ডিসক্লেইমার
পহেলগাঁতে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসবাদী জঙ্গিদের হাতে নরমেধ যজ্ঞে যারা নিহত হয়েছে তাদেরকে ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু যারা এই ভাবনার অতীত ঘৃণ্যতম নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের বিনাশ এবং উপযুক্ত শাস্তি চাই – আমার অন্তর থেকে।
শুরুর কথা
গত ২২শে এপ্রিল (২০২৫) বৈসরন ভ্যালির যেখানে হিন্দু বলে বেছে বেছে ২৫ জন বা তার বেশি ট্যুরিস্টকে জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা হত্যা করেছে বলে এখন সমগ্র বিশ্ব জেনে গেছে, ঠিক একবছর আগে ২০২৪-এ আমরা স্বামী-স্ত্রী ঠিক সে জায়গা থেকেই ঘুরে এসেছে। তখন বাতাসে কোন বারুদের গন্ধ ছিলনা। ছিল অসংখ্য দরিদ্র কাশ্মিরীর আতিথেয়তা এবং সৌজন্য। তবে খোদ শ্রীনগরে ৫০ থেকে ১০০ মিটার পরপর আধাসামরিক বাহিনীর রণসজ্জা শরীরে অন্যরকমের “gut feeling” তৈরি করেছিল তো বটেই। আজ পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন।
(কাশ্মীর অবজার্ভার পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সাধারণ কাশ্মীরিরা মোমবাতি জ্বালিয়ে লালচকে নিহতদের প্রতি সংহতি জানাচ্ছে)
এই মুহূর্তে ভারতের গণমানসিকতার যে তীব্র ধর্মীয় এবং পাকিস্তান-বিরোধী উন্মাদনা রাজত্ব করছে, সেখানে সুস্থভাবে “স্বস্থ” অবস্থায় (আয়ুর্বেদ থেকে ধার করলাম) কোন বিচার আশা করা দুরাশা মাত্র।
ঘটনাক্রম
(১) এখন অব্দি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২২শে এপ্রিল ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞেস করে বেছে বেছে সশস্ত্র মুসলিম জঙ্গি পর্যটকদের নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করল। যারা নিহত হল তাদের মধ্যে ভারতীয় সেনাকর্মী, আইবি বিভাগের কর্মী থেকে শুরু করে ২০ জনের বেশি মানুষ (সঠিক হিসেবে ২৬ জন) আধুনিক মারণাস্ত্রের গুলিতে স্রেফ ঝাঁঝরা হয়ে গেল। পর্যটকদের বাঁচানোর চেষ্টা করায় এক কাশ্মীরি মুসলিম টাটুওয়ালাও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
(৩) আমাদের কাছে গ্রহণীয়ভাবেই সন্ত্রাসবাদ এবং এর মদতদাতা পেছনের শক্তিকে নৃশংসতম ও কঠোরতম উপায়ে নির্মূল করার এক তীব্র তাগিদ সমাজের বেশিরভাগ মানুষের মাঝে সঙ্গতভাবেই তৈরি হয়। ২২শে এপ্রিল থেকে ২৮শে এপ্রিল (২০২৫) পর্যন্ত ৯টি বা তার বেশি কাশ্মীরি জঙ্গি পরিবারের বাড়ি হয় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে কিংবা আইইডি বিস্ফোরন ঘটিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তাবাহিনীর তরফে। সন্তাসবাদ দমনের জন্য সেনাবাহিনীর হাতে বল্গাহীন ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
(৪) সিন্ধু জলচুক্তি বাতিল করা হয়েছে। বাঁধের জল ছাড়ার ফলে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের একাংশে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।
(৫) সামরিক বাহিনীর স্থল বাহিনী, নৌ বাহিনী এবং বিমান বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় (high alert) রাখা হয়েছে – যেকোন সময়ে প্রতিবেশি দেশের ওপরে তীব্রতম আক্রমণ শুরু হতে পারে।
(৬) প্রায়-ব্যতিক্রমহীনভাবে সমগ্র ভারতীয় জনতার দাবী এর বাস্তবায়ন চাইছে।
(৭) এর একটি প্রসারিত রূপ হিসেবে কলকাতার এক চিকিৎসক সংবাদপত্রে জানিয়ে দিয়েছেন যে, যে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মুসলিম মহিলাকে এতদিন ধরে দেখে এসেছেন তার আর কোন চিকিৎসা করবেন না – চরক বা হিপোক্রেটিস-এর শপথের কোন পরোয়া না করে।
একমাত্র অভয়া মঞ্চ ছাড়া আর কোন সংগঠনের তরফে এরকম ধর্মীয় কারণে চিকিৎসকের অমানবিক কাজের বিরুদ্ধতা করেছেন বলে জানা নেই। দুর্ভাগ্য যে, কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে ভারতের সমস্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে এক করে ফেলা হচ্ছে। বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিমরা বিপন্ন বোধ করছেন, যুবতীরা বিশেষভাবে মানসিক আশ্রয়হীনতায় ভুগছে।
অথচ মুসলিম সমাজের অভ্যন্তর থেকেই এই সন্তাসবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বর শোনা যাচ্ছে। এবং এগুলো কিছু কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে। আমরা একে আদৌ গুরুত্ব দিচ্ছিনা। সে মানসিকতাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি, বা ফেলেছি।
আরও কিছু কথা – আমাদের ভাবার জন্য
(১) ভারতের সমস্ত ধরনের সংবাদমাধ্যমে এই ঘৃণ্য, নৃশংস এবং হাড় হিম করে দেওয়া খবর ছড়িয়ে পড়তেই, প্রত্যাশিতভাবেই, মুসলিম এবং পাকিস্তানবিরোধী কঠোর ও তীব্র মানসিকতার ঝড় উঠল। যদিও গত এক দশকের বেশি সময় ধরে এর চাষ হচ্ছিল প্রতিদিন – সুনিপুণভাবে প্রতি মুহূর্তে।
(২) ভারতবর্ষে পরিব্যাপ্ত গণতন্ত্রের যেটুকু অস্তিত্ব এখনও আছে সে পরিবেশে মানুষ এখনও একটা দূর অব্দি আন্দোলন করতে পারে, নিজের বিচার-বিশ্লেষণ-বিশ্বাস যেকোন মাধ্যমে ব্যক্ত করতে পারে। বিপরীতদিকে, পাকিস্তানে গণতন্ত্রের সামাজিক চর্চা কখনও বিকশিতই হয়নি। সামরিক শক্তি সবসময়েই রাজনীতির শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে পাকিস্তানে মুক্ত চিন্তা বা যুদ্ধবিরোধী স্বর কিংবা সন্ত্রাসবাদ বিরোধী শক্তি আদৌ অবস্থান করে কিনা, কিংবা করলে তাদের চরিত্র কী সেকথা বোঝার জন্য আমাদের হাতে কোন বাস্তব উপায় নেই – টুকরোটাকরা কিছু খবর ছাড়া।
(৩) উল্টোদিকে, ভারতে গণতান্ত্রিক পরিসর থাকার ইতিবাচক ফল হিসেবে মানুষের মতামত প্রকাশিত হবার সাথে সাথে সমান্তরালভাবে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে বিভিন্ন আইটি সেল “ফেক নিউজ” এবং অর্ধসত্য দৃশ্য-শ্রাব্য খবর নিরন্তর পরিবেশন করতে পারে। এর পরিণতিতে আমাদের অলক্ষ্যে, আমাদের অজান্তে, নিঃসারে আমাদের মধ্যে একধরনের মতামত ক্রমাগত “উৎপাদিত” হতে থাকে।
(৪) আমাদের মাঝে “উৎপাদিত” বা নিজস্ব নিয়মে জন্ম নেওয়া এরকম এক বিশেষ ধরনের সামাজিক মানসিকতা (social psyche) আমাদের সামাজিক স্মৃতিতে কিছু কিছু বিষয় নিরন্তর প্রবাহিত হবার একটি স্তর তৈরি করে, আবার, বিপরীতদিকে, আমাদের মাঝে বহু ঘটনার সামাজিক বিস্মরণ (social amnesia) ঘটাতে সক্ষম হয় এবং, সামগ্রিক ফলাফল হিসেবে, এক অদ্ভুত সম্মিলিত সামাজিক বিবশতা (numbing of collective consciousness) জন্ম নেয়। ধর্ম এখানে আমাদের প্রায়-একমাত্র আইডেনটিটি হয়ে ওঠে, বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত সাফল্যকে “স্বাধীন বিজ্ঞানচর্চা” বলে ভ্রম হয়।
(৫) ভারতবর্ষের বর্তমান অবস্থা অবশ্য বিশ্বের পরিস্থিতিতে একেবারে অভিনব, নতুন বা অপ্রত্যাশিত নয়। বিশ্বে গণতন্ত্রের “বড়দাদা’ এবং “দীক্ষাগুরু” খোদ আমেরিকায় হার্ভার্ড বা কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির কথা ভাবুন। ভাবুন একেবারে প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমআইটি-র (ম্যাসচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি) কথা। প্যালেস্তাইনের জন্য সহমর্মিতা জানানোর কী খেসারত এদের দিতে হচ্ছে, বা এক অর্থে সামাজিকভাবে অপমানিত হতে হচ্ছে।
ধ্বংসাত্মক সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করার জন্য সমগ্র ভারত, আমার বিশ্বাস, ঐক্যবদ্ধ হবে, হয়ে আছে। কিন্তু এ লড়াই চালাতে গিয়ে যেন আমদের সংবিধানের কিছু মূল্যবান কথা যেন আমরা বিস্মৃত না হই – আমাদের দেশ একটি মুক্ত, সহিষ্ণুতাসম্পন্ন এবং সবাইকে নিয়ে চলার (inclusive) সমাজ।














একদম ঠিক কথা জয়ন্তদা। খুব সুন্দর বলেছো
“আমাদের দেশ একটি মুক্ত, সহিষ্ণুতাসম্পন্ন এবং সবাইকে নিয়ে চলার সমাজ” দাদা তোমার লেখার খেই ধরেই বলছি হ্যাঁ ঠিক তাই। তবে মনে প্রশ্ন জাগত আগে কিন্তু এখন আর জাগে না । সহিষ্ণুতা কেন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষই দেখাবে আর অন্য দিকে যাদের তোমরা বাড়ির ছোট ছেলের ভালবাসা দিয়ে আলালের ঘরে বান্দরের পোলা করে আগলে রাখছ তাঁদের কেন প্রয়োজনে কানটি মূলে দিতে পারো না ? এই ধরো সহিষ্ণুতা কাকে বলে জানো ভট্টাচার্য বামুনের ঘরের ছেলে তুমি নির্দ্বিধায় নিজের জাতের ভালো মন্দের প্রতি আঙ্গুল তুলতে পারছ কারন আমাদেরকে আমাদের এই জীবন শৈলী সেটা অধিকার দিয়েছে এবং সমালোচনা গ্রহণীয়। কিন্তূ তোমার পরিচয়ে যদি আরবী ধারা থাকত তাহলে কি তুমি একই অবস্থানে থাকতে?
গদি মিডিয়া আর আইটি সেল মানুষের মানুষের মাথা খেয়ে ফেলেছে।মানুষ আর সুস্থ চিন্তা করতে সক্ষম নয়।জনগন এক নির্বোধ জীবে পরিনত হয়েছে।তারা সরকারের কোন দোষই দেখতে পায় না।