ঐতিহ্যবাহী একটি সুখ্যাত সরকারি হাসপাতালে অনেক রাতে দীর্ঘ সময় ধরে কর্তব্যকর্মরত অবস্থায় এক হবু চিকিৎসকের অবিশ্বাস্য, অমানবিক, নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল অবলীলায়। লিঙ্গ পরিচয়ে তিনি ছিলেন একজন তরুণী নারী আর সেটাই তার জীবনে এই অভিশাপ নেমে আসার বা নামিয়ে আনার একটি প্রধান হেতু হয়ে রইল। এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে প্রায় এক বছর হতে চলল। কোন কিনারা আজও হতে দেখা গেল না! তারপর থেকে আলো-আঁধারি খেলা চলছে তো চলছেই। বরং বলা যায়— দেশবাসী দেখে চলেছে একটি ধারাবাহিক গোয়েন্দা-গল্প রচিত হওয়ার পটভূমি। ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা ঘটনাগুলি কেমন?
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা সকল বাধা-বিপত্তি অগ্রাহ্য করে প্রতিবাদ আন্দোলন জারি রেখে চলেছেন দৃঢ় পদক্ষেপে। কিন্তু পাশাপাশি তাদের পথে অনবরত কাঁটা বিছানোও অব্যাহত গতিতে চলছে। তবুও তারা হতোদ্যম হননি আজও।
• সাম্প্রতিক কালে প্রায় নিভে যাওয়া প্রদীপ থেকে অকস্মাৎ চোখ ধাঁধানো আলোর ঔজ্জ্বল্য যেন সারা দেশ জুড়ে দেখা গেল যখন প্রায় সকল স্তরের নাগরিকরা প্রবল বিক্ষোভে রাস্তায় মিছিল সম্ভব করে ফেললেন রাজ্য জুড়ে আলোড়ন ছড়িয়ে দিয়ে।
• এই প্রকার আলোর ঔজ্জ্বল্যকে ঠেকানোর জন্য অন্ধকার-প্রিয় ক্ষমতাধারীরাও নিশ্চুপ না থেকে যে কান্ডটি প্রথম ঘটিয়ে ফেললেন সেটি হল, নিহিত চিকিৎসক নারী বলে তাঁর হত্যাকাণ্ডকে ধর্ষণকান্ডের পর হত্যা ঘটানো হয়েছে — সজোর চীৎকারে এমনটি ঘোষণা করে দেওয়া হল। ধর্ষকের নাম বলে দেওয়া হল, দেওয়া হল এবং বিচার-ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে ধর্ষকের ফাঁসি দেওয়া হবে বলেও রাস্তায় নেমেই বলে দিলেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান স্বয়ং।
• একটি বিলও পাশ করা হল যাতে ধর্ষকের প্রাণদন্ডই শাস্তি প্রণালী বলে স্বীকৃতি লাভ করার কথা বলা হল। সেটি করে ফেলেছেন বীরাঙ্গনার খেতার-পিয়াসী অনন্যা নেত্রী এবং এই দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি সরকারি ব্যবস্থাপনায় সুপরিকল্পিত পদ্ধতিতে অপরাধ-কর্মাদি ঘটিয়ে চলার পথে যে প্রবল বাধা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তা নির্মূল করাতে অনেকখানি সাফল্য অর্জন করে ফেললেন চললেন, বলা চলে। কিভাবে? সংক্ষেপে বলা যেতে পারে।
• অপরাধ কর্মটির পশ্চাতে যে বিধংসী কর্মকান্ড প্রসিদ্ধ হাসপাতালটিতে চলছিল সেটি এবং তাঁর সক্রিয় ব্যবস্থাপকরা আড়ালেই থাকতে পারলেন। মূল নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাধারী তো ধরা-ছোঁওইয়ার বাইরেই থেকে গেলেন কেননা, বাংলা মায়ের এক হতভাগা সন্তানকে তিনি অনায়াসেই অপরাধী সাব্যস্ত করে দিয়ে কারাবন্দি করে দিতে পারলেন। এই আঁধার ঘনিয়ে তোলার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা কোথাও ধাক্কা খেলো না, দেখা গেল।
• গোয়েন্দা গল্প যেন লেখা হতে থাকল এভাবেই কেননা, তদন্তকারী সংস্থাগুলি হাসপাতালের প্রধান পদে অবস্থানরত এক উচ্চপদস্থ বক্তিকে আইনের আওতায় এনে ফেলেছেন এমন অধ্যায়ও তৈরি ফেললেন বানানো গল্পের মতো।
• অতঃপর, সংবাদ-মাধ্যম, সমাজ মাধ্যম সকল মাধ্যম মিলে এক রোমহর্ষক গোয়েন্দা-গল্প আস্বাদনে মগ্ন পাঠকগোষ্ঠী বানিয়ে ফেললেন সমগ্র রাজ্যবাসী তথা দেশবাসীদেরকে। বিশ্ববাসীও বাদ পড়লেন না সে গোষ্ঠী থেকে। সেভাবেই চলছে। গল্পের সমাপ্তি পাঠকদের জানা নেই। ‘ক্রমশ’ চলছে যে!
পরিশিষ্ট
তবুও প্রবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ-আন্দোলন কাকে বলে দেখা গেল যেন একযুগ বাদে এই অভাবনীয় হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে। এই আন্দোলনের বাস্তবতা অনস্বীকার্য এবং কেবল ফলের কথা ভেবে সেই বাস্তবতাকে খাটো করে দেখার প্রবণতা যেন দেশবাসীকে গ্রাস না করে। চিকিৎসক-কুল আজও হাল ছাড়েননি। আসুন আমরা সমস্বরে বলি – সংগঠিত সরকারি অপরাধকর্ম দেশ থেকে নির্মূল হোক এবং এই কান্ডের কাণ্ডারী যেন অধরা না থাকে। আলোর উপর অন্ধকার নামিয়ে আনার দাপট প্রতিহত হবেই অদূর ভবিষ্যতে – এমন বিশ্বাস নিয়েই দেশবাসী বাঁচতে শিখুক।
উত্তর পাড়ার জীবনস্মৃতি আর্কাইভ-এ প্রকাশিত আমন্ত্রণমূলক লেখা।লেখকের অনুমতিক্রমে পুন:প্রকাশিত।










