আজ ভোরে চেম্বার ছিল নাটাগড়ে। এলার্মের আওয়াজে ঘুম ভাঙতেই আক্কেল গুড়ুম। পৌনে ছটা বাজে, তবুও চারদিক অন্ধকার। সাথে ঝমঝম বৃষ্টি।
কিন্তু কিছু করার নেই। আমি খুপরিজীবী চিকিৎসক। ঝড় হোক, বন্যা হোক, ভূমিকম্প হোক- খুপরিতে সময়মতো পৌঁছাতেই হবে।
রেনকোট গায়ে জড়িয়ে স্কুটার নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। রেনকোটটা কিছুটা সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো। সব কিছুই ঠিকঠাক, শুধু চেনটা কেটে গেছে। সোদপুর রোডের মতই। সব কিছু ঠিকঠাক। শুধু রাস্তার মাঝেই জায়গায় জায়গায় পুকুর। তার উপর ক’দিন আগেই দুই জায়গায় পরপর ছয় সাতটা করে বাম্পার দিয়েছে। কেন দিয়েছে আমার মত নন- টেকনিক্যাল লোকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তাই বোঝার চেষ্টাও করিনি।
আমার ছোটোমেয়ে রানী এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন বিকালে সোদপুরের নিউ কলোনি ক্লাবের মাঠে যায়। ও একটা বাম্পারের সেটের নাম দিয়েছে দীঘা, অন্যটার বকখালি। দীঘায় স্কুটার বড় বেশি লাফায়। বকখালিতে কম।
এমনিতেই রাস্তার ভালোবাসায় স্কুটারে ‘সকার’ বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। দুবেলা দীঘার ঢেউ সামলানো ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। তবু সামলাতে হয়।
নাটাগড়ে রাজীবের চেম্বারে পৌঁছে আরো ঘাবড়ে গেলাম। ঘুরঘুট্টে অন্ধকার। তারমধ্যে দুটো মোমবাতি জ্বলছে। ব্যাঙের ডাক গ্যাঙর গ্যাঙ।
রাজীব হেসে বলল, একেবারে একেলাস বন্দোবস্ত। কারেন্ট নাই। ইনভার্টার জল ঢুকে ঘেঁটে গেছে। তবে পেশেন্টও বেশি নাই। সমস্যাও নাই।
মোমবাতির আলোয় আর মোবাইলের ফ্ল্যাশে রোগী দেখছি। প্রথম রোগীর কাঁধে দগদগে ঘা। বলছেন, রাত্রে ভালোই শুয়ে ছিলাম। সকালে উঠে দেখি এই অবস্থা। এক রাতের মধ্যে সেলুলাইটিস হয়ে যায় ডাক্তারবাবু?
বললাম, সেলুলাইটিস হয় না। কিন্তু পোকাইটিস হয়।
ভদ্রলোক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, সেটা কী রোগ?
বললাম পরের দিন যখন কারেন্ট থাকবে, ফ্যান চলবে- ব্যাখ্যা করে বলব। আপাতত ওষুধ খান আর মশারি টাঙিয়ে শোন।
পরের রোগিণীর ডায়াবেটিস। পা চুলকেই চলেছেন। যাতে চুলকাতে সুবিধা হয়, তার জন্য একটা চিরুনি নিয়ে এসেছেন। বললাম, আবার কী হলো?
তিনি বললেন, কী আবার হবে। পানিহাটিতে থাকি। পানির মধ্যে হাঁটি। যা হওয়ার তাই হয়েছে।
আরো গোটা কতক রোগী দেখলাম। তারপর রাজীবের রাধারা আসতে শুরু করলেন। যারা রাজীবের কাহিনী আগে পড়েছেন, তাঁরা সকলেই তার পরকীয়ার কথা জানেন। যত সহায় সম্বলহীন বুড়ি আছে, রাজীবের সাথে তাঁদের প্রায় রাধা কৃষ্ণের সম্পর্ক। সেইসব নায়িকাদের জন্য রাজীব করতে পারে না হেনো কাজ নেই।
বুড়িগুলোও আস্কারা পেয়ে পেয়ে আমাকে পাত্তা দেন না। একজন তো মুখের উপরই বললেন, কী ডাক্তার রে বাবা, দু- মাসে হাঁটু ব্যাথা একটুও কমাতে পারলে না।
এমনিতেই বদ্ধ ঘরে মোমবাতির গরম। মাথাটাও চট করে গরম হয়ে গেল। বললাম, তোমার কৃষ্ণকে গিয়ে বল, খারাপ ডাক্তারের বদলে ভালো ডাক্তার আনতে।
চেম্বার ঝটপট শেষ করে বের হচ্ছি, অমনি চারদিক আলো করে কারেন্ট চলে এলো। পাখা ঘুরতে শুরু করল।
রাজীব বলল, অনেক ঘেমেছেন। রেনকোট পরে আবার ঘামবেন। একটু পাখার হাওয়ায় শুকিয়ে যান।
শুধু শুধু শুকাবো? তাই বসে বসে লিখে ফেললাম। এবার বাড়ি যাই। বাড়ির সামনের খুপরিতে বসতে হবে।
বিদ্রঃ দ্বিতীয় ছবিটা শিক্ষামূলক। মশারী টাঙিয়ে শোবেন না খুব ভালো কথা। কিন্তু মশারী না টানালে যে ছাপ্পান্ন রকমের সমস্যা হয় তার একটি। পোকাইটিস













পড়ে বেশ মজা হলো যে হাজারো হ্যাপা সামলেও ভেতরের রসবোধ একেবারে শুকিয়ে যায় নি। এমনিতেই মানুষের জীবন সমস্যায় ভরে উঠছে দিন দিন তার ওপর নিজের ভেতরের তৈলাধারটি রসশূন্য হয়ে যায় তাহলেই মুশকিল। ভালো থাকুন।রসেবশে থাকুন রসরাজ হয়ে