গতবছরের ঘটনা। নাইরোবি থেকে মাসাইমারা পৌঁছে ওল্কেনেইমারা ক্যাম্পে প্রথম রাত কাটলো অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা দিয়ে। ক্যাম্পের পাশে খান দশেক হায়নার চিৎকারে শাওন দার একটুও ঘুম হয়নি। আমরা অবশ্যি প্রচন্ড ক্লান্তিতে হায়নার আওয়াজ উপেক্ষা করেই প্রবল ঘুমিয়েছি। বিস্তীর্ণ তৃণভূমি সাভানা দর্শনে আমাদের ড্রাইভার জেমস ততক্ষণে উপস্থিত। সকালের ব্রেকফাস্ট করার রাস্তায় কয়েকটা ইম্পালা হরিণ লাফ দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে পরের টেন্টের পাশে লুকিয়ে পড়লো। সাড়ে ছয় ফিট উচ্চতার এক মাসাই যুবক মাসাই পোশাক পরে আমাদের খাবার এগিয়ে দিলো। ক্যাম্পের ম্যানেজার এসে প্রভাতী শুভেচ্ছা জানানোর পর হঠাৎ এক আবদার করলেন। আপনারা তো ডাক্তারবাবু। আমাদের এক কর্মচারী বেশ কয়েকদিন ধরে চুলকুনিতে ভুগছে। একটি যদি দেখে দিতেন।
মুরারী স্যার ঘাড় নামিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন “ব্রেকফাস্ট সেরে নিই। তারপর দেখছি”।
নাম না জানা খাবার গুলো খেয়ে রিসেপশনের সোফাতে বসতেই ম্যানেজার সেই কর্মচারীকে নিয়ে এলেন। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে বোঝালো তার সারা গায়ে চুলকুনি হচ্ছে। অ্যান্টিহিস্টামিন গ্রুপের সেট্রিজিন ওষুধের একটা আধখাওয়া স্ট্রিপ নিয়ে দেখালো সে। এটা খেলে একটুখানি কমে যায় বটে। কিন্তু এটা রাতে খাওয়ার পর সকালে গা ম্যাজম্যাজ করে। ঘুম পায়।বাগানের কাজে দেরী হয়।ম্যানেজার বকাবকি করে।
মুরারী স্যার ওর হাতখানা টেনে নিয়ে আঙুলের ফাঁকগুলো দেখে নিলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন – আমাদের দেশের রোগ এখানেও হচ্ছে শুভেন্দু। আমি আঙুলের ফাঁকে দেখলাম ছোট ছোট গুটি বেরিয়েছে। প্রকান্ড চেহারায় রবিঠাকুরের কায়দায় জড়ানো চাদরগুলো খুলতে বললাম। দেখলাম, পেটে, পিঠে,বগলেও ওই একই রকমের গুটিগুটি বেরিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম – বাড়িতে আর কারুর এইধরনের চুলকুনি আছে কিনা। যুবকটি বললো ওদের বস্তিতে প্রায় সবারই এই ধরনের গুটি গুটি আছে। পাশ থেকে শাওনদা জিজ্ঞেস করলো- রাতের বেলায় বেশি চুলকোয় কিনা। উত্তরে যুবকটি বললো- দিনের বেলায় অতটা না হলেও রাত্রে বেশি চুলকোয়।
আমরা তিনজনেই বুঝেছি রোগটা আসলে ‘স্কেবিস’। বাংলায় যাকে বলে ‘খোসপাঁচড়া’। সারকপটিস স্কেবি নামের এক পরজীবি চামড়ার নিচে বাসা বাঁধে। মূলত স্ত্রী সারকপটিস রাতের বেলায় চামড়া ভেদ করে ওপরে আসার ফলে এই ধরনের গুটিগুলো তৈরি হয়। চিকিৎসা খুবই সহজ। কিন্তু মুস্কিল হয় এর সংক্রমণের তীব্রতা নিয়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে হ্যান্ডশেকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্যের শরীরে। সেইজন্য ইদানীং একে যৌন সংক্রমণে ছড়িয়ে পড়া রোগের আওতায়ও আনা হয়েছে। পরিবারের একজনের হলে স্ত্রী, সন্তান সহ বাকিদেরও আক্রান্ত হতে বেশি সময় লাগে না। চিকিৎসা তাই পরিবারের সকলের একসাথে করতে হয়। না হলে পর্যায়ক্রমে ভোগান্তি চলতেই থাকে।আমাদের দেশে সাধারণত আবাসিক হস্টেলে থাকা বাচ্চারা,নোংরা পুকুরে স্নান করা,গবাদিপশুর পালন করা মানুষজনের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশিমাত্রায় দেখা যায়।
চিকিৎসা খুবই সহজ। পারমেথ্রিন, ক্রোটামিটন, সালফার জাতীয় মলম বা লোশন রাতের বেলায় গলা থেকে পা পর্যন্ত পরিবারের সকলকে মেখে রাখতে হবে। পরের দিন সকালে পরনের জামাকাপড়, বিছানার চাদর সব ভালো করে কেচে তীব্র রোদে শুকিয়ে নিতে হবে। এক সপ্তাহ পর আবার একবার একইভাবে একইপদ্ধতি পালন করতে হবে। সাথে আইভারমেকটিন ট্যাবলেট আর চুলকুনি-রোধী অ্যান্টিহিস্টামিনিক।
খসখস করে ওষুধগুলো লিখে দিলেন মুরারী স্যার। প্রয়োগ-পদ্ধতির ওপর জোর দিয়ে বললাম পরিবারের সকলকে একসাথে চিকিৎসা করতেই হবে।
এইবার খানিক ভ্রু কুঁচকে যুবকটি বললো- সবাইকে মাখাতে হলে ওর মাসাই গ্রামের প্রধানের অনুমতি নিতে হবে।
আফ্রিকা মহাদেশের বিচিত্রতায় এ আইন হয়তো বা নতুন কিছু নয়। তাই আর কথা না বাড়িয়ে আমি আর মুরারী স্যার আমাদের গাড়িতে গিয়ে উঠলাম।
শাওনদা একটু দেরিতে এসে উঠলো। যুবকটি হাত পা নেড়ে শাওনদা আর আমাদের ড্রাইভার জেমসকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে কিসব যেন জিজ্ঞেস করছিলো। গাড়িতে উঠতেই শাওনদাকে জিজ্ঞেস করলাম -কি বলছিলেন উনি?
শাওনদা কিছু বলার আগেই আমাদের ড্রাইভার জেমস বললো- বেশিরভাগ মাসাই গ্রামে মহিলারা ঐ গ্রামের যেকোনো পুরুষের সাথে যৌনতায় লিপ্ত হতে পারে। স্ত্রীর মর্যাদা দিতে গেলে গবাদিপশুর যৌতুক দিয়ে তাকে একপ্রকার কিনে নিতে হয়। এখন এই যুবকটি কতজনের পরিবারে গিয়ে গিয়ে পারমেথ্রিন লোশন লাগাতে বলবে? তার থেকে গ্রামের প্রধানের ওপর দায়িত্ব দিয়ে এই খরচ থেকে সে মুক্তি পেতে চায়।
আমরা পরস্পরের দিকে মুচকি হেসে বাইরে সাভানার তৃণভূমে দাঁড়িয়ে থাকা একপাল জেব্রা আর ওয়াইল্ড বিষ্টের দিকে তাকিয়ে থাকা এক দল হায়েনার লোলুপ দৃষ্টি ক্যামেরাবন্দী করতে প্রস্তুত হলাম।










