ক’দিন আগে অব্দি এসএসকেএমে কার্ডিওলজি রেসিডেন্সি করেছি। সোমবার ক্যাথল্যাব থাকতো, সকাল সাড়ে আটটা থেকে সন্ধ্যা অব্দি কেস চলতো, দুপুরে খাওয়াদাওয়ার কোনো গল্প ছিল না। ডিউটি সেরে রাতে হোস্টেলে ফিরে পরেরদিন ইকো ডিউটি থাকতো। সকাল থেকে শখানেক ইকো, যখন বড় হলাম বাচ্চাদের ইকো, নিজের হাসপাতাল সেরে শম্ভুনাথ হাসপাতালে ইকো। তার সাথে ক্লাস, রাউন্ড সব সেরে আধমরা হয়ে বাড়ি ফিরতাম। বুধবার আইসিসিউ সকাল সকাল, বিকেলে ডে কেয়ার এঞ্জিওগ্রাফি করতাম। পেন্ডিং থাকলে পেসমেকার। কাজ সারতে সারতে সন্ধ্যা, যখন বড় হলাম সেই জায়গায় জুটলো আউটডোর, মাথা খারাপ করা আউটডোর!! তারপর বৃহস্পতিবার অ্যাড ডে, চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি। সকালে আউটডোর, তারপর ইমার্জেন্সী, রেফার গোটা হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে, ট্রমা সেন্টারে ইকো ইত্যাদি। শুক্রবার সকাল থেকে ক্লাস, রাউন্ড, তারপর প্রাইমারি এনজিওপ্লাস্টি যদি কিছু থাকে… সন্ধ্যায় রাউন্ড সেরে বাড়ি। শনিবার ট্রমা সেন্টারে গুচ্ছের এঞ্জিওগ্রাফি, পেসমেকার, শেষ হতে হতে সন্ধ্যা। রবিবার রাউন্ড, প্রি অপ চ্যানেল ইত্যাদি, আবার রোটেশনে এডমিশান ডে ও ডিউটি পড়ত।
একা ছিলাম। পিজিতে অদ্ভুত সিস্টেমে এক ইউনিটে তিনজন, এক ইউনিটে একজন। একা থাকায় ছুটি জুটতো না, তিন বছরে কদিন হাসপাতালে যাইনি হাতে গুনে বলা যায়। পার্সোনাল লাইফ, ফ্যমিলি লাইফ বলে কিছু ছিল না। তার মাঝেই পরীক্ষা, তার মাঝেই চোরদের শুশ্রুষা, তাদের শেল্টার দেওয়া ইত্যাদি আজগুবি কাজ।
এটা আমার তিন বছরের গল্প শুধু নয়। তার আগে মেডিসিনেও জীবনটা অনেকটা এরকমই ছিল, হয়তো একটু বেটার… তখন আবার কোভিড ডিউটি ছিল অমানুষিক… তার আগে ইন্টার্নশিপের ডিউটিও অলমোস্ট কাছাকাছিই…
এটা শুধু আমার একার গল্প নয়। জুনিয়র ডাক্তার যারা যারা ডিউটি করেছে, রেসিডেন্সি করেছে, মোটামুটি কম বেশি সবাই এভাবেই জীবন কাটিয়েছেন।
হঠাৎ কেন বললাম!! ডিউটি করে হাপুস নয়নে কাঁদছে কেউ, এই ছবি মিডিয়াতে দেখিনি। ডিউটির চাপে কোর্স ছেড়ে দেওয়া, সুইসাইড হয়নি বলবো না, হয়তো হয়েছেও কোথাও কোথাও। মিডিয়া কিন্তু দেখায়নি। সব থেকে বড় কথা মুখ্যমন্ত্রী ঘটা করে সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করেননি যে জুনিয়র ডাক্তারদের অমানবিক ডিউটি করানো হচ্ছে!! বরং উল্টে মাঝে মধ্যেই ‘খুনি’ ইত্যাদি বলতে শোনা গেছে। আসলে এই গল্পটা বলে দিলে সরকারি হাসপাতালে নিজস্ব পরিকাঠামো কতটা জুনিয়র ডাক্তারদের ঘাড় ভেঙে চলছে সেটা ধরা পড়ে যাবে, আর বিএলও দের কষ্ট নিয়ে ঢাক পেটালে কটা সিমপাথি ভোট পাওয়া যাবে। তাই এই দ্বিচারিতা আর কি…
ঠিক যেভাবে এ রাজ্যে ডেঙ্গুতে কেউ মরেনি, করোনা তে মরেনি, কিন্তু এসআইআরে মরেছে, ঠিক সেইভাবে….










