“গোলাপ বউয়ের ওপর ভার পড়েছে বটতলার মাটি বাঁধানো চাতালটাকে ভালো করে ঝাঁট দিয়ে দেবার। জটা ছড়ানো বিশাল বট গাছ। কে লাগিয়ে ছিল, কবে লাগিয়ে ছিল – এসব কথা জানা নেই গোলাপের। অন্যরাও জানেনা। গরমের সময় টিনের চাল যখন গরম চাটুর মতো তেতে ওঠে তখন গেরামের মানুষজন সব এসে ঠাঁই নেয় বট তলায়, ছায়া বিছানো চাতালের ওপর। চাতালের একদিকে বসে থাকে হরিমতী, গেরামের মধ্যে সবথেকে বয়স্ক মানুষ। ভোট বাবুরা গেরামে এসে সবার আগে হরিমতীর খোঁজ করে। বটতলার চাতালে বসে নানান ধরনের নিয়মকানুনের কথা বলে গেরামের মানুষের সঙ্গে। পোলিও দিদিরা গেরামে বাচ্চাদের পোলিও প্রতিষেধক দিতে এলেও ঐ বটতলাতেই আসর পেতে বসে।গেরামে হরেকরকম পসরা নিয়ে প্রায় নিয়মিত আসা ফেরিওয়ালাদেরও পছন্দের জায়গাও ঐ বটতলার চাতাল। পুজো – পাব্বনের আগে গেরামের মুরুব্বি মাতব্বররাও এই বটতলার চাতালে বসে নানান ধরনের আলোচনা, পরিকল্পনা করে। এককথায় বলতে গেলে ভারতের গ্রাম জীবনের ঘটমান প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এই বটতলার গভীর ভূমিকা।”
ওপরের অনুচ্ছেদে বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে আমরা সবাই হয়তো কমবেশি পরিচিত। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে আজকের গ্রাম জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই।পাকা বাড়ি,ঢালাই রাস্তা, বিজলি বাতির আলো,নলবাহিত পানীয় জলের সুবিধার প্রসার – একসময়ের চেনা গ্রাম ছবিটাকে অনেকটাই বদলে ফেলেছে। ট্র্যাজেডি এখানেই – সাবেকি পোশাক বদলে গ্রামগুলো যত স্যুটেড বুটেড হয়ে ওঠার দৌঁড়ে সামিল হয়েছে, ততই বটতলা,অশথতলা ,পাকুড়তলার চেনা ছন্দোময় জীবন হারিয়ে গেছে। টিমটিম করে এখনও হয়তো টিকে আছে বেশ কিছু গাছতলা, অতীতের এক প্রাণময় সরব অস্তিত্বের স্মারক হিসেবে ; যেখানে বসে নানান ধরনের কথাবার্তায় উঠে আসতো পুরুষানুক্রমে আগলে রাখা বিপুল অভিজ্ঞতার মূল্যবান সম্পদ।
নানা নামেই পরিচিত এই চাতাল বেদীর অংশটি। আমাদের চাতাল তাই মহারাষ্ট্রের পার বা চবুতরা, কর্ণাটক রাজ্যে এর পরিচিতি আরালিকাট্টে নামে, আর উত্তর ভারতের বিস্তির্ণ অংশের মানুষদের কাছে গাছ দিয়ে ঘেরা এমন মনখোলা আলোচনার জায়গাটি চৌপল সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে যেখানে বসে গ্রামের প্রবৃদ্ধ বুজরুগরা একসাথে বসে নানান বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে মত বিনিময় করে। এই ধারা জারি রয়েছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের উত্তরাধিকারে। মূখ্যত যেসব গাছ ছাতার মতো ছড়িয়ে থেকে অনেকটা বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছায়া দেয় সেই সব গাছকে ঘিরেই পাতা হয় আলোচনার আসর। দীর্ঘজীবী ও ছায়া প্রদানের ক্ষমতাই যেহেতু প্রধান বিবেচ্য সেহেতু বট,অশথ, পাকুড়, আম,যজ্ঞ ডুমুর কিংবা তেঁতুল গাছের নিচেই পাতা হয় আলোচনার আসর।
ভারতের গ্রাম সমাজের অন্তর্লীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যাপনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই গাছ বেদী বা পারকে নিয়ে নতুন করে ভাবনার সূচনা হয়েছে। একান্তই স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি এই পারগুলো গাছের বেড়ে ওঠাতে কোনোভাবেই বাধা সৃষ্টি করে না। মহারাষ্ট্রের গ্রামজীবনে এই বৃক্ষ বেদীর গুরুত্ব অনেক। প্রশস্ত এই বেদীর ওপর গ্রামের সাপ্তাহিক হাট বসে। হাটবারে ক্রেতা বিক্রেতাদের মুখরিত উপস্থিতিতে কেনা বেচার ধুম পড়ে যায়;
এছাড়াও ছোটখাটো বিচার সভা, গ্রামীণ দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্র থেকে শুরু করে চলমান সেলুন এবং কামারশালা হিসেবেও কাজে লাগানো হয় এই জায়গাটাকে। গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মানুষেরা এখানে সমবেত হয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প গুজব করা ছাড়াও সামাজিক নানান বিষয় নিয়ে খোলামেলা মত বিনিময় করেন। এইসব আলোচনা থেকেই পাওয়া যায় নানান সমস্যার সহজ সমাধান। এভাবেই সকলের অজান্তেই ঘটে যায় এক নীরব বিপ্লব । লোকশিক্ষার এমন সুলভ আয়োজন আর কোথায় পাওয়া যাবে?
দুর্ভোগের বিষয় হলো এই যে, আগ্রাসী নগরজীবনের দাপটে আমরা এই চিরায়ত জীবনের সুষমা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি। স্বাচ্ছন্দ্যের প্রশ্নটিকে সামনে রেখে আমাদের গ্রাম জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নিরেট কংক্রিটের আবরণী, পায়ে চলার ধুলি মাখা পথ এখন হয়ো বাঁধানো রাস্তা, আমাদের পরিচিত বট,অশথ, তেঁতুল,পাকুড়েরা হারিয়ে গেছে নানান বিদেশি গাছেদের ভিড়ে। উন্নয়ন এসে কোন মায়া তুলিকা বুলিয়ে মুছে দিয়ে গেছে আমাদের বহুদিনের পরিচিত গ্রাম বিন্যাস।
এই কংক্রিটাইজেশনের ঢেউ এসে পৌঁছেছে গাছের গুঁড়ির গোড়ায়। মাটির বেদীর জায়গা নিচ্ছে কংক্রিটের বাঁধানো পার বা চবুতরা। আমাদের শহরেও আকছার দেখা যায় রাস্তার ধারের গাছেদের গোড়া ইঁট দিয়ে বাঁধিয়ে দিতে। এমনটা গাছেদের স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। গাছেরা রোগের শিকার হয় এবং ধীরে ধীরে মারা যায়। সাবেক গাছেদের মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লুপ্ত হয়ে যায় এক আশ্চর্য ভারতীয় লোকজীবন। এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে শত শত বছর ধরে গ্রামজীবনকে নিবিড় সম্পর্কে বেঁধে রাখা মহীরুহরা।
উন্নয়নের নামে আমরা আসলে আমাদের অতীতকেই কংক্রিটের মোড়কে লোপাট করে দিচ্ছি। গ্রাম পরিবেশে ইঁট কাঠ সিমেন্টের দাপট বেড়ে যাবার ফলে আমাদের গ্রামগুলোও ক্রমশই তাপদ্বীপে পরিণত হচ্ছে, ভূমি মাতৃকা হারিয়ে ফেলছে বৃষ্টির জলকে আপন গর্ভে ধরে রাখার সহজাত ক্ষমতা, তাপদাহের প্রকোপ থেকে প্রাণিকুলকে রক্ষা করার আশ্চর্য আতপত্র।
আমাদের গ্রাম জীবন থেকে চাতাল,চবুতর, পার’দের হারিয়ে যাওয়া মানে নিছক একটি বিশেষ ধরনের কাঠামোর হারিয়ে যাওয়া নয় , একই সঙ্গে চিরকালের মতো হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের কয়েক প্রজন্মের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, সর্বজনীন সামাজিক যোগাযোগের এক কাঙ্ক্ষিত পরিসর আর তাপদাহের হাত থেকে রক্ষা পাবার সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং দেশজ পরিকাঠামো যা গড়ে উঠেছে আমাদের টেকসই যাপনের সূত্রে। এই সমস্ত চবুতরগুলোকে সংরক্ষণ করে টিকিয়ে রাখার অর্থই হলো গাছ কেন্দ্রিক এক আশ্চর্য পরম্পরা কে টিকিয়ে রাখা যা ভারতের প্রবহমান জীবনধারার প্রাণময় প্রতীক। মহারাষ্ট্র সরকারের তরফ থেকে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকা গাছেদের সংরক্ষণ করার বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।এমন গাছগুলোকে চিহ্নিত করে হেরিটেজ বৃক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থা করা হয়েছে স্পেশাল GI ট্যাগের । সাথে সাথে রাজ্যের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
যাতে যে সমস্ত গাছ ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, পৌরাণিক এবং উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সেইসব গাছকে রক্ষা করার। এরফলে গাছকে কেন্দ্র করে যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যাপনশৈলী গড়ে উঠেছে তা বহমান থাকবে আরও কিছুকাল। এই নিয়ম লাগু করা হোক ভারতের সমস্ত রাজ্যে, তাহলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন সুনিশ্চিতভাবে এক নতুন মাত্রা পাবে।
আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ত আমাদের ভ্রুকুটি দেখাচ্ছে, বাড়ছে তাপদাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব, ভেঙে পড়ছে পৃথিবীর সুষম বাস্তুতান্ত্রিক শৃঙ্খলা তখন ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের পুনঃস্থাপন ও পুনঃ অনুসরণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। একটি গাছ নিছক একটি প্রাণ নয়।একটি গাছ লক্ষ প্রাণের ধারক ও পরিসেবক। আজকের দুনিয়ায় যখন চতুর্দিকে কেবলই ভাঙনের মাতন তখনই একটা গাছ , গাছের তলার চবুতর কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড এক সংহত যাপনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই সময়ের দুনিয়ায় ছায়া (স্বস্তি) মেলেনা কোথাও। এই চরম বিশৃঙ্খল সময়ে একটি গাছ হয়ে উঠুক আমাদের অন্তরের ভালোবাসার আশ্রয়।
জুলাই ২৪.২০২৫












বটতলা,হরি মন্দির সব কালের গর্ভে।দু এক জায়গায় ভগ্ন দেউলের মত আছে কিন্তু বসার লোক নেই।
যা সেকালের তা একালে অচল — এমন ভাবনা যে সবসময় ঠিক নয় মহারাষ্ট্রের পার তা যেন আবার নতুন করে আমাদের মনে করিয়ে দিল। একটা গাছ একটা যাপন। আমরা জীবনের সেই সৌন্দর্য থেকে নিজেদের বঞ্চিত করেছি। এখন আক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
খুব ভালো লাগলো পড়ে।
ভালো লাগাটাকে ব্যাখ্যা করা যায়?