব্যাকটেরিয়াল কালচার সেনসিটিভিটি ইত্যাদি) না করিয়ে আন্দাজে এন্টিবায়োটিক খাওয়ার বিপদ কি? প্রথমতঃ, সেই রোগটা যে ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ- তা নিশ্চিত করা যায় না। ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ না হলে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনও ভূমিকা নেই । এক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কোনও উপকার তো করেই না, বরং অপকার করে।
৪) যদি ব্যাকটেরিয়া ঘটিত ইনফেকশন হয়ও, আপনি যে অ্যান্টিবায়োটিকটি আন্দাজে খাচ্ছেন তাতে ওই ব্যাকটেরিয়াটি সাড়া নাও দিতে পারে। না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। অন্ধকারে আন্দাজে ঢিল মারলে যেরকম হতে পারে আর কি!
৫) অনেকেই আন্দাজে কোনও সঠিক প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক তো খায়ই, তারপর তিনটে বা চারটে ট্যাবলেট খেয়ে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলোতে জিনগত পরিবর্তন ঘটে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হয়! তখন সাধারণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক গুলো আর কাজ করে না।
ইদানিং দেখা যাচ্ছে ক্ষতের পুঁজ পরীক্ষা, রক্ত বা অন্যান্য টিস্যু কালচার পরীক্ষা করলে এমন সব ব্যাকটেরিয়া বেরোচ্ছে- দু-দশক আগেও তাদের নাম আমরা জানতাম না। আর সেইসব ব্যাকটেরিয়া বেশিরভাগ বা কখনও কখনও সমস্ত সাধারণ এবং সহজলভ্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ (রেজিস্ট্যান্ট) ক্ষমতাধারী। সেইসব ভয়ঙ্কর সকল-অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (মাল্টিরেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়া-দের শায়েস্তা করতে অত্যন্ত দামী এবং বিরল অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দরকার হয়, যেগুলো একমাত্র শিরার মাধ্যমে প্রয়োগ করা সম্ভব।
এখনও পর্যন্ত যে মাল্টিরেজিস্ট্যান্ট ইনফেকশন গুলো চিহ্নিত করা গেছে সেগুলো হল- ‘এম আর এস এ’, ‘ভি আর ই’, ‘মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিবি’, ‘মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ছত্রাক’ ইত্যাদি।
দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ, বয়স্ক, ডায়াবেটিক, ক্যান্সার রোগী, হাসপাতালের আইসিউ-তে ভর্তি রোগীরা এই মাল্টিরেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার সহজ শিকার।
এরা যেন সেই মহাভারতের কর্ণের মত কবজ-কুণ্ডল ধারণ করে বসে আছে, যা ভেদ করতে না পারলে এদের নিকেশ করা অসম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ একটা মহামারী- যেটা গত কয়েক বছর ধরে ভারত ও অন্য কয়েকটি দেশে চলছে। ভারত হল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কেন্দ্রস্থল। বিখ্যাত ‘নেচার’ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবলমাত্র ২০১৯ সালেই ভারতবর্ষে ‘মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স’ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে তিন লক্ষ প্রাণহানি ঘটেছে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চের বিজ্ঞানীদের মতে, কোভিড অতিমারীতে (ভাইরাল ইনফেকশন) উপযুক্ত ওষুধের অভাবে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এই সমস্যা আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অথচ, ভারতীয় ড্রাগ ও কসমেটিক অ্যাক্ট, ১৯৪৫ অনুযায়ী সমস্ত অ্যান্টিবায়োটিক ‘সিডিউল-এইচ’ লিষ্টের মধ্যে পড়ে। আইন অনুযায়ী, এই ‘সিডিউল-এইচ’ লিষ্টভুক্ত ওষুধগুলো রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বাজারে বিক্রি হওয়ারই কথা নয়। কিন্তু সরকার, ওষুধশিল্প, ফার্মাসিষ্ট, সাধারণ মানুষ কেউই এই নিয়ম মানে না।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধের দোকান থেকে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া ছাড়াও আরেকটা সমস্যা হল- ‘ ‘ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশন’ বা একটা ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের মধ্যে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক পুরে বিক্রি। এতে ওষুধগুলো সস্তা হয় ঠিকই- কিন্তু রোগীর শরীরের ওজন অনুযায়ী ওষুধ পড়ে না। এতে এক বা একাধিক ওষুধ প্রয়োজনের অতিরিক্ত অথবা প্রয়োজনের থেকে কম ডোজে শরীরে প্রবেশ করে সট। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের এটাও আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারন।
আমাদের দেশে এবং আরও কয়েকটা তৃতীয় বিশ্বের দেশে যথেচ্ছ এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে এবং অপপ্রয়োগ করে করে এমন অবস্থা হয়েছে যে, পৃথিবীতে আর এক অতিমারী আসার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক ও তার ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশনের প্রয়োগ অবিলম্বে নিয়ন্ত্রিত না হলে সারা পৃথিবীজুড়ে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এক ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য।
সামান্য আশার কথা এই- ইদানিং সরকার ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সরকারি সংস্থাগুলির কাজকর্ম দেখে মনে হচ্ছে যে, দেরিতে হলেও কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙছে।
এখন প্রশ্ন হল, সাধারণ মানুষের ঘুম ভাঙবে কবে? আমাদের ভাবতে হবে, ইনফেকশনের সস্তা ও চটজলদি সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমরা নিজেদের, নিজেদের প্রিয়জনদের এবং গোটা মানব জাতিকে আরো জটিল ও ভয়াবহ সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছি না তো!










