ভোটের দোরগোড়ায় পশ্চিমবঙ্গবাসী। ইতিমধ্যে SIR তথা Special Intensive Revision (বিশেষ নিবিড় সংশোধন)-এর কল্যাণে এবং প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। সহজ কথায়, ছিল ভোটার (একটি বড়ো অংশ এই জলহাওয়া-মাটিতে আজন্ম লালিত এবং এই মাটিই তাদের আত্মপরিচয়ের একটি উপাদান) হয়ে গেল না-ভোটার। “ছিল বিড়াল, হয়ে গেল রুমাল” বলে একে লঘু করে দেখা যাবে না।
ভারতের নির্বাচন কমিশন এক নতুন (আমাদের কাছে অদ্ভুত ঠেকেছে) শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে একে সঠিক প্রমাণ করার জন্য – “logical discrepancy” বা “যুক্তিসঙ্গত অসঙ্গতি”। সেটা কী? প্রায় সমস্ত সংবাদমাধমে চিন্তাশীল মানুষেরা অনেক লেখা লিখেছেন। বহু সংগঠন দিনের পর দিন এই নিয়ে আন্দোলন করেছেন। বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে সে বিষয়ে লাগাতার আলোচনা চলছে। ফলে আমার শেষবেলার লেখায় এগুলো নিয়ে চর্বিতচর্বন করার কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করিনা।
আজ সোমবার (১৩.০৪.২০২৬) ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারক জয়মাল্য বাগচি কয়েকটি পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। এখানে আবার এক বিপত্তি আছে। বিচারপতিদের কোন পর্যবেক্ষণ যে কোর্টের রায় হিসেবে বিবেচিত হবে, আর কোনটাই বা সাধারণভাবে বিচারকের মৌখিক বক্তব্য, অথচ সিদ্ধান্ত নয়, এ বিষয়টি নির্ণয় করা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে ন্যাড়ার গানের “শিশি বোতলের” অংশের মতোই কঠিন। সহজ নয়। ফলে বাগচির বক্তব্য হিসেবে যা বলছি তা আদৌ সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য কিনা তা বোঝা শক্ত। তবে এটা বেশ স্পষ্ট যে মোটের ওপরে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে ছাড়পত্র দিয়েছে – কিছু কিছু আপাত ভৎর্সনা ছাড়া।
যাহোক, বিচারক বাগচি-র উদ্বেগের কারণগুলো কী কী? প্রথমত, তিনি একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী “robust appellate system” চেয়েছেন, বিচারাধীনদের সমস্যা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য। দ্বিতীয়ত, বিচারক বাগচি নির্বাচন কমিশনকে যা বলেছেন (অবশ্যই ইংরেজিতে) তা আমি হুবহু তুলে দিচ্ছি অনুবাদ না করে –
“Unfair denial of participation as a candidate is a ground to cancel an election. But right to vote will per se, until and unless, it’s an enormous number of electors, S.100 does not fall as one of the grounds for cancelling an election. If 10% of electorate does not vote and winning margin is more than 10%…what will happen? Suppose margin is 2% and 15% of electorate who are mapped could not vote, then maybe, we are not expressing any opinion, but we would definitely have to apply our minds. Please keep this in mind that the concern of a vigilant voter whose name correctly or incorrectly is not in the list is not in our minds”।
আরও বলেছেন – “If you see the original SIR notice, it talks of the benchmark as the 2002 electoral roll. So the SIR does not touch a person who is in the 2002 roll. The 2002 roll is not touched. What is touched who are relating themselves to the 2002 roll. 2002 roll was the benchmark, why because the last intensive revisions was then….When the Bihar SIR was argued, and we understand your SIR (in Bengal) is a facsimile of the Bihar, the submissions from ECI was unequivocal that the person in the 2002 electoral roll does not need give any document.” ৪৭% ভোটারের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ – “It’s not end justifying means but means justifying the end.” (https://www.livelaw.in/top-stories/west-bengal-sir-if-winning-margin-is-2-15-of-electorate-couldnt-vote-justice-bagchi-raises-concerns-530087)
তৃতীয়ত, বিবিসি সংবাদমাধ্যমের অভিমত হল – “সংসদের সবেচয়ে বেশি আসনবিশিষ্ট চতুর্থ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি-র কাছে “key prize” হিসেবে আছে যা বিজেপি এখনও জয় করতে পারেনি।” (https://www.bbc.com/news/articles/cy51qg00dezo)
চতুর্থত, ১৩.০৪.২০২৬-এ ইন্ডিয়া টুডে সংবাদপত্রের একটি খবরের শিরোনাম – “We can’t be blinded by elections: SC backs voters’ right to be on rolls amid SIR”। (https://www.indiatoday.in/india/law-news/story/voters-have-right-to-remain-on-rolls-we-cant-be-blinded-by-election-supreme-court-during-bengal-sir-hearing-2895415-2026-04-13)
আমাদের বিচারে SIR শুধু একটি নির্বাচনী প্রক্ষালন প্রক্রিয়া নয়। এখানে কতকগুলো বিষয় আমাদের মনোযোগে রাখা দরকার। সেগুলো পরপর এরকম –
(১) রাষ্ট্র চেয়েছে তাই SIR হবে, যেমন অভিন্নন দেওয়ানি বিধি বা নতুন শ্রমকোডের পরিবর্তন হয়, ভবিষ্যতে আরও হবে। এখানে নাগরিকের কণ্ঠস্বরের কোন গুরুত্ব নেই। কার্যত, একটি oligarchy চলছে গণতন্ত্রের নামে, যেখানে নাগরিকেরা ধীরে ধীরে পর্যবসিত হচ্ছে প্রজায়। নাগরিক সমাজ এবং প্রজাকুল একাকার হয়ে যাচ্ছে কিংবা অন্যভাবে দেখলে নাগরিক জীবন পরিণত হচ্ছে সামন্ত প্রভুর প্রজার জীবনে।
(২) এখানে না হয় SIR নিয়ে মানুষের চরমতম যন্ত্রণা, মৃত্যুভার এবং কষ্ট বহন করতে হচ্ছে বয়স নির্বিশেষে। কিন্তু লাদাখ যখন সংবিধানে দেওয়া অধিকার হারায়, সোনাম ওয়াংচুক জেলবন্দী থাকেন, গ্রেট নিকোবর প্রোজেক্ট নিয়ে কর্পোরেট হাঙ্গরেরা ছাড়পত্র পেয়ে যায়, তখন একটি বিশেষ সুরই বাজতে থাকতে – “রাষ্ট্র সর্বশক্তিমান” এবং একে মান্যতা দিতেই হবে জ্যাক লন্ডনের Iron Heel-এর মতো।
জ্যাক লন্ডনের বয়ানে – “The world is ours, we are its lords, and ours it shall remain. As for the host of labor, it has been in the dirt since history began, and I read history aright. And in the dirt it shall remain so long as I and mine and those that come after us have the power. There is the word. It is the king of words—Power. Not God, not Mammon, but Power.”
(৩) সবক্ষেত্রে যে রাষ্ট্র দমনমূলক নীতি নেবে এমনটা নয়। মানুষের social psyche-তে যতভাবে সম্ভব বিভ্রান্তি তৈরি করবে – সাদা-কালোর মধ্যেকার প্রভেদ মুছে যাবে। এবং নবীন-প্রবীন নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ ক্রমাগত মনগড়া গুজবের ঢেউয়ের পেছনে ছুটবে – একজন রোহিঙ্গা পাওয়া না গেলেও। সব মিলিয়ে SIR-এর পরিণতিতে সমাজের মধ্যে যা ঘটে চলেছে তা হল – একদিকে সমাজের স্বাভাবিক বিন্যাসকে অবিন্যস্ত করা, আবার অন্যদিকে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নিরাপত্তাহীনতার চাষ করে চলা। ধর্মীয় মেরুকরণ এতই প্রকট যে এ নিয়ে আলোচনা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।
(৪) সবার ওপরে পরাক্রম এবং দেশপ্রেম সত্য – এই ধারণাকে বদ্ধমূল করা হবে।
(৫) বিকশিত গণতন্ত্রের সভ্য এবং নাগরিক সমাজে যে চারটি স্তম্ভ (সংসদ, প্রশাসনিক বিভাগ, বিচারবিভাগ এবং সংবাদমাধ্যম) এদের মধ্যেকার বিভাজন ও লক্ষ্মণরেখা ক্রমাগত মুছে গিয়ে সেগুলো শুধুমাত্র রাষ্ট্র বা পার্টি-নামক হাইড্রার অনেকগুলো শুঁড়ে পরিণত হবে।
(৬) নাগরিক সমাজ বা তৃতীয় পরিসর ক্রম-সংকুচিত হবে, যেমন এখন হচ্ছে। মানুষের মধ্যে স্তুপাকার বিক্ষোভ বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও তা এখন অব্দি ignition point-এ পৌঁছনোর কোন অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে (যেমনটা ইন্দিরা গান্ধির জরুরি অবস্থার প্রতিক্রিয়ায় হয়েছিল) আমি মনে করিনা। এরজন্য বামশক্তির সক্রিয় এবং সদর্থক ভূমিকা নিতান্ত জরুরি। স্বাধীন নাগরিক সমাজ বা তৃতীয় পরিসর গড়ে তোলা এই মুহূর্তের লক্ষ্য হওয়া দরকার বলে আমাদের প্রত্যয়।












বলিষ্ঠ প্রতিবাদী উপস্থাপন 🙏🙏🙏
Very nice 🙏🙏
যথেষ্টই সঙ্গত এবং সময়োপযোগী লেখা। বর্তমান সময়ে মানুষের যে অভূতপূর্ব যন্ত্রণার ইতিবৃত্ত বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে চোখে পড়ছে তার প্রতিফলন যেমন থাকলে ভালো লাগত একই সঙ্গে SIR এর নামে যে এক অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে তার প্রতি কটাক্ষের তীব্রতা আরো আসা দরকার ছিল। তবে লেখাটা পড়তে গিয়ে দেখলাম হঠাতই যেন শেষ হয়ে গেলো।