এই একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের মত ‘ উন্নয়নশীল ‘ দেশে, ‘ সচেতন ‘ রাজ্যে এবং ‘ সংস্কৃতিবান ‘ মহানগরীতে অবৈজ্ঞানিক ও নিয়মবিরুদ্ধভাবে ম্যানহোল পরিষ্কার করতে গিয়ে প্রতিবছর বহু শ্রমিক প্রাণ হারাচ্ছেন। এদের বেশিরভাগই অত্যন্ত দরিদ্র দলিত পরিবার থেকে উঠে আসা। প্রথমত আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার করলে এই মৃত্যুগুলি প্রতিহত করা যায়। এরপরও কোন ক্ষেত্রে একান্ত প্রয়োজনে যদি শ্রমিকদের নামাতে হয় তাহলে পদ্ধতি মেনে নামানো উচিৎ যাতে বিপদের সম্ভবনা অনেক কম।
অথচ এগুলি কোনটাই করা হয় না। কলকাতা কর্পোরেশন দাবি করে তাদের ড্রেন ও ম্যানহোল পরিষ্কারের জন্য ‘ গালিপিট ক্লিনজিং মেশিন ‘, ‘ পাওয়ার বাকেট মেশিন ‘, ‘ জেট কাম সাকশান মেশিন ‘, ‘ ম্যানহোল ডিসিল্টিং মেশিন ‘, ‘ ব্লো ভ্যাক মেশিন ‘, ‘ ওপেন নালা ডিসিল্টিং মেশিন’ ইত্যাদির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে দেখা যায় কর্পোরেশন যোগসাজশের ঠিকাদারদের এই দায়িত্ব দেয় এবং এই সব ঠিকাদার আবার তাদের অধীনস্ত ছোট ঠিকাদারদের। তারা গ্রাম বা শহর লাগোয়া ঝুপড়ির অত্যন্ত গরীব ধাঙ্গর / মেথর / বাল্মীকি সম্প্রদায়ের এবং অন্যান্য দলিত পরিবার থেকে সস্তা শ্রমিক সংগ্রহ করে কোন নিরাপত্তার ব্যবস্থা না নিয়ে ম্যানহোলের ভিতরে অন্ধকারে এমনকি ৬০ / ৭০ ফুট গভীরে দড়ি ঝুলিয়ে শ্রমিকদের নামিয়ে দেয়। না থাকে আলোর ব্যবস্থা, উপযুক্ত মই, নজরদারি, বিপদ ঘটলে দ্রুত তুলে আনার ব্যবস্থা। না করা হয় ম্যানহোল খুলে নিয়মমত প্রথমে পর্যবেক্ষণ, ‘ গ্যাস ডিটেক্টর ‘ দিয়ে পরীক্ষা, তারপর হাওয়া ঢুকিয়ে ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা। শ্রমিকদের না থাকে ‘ পোর্টেবল গ্যাস মনিটর ‘, ‘ হেলমেট উইথ লাইট ‘, ‘ পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (PPE) ‘ অক্সিজেন ব্যাক আপ ইত্যাদি। তাদের থাকে না কোন প্রশিক্ষণ। কলকাতা কর্পোরেশনের যখন এই অবস্থা তখন পুরসভা গুলোর অবস্থা কহতব্য নয়। কলকাতা কর্পোরেশন এবং পুরসভা গুলোতে এখনও ঔপনিবেশিক আমলের’ সুয়্যার ক্লিনজিং মজদুর ‘ পদ রয়ে গেছে।
শ্রমিকরা অসুস্থ হলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে না। সর্দার রা শেখায় নর্দমায় আরশোলা থাকলে ভয় নেই। কিছু না থাকলে বিষ গ্যাস থাকতে পারে। ঐ ঘুটঘুটে অন্ধকারে দুর্গন্ধ ও কাদা – আবর্জনা – নোংরা জলের মধ্যে দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে ওসব কি দেখা – বোঝা সম্ভব? তাছাড়া এই কাজটুকু করলে তবেই ঠিকাদার কিছু টাকা দেবে। নিজের ও বাড়ির অন্যদের পেট চলবে। আর এই কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে, দুর্ঘটনায়, কাদা – পাঁকে ডুবে, জলে ডুবে বা ভেসে গিয়ে প্রায়শই মৃত্যু হয়। মৃত্যু হলে কোন বিমার আওতায় না থাকায় অভাবী পরিবারগুলো আতান্তরে পর। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই কাজে মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়িয়ে পরিবারকে ৩০ লক্ষ টাকা এবং আহতদের পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা বলেন। ২০২১ এ কলকাতার কুদঘাটের ঘটনায় কলকাতা হাইকোর্টও ক্ষতিপূরণের আদেশ দেন। আজ অবধি ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ পাননি।
ভুগর্ভস্থ নর্দমায় পাঁক, আবর্জনা, মানুষের মলমূত্র পচে মিথেন (CH4), কার্বন মনোক্সাইড (CO), হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S), কার্বন ডাই অক্সাইড (CO) ইত্যাদি বিষাক্ত গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই ক্ষতিকর গ্রিন হাউজ গ্যাস গুলোর মধ্যে মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইড অত্যন্ত মারাত্মক। রং ও গন্ধহীন মিথেন গ্যাস বাতাসের চাইতে হাল্কা হওয়ায় বদ্ধ নর্দমার উপরের স্তরে জমে থাকে। এই গ্যাস দাহ্য তাই যেমন আগুন লাগাতে ও বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, তেমন ই এর অক্সিজেন সরিয়ে দেওয়ার চরিত্রের জন্য অক্সিজেনের অভাবে শ্বাস কষ্টে মৃত্যু ঘটে (Asphyxial Death)।
বহু বছর ধরে পদ্মভূষণ বিন্দেশ্বর পাঠক (১৯৪৩ – ২০২৩), ম্যাগসেসে পুরস্কার বিজয়ী বেজওয়াদা উইলসন (জন্ম: ১৯৬৬), পদ্মশ্রী ঊষা চৌমার (জন্ম: ১৯৭৮) প্রমুখ ব্যক্তিত্ব এবং ‘ সাফাই কর্মচারী আন্দোলন (SKA) ‘, ‘ সুলভ ইন্টারন্যাশনাল ‘ প্রমুখ সংগঠনগুলো খালি হাতে পায়খানা (Latrine) ও মলমূত্র (Human Excreta) পরিষ্কার, মাথায় করে মল বহন, ঝুঁকি নিয়ে ম্যানহোলে নেমে কার্যত খালি হাতে পরিস্কার ইত্যাদির বিরোধিতা করে আসছেন এবং বেশ কিছু সচেতনতা ও বিক্ষোভ কর্মসূচি সংঘটিত করেছেন। যার ফল স্বরূপ ১৯৯৩ তেই সুপ্রিম কোর্ট ‘ Employment of Manual Scavengers & Construction of Dry Latrines (Prohibition) Act’ এর মধ্যে দিয়ে খালি হাতে মলমূত্র পরিষ্কার, মলমূত্র বহন, মানুষ নামিয়ে ভুগর্ভস্থ নালা বা ম্যানহোল পরিষ্কার ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেন। এরপর ২০১৩ তে লাগু হয় ‘ Prohibition of Employment as Manual Scavengers & their Rehabilitation Act (PEMSR)। ২০১৪ থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় ‘ স্বচ্ছ ভারত অভিযান ‘। পরে শুরু হয়’ National Action for Mechanized Sanitation Eco system (NAMASTE) প্রকল্প। ২০২৫ এর ২৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় এই বিপজ্জনক কর্যকলাপগুলোকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেয়। তারপরও এগুলো চলতে থাকে, ডেকে আনে একের পর এক দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়। সরকারি পরিসংখ্যানেই বলা হয়েছে ২০১৮ থেকে ‘২৩ অবধি ম্যানহোল পরিষ্কার করতে গিয়ে ৪০০ – র বেশি শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন উচ্চবর্ণ নিয়ন্ত্রিত ভারতীয় সমাজের সামন্ত – জাতিভেদ ব্যবস্থায় হিন্দু ধর্মের জন্মগত শ্রম বিভাজনে যেমন ডোম / হরি / মুদ্দাফরাস রাই কেবল মৃতদেহের ব্যবস্থাপনা করার; মুচি / চামার / রবি দাস / রুই দাস রা কেবল মৃত পশুর চামড়া নিয়ে কাজ, পাদুকা মেরামতি ইত্যাদি করার; সেরকম ই ধাঙ্গর / মেথর / চন্ডাল / বাল্মীকি রাই কেবল বংশানুক্রমে মলমূত্র আবর্জনা সাফাই করার অভিশাপ বহন করে চলেছে। আর্থ – সামাজিক – রাজনৈতিক ভাবেও এই দলিত – তফসিলি সম্প্রদায়গুলো অত্যন্ত দরিদ্র, অবহেলিত ও প্রান্তিক। বর্তমান ভারতীয় রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুবাদীদের জোরালো উত্থান, মনুস্মৃতি – বর্ণবাদ – শোষণ – আর্থিক বৈষম্য বৃদ্ধি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে। এদের সংখ্যালঘু সুচতুর বর্ণহিন্দু রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা বৃহত্তর দলিত সমাজের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় বসার জন্য বহু জায়গায় সন্ত রবি দাস, বাবাসাহেব আম্বেদকর প্রমুখের মূর্তি বসান, বক্তৃতায় জয়গান করেন; কিন্তু প্রতিদিনকার রাষ্ট্র পরিচালনায় মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, সন্ত তুকারাম, সন্ত রবি দাস, মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে, সাবিত্রী ফুলে, বাবা সাহেব আম্বেদকর দের জাতিভেদ ও বর্ণাশ্রম প্রথা অবসানের মৌলিক চিন্তাকে নস্যাৎ করে চলেন।
৩০.১১.২০২৫










