২২ এপ্রিল যেদিন অভয়া মঞ্চের আহ্বানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য মিছিল সংগঠিত হয় জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ি থেকে ধর্মতলা, সেই দিনই দক্ষিণ কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলার পহেলগাঁও-এর বৈসরন উপত্যকায় নিরীহ পর্যটকদের উপর জঙ্গিহানায় ২৬ জনের মৃত্যু হয় যার মধ্যে একজন আদিল হুসেন শাহ ছিলেন স্থানীয় সহিস, যিনি পর্যটকদের বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিলেন। সাম্প্রতিককালের নাশকতার ঘটনাগুলির মধ্যে এই সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ একটি অন্যতম ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ঘটনা।
এই ঘটনাকে তীব্র নিন্দা করে ২৪ এপ্রিল প্রেস বিবৃতি দেবার সময়েই অভয়া মঞ্চ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল এই হামলার ফসল কুড়াবে উগ্র ইসলামিক জাতীয়তাবাদ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দুত্ববাদ। নিরীহ পর্যটককে হত্যা করে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চায় যে হামলাকারীরা তাদের কোন ধর্ম নেই। সন্ত্রাসের জিগির তুলে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, নাশকতার দোহাই দিয়ে দাঙ্গার দামামা বাজায় ধর্মীয় মৌলবাদ, যার প্রধান রক্ষক ও পৃষ্ঠপোষক ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্র-ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের মদত ছাড়া কোনো সন্ত্রাসবাদ টিকে থাকতে পারে না। উপমহাদেশে সাম্প্রতিক ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ভারত-মার্কিন যৌথ সামরিক মহড়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই নাশকতা বিশেষ অর্থবহ। বর্তমান ভারতে হিন্দুভোটের মেরুকরণের জন্য ইসলামোফোবিয়া তৈরি করা যেমন জরুরি, মুসলিম ভোটের মেরুকরণের জন্য সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িক আস্ফালন ততটাই প্রয়োজনীয়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে সব চেয়ে লাভবান হচ্ছে দক্ষিণপন্থী ভোটব্যবসায়ী দলগুলি।
২৪ এপ্রিল থেকে এই হামলাকে হাতিয়ার করে শুরু হল কাশ্মীরে এবং সারা দেশে সাধারণ মুসলমান মানুষের উপর অত্যাচার এবং মানসিক নির্যাতন । জঙ্গি দমনে ঝনটু আলি শেখের মৃত্যু, পর্যটকদের বাঁচাতে চাওয়ার অপরাধে আদিল হুসেন শাহের হত্যা, সন্ত্রাসী হামলায় নিহত লেফটেন্যান্ট বিনয় নারওয়ালের স্ত্রী হিমাংশির বলিষ্ঠ উচ্চারণ – “দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক কিন্তু সব মুসলিম বা কাশ্মীরীকে নিশানা করা ঠিক নয় “ – এর কোনটাই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণ বিদ্বেষ তৈরি করা আটকাতে পারল না। সদ্য প্রিয়জন হারানো হিমাংশিকে সমাজ মাধ্যমে চূড়ান্ত ট্রোলের শিকার হতে হল। প্রতিশোধ, প্রত্যাঘাত আর প্রতিআক্রমণের উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে অধিকাংশ ভারতবাসী।
আখলাকের ফ্রিজে রাখা মাংসের জন্য পিটিয়ে মারা, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে জুনাইদ বা পহেলু খানের হত্যা, খ্রিস্টান যাজক গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে মারা, গুজরাট দাঙ্গায় বিলকিস বানোর সামনে তাঁর শিশুসন্তানকে থেঁতলে মেরে তাঁকে গণধর্ষণ, কাঠুয়ায় বিজেপির ছাতার তলায় আশ্রিত গুন্ডাদের দ্বারা ৮ বছরের মেয়ে আসিফাকে গণধর্ষণ বা বি জে পি সাংসদ ব্রিজভূষণ সিং এর দ্বারা মহিলা কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্থা– এইসব বিষয় গুলো খুব সহজে জনস্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া যায়। আমাদের এখন এটাও বিচার্য নয় যে ভারতের সিংহভাগ শ্রমজীবী মানুষের দু বেলা পেট ভরে খাওয়া জোটে না। যেখানে কাশ্মীরে প্রতি ১০ জনে একজন সেনা বা আধাসেনা থাকে সেখানে সীমান্ত থেকে ভারতীয় সেনার পোশাকে ১০ কিলোমিটার ঢুকে খুন করে ফের ১০ কিমি কী করে চলে গেল, এইসবের আগে কেন মোদি আর শাহের সফর বাতিল, মধ্যরাতে মোদি রাষ্ট্রপতি বৈঠক হয়েছে কিসের তাগিদে এবং ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথ সামরিক মহড়া আর আমেরিকা থেকে অস্ত্র কেনার আদেশ আসার পরেই কেন এই হামলা হয় এই সব প্রশ্ন করলেই দেশদ্রোহীর শিরোপা কারণ দেশপ্রেমিকরা এখন উত্তেজিত উল্লসিত –
“ওরে বাবা দেখ চেয়ে কত সেনা চলেছে সমরে
কত সেনা কত সেনা
হাজারে হাজারে হাতিয়ার বুঝি কাটাকুটি করে “
এই সব জটিল কুটিল কূটনৈতিক আলোচনা থাক। পাকিস্তানি জঙ্গি দমনে ভারত সরকারের অভিযানের নামকরণ নিয়ে একটু ভাবা যাক। অপারেশান সিন্দুর ! দেশপ্রেম এখন ভারতীয় নারীর সনাতনী সীমন্তরাগের সঙ্গে সমার্থক। তাহলে ঝনটু আলি শেখের স্ত্রী র দেশপ্রেম এবং প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথা কোন মানদণ্ডে মাপা হবে? আদিল হুসেন শাহর পরিবারের কেউই সিঁদুর পরেন না । তারা কি এই জগৎসভায় ভারতের মর্যাদা রক্ষার বাইরে থাকবে? ভারতের পার্সি খ্রিস্টান বৌদ্ধ মহিলা যাঁদের সঙ্গে সিঁদুরের সম্পর্ক নেই তাঁদের কাছে এই অভিযান কী বার্তা বহন করছে? আর যে সব মহিলারা পিতৃতন্ত্রের চিহ্নকে অস্বীকার করে সিঁদুর পরেন না তাঁরা কী উপায়ে দেশপ্রেম প্রমান করবেন? বৈদিক যুগে বিজিত পশু এবং নারীর উপর পুরুষের অধিকারের চিহ্ন বহন করে যে সিঁদুর, সেই সিঁদুরের নামে দেশরক্ষার অভিযান বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। নারী এবং শিশুরাই অসহায় শিকার হয় সমস্ত যুদ্ধ, সমস্ত দাঙ্গার। চতুর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কর্নেল সফিয়া কুরেশি এবং উইং কম্যান্ডার ভ্যোমিকা সিংকে সেনাবাহিনীর মুখ হিসেবে দেখিয়ে ক্ষমতার কাঠামোটা বদলানোর চেষ্টা হয়েছে। মহিলারা যুদ্ধে সামনের সারিতে এসে সিঁদুর মোছার প্রতিশোধ নেবে, যে সিঁদুর নারীর স্বাধিকার কে অস্বীকার করে, যে সিঁদুর সীমন্তিনীর সিঁথিতে জ্বলজ্বল করে স্বামীর অধিকারের চিহ্ন হিসাবে। বিবাহিত পুরুষদের চিহ্ন লাগেনা কারণ তাঁরা কারোর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নন। তাহলে মহিলা সেনানায়ককে সামনে এনে ক্ষমতাতন্ত্রকে বদলানো গেল কী?
আরো চতুর পরিকল্পনায় বলা হচ্ছে অপারেশন সিন্দুর হল ‘Strategic Initiative for Neutralizing Destructive Opponents with Overwhelming Retaliation’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ। কোনটা কার সংক্ষিপ্ত আর কোন টা কার সুপরিকল্পিত পরিবর্ধিত রূপ সে তর্ক অবান্তর। ২০২৫ সালের ভারত সনাতনী হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়িয়ে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে, এ অভিযান শুধু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়, পিতৃতন্ত্র আর ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কারকে অগ্রাহ্য করা স্বাধীনতাপ্রেমী নারীদের বিরুদ্ধেও। রাষ্ট্র আর উগ্রহিন্দুত্ব বাদ দেশপ্রেমের আড়ালে আক্রমণ শানাচ্ছে মানুষের ধর্মীয় অধিকার আর লিঙ্গসাম্যের বিরুদ্ধে। মুখ খুললেই দেশদ্রোহী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হবে। তাই বোধহয় এখনও পর্যন্ত কোন নারী সংগঠনের শক্তিশালী প্রতিবাদ শোনা গেল না অপারেশান সিন্দুরের বিরুদ্ধে। খেতে পাওয়া, খেতে না পাওয়া সব মানুষের উচ্ছ্বাসে ভাসছে সারা দেশ –
“সেনা দেখে লাগে ভয় লাগে ভয়
আধ পেটা খেয়ে বুঝি মরে…”
শান্তির ললিত বাণী এখন ব্যর্থ পরিহাস। কিন্তু নারীবাদী, স্বাধিকারবাদী রা ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়েও কিছু বলবেন না? বাম এবং গণতান্ত্রিক শক্তিরা ইতিহাস বিস্মৃত হবেন? পৃথিবীর সর্বত্র ‘রাষ্ট্র আক্রান্ত’ এই যুক্তি দেখিয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠ রোধ করে, প্রতিবাদী শক্তিগুলিকে পদ দলিত করা হয়েছে। ‘বিরুদ্ধতার চাবুক’ কে ভেঙ্গে ফেলার জন্য ‘war hysteria’ বা রণউন্মাদনাই রাষ্ট্রের হাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র এটা যেন আমরা ভুলে না যাই ।










