অতীতে যাই থাক না কেন বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি দরিদ্র, সমস্যাসঙ্কুল, জনবহুল, পেছিয়ে পড়া রাজ্য যেখানে শিল্প, কৃষি, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণ পরিবহন, আইন – শৃঙ্খলা, পরিবেশ, সংস্কৃতি সব কিছু রসাতলে। কংগ্রেসী আমলের কেন্দ্রের বঞ্চনা, মাসুল সমীকরণ নীতি, নৈরাজ্যবাদী সন্ত্রাস ও তাকে নৃশংস দমন, আত্মঘাতী বাম আন্দোলন, শিল্প ও পুঁজির পশ্চিম ভারতে গমন ইত্যাদি দিয়ে যার শুরু, ৩৪ বছরের বাম আমলে যার সার্বিক ও ধারাবাহিক অধোগতি, পরিশেষে বিগত ১১ বছরের তৃণমূলী শাসনে তার চূড়ান্ত ও সামগ্রিক অবনমন।
ছোটখাটো উৎপাদনই হোক কিংবা চাল – গম – ডাল – মাছ – পেঁয়াজ সবকিছুতেই এখন অন্য রাজ্য নির্ভরতা। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, সামান্য রুজিরোজগার থেকে ভদ্রস্থ কর্মসংস্থান – এখন সব কিছুর জন্য অন্য রাজ্যে পাড়ি জমাতে হয়। দুর্নীতি, নৈরাজ্য, অপরাধ, নারী নির্যাতন, পরিবেশ দূষণ রাজ্যব্যাপী। এখানকার মত কলুষিত, নোংরা ও হিংসাত্মক রাজনীতি এবং ভোট নিয়ে সারা বছর মাতামাতি কোন রাজ্যে দেখা যায় না। বিগত দশকে সুস্থ চিন্তা – চেতনা – সংস্কৃতির বিকাশের পরিবর্তে আর এস এসের দুই স্তম্ভ তৃণমূল এবং বিজেপির মাধ্যমে হিন্দুত্বর নামে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় বর্বরতা ও উন্মাদনা বেড়েই চলেছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিষাক্ত ওয়াহাবি – সালাফি ইসলামি মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ।
সেই পশ্চিমবঙ্গের সবচাইতে পিছিয়ে পড়া জেলাগুলির একটি গরীব মুসলমান ও দলিত অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ। জা দ্রেজ ও অমর্ত্য সেনের উন্নয়নের সুযোগ নিয়ে বিখ্যাত বইটিতে দেশের তিনটি পিছিয়ে পড়া জেলাকে তুলনামূলক আলোচনায় রাখা হয়েছিল – রাজস্থানের বারমের, ওড়িশার বোলাঙ্গীর এবং পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পে এখানকার দরিদ্র পরিবারগুলি কর্তৃক বাড়ির মেয়েদের বিক্রির উল্লেখ আছে। জেলার বাস্তব অবস্থা আরও মর্মন্তুদ। জেলার বগরি ও রাঢ় দুটি ভৌগোলিক অঞ্চল ঘুরলে শুধু দেখা যাবে অভাব, ক্ষোভ, হতাশা আর উন্নয়নের নামে প্রতারনা।
লোভী ও মুনাফাকারী মানুষ এবং আক্রান্ত প্রকৃতির যৌথ অভিযানে এবং কেন্দ্র – রাজ্যের সীমাহীন অবহেলায় গঙ্গা, পদ্মা ও ভাগীরথীর ভয়াল ভাঙনে এই জেলা চূর্ণ – বিচূর্ণ। ধুঁকতে থাকা বিড়ি শিল্প এবং জাতীয় সড়ক ঘিরে ধাবা ও পতিতাবৃত্তি ছাড়া কোন শিল্প নেই। কৃষি প্রবল সংকটে। শ্রম ও খরচের টাকা ওঠেনা, পাটের আর বাজার নেই। মিষ্টি জলের স্থায়ী আধার বিস্তৃত বিল অঞ্চল এবং ভৈরব – জলঙ্গী শুকিয়ে গেছে। পেটের দায়ে বেশির ভাগ গৃহের বালক থেকে প্রৌঢ় – সকলকে আড়কাঠির মাধ্যমে অন্য জেলায় কিংবা অন্য রাজ্যে যেতে হয় শ্রমিকের কাজ করতে যার বড় একটি অংশ নির্মাণ শিল্পে রাজমিস্ত্রি ও জোগাড়ের কাজে যুক্ত। স্বাভাবিকভাবে স্কুল ছুট এর সংখ্যা বিপুল। নাবালিকা বিবাহ, নাবালিকা মায়ের সংখ্যাও প্রচুর। দেশের বিভিন্ন পতিতালয়ে এবং ধনী গৃহে যৌন দাসীর কাজে নারী পাচার দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার সঙ্গে এই জেলায় সর্বাধিক।
একটি বড় সংখ্যক মানুষ বাংলাদেশ সীমান্তের বিভিন্ন অরক্ষিত ঘাট দিয়ে বি এস এফ, রাজ্য পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের দাদন দিয়ে যথেচ্ছ গরু ও মানব বিশেষত নারী পাচার; ড্রাগস, সোনা, অস্ত্র, জাল নোট, চিনা সিল্ক সহ বিভিন্ন দ্রব্য চোরাচালান; ডাকাতি; সুপারি খুন; নানারকম অপরাধ প্রভৃতির সঙ্গে যুক্ত। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী নেশা করার কাশির ওষুধ, আঠা থেকে প্রতিটি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং সার, ইস্পাত, সিমেন্ট, পাথর ইত্যাদি বাংলাদেশে চোরাচালান করে বিপুল মুনাফা অর্জন করে। অন্যদিকে কোন রাষ্ট্রীয় সংস্থা নয়, মোদিবান্ধব আদানি গোষ্ঠী ঝাড়খণ্ডের গোড্ডাতে উৎপন্ন তাপবিদ্যুৎ লালবাগের মূল্যবান আম বাগান কেটে জেলার মধ্যে দিয়ে লাইন নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে বিক্রি করে মুনাফা লুঠছে। আরব মূলুকে শিশু ও নারী পাচার চক্রও এই জেলায় খুব সক্রিয়। জনপ্রিয় হজ ধর্মীয় পর্যটন।অশিক্ষা, দারিদ্র, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতার উপর ভর করে এখানকার সমাজ জীবন কে গ্রাস করে রেখেছে মাফিয়া বাহিনী, অসাধু রাজনীতিক এবং ধর্মীয় মৌলবাদীরা।
মুর্শিদাবাদ কে তাই বেছে নেওয়া হয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদ চাষের মডেল খামার এবং ধর্মীয় বিভাজন ও সাম্রদায়িক মেরুকরণের মুক্তাঞ্চল হিসাবে যার অন্তিম লক্ষ্য মানুষের মৌলিক দাবিগুলিকে আড়াল করে ধর্মের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, যে কোন মূল্যে ক্ষমতা দখল এবং ধরে রাখা। এই বৃহৎ পরিকল্পনার বেশ কিছু খেলোয়াড় – বৃহৎ পারিবারিক ও কর্পোরেট পুঁজি লালিত কেন্দ্রের শাসক দল, লুম্পেন পুঁজি ও মাফিয়া পালিত রাজ্যের শাসক দল এবং আরব মূলুকের তেলের টাকায় বলীয়ান রাজ্যের ও দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্যান – ইসলামিক মৌলবাদী শক্তি। যেখানে রেজিনগরের চিবিয়ে, স্থানীয় লবজে, গুছিয়ে কথা বলা প্রাক্তন কংগ্রেস, তৃণমূল ও বিজেপির বাহুবলী নেতা ও ‘ ব্যবসায়ী ‘ হুমায়ুন কবীর মহম্মদ আলি জিন্না না হলেও আসাউদ্দিন ওয়েসি র ভূমিকায় অবতীর্ণ। যাবতীয় পয়সা খাওয়া সংবাদমাধ্যম নিয়েছে এইসব দুরাচার প্রচারের গুরু দায়িত্ব।
সামনে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। তিলোত্তমা, বরুণ বিশ্বাস, আনিস খান, কামদুনির তরুণী হত্যা … একের পর এক লোমহর্ষক ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা, অবৈধ কয়লা বালি গরু পাচার – সব অপরাধ ধামা চাপা পড়ে গেছে। কেষ্ট মণ্ডল, বালু মল্লিক, আলু পার্থ … মাননীয়ার বিশ্বস্ত সেনাপতি এবং সমস্ত দুর্নীতির নাটের গুরুরা দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কালীঘাটের কাকুর কন্ঠস্বর শুনেও ই ডি, সি বি আই আজ অবধি কালীঘাটের অগভীর পচা নালা পেরোতে পারল না। সারদা থেকে নারদা, খাগড়াগড়ে ইসলামি জিহাদীদের বিস্ফোরণ, বগটুই গণহত্যা, সন্দেশখালীর জমি দখল, সমসেরগঞ্জ দাঙ্গা, নিয়োগ দুর্নীতি, চাকরি হরণ, ডি এ বঞ্চনা, পাচামিতে আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদ … সব ঘুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তথাকথিত বাম, বিপ্লবী, প্রগতিশীল, বিদ্বজ্জন হয় নির্বাক দর্শক অথবা চক্রান্তকারী লুঠেরাদের দোসর। এন আর সি, সি এ এ, এস আই আর প্রভৃতির চক্করে নাগরিক সমাজকে বেনাগরিক করে, রাষ্ট্র কর্তৃক স্থানীয় দাদাদের তোলা ও নিয়ন্ত্রণের উপর তাদের ছেড়ে দিয়ে এবং তাদেরই প্রদেয় করে কিছু ডোল ছুঁড়ে দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। অশিক্ষা, ধর্ম, নেশা, পর্ণ, অপসংস্কৃতি ও দলদাসের বাঁধনে যুব সমাজকে করে দেওয়া হয়েছে স্থবির।
প্রতিবেশী সোনার বাংলা ইতিমধ্যেই সাম্রাজ্যবাদী এবং মৌলবাদী চক্রান্তে তালিবানী খিলাফতে পরিণত। এদিকে পশ্চিমবাংলার আকাশে আজ ঘন কালো মেঘ। একদা ব্রিগেড ছিল লালে লাল এবং মা মাটি মানুষে ভরা। এখন সেখানে গেরুয়াধারী অসাধু ব্রাহ্মণ্যবাদী পুনরুত্থানবাদীদের হানা। বাংলাদেশ সীমান্তের এলাকা গুলিতে আগেই ঘটে গেছে, চলে আসতে হয়েছে জেলার অন্যত্র অনেকটা পশ্চিম দিকে সরে। এবার সাধারণ মানুষ চিন্তিত যে পশ্চিমবঙ্গের অন্যত্রও কি শয়তান ধান্দাবাজ নীতিহীন ক্ষমতালোভী রাজনীতিকদের হাত ধরে ৮০ বছর বাদে দ্বি জাতি তত্ত্বের (৪০% মুসলমান, ৬০% হিন্দু) ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ আবার ভাগ হবে? পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের কিছু জেলাকে নিয়ে কি বৃহত্তর ইসলামিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে? অতীতের নোয়াখালী – কলকাতার মত বাংলার মাটি কি আবার রক্তাক্ত হয়ে উঠবে? দেশ ভাগ ও বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়ের মত ভিটে মাটি, মহিলাদের ইজ্জত হারিয়ে আবার কি শরণার্থী হয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে?
তাহলে কি কিছু করার নেই? সব পরিস্থিতিতেই কিছু না কিছু করা যায়। ধরুন দক্ষিণপন্থী ধর্মান্ধ দুরভিসন্ধি মৌলবাদীরা যখন সমস্ত পরিসর দখল করে নিতে চাইছে তখন যারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, ধর্ম নিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী তাঁরা কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন? নিশ্চয় নয়।
তাঁদের প্রথমে উচিত ঐক্যবদ্ধ হওয়া। তারপর মানুষের মৌলিক ও প্রয়োজনীয় দাবি গুলি তুলে ধরা। প্রয়োজন অনুযায়ী আন্দোলন গড়ে তোলা। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে সমস্ত বাম ও জাতীয়তাবাদী দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দক্ষিণপন্থী ও মৌলবাদীদের বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা।









পরিস্থিতির যথাযথ বিশ্লেষণ আর সঠিক মূল্যায়ন। আমরা সবাই চাই বাম গণতান্ত্রিক শক্তি একজোট হোক।