Oopp0p0সুপ্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার যুগ থেকে প্রায় অষ্টাদশ শতকের শুরু পর্যন্ত সমাজে শ্রমিকের স্থান ছিল কেবল ও কেবলমাত্র ক্রীতদাসের মতো। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম এই সকল প্রয়োজনীয় রসদের কোনও কিছুতেই তাদের অধিকার ছিল না। প্রতিবাদের কোনও ভাষাও ছিল তাদের অজানা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত -এই ছিলো তাদের ন্যূনতম কাজের সময়। দিনে তো নয়ই, রাতেও তাদের অনেকের বরাতে ঘুম জুটতো না। প্রতিটি মূহুর্তে শাসকের কড়া নজরবন্দী হয়ে সচল থাকতো তাদের হাতদুটো। সামান্য বিচ্যুতিতেই জুটতো দন্ড বা চাবুকের তীব্র আঘাত, রক্তাক্ত হতো শ্রমিকের শীর্ণ ও রোগগ্রস্ত শরীর। অনাহারে, অর্ধাহারে রুগ্ন শ্রমিকদের অধিকাংশের অল্প বয়সেই মৃত্যু ঘটতো।
অষ্টাদশ শতকে শিল্পবিপ্লবের সাথে বিকশিত হয় পুঁজিবাদ। গড়ে ওঠে নিত্য নতুন ধরণের শ্রমের বাজার। অর্থের সমগ্র জোগান পুঁজিপতি বা মালিকদের হাতে থাকায় তারা শ্রমিকদের শোষনের মাত্রা বাড়িয়েই চলে। উদ্দেশ্য একটাই ক্রমাগত মুনাফা বাড়ানো। বিপজ্জনক কাজে সারা দিনরাত কাজ করেও অত্যল্প বেতনের কারণে দুবেলা দুমুঠো আহারও জুটতোনা অধিকাংশ শ্রমিকের। এর সাথে শুরু হয়েছিল আরো কম বেতন দেবার উদ্দেশ্যে শিশুশ্রমিকের ব্যবহার। ফলে শ্রমিককে বঞ্চিত রেখে মুনাফার পাহাড়ে চড়ে বসছিল কারখানার মালিকেরা। এই সময়কালে বিভিন্ন দেশে কিছু শ্রম আইন তৈরি হলেও মালিকদের দাপটে তার প্রয়োগ ছিলনা বললেই চলে।
১৮০৬ সাল। ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা চলছে ফিলাডেলফিয়ার ধর্মঘটী জুতো শ্রমিক ও তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে। মামলায় জানা গেলো, কারখানা মালিকেরা শ্রমিকদের দিনে ১৯ থেকে ২০ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করে। তখনকার প্রচলিত অলিখিত নিয়মে এটা ছিল স্বাভাবিক বিষয়, মালিকদের ছিল এটাই বক্তব্য। সংগঠনের ধারণা তখনও শ্রমিকদের ভাবনা চিন্তার বাইরে। আরও কয়েক বছর পর ১৮১০ থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত কাজের সময় কমানোর ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা আদায়ের জন্য লড়াই চলে আমেরিকা ও ইউরোপে। এই পর্যায়ে শ্রমিকরা ক্রমশঃ সংগঠিত হয়ে উঠতে থাকে। উনবিংশ শতকের শেষদিকে বিশ্বের কিছু কিছু অংশে বিক্ষিপ্তভাবে শ্রমিকদের সংগঠিত প্রতিবাদের আওয়াজ প্রকটভাবে শোনা যেতে থাকে। সেইসব এলাকার কিছু এগিয়ে থাকা মানুষ চেষ্টা করেন শ্রমিকদের কষ্টলাঘবের উদ্দেশ্যে তাদের সংগঠিত করতে ও কিছু সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দিতে।
সারাদিনে ৮ ঘন্টা কাজ, ৮ ঘন্টা বিনোদন ও ৮ ঘন্টা বিশ্রাম শ্রমিকশ্রেণীর তরফে প্রথম এই দাবি শোনা যায় ১৮৫৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার এক শ্রমিক আন্দোলনে। পরবর্তীকালে এই দাবি ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশ থেকে বিদেশে। ক্রমশঃ আন্দোলনের ঢেউ বাড়তে থাকে বিশ্বজুড়ে। এরই পরিণতিতে ১৮৮৪ সালে একই দাবিতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমেরিকার নানা শিল্পক্ষেত্রের শ্রমিকেরা। শুরুতে এই আন্দোলনের তীব্রতা টের না পাওয়া গেলেও তা তীব্র আকার ধারণ করে ১৮৮৬ সালে। ঐ বছরের ১লা মে শিকাগো শহরের সব কারখানায় ধর্মঘটের ডাক দেয় সেখানকার কর্মরত শ্রমিকরা। এরপর ৩রা মে শিকাগো শহরে মিছিলের পর ৪ঠা মে দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে শহরের হে মার্কেট স্কোয়ারে শহরের শ্রমিকরা সমবেত হয়। আগের দিন মিছিলে পুলিসের গুলিতে ২ জন শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে, ফলে শ্রমিকরা ছিল উত্তেজিত। সেখানে আচমকা তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিসের দিকে এক অজ্ঞাতনামা বোমা নিক্ষেপ করে। সাথে সাথে পুলিস মারমুখী হয়ে ওঠে আর শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক ও পুলিসকর্মী নিহত হয়। আহত হয় ৭০ থেকে ৮০ জন। গ্রেপ্তারের সংখ্যা শতাধিক। রক্তে ভেজা শহিদের পোষাক দিয়ে গড়ে ওঠে লাল পতাকা, যা আজও শ্রমিকদের যে কোনও আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। বিচারে এদের মধ্যে ৭জনের ফাঁসি হয়। এই শহিদদের বলিদান বিফলে যায়নি। দুবছর পর ১৮৮৮ সালে শ্রমিকদের ৮ ঘন্টা কাজের দাবি আমেরিকা জুড়ে স্বীকৃতি পায়। সাথে সাথে ১৮৯০ সালের ১লা মে তারিখে এক সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয় গোটা আমেরিকা জুড়ে। ১৮৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে ২য় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সালে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড ল্যাভিনে। ১৮৯১ সালে আন্তর্জাতিকের ২য় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। ১৮৯০ সালে এই বিশেষ
দিবসটি পালিত হয়েছিল অভূতপূর্ব উদ্দীপনা ও উপস্থিতির মাধ্যমে। আজও প্রতি বছর ১লা মে বিশ্বের বহু দেশে সাড়ম্বরে পালিত হয় মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস।
সুদূর অতীতে ও বৃটিশ শাসিত ভারতেও শ্রমিকদের অবস্থা কখনোই অন্য দেশের তুলনায় ভালো ছিলোনা। স্বাধীনতার আগের দুই শতকে পশ্চিমী দেশগুলিতে নানা ধরণের শ্রমিক স্বার্থবাহী আইন চালুর ফলে সেই দেশগুলির শ্রমিকরা অনেক সুযোগ সুবিধা পেলেও পরাধীন ভারতের শ্রমিকদের কপালে তার ছিটেফোঁটাও জোটেনি। তবে সেইসব আন্দোলনের ঢেউ অংশতঃ ভারতে পৌঁছতে শুরু করেছিলো বিংশ শতকের প্রথম দিকে। তার ফলে বিক্ষিপ্তভাবে কোথাও কোথাও শ্রমিক আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। কদাচিৎ কিছু সুবিধাও মেলে দু-একটি ক্ষেত্রে। এর পরিণতিতে ভারতে প্রথম মে দিবস উদযাপিত হয় শ্রী মালায়াপুরাম সিঙ্গরাভেলু-র নেতৃত্বে তৎকালীন হিন্দুস্তান কিসান পার্টির উদ্যোগে। তারিখটি ছিলো ১৯২৩ সালের ১লা মে। উল্লেখযোগ্য জমায়েতের মাধ্যমে উদযাপিত এই অনুষ্ঠানে রক্তবর্ণ পতাকা উত্তোলন করা হয় ও এর মাধ্যমে বিগত দিনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এর পর থেকে আজও মে দিবস পালিত হয়ে আসছে ভারতজুড়ে প্রতি বছর ১লা মে তারিখে।
ভারতের অর্থনীতি ও শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থা
আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বে শিল্প ও বানিজ্যের অধিপতিরা অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন। শ্রমিক দূর অন্ত, সাধারণ মানুষের কোনও মুল্য নেই তাদের কাছে। তারাই এখন রাষ্ট্রক্ষমতার ধারক ও বাহক। তাদের পুঁজির পরিমাণ ও মুনাফাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলতে তারা সদাসচেষ্ট। নিজেদের সম্ভাব্য সর্বশক্তি দিয়ে শ্রমিককে নিষ্পেষিত করার বিনিময়ে গড়ে উঠছে তাদের পুঁজির পাহাড়। ৮ ঘন্টার পরিবর্তে তারা আওয়াজ তুলছে দিনে ১০, ১২ বা ১৪ ঘন্টা কাজের সময় করা হোক, যাতে শ্রমিকের সর্বনাশ হলেও তাদের উদরস্ফীতি বজায় থাকে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, একনাগাড়ে দিনে দশ-বারো বা চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করবার পর কোনও মানুষ কি সুস্থ থাকতে পারে? বিজ্ঞান বলে, প্রতিটি মানুষের কর্মক্ষমতার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। তাকে যদি একনাগাড়ে তার কর্মক্ষমতার চেয়ে অধিক পরিশ্রম করানো হয়, তবে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটতে বাধ্য। ফলে উদ্বেগ বাড়ার সাথে সাথে তার নিজ কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা তলানিতে ঠেকে যায়। এমনকি সেই উদ্বেগ তাকে কর্মবিমুখ করে তোলে আর অবশেষে তাকে অসামাজিক কাজের দিকে ঠেলে দিতে পারে। উৎপাদনকে সঠিক মাত্রায় রাখতে হলে যে কোনও পেশার শ্রমিককে অবশ্যই শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকা প্রয়োজন। সেই শ্রমিক কাজ করবে মনের আনন্দে, ফলে সে উৎপাদন বৃদ্ধিরও সহায়ক হতে পারে। মে দিবসের সাথে শ্রমিকের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক তাই
আনন্দে, ফলে সে উৎপাদন বৃদ্ধিরও সহায়ক হতে পারে। মে দিবসের সাথে শ্রমিকের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক তাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মে দিবসের দাবিসমূহের মধ্যে সঠিকভাবেই উল্লেখ করা হয়েছিল কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও কর্মস্থলে যথাযথ স্বাস্থ্য পরিষেবা উপলব্ধ হবার কথা।
এই প্রসঙ্গে কিছু রোগের কথা বলা যেতে পারে যেগুলো শ্রমিকের পেশার সাথে সরাসরি যুক্ত:
১) শ্বাসতন্ত্রের অসুখ অ্যাসবেস্টস, পাথর খাদান, কয়লাখনি ইত্যাদি অঞ্চলে যুক্ত কর্মীদের অধিকাংশ অ্যাসবেস্টোসিস, সিলিকোসিস, নিউমোকোনিওসিস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হন। কাজের মাঝে মাঝে বিরতি, মাস্ক ও উপযুক্ত সরঞ্জামের ব্যবহার এদের প্রাদুর্ভাব কমাতে পারে।
২) চর্ম রোগ কর্মক্ষেত্রে রাসায়নিক পদার্থ, প্রদাহ সৃষ্টিকারী পদার্থ বা বিভিন্ন ধরণের বিকিরণের ফলে চর্মরোগ ও ত্বক ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা যথেষ্ট। উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা অবলম্বন করলে এইসব রোগকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব।
৩) কর্মক্ষেত্রে ক্রমাগত ভারি জিনিষ তুলতে থাকলে ঘাড়, কোমর ও পিঠে ব্যথা হতে পারে। এই ধরণের ভারি কাজে যন্ত্রের ব্যবহার করা হলে ব্যথা এড়ানো সম্ভব।
৪) কারখানায় একটানা প্রবল আওয়াজের মধ্যে কাজ করলে শ্রমিকদের শ্রবণক্ষমতা কমতে থাকে। কারখানায় এজন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক ব্যবস্থা থাকা উচিত।
৫) ধূলিপূর্ণ ও দুষিত পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী কাজে শ্রমিকদের ক্যান্সার রোগের সম্ভাবনা প্রবল। রোগ এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কারখানায় থাকা দরকার।
৬) প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে দু-তিনমাস অন্তর শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা উচিত। এতে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ ধরা পড়লে সহজেই তা নিরাময় হতে পারে।
৭) কোনও শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় পড়লে, আহত হলে বা মারা গেলে অবশ্যই যথাযথ চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের
ব্যবস্থা থাকা উচিত।
ভারতে জনস্বাস্থ্যের অবস্থা
ভারতবর্ষের জনগণ আজ মহাসঙ্কটের মধ্যে দিয়ে চলেছে। একদিকে লক্ষকোটিপতিদের মুনাফার মোহ, অন্যদিকে ধর্মীয় বিভাজনের যাঁতাকলে পড়ে ভারতবাসী আজ উদভ্রান্ত। ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাশিয়া ও বর্তমানে কাজাখস্তানে অবস্থিত আলমা আটা শহরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে প্রায় ২০০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা করেন, ২০০০ সালের মধ্যে প্রতিটি দেশের সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যের যাবতীয় দায়িত্ব নেবে বিবৃতিকারী সকল দেশের সরকার। ভারত সরকারের নিযুক্ত শ্রীনাথ রেড্ডি কমিশন ২০১০ সালে তাদের রিপোর্টে বলেন, দেশের জি. ডি. পি.-র ৩ থেকে ৩.৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করলেই দেশের সব নাগরিককে সব ধরণের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া সম্ভব। আশ্চর্যের বিষয়, আজ ২০২৫ সালেও দেশের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় জিডিপি-র মাত্র ১.৫ শতাংশ! এর ফলে গোটা দেশে সরকারী স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধুকলেও বেসরকারী নার্সিং হোম ও হাসপাতালের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। তাদের সাথে দোসর হয়েছে সাধারণ মানুষকে লুট করতে গড়ে ওঠা অগুন্তি স্বাস্থ্য বীমা সংস্থা। এইসবের যাঁতাকলে পড়ে বহু পরিবার আজ পথে বসেছে। আগামীদিনে আরো কত পরিবার শুধু চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হবে, কে জানে?
তাই আসুন, সবাই মে দিবসের ডাকে সাড়া দিয়ে সবার জন্য স্বাস্থ্যের অধিকারের দাবীতে একসাথে গর্জে উঠি।
স্বাস্থ্যের বৃত্তে পত্রিকার মে-জুলাই ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত।











