কাশ্মীরে যে বীভৎস হত্যালীলা ঘটালো ইসলামিক টেররিস্টরা সেটা আমাদের ভেতর পুড়িয়ে দিয়েছে। মুসলিম মৌলবাদ সারা পৃথিবীর কাছেই এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের কারণ। আমাদের দেশে এই ভয় আরও বেশি যেহেতু হিন্দু মুসলমান বিভাজনের ওপর দাঁড়িয়েই ভাগ হয়েছিল ভারতবর্ষ এবং ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ এই তিন দেশের রাজনীতিকদের সিংহভাগ হিন্দু মুসলমানের পারস্পারিক বিদ্বেষকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে যায় ক্ষমতায় আসা বা গদি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে।
এরকম অকারণ হত্যালীলায় সাধারণ মানুষের প্রাণ যায় কিন্তু সুবিধা হয় রাজনীতিকদের। ধরুন এই ঘটনায় পাকিস্তান তাদের দেশের ভেতরকার নানা সমস্যাকে আপাতত ধামাচাপা দিতে পারবে। ভারত যত পাকিস্তানকে নানাভাবে শিক্ষা দিতে চাইবে ততই সেখানে অন্ধ ধর্মবিদ্বেষের সঙ্গে যুক্ত হবে উগ্র জাতীয়তাবাদ। ব্যাস ওখানকার মানুষের রুটি রুজির সমস্যা, শাসকবিরোধী দলগুলোর বিরোধিতা করার নানান অ্যাজেন্ডা, সব চলে যাবে কার্পেটের তলায়। আবার এদেশে দেখুন হিন্দুত্ববাদী শাসক এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে হিন্দু আবেগ উস্কে দিয়ে হিন্দু ভোটের চরম মেরুকরণ করতে চাইছে। সঙ্গে রয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদের ভাবাবেগ। ভারত যদি সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের মত প্রত্যাঘাত করে যা এই মুহূর্তে অবশ্যম্ভাবী তাহলে তার ফায়দা তুলবে শাসকদল। এদেশের কোটি কোটি গরিবগুর্বো পোকামাকড়ের মত মানুষজনের সকল সমস্যাকে আপাতত ঠেলে দেওয়া যাবে পিছনের সারিতে। পুলোওয়ামা কান্ডের পর বিজেপির লোকসভা ভোটে সুইপ করার উদাহরণ নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি আমরা। সামনে বিহারে নির্বাচন, তারপর নির্বাচন এই বাংলায়। কে বলতে পারে জাতীয়তাবাদ আর এই তীব্র মুসলিম বিরোধিতার ভেতর দিয়ে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ, বিজেপিকে সামনের নির্বাচনগুলিতে বড় কোন সুবিধা দেবে না?
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হোক ঐক্যবদ্ধ। তা যেন ধর্মের লড়াই না হয়ে ওঠে এই বোধকে এখন শ্বাসরোধ করার চেষ্টা হচ্ছে প্রবলভাবে। এখন হাওয়া উঠেছে সব মুসলমানগুলোকে মেরে বের করে দাও। যেন কোটি কোটি সাধারণ মানুষের যে মুসলিম সমাজ আছে এই দেশে, তারাই দায়ী এই হত্যালীলায়। ঠিক এই যুক্তিতে গাজায় হাজার হাজার হাজার শিশুকে ইজরায়েলের খুন করাকেও অনেকেই সমর্থন করছেন। বেশ হচ্ছে, মুসলমানগুলো মরছে। অন্ধ হিন্দুত্ববাদীরা উল্লসিত হচ্ছেন। ঠিক একই রকমের বর্বরতা যখন বাংলাদেশ দেখাচ্ছে হিন্দুদের খুন করে বা অত্যাচার করে, মৌলবাদী মুসলমানরা মহা খুশি। কিন্তু একটু মানুষ হয়ে ভাবলে বোঝা যায় এটা কতটা অন্যায়। নিরীহ, নির্দোষ মানুষকে কোনো যুক্তিতেই মেরে ফেলা, কেটে ফেলা যায় না। হাজার হাজার শিশুকে যারা হত্যা করতে কুণ্ঠিত হয় না, তাদের আমরা বর্বর বলি। সন্ত্রাসবাদীরা বর্বর কারণ তারা এরকমই করে। এই সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণ করা বা দমন করা মানে একটা ধর্মের সকল মানুষকে আক্রমণ করা কিছুতেই নয়। এই হামলার ফলে মুসলমান সমাজের বিরুদ্ধে ঘৃণা এমনভাবে ছড়িয়েছে যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টার পড়েছে, কুকুর এবং মুসলমানদের প্রবেশ নিষেধ!
রাজনীতিকরা সন্ত্রাসবাদকে লালন করে। একটা সন্ত্রাসের পাল্টা আরেকটা ধর্মীয় সন্ত্রাসের আয়োজন করে কিংবা মদত দেয়। এই যে বিরোধী দলনেতা বললেন, ২৬০টা বডি চাই, এর কারণ ভোট। একটা ষাঁড় যে একটা টিভি চ্যানেলের সঞ্চালক হয়ে সংবিধানকেও নস্যাৎ করে দিতে চাইছে তার কারণও ভোট।
দেশের সহনাগরিকদের প্রতি ঘৃণা না ছড়িয়ে বরং প্রশ্ন করা উচিত এরকম একটা অধ্যুষিত অঞ্চলে ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন দেওয়া হয়নি। হাজার হাজার পর্যটক যেখানে নিয়মিত যাচ্ছেন তাদের জন্য একজন নিরাপত্তা রক্ষীও থাকবে না? এ হতে পারে? জঙ্গিরা হেঁটে হেঁটে এল, ২০ মিনিট ধরে বেছে বেছে হত্যালীলা চালালো, আবার হেঁটে হেঁটে পালিয়েও গেল! নির্জন পাহাড়ে বহুদূর থেকে গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়। সেনার কানে সে আওয়াজও পৌঁছল না যাতে তারা দ্রুত চলে আসতে পারে? তাহলে ঐ পর্যটনকেন্দ্র থেকে কত দূরে ছিলেন তাঁরা যে সাহায্যের জন্য আসতে ঘণ্টা পার হয়ে গেল? অথচ কাশ্মীরে তাঁরা হাই এলার্টে থাকেন যাতে মুহূর্তে আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাঁদের কাছে হেলিকপ্টার ছিল যার সাহায্যে ১০ মিনিটের ভেতর ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। ড্রোনের সাহায্যে অতি দ্রুত জঙ্গীদের পালানোর ট্র্যাক করার চেষ্টা করা সম্ভব। এসবই শুরু হল, চিরুনি তল্লাশি চলল, কিন্তু হল জঙ্গীরা হেঁটে হেঁটে পগার পর হওয়ার বেশ কয়েক ঘণ্টা পর থেকে। খুউব অদ্ভুত নয় কি? কেন এমন হল এই প্রশ্ন করা কি জরুরি নয়? এই যদি আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নমুনা হয় তাহলে তো শত্রুরা আরও বড় সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়ে প্রচুর ক্ষয়, ক্ষতি ও প্রাণ হানি করে সহজেই পগার পার হবে! পর্যটকরাই বলেছেন আরও আগে পৌঁছলে হয়ত আহত কয়েকজনকে বাঁচানো যেতে পারত! তা হয়নি।
ভারতবর্ষের সমগ্র মুসলিম সমাজকে দায়ী করার আগে এত বড় গাফিলতির দায় কেন স্বরাস্ট্রমন্ত্রী নেবেন না এই প্রশ্ন করা উচিত নয় কি? পুলোওয়ামার জঙ্গী হানায় অত সেনাজোয়ান মারা গেলেন, গেরুয়া শিবির জাতীয়তার জোয়ারে ভোট বৈতরণী পার হয়ে ক্ষমতায় এলো সহজেই, কিন্তু অনেক জরুরি প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানকে সবক শেখানো, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ইত্যাদির ক্রমাগত প্রচারের ফলে উথলে ওঠা জাতীয় আবেগের ঢেউয়ে সে সময়ে, চরম গাফিলতির প্রশ্ন-ঝড় দেশ জুড়ে ওঠেনি বলেই হয়ত। আজও গোটা দেশ চাইছে পাকিস্তানকে সবক শেখাতে। সেটাই স্বাভাবিক। উচিতও। কিন্তু স্বাভাবিক জাতীয় আবেগের পাশে দেখুন ক্রমাগত ধর্মীয় আক্রমণকে বড় করে তুলেছে গেরুয়া শিবির, যাতে এই গাফিলতির প্রশ্নগুলোও সহজে ধামাচাপা পড়ে যায়!
আর একটি কথা এই প্রসঙ্গে বলতেই হয়। সেকুলারদের আক্রমণ করেই চলেছে হিন্দুত্ববাদীরা। তারা সেকুলারদের দেশ ছাড়ার ফতোয়াও দিচ্ছে, যেন সেকুলাররাই মুসলমানদের তোল্লাই দিয়ে দিয়ে এইসব কাজ করায়। আসলে ধর্মান্ধদের কাছে সবচেয়ে বড় থ্রেট হল এই সেকুলাররা। কারণ ধর্মের নামে যে সকল নষ্টামির চেষ্টা হয় তাকে সপাটে প্রশ্ন করতে পারেন এঁরা। সেকুলার হতে গেলে অবশ্য ধর্মবিশ্বাসী হতে বাধা নেই। হতে হয় ধর্মনিরপেক্ষ। রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি ধর্মবিশ্বাসী হয়েও সেক্যুলার ছিলেন। সেকুলাররা যেহেতু ধর্ম-নিরপেক্ষ তাই তাঁদের কোনো দায় নেই কোনও ধর্মের নষ্টামিকে ডিফেন্ড করার।

বাংলাদেশে নাজিমুদ্দিন সামাদ, আহমেদ রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি নিলয়, ফয়সল আরেফিন দীপন ইত্যাদি মুক্তমনা সেকুলারদের হত্যা করেছে মুসলিম মৌলবাদীরা। এদেশেও গৌরি লঙ্কেশ, গোবিন্দ পানেসর, নরেন্দ্র দাভলকর, এম. এম. কালবুর্গীদের হত্যা করেছে হিন্দুত্ববাদীরা। এদেশে ধর্মান্ধ গেরুয়া শিবির দাবি করেন সেকুলাররা সিলেক্টিভ বিষয়ে ধর্ম নিরপেক্ষ অর্থাৎ মুসলমানদের দোষ যেন তাঁরা দেখতেই পান না। এটা সম্পূর্ণ অসত্য। তাহলে তো তাদের ধর্ম নিরপেক্ষতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাতে তাঁদের লাভ কী? আসলে যেহেতু হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর ক্ষমতায় আসা আর ধরে রাখার চেষ্টা হয়েই চলেছে, ফলে মুসলমান বিদ্বেষের নানা বীভৎস রূপ এদেশে অহরহ চোখে পড়ে। তার প্রতিবাদ স্বাভাবিকভাবেই সেকুলাররা করেছেন, করছেন।
মুসলমান মৌলবাদের বিরোধিতা বা জায়নিস্টদের বিরোধিতা, যে কোনো ধর্মীয় আগ্রাসনের বিরোধিতা করতে সেকুলারদের কোনো অসুবিধে নেই। এদেশের মুসলমান ধর্মান্ধরা নানা সময়ে উগ্র ঘৃণা ভাষণ দেন, তার প্রতিবাদও কিন্তু প্রবলভাবেই হয় সেকুলারদের দিক থেকে। (যেমন ধরুন ববি হাকিম, সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বা হুমায়ূন কবিরদের ঘৃণা ভাষণের প্রতিবাদ)। কিন্তু এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের ঘটানো অন্যায় সংখ্যায় অনেক বেশি হওয়ায় সেগুলোর প্রতিবাদই চোখে পড়ে বেশি। আর ইসলামী জেহাদি বাহিনী যে নৃশংস অপরাধ সংগঠিত করে তাকে তীব্র আক্রমণ, বা দিদিমণির ভোটের জন্য মুসলমান তোষণের বিরোধিতা, বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর আক্রমণের বিরোধিতা, সেকুলাররা করে শুধু নয় তাঁরা সৌভ্রাতৃত্বের কথা বলে, ধর্মান্ধতার বাইরে বেরিয়ে এসে মানবতার কথা বলে, রাস্তায় নেমে মানুষকে ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে ওঠার ডাক দেয়, ভালোবাসার কথা বলে। তাতে রাজনীতিকদের অবিরাম ঘৃণার চাষ করে যাওয়া এই সমাজটা, মানুষের শুভবুদ্ধির সামান্য লালনে হয়ত একটু বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। আর তাতেই বিপদ বাড়ে এই ধর্মব্যবসায়ী রাজনীতিকদের যাঁরা এই খিদের দেশে জোর গলায় ঘোষণা করেন ‘ভাতের লড়াই নয় জাতের লড়াই চাই।’









